সড়কে প্রতিদিন চলাচল করা হাজারো সিএনজি চালিত থ্রি-হুইলারের নিচে সংযুক্ত গ্যাস সিলিন্ডার এখন জননিরাপত্তার জন্য এক নীরব হুমকিতে পরিণত হয়েছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়মিত পরীক্ষা এবং কার্যকর সরকারি তদারকির অভাবে এসব সিলিন্ডারের অনেকগুলোই যেন সম্ভাব্য দুর্ঘটনার অপেক্ষায় থাকা ‘চলন্ত বোমা’। ফলে চালক, যাত্রী ও পথচারী—সবাই রয়েছেন বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে।
গ্যাস সিলিন্ডার বিধিমালা-২০০৩-এর ২৭ ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি সিএনজি সিলিন্ডার তিন বছর পরপর পুনঃপরীক্ষা (রি-টেস্টিং) করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানা হচ্ছে না। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বহু যানবাহনে ব্যবহৃত সিলিন্ডার দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত সিলিন্ডারের পরিবর্তে খোলা বাজার থেকে সংগ্রহ করা পুরনো, মানহীন ও অজানা উৎসের সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে।
সংগৃহীত বিভিন্ন স্থিরচিত্রে দেখা যায়, উচ্চচাপের গ্যাস সিলিন্ডারের সংযোগস্থলে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সাধারণ টেপ ব্যবহার করে গ্যাস লিক বন্ধের চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক সিলিন্ডার মরিচা ধরা, ক্ষয়প্রাপ্ত এবং দৃশ্যত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এমনকি ১০ থেকে ১২ বছর পুরনো সিলিন্ডারও কোনো পুনঃপরীক্ষা ছাড়াই সড়কে চলাচল করছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চচাপের গ্যাস ধারণকারী এসব সিলিন্ডারে সামান্য ত্রুটিও ভয়াবহ বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে সিলিন্ডারের অভ্যন্তরীণ চাপ বেড়ে গেলে ঝুঁকি আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। একটি বিস্ফোরণ মুহূর্তেই বহু মানুষের প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এদিকে চালকদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় অনুমোদিত রি-টেস্টিং সেন্টার না থাকায় তারা নিয়ম মেনে পরীক্ষা করাতে পারছেন না। এক সিএনজি চালক ফারুক মিয়া বলেন, “আইন আছে, কিন্তু পরীক্ষা করানোর সুযোগ নেই। তাই বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়।”
বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি সিলিন্ডারের গায়ে উৎপাদনকারী দেশ, ওজন, ধারণক্ষমতা এবং পরবর্তী পরীক্ষার তারিখ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ‘আফটার মার্কেট’ সিলিন্ডারে এসব তথ্য অনুপস্থিত। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু চক্র ভুয়া স্টিকার ও জাল সনদের মাধ্যমে অবৈধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারকে বৈধ হিসেবে ব্যবহার করছে।
সচেতন মহলের মতে, বিষয়টি শুধু পরিবহন নিরাপত্তার নয়, এটি সরাসরি জননিরাপত্তা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। প্রতিদিন লাখো মানুষ এসব যানবাহনে যাতায়াত করছেন, অথচ তাদের অনেকেই জানেন না যে তারা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ভ্রমণ করছেন।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট আলমগীর কিবরিয়া কামরুল বলেন, “মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এটি নাগরিকের নিরাপদ জীবনের সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষা কেন্দ্র না থাকা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর দায় এড়ানোর সুযোগ হতে পারে না।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে সিলিন্ডারের বৈধতা যাচাই, নিয়মিত হাইড্রোস্ট্যাটিক টেস্ট নিশ্চিত করা এবং বৈধ পরীক্ষার সনদ ছাড়া গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করা জরুরি। একই সঙ্গে বিআরটিএ, বিস্ফোরক পরিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অবৈধ সিলিন্ডার অপসারণ করতে হবে।
সচেতন নাগরিকদেরও এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কোনো সিএনজি চালিত যানবাহনে মরিচা ধরা, ক্ষতিগ্রস্ত বা অস্বাভাবিক অবস্থার সিলিন্ডার চোখে পড়লে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত বলে তারা মনে করেন।
নিরাপদ সড়ক শুধু উন্নত অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে যানবাহনের কারিগরি নিরাপত্তা, নিয়মিত তদারকি এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগ। এখনই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে একটি বড় দুর্ঘটনার পরই হয়তো আবারও সচেতন হওয়ার আলোচনা শুরু হবে। কিন্তু তখন অনেক মূল্যবান প্রাণ হারিয়ে যেতে পারে। জনস্বার্থে তাই ‘চলন্ত বোমা’ হয়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ সিএনজি সিলিন্ডারের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।






এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।