ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ী সাব-পোস্ট অফিসে কর্মরত প্রবীণ ডাককর্মী মো. নুরুজ্জামান খান রতনের অবসর উপলক্ষে এক আবেগঘন বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন অনুষ্ঠিত। দীর্ঘ প্রায় ৪১ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের ইতি টেনে তিনি বিদায় নিয়েছেন বাংলাদেশ ডাক বিভাগের দায়িত্ব থেকে। ১৯৮৫ সালের ৩ জানুয়ারি চাকরিজীবন শুরু করে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও মানবিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
ডাক বিভাগের স্বর্ণযুগ থেকে শুরু করে ডিজিটাল যুগের রূপান্তর—সবকিছুরই জীবন্ত সাক্ষী ছিলেন নুরুজ্জামান খান রতন। একসময় সকাল ৮টায় অফিসে এসে চিঠিপত্র গোছানো শেষে সকাল ১০টার মধ্যে বের হয়ে যেতেন গ্রাম থেকে গ্রামে। হেঁটে, কখনো রিকশায় চড়ে মানুষের সুখ-দুঃখের সংবাদ পৌঁছে দিতেন বাড়ি বাড়ি। ফিরতে ফিরতে বিকেল গড়িয়ে যেত। সরকারি চিঠির পাশাপাশি ব্যক্তিগত চিঠি, মানি অর্ডার, পার্সেল, বিমার কাগজ—সবই ছিল তাঁর দায়িত্বের অংশ। মানুষের অপেক্ষা, আবেগ আর প্রয়োজনকে নিজের কর্তব্যের সঙ্গে একাকার করে নিয়েছিলেন তিনি।
ডাক বিভাগে কর্মরত কর্মীদের সেই হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যেরই এক নীরব সৈনিক ছিলেন রতন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কবিতা ‘রানার’-এর মতোই যেন তাঁর জীবনও ছিল অবিরাম ছুটে চলার গল্প। রাতের অন্ধকার, দূরপথ কিংবা ক্লান্তি—কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। মানুষের দোরগোড়ায় খবর পৌঁছে দেওয়ার সেই দায়িত্ববোধ আজও স্মৃতিতে জাগিয়ে তোলে ডাক বিভাগের গৌরবময় অতীতকে।
একসময় লণ্ঠন, ঘণ্টা আর বল্লম হাতে ডাকহরকরারা যেভাবে রাতের আঁধারে দূর-দূরান্তে ডাক বয়ে নিয়ে যেতেন, সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করেছেন নুরুজ্জামান খান রতন। তাঁর চাকরিজীবনের মাধ্যমে যেন একসঙ্গে যুক্ত হয়েছে চারটি প্রজন্ম—দাদা, বাবা, সন্তান ও নাতির সময়কাল। মানুষের জীবনের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে থেকেছেন তিনি।
বিদায় অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে ডাক বিভাগের পুরোনো আবেগ অনেকটাই ফিকে হয়ে গেলেও নুরুজ্জামান খান রতনের মতো কর্মীদের আত্মত্যাগ ও নিষ্ঠা ডাক বিভাগের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁরা তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও শান্তিময় অবসরজীবন কামনা করেন।
আঠারবাড়ী সাব-পোস্ট অফিসের সাব-পোস্টমাস্টার মো. সাজ্জাদুল হক (রুবেল) বলেন, “রতন সাহেব ন্যায় ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রায় চারটি প্রজন্মের মানুষের সঙ্গে কাজ করেছেন। পোস্ট অফিসের স্বর্ণযুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তাঁর কর্মজীবন আমাদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।”
দীর্ঘ কর্মময় জীবনের শেষে নুরুজ্জামান খান রতনের বিদায় যেন শুধু একজন কর্মীর অবসর নয়; বরং একটি সময়, একটি ঐতিহ্য ও মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্ক বহন করা এক জীবন্ত ইতিহাসের নীরব প্রস্থান।






এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।