বঙ্গদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানুষে মানুষে যে ঘৃণার বিস্তার ঘটেছে, তার উৎস খুঁজতে গেলে রাজনীতি ও সমাজ—উভয়কেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়। বলা যায়, এই ঘৃণার অর্ধেকের জন্ম রাজনীতির হাত ধরে, আর বাকি অর্ধেক আমরা নিজেরাই লালন করেছি—নীরব সম্মতিতে, কখনো সচেতনভাবে, কখনো উদাসীনতায়।
রাজনীতি একসময় ছিল জনকল্যাণের ভাষা। আজ তা অনেক ক্ষেত্রেই বিভাজনের হাতিয়ার। ভোটের অঙ্ক কষতে গিয়ে মানুষকে ভাগ করা হচ্ছে ধর্মে, মতাদর্শে, শ্রেণিতে ও পরিচয়ে। রাজনৈতিক বক্তৃতা, স্লোগান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বক্তব্যে প্রতিপক্ষকে কেবল বিরোধী নয়, শত্রু হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। এই বয়ান ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের ভাষা ও আচরণে ঢুকে পড়ছে।
তবে দায় শুধু রাজনীতির ঘাড়ে চাপিয়ে দায়মুক্তি পাওয়া যায় না। সমাজ নিজেও এই ঘৃণাকে গ্রহণ করেছে। আমরা ভিন্নমত সহ্য করার অভ্যাস হারাচ্ছি। অন্যের মত শুনে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করার বদলে আক্রমণ, বিদ্রূপ ও বর্জনের পথ বেছে নিচ্ছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণামূলক মন্তব্যে লাইক দেওয়া, ভুয়া তথ্য যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়া—সবই এই সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঘৃণা এখন প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হচ্ছে। শিশু-কিশোরেরা বড় হচ্ছে বিভক্তির ভাষা শুনে, বিদ্বেষের গল্প দেখে। ফলে সহনশীলতা, মানবিকতা ও সহমর্মিতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ একমুখী নয়। রাজনীতিকে দায়িত্বশীল হতে হবে—ঘৃণার রাজনীতি পরিহার করে সংলাপ ও সহাবস্থানের চর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে সমাজকেও আত্মসমালোচনায় ফিরতে হবে। মতের অমিলকে শত্রুতা নয়, গণতান্ত্রিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
ঘৃণার অর্ধেক রাজনীতি শিখিয়েছে—এ কথা সত্য। কিন্তু বাকি অর্ধেক যে আমরা নিজেরাই শিখেছি, সেটাও অস্বীকারের উপায় নেই। এই সত্য স্বীকার করাই হতে পারে বঙ্গদেশে মানবিক সহাবস্থানের পথে প্রথম পদক্ষেপ।






এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।