শিরোনাম
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের পাশে এমপি, ঈশ্বরগঞ্জ থানায় পিকআপ বেরোবিতে শুরু হলো ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ এক্সিলেন্সের যাত্রা সুন্দরগঞ্জে জামাই শশুর বাড়িতে এসে অবরুদ্ধ: রফাদফায় বিএনপি নেতাদের পকেটে ঢুকলো পঞ্চাশ হাজার টাকা বিজ্ঞানচর্চায় শিক্ষার্থীদের আরও মনোযোগী হওয়ার আহ্বান নোবিপ্রবি উপাচার্যের লালমনিরহাট ব্যাটালিয়ন ১৫ বিজিবি’র বিশেষ অভিযানে পিস্তল গুলি এবং ক্রিস্টাল মেথ আইস উদ্ধার নেপিয়ার ঘাস চাষে বদলে যাচ্ছে ধুনটের কৃষি অর্থনীতি ময়মনসিংহে একই পরিবারের চারজনসহ মোট সাতজন সিএনজি বাস মুখোমুখিতে নিহত হাসিনাকে ফেরাতে ৭ বেরোবি শিক্ষকের তৎপরতা, ২ মাসেও নেই তদন্তের অগ্রগতি জাতীয়করণকৃত কলেজে অধ্যক্ষের যোগদান নিয়ে প্রশ্ন, পূর্বধলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা নোবিপ্রবির টিএইচএম বিভাগের নতুন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রিনু ফাতেমা
ক্যাম্পাস

চবিতে ছাত্রীকে শিবিরকর্মীর স্ল্যাটশেমিং ও বদ্ধঘরে ছাত্রদল নেতা মেয়েসহ ধরা

একসময় দুইজনই ছিলেন নিষিদ্ধ সংগঠনের অনুসারী

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টের মন্তব্যের ঘরে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ভাষায় নারী শিক্ষার্থীকে স্ল্যাটশেমিংয়ের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের ছাত্রী কর্নার ও ব্যক্তিগত পর্দা নিয়ে উপহাসের দুইদিন পেরোতে না পেরোতেই বদ্ধঘরে বান্ধবীসহ আপত্তিকর অবস্থায় একটি বাসা থেকে স্থানীয়দের হাতে আটক হয়েছেন।

জানা গেছে, স্ল্যাটশেমিংয়ে অভিযুক্ত ওই শিক্ষার্থীর নাম মোজাহিদুল ইসলাম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮তম আবর্তনের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের একজন শিক্ষার্থী। তিনি ভুক্তভোগী নারীর কাছে শিবিরের কর্মী হিসেবে নিজেকে স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে বদ্ধঘরে নারীসহ আটকের ঘটনায় চবি শাখা ছাত্রদল নেতা আব্দুল্লাহ আল সাকিফ রহমানকে হাতেনাতে স্থানীয়রা আটক করেছে। 

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, অভিযুক্ত মোজাহিদুল ইসলাম ও আব্দুল্লাহ আল সাকিফ রহমান একসময় সরকারি নথিভুক্ত নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের উপগ্রুপ ‘সিএফসি’-এর অনুসারী ছিলেন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি সচেতন শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতারা বলছেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরে সুযোগ বুঝে কিছু কুচক্রী মহল নিজেদের বাঁচাতে বিভিন্ন ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্রসংগঠনের ভেতরে ঢুকে পড়েন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরে নতুন ধারার রাজনীতি শুরু হলেও পুরোনোধারার সেই অপরাধ সংস্কৃতিতে বদল আনতে পারেননি তারা। কেননা এসব ব্যক্তিরা এমন এক সুবিধাভোগী, যারা সময়ের পরিবর্তনে নিজেদের পরিবর্তন করে নেন, বলেন তারা।

পহেলা নভেম্বর ২০২৩ সালের একটি স্কিনশট। যেখানে মোজাহিদুলকে সিএফসির অনুসারী হিসেবে স্বীকার করে পরিচয় দিতে দেখা গেছে।

শিবিরকর্মী

জানা গেছে, শামসুন নাহার হল এবং হল সংসদ নিয়ে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের গ্রুপে একটি পোস্ট করা হয়। সেখানে শামসুন্নাহার রুমি নামে এক নারী শিক্ষার্থী মন্তব্য করলে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের পরিচয় গোপন করে ‘ScenicLizard7729’ নামে বেনামি ঠিকানা থেকে অত্যন্ত অশ্লীল ভাষায় তার প্রতিউত্তর দেন। মন্তব্যে ওই শিক্ষার্থীকে ‘আইছে বাম ব্যাশা মাগী’ বলে সম্বোধন করা হয়।

বট আইডি ব্যবহার করে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা হয়

পরবর্তীতে প্রযুক্তির সহায়তায় ভুক্তভোগী ওই নারী শিক্ষার্থী খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, পরিচয় গোপন করে মন্তব্যকারী ব্যক্তিটি মোজাহিদুল ইসলাম। পরিচয় জানার পর রুমি তাকে সরাসরি মেসেজ দিলে সে নিজেই (মোজাহিদ) কমেন্ট করেছেন বলে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন। পরে এমন কাজের জন্য ওই নারী শিক্ষার্থীর কাছে ক্ষমাও চান তিনি। 

ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর নাম শামসুন্নাহার রুমি। তিনি মানবসম্পদ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘একটি পোস্টে আমি কমেন্ট করলে সেখানে এক বট আইডি থেকে আমাকে অশ্লীল ভাষায় রিপ্লাই দেওয়া হয়। দুর্ভাগ্যক্রমে ওই আইডির মালিক আমার লিস্টেরই একজন। আমরা একসাথে কয়েকটি প্রোগ্রামে ছিলাম এবং আমি আমার ছোটভাই হিসেবে পরিচয় ও দিতাম তাকে। তিনি নিজে অনেকবার দাবী করেছে-সে শিবিরের সাথে যুক্ত, বলেন ভুক্তভোগী শামসুন্নাহার রুমি।

শ্ল্যাটশেমিংয়ের দায় স্বীকার

বিষয়টা জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। চাকসুর ছাত্রী কল্যাণ সম্পাদক তার ফেসবুকে লেখেন, ‘নারীর প্রতি প্রতিহিংসা এবং নারীদেরকে নিয়ে বুলিং কারী সে যেই হোক না কেন তাকে যথাযথ শাস্তির আওতায় আনা দরকার। কোনো ধরনের মারসি চলবে না। দল মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে কিন্তু ভাষা প্রয়োগের আদব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর থাকা প্রয়োজন, যেটা ছেলেটি লিমিট ক্রস করেছে।’

চাকসুর এজিএস আইয়ুবুর রহমান তৌফিক বলেন, ‘শিবিরকর্মী আলি আহসান মুজাহিদ একজন নারী শিক্ষার্থীকে যে ভাষায় ও যে ধরনের বাজে শব্দচয়নের মাধ্যমে আক্রমণ করেছে সেটিকে আমি শিবিরের প্রকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করি। এটি প্রমাণ করে তাদের একটি ‘বটবাহিনী’ রয়েছে, যারা বিভিন্নভাবে মানুষকে হেনস্তা করার কাজে জড়িত। ওই শিক্ষার্থী (মোজাহিদ) তাকে লেলিয়ে দেওয়ার যে দাবি করেছে, আমরা অবশ্যই জানতে চাই কারা এর পেছনে উসকানিদাতা।

চাকসুর জিএস সাঈদ বিন হাবিব বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো নারী শিক্ষার্থীকে বুলিং বা হয়রানি কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হলে দল-মত নির্বিশেষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে চাকসু। কোনো শিক্ষার্থীর আইনি সহায়তার প্রয়োজন হলে চাকসুর লিগ্যাল এইড সেল থেকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান করে অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করবে চাকসু।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ পারভেজ বলেন, মেয়েদের প্রতি ঘৃণা চর্চা, ট্যাগিং, বুলিং ও স্ল্যাটশেমিং আজ উদ্বেগজনকভাবে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। যে বোনটিকে অশ্লীল ও অবমাননাকর ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও লজ্জাজনক। মতভেদ বা ব্যক্তিগত বিরোধ কখনোই কাউকে হেয় করা কিংবা নারীর মর্যাদায় আঘাত করার বৈধতা দিতে পারে না। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব, ইনশাআল্লাহ।

ছাত্রদল নেতা

পর্দা কর্নার নিয়ে ব্যঙ্গ করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিফ রহমান বান্ধবীসহ আপত্তিকর অবস্থায় একটি বাসা থেকে স্থানীয়দের হাতে আটক হয়েছেন। পরে প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা তাদেরকে উদ্ধার করেন। গতকাল শনিবার রাত ১২টার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকার জে এম টাওয়ার সংলগ্ন একটি বাসা থেকে তাদেরকে আটক করা হয়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার চাকসুর উদ্যোগে পর্দাশীল নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ক্যান্টিনে ‘ছাত্রী কর্নার’ চালু করা হলে তা নিয়ে ফেসবুকে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট করেন তিনি। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের সমালোচনার মুখে পড়েন। সর্বশেষ চাকসু নির্বাচনে তিনি ছাত্রদলের প্যানেল থেকে আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে নির্বাচন করেছিলেন।

অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা

এ ঘটনায় পাবলিকভয়েস২৪.কমে একটি সংবাদ পরিবেশন করা হয়েছিল। সংবাদটি ছিল পর্দা নিয়ে ‘উপহাস’, চবিতে ছাত্রদল নেতার পোস্ট ঘিরে তীব্র ক্ষোভ।

এদিকে এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে একটি ফেসবুক পেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন ও এক ছাত্রীর নাম জুড়ে দেওয়া হয়। নাম জুড়ে দেওয়া ওই ছাত্রী কয়েকমাস আগে শাখা ছাত্রদলের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিনের বিরুদ্ধে হেনস্তা ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। পরে আব্দুল্লাহ আল মামুন ফেসবুক লাইভে এসে জানান তিনি গত শুক্রবার সিরাজগঞ্জে গ্রামের বাসাতে এসেছেন।

জানতে চাইলে শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিফ রহমান বলেন, আমার বান্ধবী গ্রামের বাসায় যাওয়ার জন্য সকাল ৬টার টিকিট কেটেছিল। আমরা ৪-৫ জন বন্ধু মিলে রাতে ক্যাম্পাসে ঘোরার পরিকল্পনা করি। রাতের দিকে ১ নম্বর গেট এলাকায় খাওয়া-দাওয়া শেষে বাসায় ফেরার সময় জানতে পারি স্টেশন তলায় ঝামেলা হচ্ছে। তাই আমরা ২ নম্বর গেট দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

তিনি বলেন, পরে রাত প্রায় ১২টার দিকে আমি ব্যাগ নেওয়ার জন্য রুমে যাই। তখন আমার বান্ধবীকে নিচে একা রেখে যাওয়াটা নিরাপদ মনে হয়নি। তাই তাকে রুমে নিয়ে আসি, যেন আমি দ্রুত গোসল করে ব্যাগ নিয়ে বের হতে পারি। কিন্তু পরে কিছু মানুষ দরজা ভেঙে রুমে ঢুকে পড়ে এবং পরিস্থিতিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। অথচ আমরা কোনো আপত্তিকর অবস্থায় ছিলাম না।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. মো. কামরুল হোসেন বলেন, এরকম একটা ঘটনার খবর পেয়ে আমরা গিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে নিয়ে আসি। ঈদের ছুটি থাকায় পরবর্তীতে এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেটি বিশ্ববিদ্যালয় নেবে।

উল্লেখ্য যে, এ ঘটনায় গতকাল ২৪ মে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক অভিযুক্ত চবি ছাত্রদলের এক নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। 

ক্যাম্পাস থেকে আরও পড়ুন
কমেন্ট

এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।