তোমার দুটি হাতে ধরি, পায়ে পড়ি, খোদার কসম, প্লিজ লাইন টা কেটে দিওনা। একটু বোঝার চেষ্টা কর। সবকিছু আবার ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের একটা ছোট্ট, সুন্দর সংসার আছে। কত লোকের তো তাও নেই। আমরা দুজনে যেমন শূন্য থেকে শুরু করেছিলাম তেমনি আবার শূন্য থেকেই নতুন করে আমাদের পৃথিবীটাকে সাজিয়ে নেবো।
আপনি কে? কাকে ফোন করেছেন? রং নাম্বর!
না! না! না। প্লিজ ফোনটা কেটোনা। আমি জানি তুমি রেগে আছো। আমি আস্তে আস্তে তোমার সব আশা পূরণ করব। তুমি এভাবে আমাকে এই বিষাক্ত পৃথিবীতে একাকী রেখে চলে যেওনা। আমাদের অবস্থা সারাজীবন এরকম থাকবেনা। তুমি আমার পাশে থাকলে, আমি নিশ্চয়ই সবকিছু ঠিক করে ফেলতে পারবো। তোমার মহৎ মন, প্লিজ, আমায় করুনা কর।
যতসব ফালতু কথা। কে আপনি? কাকে ফোন করেছেন? আর এত রাতে কেনইবা অকারণে বিরক্ত করছেন?
একটু রেগে গিয়ে, কিছুটা বিরক্ত হয়ে ফোনটা কেটে ঠপাশ করে চেয়ারের উপর বসে পড়লাম। রাত দুইটা বাজে। এত রাতে কার ফোন। কেউ কি আমার সাথে ফাজলামো করছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনা। হোস্টেলের সবাই ঘুমে আচ্ছন্ন। কার সাথে শেয়ার করব এই অদ্ভুত ফোন কলের ব্যাপারে। ফোনে যার কণ্ঠ শুনলাম, মনে হলোনা যে ফান করছে। তার ক্লান্ত, ক্ষান্ত, বিষন্ন, ভগ্নকণ্ঠে কৃত্রিমতার বিন্দুমাত্র আভাস পেলাম না। কিন্তু আমাকে কেনো বারবার ফোন করে এইসব বলছে! এইযে! আবার বেজে উঠল….। রিসিভ করব? না থাক। নাকি রিসিভ করব। কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনা।
কেন বারবার বিরক্ত করছেন। বললাম তো রং নাম্বর। আমাকে কিছু বলতেও দিচ্ছেন না। যাচ্ছেতাই নিজের ইচ্ছামত বলে যাচ্ছেন আর কান্না করছেন?
প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ! তোমার দুটি পয়ে পড়ি, আর অভিমান করনা। অনেক রাত হয়েছে, ফিরে আসো। এই বয়সে তুমি যদি এইভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাও! মানুষ কি বলবে। তাছাড়া আমাদের দুটি ছেলেমেয়ে আছে, ওদের কি হবে। কার ভালোবাসা নিয়ে ওরা বড় হবে। শুধু ওদের মুখের দিকে চেয়ে ফিরে আসো। না হয় আমাকে বলো, কোথায় আছো। আমি নিজে গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসবে। দোহায় তোমার, আর আমাকে কষ্ট দিওনা। বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে, তোমার নিজের সংসারের কথা চিন্তা করে ফিরে আসো প্লিজ।
আপনি কিন্তু অসভ্য আচরণ করছেন। সবকিছুর একটা সীমা থাকে। সত্যি করে বলুন, কে? কেনো এতো রাতে বিরক্ত করছেন। হয় পরিচয় দিন, না-হয় গুড বাই। লাইনটা কেটে দিয়ে ফোনটা বন্ধ করে চেয়ার থেকে উঠে খাটের ওপর বসলাম। কে হতে পারে। আমাকে কেনো বারবার ফোন করেছে। না! ফোনটা বন্ধ করা উচিত হয়নি। বিষয়টা জানা দরকার।
ফোনের সুইস অন করতেই সঙ্গে সঙ্গেই রিংটোন বেজে উঠল। রিসিভ করব। নাহঃ থাক। নাকি রিসিভ করব। বারবার বাজছে। এবার রিসিভ করব, যদি পরিচয় না দেয় তাহলে যাচ্ছে তাই উলুম ধুলুম দু’চারটা শুনিয়ে দিয়ে ফোন অফ করে ঘুমিয়ে পড়ব।
ফোন রিসিভ করতেই একটি নরম অনুতপ্ত আবেগি কণ্ঠ ভেসে এলো। এত অল্প সময়ের মধ্যে লোকটার মধ্যে কেমন যেনো অস্বাভাবিক একটা পরিবর্তন এসেছে। মৃদুস্বরে নিজের ভুল স্বীকার করে আর্তস্বরে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলো।
সরি ম্যাডাম। ভুল করে অন্য কাউকে ফোন দিতে গিয়ে, আপনার নাম্বারে চলে গেছে। আমি অত্যন্ত দুঃখিত। বারবার ভুল হওয়ার পরেও বুঝতে পারিনি। আসলে আমি এতটাই বিচলিত ছিলাম যে, খেয়ালই করেনি।
খেয়াল করিনি! এটা আবার কেমন কথা। এত রাতে একটা না-জানা, না চেনা মেয়েকে আপনি বারবার বিরক্ত করছেন। এটা কোন ধরনের ভদ্রতা। বিপদে মানুষ দিশাহারা হয়, তাই বলে এই ধরনের আচরণ!
ফোনটা কেটে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলাম। কিছুক্ষন চিন্তা করে বাস্তবিক তার কষ্টটা উপলব্ধি করতে চেষ্টা করলাম। বেচারা! বউ চলে গেছে তার। এমনিতেই কি অসহ্য যন্তণায় আছে। তার সাথে এমন আচরণ করাটা উচিত হয়নি। আবার কে ফোন দিলো। এতো সেই নাম্বারটাই।
প্লিজ ম্যাডাম। কিছু মনে নিবেন না। আমার মাথা ঠিক ছিলো না। মানুষিক চাপের কারণে আপনার কণ্ঠও বুঝতে পারিনি। আমার অবস্থা আপনি বুঝবেন না। তবুও মিনতি করছি। আমায় ক্ষমা করবেন। ভুল করে আপনাকে বিরক্ত করে ফেলেছি।
নো প্রবলেম। আমি কিছু মনে করছি না। আসলে আমারও উচিত হয়নি আপনার সাথে এমন আচরণ করা। আপনার বাচ্চাদের খেয়াল রাখবেন। স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। আর শোনেন, এত রাতে আর ফোন দিবেন না। আমি আপনার আবেগ বুঝতে চেষ্টা করছি এবং কথা দিচ্ছি আপনার সম্মানে বিষয়টা অন্য কারো সাথে আলোচনা করব না।
… এভাবেই হঠাৎ করে একদিন মাঝরাতে তার সাথে আমার পরিচয়। উপরওয়ালা কখনোই কারো ঘর খালি রাখেনা। যে রাতে ওর স্ত্রী ওর ঘর ছেড়ে চলে গেছে, সেই রাতেই ওর সাথে আমার পরিচয়। রাতে কতবার ফোন করে আমার কাছে একটা অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছে। আমি মাঝে মধ্যে ভেবে অবাক হই, এমন লোকের বউ কিভাবে তার ঘর ছেড়ে চলে যেতে পারে? আমি আবেগের মোহে মাঝে মধ্যে দু-একবার ফোন দিয়ে ওর বাচ্চাদের খোঁজ খবর নিতাম। কখনো কখনো ভাবতাম যেয়ে দেখে আসব তাদের। কাজের চাপে তা আর সম্ভব হয়নি। কিন্তু ওর সাথে কথা হতো, একই শহরে থাকি, দেখাও হতো মাঝে মধ্যে। এইভাবে কথা, দেখা আর একসাথে চলতে চলতে কখন যে ওর মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম তা বুঝতেও পারিনি। একজন অপরিচিত লোক একটা ছোট্ট ফোনকলের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে উঠলো আর ধীরে ধীরে কতটা আপন হয়ে গেলো। মাঝে মধ্যে মনে হয় ওকে বলে দিই! ওর বাচ্চদুটোর মা হওয়ার কি আগ্রহ আমার। কিন্তু সাহস পাইনা। সবে মাত্র কত বড় একটা ধাক্কা সামলে উঠেছে। যদি অস্বীকার করে। সবকিছু যদি আবার ভেঙে চুরে চুরমার হয়ে যায়। জীবনে একবার ভেঙে গিয়ে সোজা হয়ে দাড়াতে আমার পনেরো বছর সময় লেগেছে। আমি আর আমার জীবন থেকে কাউকে হারাতে চাইনা।
আমার বাবা শহরের যথেষ্ট বৃত্তবান লোক। স্কুল জীবনে আমি একটা ছেলেকে খুব পছন্দ করতাম। মেডিক্যালে ভর্তি হবার পর বাবা আমাদের সম্পর্ক অস্বীকার করে। তারপর থেকে কখনোই সংসারী হতে মন চাইনি। বাবাব সাথেও কোনো যোগাযোগ নেই আমার। একটি ছোট্ট দাতব্য হাসপাতালে চাকরি করি, তাদেরই হোস্টেলে থাকি। কখনো বিয়ে বা সংসারের কথা চিন্তাও করিনি। ভেবেছিলাম বাকি জীবন একা একায় কাটিয়ে দেব। অথচ দেখুন, হঠাৎ একটা রং কল আমার সাদাকালো জীবনটাতে আবার রং মাখিয়ে গেলো।
কিন্তু জীবন বৃক্ষে ফুলের যে রসদের সঞ্চার হয়েছে, কিভাবে তার পরিপূর্ণতা লাভ করবে তার কোনো উপায়ন্তর করতে পারছি না। টুকিটাকি চা,কফি, পার্ক, রেস্তোরাঁ চলতেই থাকে কিন্তু সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারিনা। কতদিন ভাবি ওর বাচ্চাদের সাথে ভালো ভাব জমিয়ে তাদের আপন হওয়ার চেষ্টা করব। কিন্তু সে সুযোগও সে দেয়না। আজ পর্যন্ত শুধু তাদের গল্পই শুনেছি, চোখে দেখিনি।
এভাবে আরো কিছু দিন কেটে গেলো। এখন সম্পর্ক মনের গন্ডি পেরিয়ে আত্মার সাথে মিশে গেছে। হয়তো তার সাথে আমার প্রেম, মিলনের পথ বেয়ে হাটতে শুরু করেনি কিন্তু বন্ধুত্বের সম্পর্ক সীমার হিমালয় ঠিকই স্পর্শ করেছে। আর প্রেমের সম্পর্ক? যা এখনো অব্দি প্রকাশ ই পাইনি তার পরিনাম কল্পনা করা দুঃসাধ্য, অহেতুক নয়কি?
ভেবেছিলাম একপথে চলতে চলতে তার প্রতি আমার যেমন মোহ সৃষ্টি হয়েছে আমার প্রতি তারও হয়তো তেমনি ভালোবাসার সৃষ্টি হয়েছে। অথচ তা হয়নি, বরং আমার ভালোবাসাকে অস্বীকার করে অন্য কিছু গ্রহন করেছে। সে আমার ভালোবাসা নেইনি কিন্তু তার প্রতিদান ঠিকই নিয়ে গেছে। সে আমায় ভালোবাসতে পারেনি ঠিক আছে তবে তার চরম অবহেলা আমাকে যন্ত্রণা দিয়েছে। মনের মানুষ যখন মন ভেঙে তছনছ করে তখনের অনুভূতি ভাঙ্গা মনের মানুষ ছাড়া কেউ উপলব্ধি করতে পারবে না। সে আমার ভালোবাসাকে শুধু ফিরিয়েই দেয়নি, চরমভাবে অপমানিত করেছে। আমাকে বলে বিবাগী, আমার দ্বারা নাকি ঘর, সংসার, স্বামী, সন্তান সামলানো সম্ভব নয়। ওর অনুপ্রেরণায় বাবার বাড়িতে ফিরে এসেছিলাম, আর ক্ষোভে বাবার পছন্দের ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছে। কি নির্লজ্জ, বেহায়া ছেলে। হাসি মুখে আমার বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে আমার বাবার সাথে তার ঘরে বসে আড্ডা দিচ্ছে। আবার বাবার দেওয়া গিফট নিয়ে আমার সামনে দিয়ে হ্যাব এ গুড লাইফ বলে চলে যাচ্ছে। কত কিছু বলার ইচ্ছা মনে। তবু্ও একটি কথাও বলার সাহস পেলাম না। পাশেই আমার বান্ধবী দাঁড়িয়ে ছিলো। আমার পাশে এসে চুপি, চুপি বলল।
চিনিশ ছেলেটাকে?
কেনো? তুই চিনিশ?
ওকে কে না চেনে!
মানে?
ব্রোকার! শহরের সবচেয়ে বড় ব্রোকার। ঘর ভাঙ্গা, আবার ভাঙ্গা ঘর গড়া! শুধুমাত্র টাকার বিনিময়ে সে সবকিছু করতে পারে। তার কাছে পৃথিবীর যেকোনো কিছুর চেয়ে তার……






এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।