কোর্স অনুযায়ী বিশ্লেষণ অনার্স, মাস্টার্স, পাস কোর্স, প্রফেশনাল কোর্স, অনার্স পর্যায়ে চার বছরব্যাপী শিক্ষার কাঠামো থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে অংশ নেয় না। বিশেষ করে সেশনজট, শিক্ষক সংকট ও অনিয়মিত ক্লাসের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লাসবিমুখতা তৈরি হয়।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তৃত কলেজগুলোর মাধ্যমে লাখো শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করে। এখানে উল্লেখ্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় ২,২০০টি কলেজ এবং ৩০ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে ক্লাসে উপস্থিত না থেকেও পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করা। এই প্রবণতা শুধু শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং পুরো ব্যবস্থাকে একটি ‘সনদ উৎপাদন কারখানা’তে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে। এ পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবা এবং কার্যকর সমাধান খোঁজা এখন সময়ের দাবি।
কোর্স অনুযায়ী বিশ্লেষণ অনার্স, মাস্টার্স, পাস কোর্স, প্রফেশনাল কোর্স, অনার্স পর্যায়ে চার বছরব্যাপী শিক্ষার কাঠামো থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে অংশ নেয় না। বিশেষ করে সেশনজট, শিক্ষক সংকট ও অনিয়মিত ক্লাসের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লাসবিমুখতা তৈরি হয়। ফলে তারা শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ থাকে।
মাস্টার্স পর্যায়ে এই প্রবণতা আরও বেশি দৃশ্যমান। অনেক শিক্ষার্থী চাকরি বা অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে ক্লাসে উপস্থিত হতে পারে না এবং পরীক্ষার আগে কোচিং বা গাইডবইয়ের উপর নির্ভর করে। পাস কোর্সে সমস্যা আরও প্রকট। এখানে শিক্ষার্থীদের বড় অংশই ক্লাসে অনুপস্থিত থেকে শুধুমাত্র পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পাশ করার চেষ্টা করে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতির ক্ষেত্রে একটা বাইন্ডিং আছে, সেটা হচ্ছে ৬০% ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলকভাবে থাকতে হবে। আরও নির্দেশনা আছে কমপক্ষে ৬০% ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক এই উপস্থিতি না থাকলে সাধারণভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ অর্থাৎ ফরম পূরণ করা যাবে না। প্রফেশনাল ডিগ্রির ক্ষেত্রে এই পারসেন্ট আরো বেশি। নিয়ম থাকলেও এই নিয়মের কেউ তোয়াক্কা করে না।
প্রফেশনাল কোর্সে যেমন বিএড, এম এড, বিপিএড ও অন্যান্য কোর্সে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেলেও, অনেক ক্ষেত্রে তদারকির অভাব ও বাণিজ্যিক মানসিকতার কারণে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না। এখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠান তিনটি পক্ষই নিজ নিজ সুবিধা অনুযায়ী আচরণ করছে, এবং এই আচরণগুলো একে অপরকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিচ্ছে।
প্রথমে শিক্ষার্থীদের দিকটি বিবেচনা করা যাক। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে কম সময় ও কম পরিশ্রমে পাশ করা। বাস্তব জীবনের চাপ যেমন চাকরি, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা আর্থিক সীমাবদ্ধতা তাদের এই মনোভাবকে আরও শক্তিশালী করে। ফলে তারা নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণের পরিবর্তে পরীক্ষার আগে গাইডবই, নোট বা কোচিংয়ের উপর নির্ভর করে। তাদের কাছে “শেখা” নয়, “পাশ করা”ই মুখ্য হয়ে ওঠে। এই মানসিকতা দীর্ঘমেয়াদে তাদের জ্ঞান ও দক্ষতার ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
এরপর আসে শিক্ষকদের ভূমিকা। আদর্শভাবে শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকরা নিজেরাও কম চাপের মধ্যে থাকতে চান। অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া, নিয়মিত প্রস্তুতি নেওয়া বা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার পরিবর্তে তারা কখনও কখনও অনিয়মিত ক্লাস নেন বা দায়সারা দায়িত্ব পালন করেন। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে যেমন অতিরিক্ত কাজের চাপ, প্রশাসনিক দায়িত্ব, ব্যক্তিগত ব্যস্ততা বা প্রাতিষ্ঠানিক উৎসাহের অভাব। ফলে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে না আসার প্রবণতা আরও বাড়ে, কারণ তারা মনে করে ক্লাসে গেলেও বিশেষ কিছু শেখার সুযোগ নেই।
সবশেষে প্রতিষ্ঠান বা কলেজের দিকটি আসে। ব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রশাসনিক নেতৃত্ব যেখানে দৃঢ় ও সক্রিয় হওয়ার কথা, সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় উদাসীনতা ও দায় এড়ানোর প্রবণতা। ক্লাস নিয়মিত হচ্ছে কি না, শিক্ষকরা দায়িত্ব পালন করছেন কি না, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কতটুকু এসব মৌলিক বিষয়েও কার্যকর তদারকি অনুপস্থিত। ফলে একটি শিথিল ও অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে নিয়ম ভাঙাই যেন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। এই গা-ছাড়া মনোভাব শুধু শিক্ষার মানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং পুরো ব্যবস্থায় জবাবদিহিতার সংস্কৃতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিষ্ঠান প্রধানদের আরও দায়িত্বশীল, সক্রিয় ও নেতৃত্বসুলভ ভূমিকা পালন এখন অপরিহার্য। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করাকে অগ্রাধিকার দেয়। এতে করে তাদের আয় বাড়ে, কিন্তু একই সঙ্গে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। উপস্থিতি নিশ্চিত করা, নিয়মিত ক্লাস পরিচালনা করা বা কঠোরভাবে একাডেমিক নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক সময় তারা শৈথিল্য দেখায়। কারণ কঠোরতা প্রয়োগ করলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বিরূপ হতে পারে, যা ভর্তির সংখ্যার উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এই তিন পক্ষের আচরণ একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, একটি অদৃশ্য ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে না এলেও শিক্ষকরা কঠোর হচ্ছেন না, আবার প্রতিষ্ঠানও এই অনিয়মকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে না। ফলে একটি “কম দায়বদ্ধতা, কম প্রত্যাশা, কিন্তু নিশ্চিত পাশ” সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
এই অবস্থাকে ভাঙতে হলে তিন পক্ষকেই একসঙ্গে পরিবর্তিত হতে হবে। শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের দোষারোপ করে বা শিক্ষকদের উপর চাপ প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবে এবং শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে একটি শেখার প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।
প্রথমত, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর অধিকাংশেই পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। ফলে নিয়মিত ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না।
দ্বিতীয়ত, সেশনজট শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনীহা তৈরি করে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে তারা ক্লাসের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।
তৃতীয়ত, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের শুধু পাশ করার দিকে ধাবিত করে, শেখার দিকে নয়।
চতুর্থত, সামাজিকভাবে ‘সনদ’কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, দক্ষতাকে নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা মনে করে ক্লাস না করেও যদি সনদ পাওয়া যায়, তবে সেটাই যথেষ্ট।
পঞ্চমত, অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করতে হয়, যা তাদের ক্লাসে উপস্থিত হতে বাধা দেয়।
ষষ্ঠত, তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাব পুরো সমস্যাকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে।
পরিণতি
এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষার মানের অবনতি। শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করতে পারছে না। ফলে তারা কর্মক্ষেত্রে অদক্ষ হয়ে পড়ছে।
দ্বিতীয়ত, উচ্চশিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে।
তৃতীয়ত, দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চতুর্থত, শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, কারণ তাদের ভূমিকা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে।
পঞ্চমত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে শর্টকাট সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, যা নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয়।
৬টি বাস্তব সমাধান
১. উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা: নির্দিষ্ট শতাংশ উপস্থিতি ছাড়া পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়া।
২. ডিজিটাল উপস্থিতি মনিটরিং: বায়োমেট্রিক বা অনলাইন সিস্টেম চালু করে উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
৩. নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা: শিক্ষক নিয়োগ বৃদ্ধি ও ক্লাস রুটিন কঠোরভাবে অনুসরণ করা।
৪. মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন: শুধুমাত্র লিখিত পরীক্ষার উপর নির্ভর না করে ক্লাস পারফরম্যান্স, প্রেজেন্টেশন ও অ্যাসাইনমেন্টকে মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত করা।
৫. শিক্ষার্থীদের প্রণোদনা: নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা বা পুরস্কার চালু করা।
৬. কঠোর তদারকি ও জবাবদিহিতা: কলেজ ও শিক্ষকদের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং অনিয়মের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করা।
উপসংহার-ক্লাসে না এসেও পাশ করার সংস্কৃতি কোনো সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। এটি একদিকে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করছে, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই সমস্যার সমাধান শুধু নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব নয়; শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠান তিন পক্ষকেই নিজেদের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করতে হবে। সময় এসেছে ‘সহজে পাশ’ নয়, ‘গভীরভাবে শেখা’কে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করার। তবেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃত অর্থে দেশের জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারবে।
মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার: সহকারী অধ্যাপক, পোস্ট গ্রাজুয়েট (মালয়েশিয়া), সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ময়মনসিংহ।






এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।