ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ী গ্রামে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন ইমারতগুলো আজও নীরবে বহন করে দুই শতাব্দীরও বেশি পুরোনো ইতিহাস। জরাজীর্ণ দেয়াল, লতাগুল্মে ঢাকা খিলান, ভাঙাচোরা দরবার হল—সব মিলিয়ে আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ি যেন হারিয়ে যেতে বসা এক সমৃদ্ধ অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। এই জমিদার বাড়িকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আঠারবাড়ী গ্রাম; যার নামকরণও ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এই রাজবাড়ির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
জমিদারির গোড়াপত্তন ও নামকরণের ইতিহাস-প্রায় আড়াই শত বছর আগে আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন করেন দ্বীপ রায় চৌধুরী। তিনি ছিলেন যশোর জেলার একটি পরগনার জমিদার। পরবর্তীতে ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন শিবগঞ্জ এলাকায় জমিদারি ক্রয় করে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। শিবগঞ্জ বা গোবিন্দ বাজার নামে পরিচিত এই জনপদ ধীরে ধীরে রায় বাজার এবং পরবর্তীতে আঠারবাড়ী নামে পরিচিতি লাভ করে।
সূত্রে জানা যায়, জমিদারি পরিচালনার কাজে সহায়তার জন্য দ্বীপ রায় চৌধুরী যশোর থেকে আঠারটি হিন্দু পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং তাঁদের বসবাসের জন্য আলাদা করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে দেন। এই ‘আঠারটি বাড়ি’ থেকেই পরবর্তীতে এলাকার নামকরণ হয় আঠারবাড়ী।
উত্তরাধিকার ও সাংস্কৃতিক বিকাশ-দ্বীপ রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সম্ভুরায় চৌধুরী জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় তিনি এক ব্রাহ্মণ সন্তান প্রমোদ রায়কে দত্তক হিসেবে লালন-পালন করেন। পরবর্তীতে প্রমোদ রায় চৌধুরীই আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ির উত্তরাধিকারী হন। তাঁর আমলেই এই জমিদার বাড়ি সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।
রবীন্দ্রনাথের আগমন-আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়গুলোর একটি হলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগমন। ১৯২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন জমিদার প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরীর আমন্ত্রণে কবিগুরু আঠারবাড়ী রাজবাড়ি পরিদর্শনে আসেন। জানা যায়, প্রমোদ চন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী এবং তাঁর শিক্ষক ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
এই সফর উপলক্ষে কবিগুরুর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের পাশাপাশি বাউল, জারি ও সারিগানের আসরের আয়োজন করা হয়। আঠারবাড়ীর ইতিহাসে দিনটি আজও বিশেষভাবে স্মরণীয়।
চলচ্চিত্রে আঠারবাড়ী-শুধু ইতিহাসেই নয়, আধুনিক সাংস্কৃতিক মাধ্যমেও আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ির উপস্থিতি রয়েছে। কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদের ‘চন্দ্রকথা’ চলচ্চিত্রের (২০০৩) বেশ কিছু দৃশ্যের চিত্রায়ন হয়েছে এই জমিদার বাড়িতে। এতে নতুন প্রজন্মের কাছেও স্থানটি পরিচিতি পায়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার বর্তমান চিত্র-১৯৬৮ সালে আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ির বিস্তৃত জমির অংশে প্রতিষ্ঠিত হয় আঠারবাড়ী ডিগ্রি কলেজ। কলেজ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে বিশাল খেলার মাঠ, অন্দরমহল, দরবার হল, কাছারি বাড়ি ও ঐতিহ্যবাহী রানীপুকুর—যা একসময় জমিদারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।
তবে বর্তমানে এসব স্থাপনার অনেক অংশই জরাজীর্ণ। লতাগুল্মে ঢেকে গেছে ছাদ ও দেয়াল, কোথাও কোথাও ধসে পড়েছে কাঠামো। পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে।
সংরক্ষণের দাবি-ইতিহাসপ্রেমী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, যথাযথ সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ি ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
যাতায়াত সুবিধাম-ময়মনসিংহ শহর থেকে আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ির দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন থেকে ভৈরবগামী ট্রেনে আঠারবাড়ী স্টেশনে নেমে রিকশা বা হেঁটে সেখানে যাওয়া যায়। সড়কপথে ঈশ্বরগঞ্জ হয়ে সিএনজি অথবা ইজিবাইকে পৌঁছানো সম্ভব।
আঠারবাড়ী জমিদার বাড়ি শুধু একটি পুরোনো ইমারত নয়; এটি ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষার সম্মিলিত স্মারক। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উদ্যোগ না নেওয়া হলে সময়ের গর্ভে হারিয়ে যাবে ঈশ্বরগঞ্জের এই গৌরবময় অতীত।






এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।