সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বারণি স্নান উৎসব উপলক্ষ্যে বৃহঃস্পতিবার চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদ এর তীরে ঐতিহ্যবাহী অষ্টমীর মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা সনাতন ধমর্মাবলম্বিরা যুগের পর যুগ তাদের পাপ মোচনে ব্রহ্মপুত্র নদে পূন্যস্নান করে আসছেন। ধর্মীয় বিশ্বাস মতে মাতৃ হত্যার অভিশাপে রাজা ভিগুরামের হাতে আটকে যাওয়া কুঠার খুলতে তিনি এক সন্যাসীর আদেশে কৈলাশের মানষ সরোবর হতে একটি স্রোতধারা সৃষ্টির করার আদেশ পান। সে মোতাবেক ভিগুরাম নিজ হাতের কুঠার দিয়ে একটি হ্রদ খুড়তে শুরু করেন। সেখান থেকে একটি স্রোত ধারা সৃষ্ট হয়। এই স্রোত ধারায় তিনি মাটি খুড়তে খুড়তে স্রোতে ভেসে গিয়ে এই চিলমারীতে এসেই নাকি ভেসে উঠেন এবং তার হাতের কুঠার পড়ে গেলে তিনি অভিশাপ মুক্ত হন। তখন থেকেই পাপ মোচন সহ নিজেকে শুদ্ধ করতে এ স্নানের প্রচলন শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্তরা এখানে সমবেত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে স্নান করে নিজেকে পবিত্র করে তোলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত দুই দিন থেকে সনাতন ধর্মের লোকজনেরা চিলমারীতে আসা শুরু করেন। এবারে অষ্টমী স্নান ও বারুণী স্নান উপলক্ষ্যে পুরাতন জোড়গাছ বাজার সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদে স্থান নিদৃষ্ট করা হয়। সে মোতাবেক ভক্তবৃন্দ এলাকার আশ-পাশেই আশ্রয় নেয়। অনেকেই দূর থেকে রিজার্ভ গাড়ি ভাড়া করে মাঝ রাত থেকে সকাল পর্যন্ত স্নানের উদ্দেশ্যে পরিবার, পরিজন সহ রওয়ানা দিয়ে এসেছেন। ভোর হওয়ার আগেই নিদৃষ্ট প্রহর থেকেই ভক্তরা নদীতে স্নান আরম্ভ করেন। অনেকে ফুল, ফল ও তুলসীপাতা নিয়ে পূজা-অর্চনায় অংশ নেন। তাদেরকে ঠাকুর বিভিন্ন মন্ত্রপাঠপূর্বক পূজা অর্চনা শেষ করালে তারা হাত জোড় করে নদীতে কয়েক বার ডুব দিয়ে স্নান সমাপন করেন। এসময় তাদের সংগে পরিবারের লোকজনও স্নানের মাধ্যমে পাপ মোচন ও আত্মশুদ্ধি করতে স্নান করেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে রমনা ঘাট সহ জোড়গাছ ঘাটের বিভিন্ন স্থানে স্নানের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন ছিল।
নারীরা শাড়ি পরে, পুরুষরা ধুতি/লুঙ্গিতে হাতে ফুল, প্রদীপ, ধূপ নিয়ে পূজা অর্চনা করে। স্নান উপলক্ষ্যে নদীর তীরে অস্থায়ী দোকান, খেলনা, রঙিন মাটির হাড়ি, মিষ্টির দোকান,মাছ ইত্যাদির পশরা বসে। ব্রহ্মপুত্র নদকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে ওঠে নানা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন, যার মধ্যে অন্যতম এই স্নান উৎসব ও ঐতিহ্যবাহী অষ্টমীর মেলা। সনাতনীদের ধর্মীয় বিশ্বাস। ,নদীকে “মা গঙ্গা” বা পবিত্র শক্তির প্রতীক ধরা হয়। স্নানের মাধ্যমে পাপ মোচন হয়। আত্মার পরিশুদ্ধি ও মুক্তি লাভের আশা করা হয়। চিলমারীর ব্রহ্মপুত্র স্নান শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানই নয়—এটি উত্তরবঙ্গের তথা বৃহত্তর রংপুরের মুসলিম, হিন্দু ও অন্যান্য জাতী ধর্মের লোক জনের নিকট একটি উৎসবের দিন। মামা,ভাগ্নে, বোন,দুলা ভাই সহ সব দূরের আত্মিয়দের আগমনের দিন। মেলায় যাওয়া, নদের পাড়ে ঘুরে ঘুরে অষ্টমির স্নান ও মেলা দেখা,সাচ,বাতাসা,জিলাপি, মুড়ি, মুড়কি, মাছ আর কতই কিছু নুতন -পুরাতন জামাইরা কিনে শ্বশুর বাড়িতে আনে। ছোটরা টমটমি গাড়ি, বাশি, ঘুড়ি সহ বিভিন্ন খেলনা সামগ্রী কিনে আনন্দ করে। ব্রহ্মপুত্র নদ ঘাটের স্নানের সময় সমাপ্ত হলেই স্থানীয় মুসলিম,রমনা, বালাবাড়ি,হ্যালিপ্যাড, কাশিম বাজার সহ বিভিন্ন জায়গায় ২ থেকে তিন দিন পর্যন্ত মেলা বসায়। রাজার হাট উপজেলার সিন্দর মতিতেও এ উপলক্ষ্যে মেলা জমে। চিলমারীর অষ্টমীর মেলা অতিত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের বিশ্বাসের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সময়ের সাথে নদীর রূপ বদলালেও এই উৎসব এখনো একইভাবে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে আছে। চিলমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদুল হাসান জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা ও সহায়তায় মেলাটিকে সাফল্য মন্ডিত করার লক্ষ্যে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহন সহ তদারকি করেছেন। সেনা বাহিনী, পুলিশ,আনসার সহ বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সার্বক্ষনিক টহল ও জোরালো তৎপরতা চালিয়েছেন। কোথাও কোন দূর্ঘটনা কিংবা বিশৃংঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি।





এই পোস্টে মন্তব্য বন্ধ আছে।