ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বর্বরতা এবং বিশ্ববিবেক

প্রকাশিত: ১০:০২ পূর্বাহ্ণ, মে ১৭, ২০২১

আল-আকসা মসজিদের সন্নিকটে অবস্থিত আবাসিক এলাকা শেখ জাররাহর বাসিন্দা উম্মে সামিরের কথা এখনও আমার কানে বাজে। সম্প্রতি তার বাড়িটি বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। তারপরও তিনি ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী ও দখলদারদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তার ভাষায়, ‘আমি ইট-পাথর দিয়ে আমার বাড়ি নির্মাণ করেছিলাম। এখানে আমি সন্তানদের বড় করেছি। ইসরায়েল গত সত্তর বছর ধরে এমনকি এখন অবধি দাবি করছে এ এলাকা তাদের এবং তারা জোর করে আমাদের এ এলাকা থেকে বের করে দিতে চাইছে। আমরা আমাদের নিজস্ব শক্তি দিয়ে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব প্রতিহত করার চেষ্টা করছি। আমাদের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমরা তাদের প্রতিহত করেই যাব।

ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও সহিংসতার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ক্রোধ আর প্রতিরোধ সংগঠিত হতে সময় লেগেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন অবৈধভাবে জেরুজালেম, গোলান বা জর্ডান উপত্যকা ইসরায়েলের হাতে সমর্পণ করার চেষ্টা করেছিলেন, তখনও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এরকম উত্থান দেখা যায়নি। অতীতে ফিলিস্তিনি নেতাদের বা হামাসের নির্দেশেও এ ধরনের উত্থান ঘটেনি।

সম্প্রতি অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম থেকে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করতে ইসরায়েল যে সহিংসতা শুরু করেছে, তা ফিলিস্তিনসহ গোটা বিশ্বের জন্যই বড় আঘাত। ১৯৪৮ সালে জায়নিস্ট বাহিনী এই পরিবারগুলোর পূর্বপুরুষদের হাইফা ও জাফফা থেকে উচ্ছেদ করলে তারা দীর্ঘদিন গৃহহীন থাকে। আর এখন ইসরায়েল আবার তাদের সমূলে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করছে। শেখ জাররাহ থেকে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করতে ইসরায়েল নগ্ন বিচারিক রায়কে ব্যবহার করছে, যা শুধু আন্তর্জাতিক আইনকেই ভঙ্গ করছে না বরং মানুষের মৌলিক মানবাধিকারকেও লঙ্ঘন করছে।

বর্ণবাদী দখলদারিত্ব ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে রাজধানী জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের বসবাস ও জীবন ধারণ অসম্ভব করে তুলছে ইসরায়েল। এটি জাতিগত নির্মূলকরণ এবং বর্ণবাদের স্পষ্ট নিদর্শন। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একের পর এক শান্তি উদ্যোগকে কুঠারাঘাত করেছে। বর্ণবাদ, জাতিগত নির্মূল ও দখদারিত্বের পরিকল্পনার মাধ্যমে ইসরায়েল অনেক ফিলিস্তিনিকে তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে উচ্ছেদ করেছে, একই পরিকল্পনা আর নগ্ন সন্ত্রাসী হামলার মাধ্যমে তারা পুরো ফিলিস্তিন দখল করতে চায়।

ইসরায়েল এখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনের যত ভূমি দখল করেছে এবং যে পরিমাণ হত্যাযজ্ঞ ও ক্ষতিসাধন করেছে, তাতে এই উত্থান ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধ অনিবার্য ছিল। ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের হত্যা করবে, তাদের ধরে নিয়ে দীর্ঘকাল আটক রাখবে, তাদের নির্মূল করবে, তাদের বাড়িঘর ও ভূমি দখল করবে তখন আপনি কোনো কথা বলছেন না; ইসরায়েলের এতসব অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিবাদে ফিলিস্তিনিরা পাথর নিক্ষেপ করলে আপনি তার নিন্দা করছেন!

বাইডেন প্রশাসনও নেতানিয়াহুর দখদারিত্বের ধ্বংসাযজ্ঞে সমর্থন দিচ্ছে। গত আট বছর ধরে ফিলিস্তিন যে দাবি করে আসছে ইসরায়েলের প্রতি সরল বিশ্বাসের ভিত্তিতে তা উপেক্ষা করছে যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক হত্যযজ্ঞের পরও কি বাইডেন ইসরায়েলকে বিশ্বাস করে? এমন মানবিক বিপর্যয়ের পরও শুধু ইসরায়েল ও তার মিত্রদের আক্রমণের ভয়ে যেসব সরকার এবং সংবাদমাধ্যম নীরব ভূমিকা পালন করছে বা সত্য প্রকাশ করছে না, তারাও কম অপরাধী নয়।

ইসরায়েলকে জবাবদিহি না করে বরং দেশটিকে প্রতিবছর শত শত কোটি ডলার সহায়তা দিয়ে আমরা এই বার্তা দিয়েছি যে, ইসরায়েল চাইলে যে কাউকে হত্যা করতে পারে এবং নিরীহ নাগরিকদের হামলা ও নির্যাতন করে দায়মুক্তি উপভোগ করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের মতো ক্ষমতাধর দেশগুলোর এমন নীরবতা ও অবজ্ঞা এ ধরনের সহিংস ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে; যা জাতিসংঘের ভাষায় ‘পরিস্থিতি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে’।

আমরা জানি কীভাবে এ সংঘাতের সমাপ্তি ঘটবে; এতে ফিলিস্তিনের দশ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস হতে পারে, মৃত্যু হতে পারে সহস্রাধিক ফিলিস্তিনি নাগরিক। দুই দেশের নিরপরাধ মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে এই মৃত্যুর মিছিলকে আরও দীর্ঘ করা হবে।

ইসরায়েলে বর্ণবাদকে যেভাবে লালন করা হয় এবং বর্ণবাদকে যেভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়, তা যে কোনো সময় দেশটির আধিপত্যবাদী নীতির ক্ষতিসাধন করতে পারে। যদি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলো পারস্পরিক যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাহলে দেশটিতে দ্রুত বসনিয়া, রুয়ান্ডা, লিবিয়া এবং দক্ষিণ সুদানের মতো মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

সংঘাত, সহিংসতা, দখলদারিত্ব কোনো আরব বা মুসলিম সম্পর্কিত বিষয় নয়; বিষয়টি মানবিকতার- এসব বন্ধ হওয়া উচিত। বিশ্ব যদি নেতানিয়াহু এবং তার ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে, তাহলে চীনের জিনজিয়াং, মিয়ানমার, সিরিয়া, কাশ্মীর ও তিব্বতে যেসব মানুষ প্রতিনিয়ত সহিংসতার শিকার হচ্ছে, তাদের কী হবে? মধ্যপ্রাচ্য মনে করে, সেখানে শান্তি কেবল তখনই আসবে, যখন ফিলিস্তিনিরা একটি পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো- বাইডেন প্রশাসন ফিলিস্তিনকে যেভাবে উপেক্ষা করছে তাতে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে না।

ফিলিস্তিনি জনগণের মর্যাদাবোধ, সহনশীলতা ও গর্ব আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা এবং অনুসরণীয়। সে ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়- আমরা কি বিবেকবান? মানবিকতা এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদ করার ভিত্তিতে মানুষকে সংজ্ঞায়িত করা উচিত।

ফিলিস্তিনে ইতোমধ্যে অসংখ্য মা-সন্তান হারিয়েছেন, গৃহহীন হয়েছেন? আরও কতবার আমরা দুর্বলদের প্রতি এ ধরনের সহিংসতার সাক্ষী হবো? নেতানিয়াহু একজন গণহত্যাকারী হতে পারেন, কিন্তু আমাদের কাঁধে ন্যায়বিচারের যে দায়িত্ব রয়েছে, আমরা সে দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছি?

সম্পাদক, মিডিয়া সার্ভিসেস সিন্ডিকেট; আরব নিউজ থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত, অনুবাদকৃত

মন্তব্য করুন