মজলুমের রক্তে জাতীয় ফুল ‘শাপলা’ লাল হয়ে যাবার দিন আজ

প্রকাশিত: ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ, মে ৫, ২০২১

আজ আমি নতুন কিছু লিখছি না। আজ থেকে ছয় বছর আগে যা লিখেছি, তাই আবার আপনাদের স্মৃতি, বিবেক ও প্রজ্ঞার কাছে পেশ করছি। আমি কবি, আমি মোয়াজ্জিন। আমার কাজ আজান দিয়ে যাওয়া, যারা ব্যক্তির চেয়ে সমষ্টি এবং সমষ্টির মধ্য দিয়ে তৌহিদের তাৎপর্যে পোঁছে এবং ‘এক’-এর নিকটবর্তী হবার তীব্র আকুতি বোধ করে, তাদের জন্যই আমার এই ডাক। অর্থাৎ যারা বৈচিত্রের মধ্যে ‘এক’ কে আবিষ্কার ও উপলব্ধি করেন তাদের কানে আমার আজান পৌঁছাবে ইনশাল্লাহ। আল্লাহ বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেন যেন আমরা পরস্পরকে চিনতে পারি এবং পরস্পরকে চেনা, জানা ও সম্পর্ক রচনা করার মধ্য দিয়ে বুঝতে পারি দুনিয়ায় ‘এক’-ই শুধু আছেন, তাই ‘অনেক’ বা আর সবকিছু ‘আছে’ বা ‘আছি’ হতে পারে। এছাড়া ‘আছে’ বা ‘আছি’ কথাটা সীমিত, বিনাশপ্রবণ, লয়মুখী কিম্বা রূপান্তরশীল কোন নশ্বর বস্তু, অবস্তু কিম্বা বিষয়ের জন্য প্রযোজ্য নয়।

‘মুখে পড়্রে সদাই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
আইন ভেজিলেন রাসুলুল্লাহ্‌ (ফকির লালন শাহ)
আ জ ৫ ই মে।
বাংলাদেশের জাতীয় ফুল সাদা শাপলা মজলুমের রক্তে লাল হয়ে যাবার দিন আজ

নিরস্ত্র মানুষের ওপর বিশাল সশস্ত্র বাহিনীর গুলি যে ফুলের রক্তাক্ত উদয় রুদ্ধ করতে পারে নি তার মাথায় টুপি পরিয়ে দাও কি গোপনে কবর দাও কুঁড়ি শুকাবে না। এই এক রক্তশাপলা যার আর মৃত্যুর সম্ভাবনা নাই। তার ভূগোল মোমিনের অন্তর, ষোল কোটি পাপড়ি লক্ষ কোটি শাপলা হয়ে ফুটবেই।

কসম এই রক্তকুসুমের, এই ফুল ফুটবে রানা প্লাজায়, ফুটবে পোশাক কারখানার মেয়েদের খোঁপায়, তাদের প্রতিটি আঙুলের ডগায়। সেই সকল আঙুলে পুড়ে মরা ও জ্যান্ত কবর হয়ে যাওয়া প্রতিটি কিশোর কিশোরি বোন ও ভাইয়ের লাশের সংখ্যা গোনা। নামগুলো সেলাই করা হৃদপিণ্ডে। সুঁইয়ে ও সুতায়।

আঙুলগুলো হিসাব নেবে শাপলা চত্বরের লাশেরও। কারণ অন্য ভাইয়েরা গ্রাম থেকে শহরে এসে আর ফেরে নি। যে অভাবে বোন শহরের কারখানায় সেই একই অভাবে ভাইটি মাদ্রাসায়।

পুড়ে মরা, জ্যান্ত কবর হওয়া ও গুলি খেয়ে মরা নিখোঁজ লাশ সকল দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের আদালতে। তারা ইনসাফ চাইছে।

কসম উদ্ভিদ, মাটি ও কাদাপানির, এই ফুল ফুটবে কৃষকের জমিতে কারন তাদের তাড়াতে হবে মনসান্টো ও মাহিকো সহ সকল বীজ কম্পানিগুলোকে। দখল নিতে হবে নিজ ভূখণ্ডের। কৃষকের বীজ লুট করে নিয়ে যাচ্ছে বীজের ডাকাত, বহুজাতিক পাইরেটস; আল্লার দান জমিনকে তারা বিষাক্ত করছে বিষে ও বিকৃত বীজে। গ্রামের কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা ধ্বংস করে যারা মায়ের কোল খালি করে কিশোরি মেয়েদের ঘর থেকে টেনে শহরের কারখানায় কারখানায় দাসশ্রমিক হতে বাধ্য করেছে, সেই সহিংসতা ও সন্ত্রাসের শুরু কৃষিতে। সেই রক্তাক্ত ইতিহাস আমাদের জানা আছে।

কসম আগুন ও শক্তির, এই ফুল ফুটবে নোনা দরিয়ায় বঙ্গোপসাগরে। কনকো ফিলিপস সহ বহুজাতিক কম্পানিগুলোর হাত থেকে তেলগ্যাস ব্লকগুলো উদ্ধার করবার লড়াইয়ে ময়দানে ফুটে থাকবে এই ফুল।

কসম মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও সকল এবাদতখানার। একদিন ফুল ফুটবে মোমিনের এবাদতে, ভক্তের উপাসনায়, ক্রুশ বিদ্ধ ঈসা আলাইহে ওয়া সাল্লামের পেরেকবিদ্ধ পদযুগলে। মানুষের জন্য প্রেমে শহিদ হওয়ার চেয়ে মহৎ আর কী হতে পারে! এই ফুল কবর রচনা করবে আস্তিক কিম্বা নাস্তিক সকল কিসিমের সাম্প্রদায়িকতার। তাদের দাফন শেষে মানুষ যার যার বাড়িতে ফিরে যাবে।

এই ফুল আল্লার কাছে ক্ষমা চাইবে তাদের জন্যও যারা জানে না তারা কী করছে

কসম বন্যা ও নদির, এই ফুল ফুটবে সীমান্তের জনপদে যেখানে প্রতিদিন গ্রামের মানুষগুলোকে হত্যা করছে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী, সীমান্ত পাহারার নামে। একদিন সীমান্তের কাঁটা তারের বেড়া ডুবে যাবে প্রগাঢ় বন্যায় আর সেই জলের ওপর ভাসবে লাল লাল শাপলা। মানুষের তৈয়ারি সীমান্তগুলো এমনকি জলজ প্রাণীরাও আর খুঁজে পাবে না।

আহ্‌, আমাকে আমার হত্যাকারীরা গুম করবার আগে দেখতে পাচ্ছি ফুল ফুটছে বস্তিতে বস্তিতে, পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় গ্রাম থেকে গ্রামে গ্রামান্তরে। আমাদের শহর ও গ্রামগুলোকে আমরা নতুন করে গড়ে তুলছি। ক্ষুধার্ত জীর্ণ শেকড়হারা উৎসহারা মানুষ নিজেদের বসতি খুঁজে পেয়েছে আবার।
বড় দীর্ঘকাল মানুষ বেহেশত থেকে নির্বাসিত। মানুষের স্মৃতির মধ্যে আছে বেহেশতের নকশা, ইহলোকে বেহেশত কায়েমই যুগপৎ একালের ধর্ম কিম্বা একালের রাজনীতি। মানুষের মুক্তির জন্য মজলুমের জিহাদে সন্তুষ্ট মাবুদ বেহেশত নামিয়ে আনবেন দুনিয়ায়।

আমরা তাঁকেই সন্তুষ্ট করি যিনি মজলুমের ভাষা বোঝেন এবং জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের সহায় হন।
কসম ভালবাসার, শাহবাগেও ফুটবে লাল লাল শাপলা। ফেরেশতাদের সঙ্গে মেঘের চেয়ারে বসে আমি দেখব ছবির হাটে বিশাল ক্যানভাসে আঁকা হয়েছে বিশাল এক লাল শাপলা।তার লক্ষ কোটি পাপড়ি। শেকড় বাংলাদেশে কিন্তু সারা জাহানে তার বিশাল বিপুল বিস্তার।

আজ ৫ মে। আজ প্রতিশ্রুতি দেবার ও শপথ নেবার দিবস।

ফরহাদ মজহার, সমাজ গবেষক

মন্তব্য করুন