শরীয়তপুরের গর্ব বুড়িরহাট ঐতিহ্যবাহী জামে মসজিদ

প্রকাশিত: ১২:৩৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৩, ২০২১

বিশ্বে গর্ব করার মতো বাংলাদেশের আছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ স্থাপত্যকলা। শিল্পের এই মাধ্যমে কোনও অংশে কম ছিল না এ অঞ্চল। বাংলাদেশের যে স্থাপনাশৈলী এখনও বিমোহিত করে চলেছে অগণিত ভ্রমণচারী ও মননশীল মানুষকে, তার মধ্যে আছে দেশজুড়ে থাকা অগণিত নয়নাভিরাম মসজিদ।

শরীয়তপুর সদর উপজেলার রুদ্রকার ইউনিয়নে আছে ঐতিহ্যবাহী বুড়িরহাট বাজার। ত্রিশ বছর আগে মসজিদটি পরিপূর্ণতা লাভ করলেও এর ইতিহাস আরও আগের।

দৃষ্টিনন্দন মসজিদটির পেছনে আছে কিছু নিবেদিত ধর্মপ্রাণ মানুষের অবদান। তাদের কেউ বেঁচে না থাকলেও তাদের নির্মিত চমৎকার স্থাপনাটি টিকে আছে এখনও। ইংল্যান্ডের সিমেন্ট ও কলকাতা থেকে আনা বিভিন্ন পাথর দিয়ে কারুকাজ করা মসজিদটি দেখতে পর্যটকরাও আসেন।

১৯৯০ সালে তৎকালীন ধনাঢ্য ও ধর্মনুরাগী একাব্বর হোসেন হাওলাদার মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নব্বই দশকের শুরুর দিকে বুড়িরহাট গ্রামে শন দিয়ে ছোট্ট একটি মসজিদ বানানো হয়। এর কয়েক বছর পর একাব্বর হোসেন হাওলাদারের ছেলে মরহুম মমতাজ উদ্দিন হাওলাদার টিনের ঘর দিয়ে মসজিদ বানান।

কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের আদলে এর নকশা করা হয়। মসজিদটি ৫ একর জমির ওপর। দৈর্ঘ্য ২৫০ ফুট ও প্রস্থ ১২০ ফুট। দেয়াল ৩ ফুটেরও বেশি পুরু। মসজিদের ভেতরের দেয়ালে সিরামিক চুর্ণ দিয়ে লতাপাতা আঁকা অসংখ্য রঙিন নকশা আছে। বাইরের দিকে আছে সিমেন্ট ও সিরামিকের টোরাকোটা নকশা।

মোট ১০টি গম্বুজ আছে মসজিদটিতে। গ্রামের লোকজনের নামাজ আদায়ে জায়গা হচ্ছিল না। তাই উত্তর-পূর্ব পাশে বাড়ানো হচ্ছে। এখন চলছে ৩০টি গম্বুজের কাজ।

মূল প্রবেশপথ দুটি। এখন একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন এক হাজার মুসুল্লি। ওয়াকফকৃত সম্পত্তিতেই মসজিদটি স্থাপিত। পাশে ঈদগাহ। পশ্চিমে মসজিদের মার্কেট। পূর্বপাশে ইমামের থাকার ব্যবস্থা ও মিনার। বিদ্যুৎ চলে গেলে আছে জেনারেটর।

স্থানীয় বয়স্কদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুড়িরহাট এলাকার মুসলমানরা শিক্ষায় অনগ্রসর ছিল। কিছু সম্ভ্রান্ত পরিবার ছাড়া বাকিরা পড়াশোনা করেনি। এ সময় একাব্বর হোসেন হাওলাদার বুড়িরহাটের এই জায়গায় একটি গাছের নিচে বসে ইবাদত করতেন। কয়েক বছর পর একাব্বর হাওলাদার এ এলাকার বিশিষ্ট কয়েকজনকে নিয়ে একটি শনের ঘর তৈরি করে নামাজ ও কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। তার ছেলে মরহুম মমতাজ উদ্দিন হাওলাদার একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ার চিন্তা করেন। কিন্তু তার ছিল না জমি বা অর্থ।

স্থানীয় অনেকে জানান, টিনের ঘরের একটি মসজিদ ছিল ১৯১০ সাল পর্যন্ত। এরপর সেটা পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন যে কয়েকজন ব্যক্তি অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম মরহুম মমতাজ উদ্দিন হাওলাদার, মরহুম মন্তাজ উদ্দিন মুন্সী ও আফতাব উদ্দিন মুন্সী। উদ্যোগ নেওয়া হয় নানা কারুকাজখচিত দর্শনীয় বিশাল বুড়িরহাট জামে মসজিদ নির্মাণের।

শরীয়তপুর চন্দনকর মৌজায় বুড়িরহাট বাজারের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমানার শেষ প্রান্তে এই মসজিদ। এর দক্ষিণ পাশের খালের অস্তিত্ব এখন আর নেই। দান করা কিছু জমি ও খালে তৈরি হয়েছে মসজিদের পুকুর।

মসজিদটির নকশা করেন প্রকৌশলী মরহুম আফতাব উদ্দিন মুন্সী। তিনি নির্মাণকাজে বিভিন্ন ধরনের পাথর ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কলকাতা থেকে কিনে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সিমেন্ট সরবরাহ করা হয় ইংল্যান্ড থেকে। কারুকাজের জন্য কারিগর আনা হয় চাঁদপুর থেকে। তাদের কাজ দেখে উদ্যোক্তাদের উৎসাহ আরও বাড়ে। এরপরই বাড়তে থাকে সহযোগিতা।

৯০’র দশকে নির্মাণ হয় মসজিদের মিনার। মিনারটি তৈরি করতে বিরতিহীনভাবে ১০ জন মিস্ত্রির সময় লেগেছে দেড় বছর। বিভিন্ন সময়ে ধর্মপ্রাণ মানুষ ও পথচারীরা মসজিদের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে থমকে দাঁড়ান। শহর থেকে দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনুন্নত একটি গ্রামে এমন একটি স্থাপনা দেখে অবাক হন তারা।

স্বাধীনতার বছর থেকে মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার শিরঙ্গল গ্রামের মাওলানা মনসুর আহমেদ। ১৯৮২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ইমাম ও খতিবের দায়িত্বে ছিলেন চাঁদপুর জেলার মাওলানা ইসহাক নিজামী। তার মৃত্যুর পর আরও দুজন ইমামের পরিবর্তন হলেও বর্তমান খতিব ও ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওসমানী।

বর্তমানে মসজিদ পরিচালনা কমিটির পক্ষে দায়িত্ব পালন করছেন মোজাম্মেল হোসেন সেন্টু হাওলাদার, শরীয়তপুর সরকারি কলেজের প্রফেসর মিজানুর রহমান হাওলাদার, পূর্ব মাদরীপুর সরকারি কলেজের প্রফেসর খোরশেদুল আলম, বদর উদ্দিন হাওলাদার ও মহিবুর রহমান বাবু চৌধুরীসহ আরো অনেক স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি।

মিজানুর রহমান হাওলাদার বলেন, আশির দশকে মসজিদের মিনার তৈরি হয়। তখন থেকেই এ মসজিদের অনেক দায়িত্ব পালন করে আসছে আমার পরিবার। মুসুল্লি বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদটি আরো বড় করার জন্য এর উত্তর ও পূর্ব পাশে উন্নয়নকাজ শুরু করি ২০১৫ সালে। তবে কোনও দেয়াল ভাঙা সম্ভব হয়নি। আগের নকশা ঠিক রেখেই উন্নয়নকাজ চলছে।

মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর খোরশেদুল আলম জানান, মসজিদটি কলকাতার টিপু সুলতাল মসজিদের আদলে নির্মিত। অনেকে এখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে নামাজ পড়তে আসে। মানুষের অনুদানে এবং মসজিদের মার্কেটের আয়ে এর ব্যয় চলে।

মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য কামরুল আলম নান্নু জানান, আমরা ঐতিহাসিক বুড়িরহাট জামে মসজিদে প্রতি বছর রমযানে ইফতারের আয়োজনে করে থাকি। করোনার কারণে গতবছর ও এ বছর ইফতারের আয়োজন নেই। স্থানীয় মুসুল্লি সামচুল আলম শামীম বলেন, ঐতিহ্যবাহী বুড়িরহাট মসজিদে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে নামাজ পড়ছি। এখানে নামাজ পড়তে ভালোলাগা কাজ করে।

মসজিদের খতিব ও ইমাম মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওসমানী জানান, দীর্ঘদিন এ মসজিদে ইমামের দায়িত্ব পালন করছি। এ এলাকায় এমন মসজিদ আর নেই। দূর থেকে মানুষ মসজিদটি দেখতে আসে।

বাংলা ট্রিবিউনের সৌজন্যে

মন্তব্য করুন