আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জবিতে ৫ শিক্ষক নিচ্ছেন অনৈতিক সুবিধা

প্রকাশিত: ১২:৫৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৫, ২০২১

জবি সংবাদদাতা: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) বিদ্যমান আইন কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাঁচজন শিক্ষক একাধিক পদের দায়িত্ব পালন করছেন, নিচ্ছেন বিশেষ সুবিধা। এই কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের পরিপন্থী হলেও তারা অনৈতিকভাবে এক সাথে একাধিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন এবং আর্থিক সুবিধা ভোগ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ১৭(২) ধারায় সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সকল দায়িত্বের জন্য আর্থিক সুবিধা প্রদান করা যাইবে সেই সকল দায়িত্বের মধ্য হইতে একসঙ্গে একাধিক দায়িত্ব কোন শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে প্রদান করা যাইবে না।’ তবে শিক্ষকরা এই বিষয়টি জানলেও তারা নিজ উদ্যেগে কোন পদক্ষেপ নেন নি ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ জন শিক্ষক একাধিক পদে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন এবং আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন। এই তালিকায় রয়েছেন পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নূরে আলম আব্দুল্লাহ। তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্বের পাশাপাশি গবেষণা পরিচালকের দায়িত্বও পালন করছেন এবং আর্থিক সুবিধা ভোগ করছেন।

আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সরকার আলী আক্কাস একই সাথে আইন বিভাগের চেয়ারম্যান ও আইন অনুষদের ডীন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন।

প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও লাইফ এন্ড আর্থ সাইন্স অনুষদের ডীন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। তিনিও দুই পদে থেকে আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ইভিনিং ডিরেক্টর ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ড. মোস্তফা কামালও একাধিক পদে থেকে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন। এই তালিকায় আছেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. অরুন কুমার গোস্বামী ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সিনিয়র অধ্যাপকের সাথে কথা বলে জানা গেছে গত আট বছর যাবৎ সদ্য-সাবেক ভিসির যারা কাছের মানুষ তাদেরকে বিভিন্নভাবে সুবিধা পেয়েছেন। এজন্য এক ব্যক্তি একাধিক দায়িত্ব পেয়েছেন এবং আর্থিক সুবিধাও ভোগ করেছেন।

একজন অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যেহেতু ডীন ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ‘বাই রোটেশন’ এ আসে তাই এটা হয়তো এর মধ্যে পড়বে না। কিন্তু চেয়ারম্যান ও অন্যান্য দায়িত্ব এক ব্যক্তির ওপর অর্পিত হওয়া আইন বহর্ভূত। আর তাছাড়া অনেক যোগ্য লোক থাকতেও এক ব্যক্তি একাধিক পদে আছেন। এটা প্রশাসনের উচিত বলে মনে করি না।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের দুটি গ্রুপের মধ্যে প্রভাব বিস্তার কে কেন্দ্র করে সিনিয়র শিক্ষকরা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান নীল দলকে দুই গ্রুপে বিভক্ত করে শিক্ষকদের ম্যানেজ করতেন। তার আশকারায় নীল দলের প্রভাবশালী শিক্ষকরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব খাটাতে শুরু করেন। তাদের পছন্দমত শিক্ষক না হলে দুই পদে দায়িত্ব থাকা শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার কতৃক দায়িত্ব হস্তান্তর করতে বাধ্য করেন। তবে তারা এক সাথে দুই দায়িত্বে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন তোয়াক্কা করেন না।

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টারও বেআইনিভাবে দুই পদে দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের কোনো নোটিশ প্রদান করেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার ইঞ্জিনিয়ার ওহিদুজ্জামান বলেন, আসলে আমি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ব্যাখ্যা দিতে পারি না। তবে এটা জানতে চাইলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। টেলিফোনে এসব ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হবে না। তবে তাকে এ বিষয়ে আরো প্রশ্ন করা হলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেন নি। তবে তিনি কর্তব্যরত সাংবাদিককে লিখিত ভাবে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরামর্শ দেন।

এদিকে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নূরে আলম আব্দুল্লাহ একইসাথে বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরিচালকের দায়িত্বও পালন করছেন এবং আর্থিক সুবিধা ভোগ করছেন। তবে তিনি একাধিক পদের জন্য আর্থিক সুবিধা নেন না বলে জানান।
তিনি বলেন, চেয়ারম্যানের দায়িত্ব কোন আর্থিক সুবিধার পদ নয়। তবে গবেষণা পরিচালক একটি আর্থিক লাভজনক পদ বলা যেতে পারে এটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়োগ দিয়ে থাকে।

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সমন্ধে জেনেও কেন আইন পরিপন্থি কাজ করলেন এমন প্রশ্ন করলে তিনি দুইজন সিনিয়র শিক্ষকের কথা উল্লেখ্য করে বলেন, এর আগেও তারা একসাথে চেয়ারম্যান ও ডীন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
তবে, অন্যের করা অন্যায়কে ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করে নিজে একই অন্যায়কে লালন করাকে কতটুকু যুক্তিযুক্ত সে বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. সরকার আলী আক্কাস। তিনি আইন বিভাগের শিক্ষক হয়েও বেআইনি ভাবে একইসাথে বিভাগের চেয়ারম্যান ও আইন অনুষদের ডীন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন। এই বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. সরকার আলী আক্কাস বলেন, ” বিশ্ববিদ্যালয়ে সিন্ডিকেট পাশ করা একটি আইন আছে যত পদই থাকুক না কেন সর্বোচ্চ যে পদে থাকবে সে পদের বেতন এবং এর পরের যে পদে থাকবে তার অর্ধেক বেতন পাবে।”

তাহলে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও সিন্ডিকেট কি পরস্পর বিরোধী কথা বলছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না তা হবে কেন। আমাদের সিন্ডিকেটে বলা হয়েছে এমন কথা। তবে সিন্ডিকেটের পাশ করা কোন আইনে এমন কোন তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় নি।

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম একসাথে লাইফ এন্ড আর্থ সাইন্স অনুষদের ডীন ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যানে দায়িত্ব পালন করছেন । বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অমান্য করে একসাথে দুই পদে দায়িত্বে থাকা বিষয়ে তিনি বলেন, এসব দায়িত্ব পালন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ভাঙ্গা হচ্ছে না। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অথারিটির সাথে কথা বলতে বলেন।

এদিকে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের বহুল আলোচিত-সমালোচিত শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক ড. মোস্তফা কামাল একই সাথে বিভাগের ইভিনিং ডিরেক্টর এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আইনের বিষয়ে জানতে চাইলে ড. মোস্তফা কামাল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট থেকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। লোকবল সঙ্কট থাকায় এমনটা দেয়া হয়েছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে একশ জনের অধিক অধ্যাপক এবং কয়েকশ সহযোগী অধ্যাপক আছেন। এবং তার নিজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে চারজন অধ্যাপক ও পাঁচ জন সহযোগী অধ্যাপক কর্মরত আছেন। সেক্ষেত্রে লোকবল সংকটের কোন প্রশ্নই আসে না।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য (চলতি দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. কামালউদ্দীন আহমদ বলেন, আমাদের এখানে সিন্ডিকেটে এমন একটি নিয়ম আছে। তবে কারো একাধিক দায়িত্ব এক সাথে পালন করা উচিত নয়।

মন্তব্য করুন