এক যুগ ধরে ক্যাম্পাসে প্রাণীদের দুঃসময়ের বন্ধু

প্রকাশিত: ৪:৪০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১, ২০২১

রাবি প্রতিনিধি, মিনহাজ আবেদিন: প্রতি বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) প্রায় ৯০-৯৫ দিন ছুটি থাকে। এই বন্ধকালীন শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে না থাকায় হল, খাবার হোটেল, দোকানপাটসহ প্রায় সবকিছুই বন্ধ থাকে। এসময় ক্যাম্পাস দাপিয়ে বেড়ানো কুকুরগুলোকে খাবারের উচ্ছিষ্ট না পেয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়। এ দৃশ্য দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসি ভবনের উচ্চমান সহকারী পদে দায়িত্বে থাকা মো.গাজীউল ইসলাম এই বন্ধের দিনগুলোতে কুকুরগুলোকে দিনে একবেলা খাবার দেয়া শুরু করে। আর এখন করোনা সংক্রমণ রোধে ক্যাম্পাস বন্ধ রয়েছে এক বছরেরও বেশি সময়। এখন সকাল- বিকাল দুই বেলা খাবার দিচ্ছেন তিনি। তার এ মহৎ কাজে এগিয়ে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও।

বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রায় ৪৫-৫০ টির মতো কুকুর রয়েছে। বিড়ালও রয়েছে প্রায় ১৫-২০টি। যারা ক্যাম্পাস দাপিয়ে বেড়ায়। প্রতিদিন এদের পিছনে ৪-৫ শত টাকা করে মাসে প্রায় ১২ হাজার টাকার খাবার দিতে হয়। খাদ্য হিসেবে গরু, মুরগির মাংসের হাড়গোড়সহ খিচুরি দেয়া হয়। মাঝেমধ্যে দুই- একটা কুকুর অসুস্থ হয়ে পড়লে রাজশাহী শহর থেকে ওষুধ এনে তাদের চিকিৎসাও দেয়া হয়।

৯০-৯৫ দিন সাধারণ বন্ধের সঙ্গে আরও ছুটি যুক্ত হয় যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভূত কোনো সমস্যা দেখা দেয়। ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছর এই বন্ধের দিনগুলোতে কুকুরগুলোকে খাবার দেন গাজিউল ইসলাম। করোনার দীর্ঘ বন্ধে এখন ক্যাম্পাসের কুকুর-বিড়ালদের নিয়মিতই খাবার দিচ্ছেন তিনি। প্রতিদিন এ খাবারের টাকা জোগাড় করতে কিছুটা হিমশিমের মধ্যেও পড়েন বলে জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গাজীউল পশু-পাখি ও প্রাণীপ্রেমী একজন মানুষ। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসি ভবনের উচ্ছমান সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন ১৯৯৮ সাল থেকে। ২০০৮ সাল থেকে ক্যাম্পাসের কুকুরসহ বিভিন্ন প্রাণীদের সেবা দিয়ে আসছেন। এখনও দিচ্ছেন। তিনি রাজশাহী জেলার মতিহার থানার অন্তর্ভুক্ত বিনোদপুর এলাকার বাসিন্দা।

গাজীউল ইসলাম বলেন, আমি বিবেকের জায়গা থেকে কাজটা করি। ১২ বছর থেকে আমি ক্যাম্পাসের প্রাণীদের সেবা দিয়ে আসছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকেও এখন পর্যন্ত সরাসরি ক্যাম্পাসের প্রাণীদের জন্য কোনো আর্থিক সহযোগিতা পায়নি। প্রতিদিন ভোর ৬ টায় উঠে কুকুরের জন্য রান্না তৈরি করা শুরু করি। ৯টা পর্যন্ত মোট ৩ ঘন্টা এদের পিছনে সময় ব্যয় করি। প্রতিদিন প্রায় ৪৫-৫০ টি কুকুরকে রান্না শেষে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে তাদের খাওয়া দিয়ে আসি। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসি ভবন থেকে তাদেরকে খাওয়া দেয়া শুরু করি। মাঝে মধ্যে টিএসসিসির নিরাপত্তা কর্মী মো. নজরুল ইসলাম আমার এ কাজে সহযোগিতা করে।

কুকুর-বিড়ালদের পিছনে দিন ৪-৫শ করে মাসে প্রায় ১২ হাজার টাকা করে খরচ হচ্ছে বলে জানান গাজীউল। এই অর্থ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই কাজ শুরু করার প্রায় একমাস পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাসে ১৫০০- ৩০০০ টাকা করে দিচ্ছেন নিয়মিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হাবিবুর রহমান মাসে ১৫০০ টাকা এবং টিএসসিসি ভবনের নাটকের উপ-পরিচালক মো. আহসান কবীর ২০০০ টাকা করে নিয়মিত দিচ্ছেন। আরো অনেকেই এই প্রাণীদের জন্য এককালীন অর্থ দিয়েছেন। সবার সহযোগিতায় মাসে ৭০০০ টাকার মতো আসে। আর বাকি ৫০০০ হাজারের মতো আমার নিজ পকেট থেকে দিতে হয়। অনেক সময় এই অর্থ বহন করতে আমার কষ্ট হয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, আমাকে দেখে মার্কেটিং বিভাগের প্রসেংজিৎ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের মাহমুদ সাকিসহ কিছু শিক্ষার্থী প্রায় তিন- চার মাস যাবৎ কুকুরদের খাওয়া দিয়েছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় দুইশত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাণিদের খাওয়ানোর জন্য সহযোগিতা পেতো। পরে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে শিক্ষার্থীদের এ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, মানবিকদৃষ্টিকোণ থেকে গাজীউল ইসলাম ক্যাম্পাসে অনাহারে থাকা প্রাণিদের খাবার দিচ্ছেন বলে আমি জানি। একাজ করার জন্য তাকে বাধ্যও করা হয়নি। এতে অনেক অর্থ ব্যয় হয়। তবে এ প্রাণিদের খাবারের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে কিছুটা সহযোগিতা করা হয়।

মন্তব্য করুন