মোদির আগমন : আলেম-ওলামা ও হেফাজতের ভূমিকা

প্রকাশিত: ৬:৪৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ২২, ২০২১

মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী

ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে আওয়ামী সরকারের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। মুসলিমবিদ্বেষী সাম্প্রদায়িক মোদির আগমনের বিরোধিতা করে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষ ইতোমধ্যে তীব্র প্রতিবাদে জেগে উঠেছে।

এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশপ্রেমিক ও ঈমানদার মুসলমানদের ট্যাক্সের টাকায় মুসলমানদের শত্রু কসাই মোদীকে অভ্যর্থনা ও খাতির করা হবে, অথচ তাদের তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভকে উপেক্ষা করা হচ্ছে! এদেশের ওলামায়ে কেরাম ও তৌহিদি জনতা কোনোভাবেই মোদির আগমন মেনে নিবে না।

আমাদের পূর্বপুরুষ দেওবন্দি ওলামায়ে কেরাম দখলদার ও সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে অক্লান্তভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। ভারতবর্ষের আজাদি অর্জনে তাদের অগ্রণী ভূমিকা অবিস্মরণীয়। তাদের উত্তরসূরী হিসেবে এবং একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এদেশের আলেম-ওলামা কোনোভাবেই ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদের কাছে নতি স্বীকার করবে না এবং নব্য ফ্যাসিবাদী অপশক্তির দাসত্ব মেনে নিবে না।

মোদির আগমনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের ব্রাহ্মণ্যবাদী চক্রান্ত হলে সচেতন ওলামায়ে কেরাম তা প্রতিহত করতে বদ্ধপরিকর। সম্প্রতি হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের নামে কটূক্তি করে ফেসবুকে এক হিন্দু যুবকের পোস্টের নাটক সাজিয়ে সুনামগঞ্জের শাল্লায় নিরীহ হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতভিটায় হামলা ও লুটপাটের ঘটনা সম্পূর্ণভাবে ফ্যাসিবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদের যৌথ পরিকল্পনা বলে আমরা মনে করি।

এইমুহূর্তে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণা চলছে। সেখানে নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপিও নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। ফলে বাংলাদেশের তথাকথিত হিন্দু নির্যাতনের কাহিনী প্রচার করে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সবসময় পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চায়। সুতরাং, আমরা মনে করি, বাংলাদেশে নরেন্দ্র মোদির আগমনকে কেন্দ্র করে ফ্যাসিবাদ ও হিন্দুত্ববাদের যৌথ পরিকল্পনায় শাল্লার ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে।

ইসলামবিদ্বেষী সেকুলার মিডিয়াগুলো পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও যাচাই-বাছাই ছাড়া শাল্লার ঘটনার সাথে হেফাজতে ইসলামের নাম জড়িয়ে সংঘবদ্ধভাবে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের উসকানি দিয়েছে। অথচ পরবর্তীতে স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি শহীদুল ইসলাম স্বাধীন শাল্লার ঘটনার মূল হোতা হিসেবে গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের কোনো নেতা বা সমর্থক এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি।

অতীতে হিন্দুদের উপাসনালয় ও বাড়িঘরে হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলে হেফাজতে ইসলাম সুস্পষ্টভাবে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল। হিন্দুদের উপাসনালয় ও বাড়িঘরে কোনো ধরনের হামলা আমরা সমর্থন করি না; ইসলাম কোনো ধরনের সম্প্রদায়বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক ফ্যাসাদ অনুমোদন করে না। কিন্তু এগুলো নিছক সাম্প্রদায়িক হামলা নয়, বরং এগুলো মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা বা সাবোট্যাজ। এ ধরনের সাবোট্যাজ আজকে নতুন নয়। আগেও হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ও বাড়িঘরে ষড়যন্ত্রমূলক হামলার ঘটনা ঘটিয়ে তদন্ত ও অনুসন্ধানের আগেই দেশের ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামী দলগুলোর ওপর দায় চাপিয়ে উদ্দেশ্যমূলক প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে। এক্ষেত্রে কতিপয় সেকুলার মিডিয়া ফ্যাসিবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদী ষড়যন্ত্রের সহযোগী ভূমিকা পালন করে থাকে, যা অত্যন্ত নিন্দাজনক ও লজ্জাজনক!

বাংলাদেশের হিন্দুদের সাথে আমাদের সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহাবস্থান শত শত বছরের ঐতিহ্য। কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই ঐতিহ্য নষ্ট করার সুযোগ আমরা দিবো না।

নিরীহ সাধারণ হিন্দু ভাইদের আমরা আহ্বান করবো, ফ্যাসিবাদ ও হিন্দুত্ববাদের ফাঁদে পা দেবেন না। হিন্দুত্ববাদীদের প্ররোচনায় এদেশের ওলামায়ে কেরাম ও মুসলমানদের ওপর ঢালাও দোষ চাপাবেন না। আসুন, মুসলিমবিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদী নরেন্দ্র মোদির আগমনের প্রতিবাদে এদেশের জনগণের সাথে আপনারাও শামিল হোন। এই বাংলাদেশ আপনাদেরও বাসভূমি। আপনাদের ব্যবহার করে ভারতের হিন্দুত্ববাদী শাসকগোষ্ঠী নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থ হাসিল করবে মাত্র। তাদের দ্বারা আপনাদের কোনো কল্যাণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এদেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে আপনাদের পূজা-পার্বণে সরকারি সহায়তা আসে। আপনাদের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ের উন্নয়নে এদেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকা বরাদ্দ হিসেবে আপনাদের কাছে আসে। ভারত যেখানে আমার আপনার বাংলাদেশকে ন্যায্য পাওনা দিতে ব্যর্থ, সেখানে আপনাদেরকে আলাদা করে কী দেবে? সুতরাং, এদেশের মুসলমানদের আপনারা আপন হিসেবে দেখুন। নিজেদেরকে এদেশের নাগরিক হিসেবে অনুভব করুন। এতেই আপনাদের কল্যাণ। ভারতকে তীর্থস্থান মনে করার ফ্যান্টাসি থেকে আপনারা বের হয়ে আসুন।

সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদী ব্যক্তি হিসেবে নয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আসবেন। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী পরিচয়ের চেয়েও নরেন্দ্র মোদীর বড় পরিচয় হলো সে মুসলিমবিরোধী হিন্দুত্ববাদী কসাই, যে কিনা ২০০২ সালে গুজরাটে নিরীহ মুসলমানদের ওপর গণহত্যা পরিচালনার মূল হোতা। এছাড়া সে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি সংগঠন আরএসএস-এর সাবেক সদস্য। নরেন্দ্র মোদি ভারতের ক্ষমতায় এসেছে আরএসএস-সহ উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশবিরোধী ও মুসলিমবিরোধী অবস্থান ধরে রেখে মোদি-অমিত গং ভারতের ক্ষমতায় টিকে আছে।

মুসলিমবিদ্বেষী নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহদের শাসনামলে ভারতজুড়ে গরুর মাংস ইস্যু নিয়ে বহু মুসলমানকে কখনো পিটিয়ে আবার কখনো আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহরা বাংলাদেশবিরোধী ধুয়া তুলে ভারতের আসামে মুসলিমবিদ্বেষী নাগরিকত্ব আইন করে লক্ষ লক্ষ নাগরিককে রাষ্ট্রহীন করার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ভারতজুড়ে এই বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হলে মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অত্যাচার-নির্যাতনের স্টিমরোলার চালায় মোদি-অমিত গং। জয় শ্রীরাম ধ্বনিতে মসজিদে মসজিদে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয় উগ্র হিন্দুত্ববাদী শিবসেনারা। সেসময় তারা সংঘবদ্ধভাবে দিল্লির একটি মসজিদের মিনারে উঠে গেরুয়া পতাকা উড়িয়ে উল্লাসও করে।

২০১৯ সালের আগস্টে মোদি-অমিত সরকার ভারতের সংবিধান থেকে অনৈতিকভাবে ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা হরণপূর্বক কাশ্মিরী মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার কেড়ে নিয়েছে। বছরের পর বছর লকডাউনের মধ্যে আটকে রেখে কাশ্মিরের মুসলমানদের মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য করেছে আগ্রাসী দখলদার ভারতীয় সৈন্যরা। আমরা সবসময় কাশ্মিরী মুসলমানদের স্বাধীনতার লড়াইয়ের সাথে একাত্মতা পোষণ করি।

এছাড়া ভারতের আদালতকে ব্যবহার করে হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার বাবরি মসজিদ ভাঙায় জড়িত আসামীদের বিনাবিচারে বেকসুর খালাস দিয়ে বাবরি মসজিদের জায়গায় অবৈধভাবে রামমন্দির বানানোর কাজ চলমান রেখেছে। এই ঘটনাটি ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার হরণের প্রমাণ বহন করে।

এমনকি সম্প্রতি ভারতের মাদ্রাসাগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে গীতা-বেদ-রামায়ণ পড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিজেপি সরকার। মোদির শাসনামলে পুরো ভারতজুড়ে আজ মুসলমানরা চরম আতঙ্ক ও নিপীড়নের মধ্যে বসবাস করছে। তাদের তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানরা যথেষ্ট ভালো আছে এবং অনেক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। মাঝেমধ্যে স্পর্শকাতর সময়ে ফ্যাসিস্ট অপশক্তি কর্তৃক সাবোট্যাজ ছাড়া এদেশে ভারতের মতো সংখ্যালঘু নির্যাতন হয়না। এ ধরনের রাজনৈতিক সাবোট্যাজ বন্ধ করতে হলে সর্বাগ্রে ধর্ম-দল-মত নির্বিশেষে আমাদের পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফ্যাসিবাদ ও হিন্দুত্ববাদকে পরাজিত করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তাকে আমরা স্বীকার করি; কিন্তু তার মানে এই নয় যে, পিন্ডির শিকল থেকে মুক্ত হয়ে দিল্লির গোলামিতে আমরা আত্মসমর্পণ করবো। আমরা এটাও ভুলে যাইনি যে, মুক্তিযুদ্ধকালীন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে ভারতীয় সৈন্যরা এদেশের অফিস ও কল-কারখানাগুলোতে সীমাহীন লুটপাট চালিয়েছিল এবং পাকবাহিনীর ফেলে যাওয়া কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক অস্ত্রশস্ত্র ও ট্যাংকসমূহ লুট করে ভারতে নিয়ে গিয়েছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, কারণ ভারতের আধিপত্যবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে এখনো আমাদের লড়াই করতে হচ্ছে। সুতরাং, মুসলিমবিদ্বেষী ও উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের শাসনাধীন ফ্যাসিস্ট ভারত কখনো বাংলাদেশের মতো একটি মুসলিম-অধ্যুষিত রাষ্ট্রের বন্ধু হতে পারে না।

আধিপত্যবাদী ভারত বছরের পর বছর বন্ধুরাষ্ট্রের ছলনায় বাংলাদেশের সাথে প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি করেছে। আমাদের মেরুদণ্ডহীন সরকারকে তিস্তার মুলা ঝুলিয়ে বিনা ফিতে ট্রানজিট-করিডোরসহ বহু একতরফা স্বার্থ হাসিল করে নিয়েছে ভারতের চাণক্যবাদী শাসকগোষ্ঠী। তারা তিস্তার পানি না দিলেও আমাদের ফেনী নদীর পানি নেওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করে নিয়েছে। ভারত আমাদের দেশে অবাধে পণ্য রপ্তানি করে ব্যবসা-বাণিজ্য করলেও তাদের দেশে আমাদের পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা বাধা তৈরি করে উভয় দেশের মধ্যে অস্বাভাবিক বিশাল বাণিজ্য-ঘাটতি বজায় রেখেছে। বৈধ-অবৈধভাবে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিক এদেশে এসে চাকুরি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ভারতে নিয়ে যায়। অথচ নির্দয়ভাবে সীমান্তে প্রতিনিয়ত গুলি করে পাখির মতো বাংলাদেশিদের হত্যা করছে ভারত। ফলে ভারত ছোটলোকের মতো শুধু নিতেই জানে, বিনিময়ে দিতে জানে না। ভারত চাণক্যনীতি অনুসরণ করে তার আশেপাশের অপেক্ষাকৃত ছোট দেশগুলোকে দাদাগিরি দিয়ে দমন করে রাখতে চায়; ফলে ভারত মোটেও আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র হতে পারে না। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক হতে হবে সম-সার্বভৌমত্বের মর্যাদার ভিত্তিতে।

গুজরাটের কসাইখ্যাত নরেন্দ্র মোদির আগমনের বিরোধিতা ও প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে সরকার ও প্রাশাসন যতই হুমকি-ধমকি ও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করুক, এদেশের আপসহীন ওলামায়ে কেরাম দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করে যাবে ইনশাআল্লাহ। এদেশের জনগণ চায় না– মোদির আগমনের কারণে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী কলঙ্কিত হোক। সরকারের উচিত জনগণের প্রতিবাদ-বিক্ষোভকে আমলে নিয়ে অবিলম্বে মোদির আগমন বাতিল করা।

লেখক: কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ

মন্তব্য করুন