ইস্তান্বুলে চির নিদ্রায় শায়িত হলেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আলেম আস-সাবুনি

প্রকাশিত: ৬:২৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ২১, ২০২১

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আলেম আস-সাবুনির মরদেহ তুরস্কের ইয়োলভা শহর থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ইস্তান্বুলে নেয়া হয়। ২০ মার্চ ‘আল ফাতিহ’ মসজিদে জানাজা শেষে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকানের (রহ.) কবরের পাশে মের্কেজেফেন্ডি মসজিদে দাফন করা হয়েছে।

জানাজায় একে পার্টি গ্রুপের ডেপুটি চেয়ারম্যান মুহাম্মাদ এমিন আকবাওসালু, সিরিয়ার ইসলামিক কাউন্সিলের সভাপতি উসাম এর রাফাই, একে পার্টির চেয়ারম্যান রাষ্ট্রপতি রেসেপ তাইয়িপ এরদোগানের উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইয়াসিন আক্তা, সাবেক এমপি সেভকি ইলমাজ এবং বিজ্ঞান ও চিন্তা গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ইহসান সেনোজাক, সাবুনির আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সবাই অংশগ্রহণ করেন।

ইয়ালোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. অ্যালিজান দাদেবীরেন বলেন, মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনি আধুনিক শতাব্দীর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় তাফসির পন্ডিত ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘তিনি আধুনিক শতাব্দীর শীর্ষস্থানীয় তাফসির পন্ডিতদের মধ্যে একজন ছিলেন। এই শিক্ষকের তাফসির অনেক কাজে এসেছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো সাফওয়াত-তাফসির, যা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত সুপরিচিত ও যুগোপযোগী।

তিনি আরও বলেন, এটি তুরস্কসহ অনেক ইসলামী দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে পড়ানো হয়। এর অনুবাদগুলোও ব্যবহৃত হয়। এগুলো ছাড়াও তার মূল্যবান রচনাও রয়েছে। ১৯৮৪ সাল থেকে এই শিক্ষককে আমি চিনি। তিনি তুরস্কের ইয়ালোভাতে একটি ইলমী আন্দোলন নিয়ে এসেছেন।

তিনি আরও বলেন, জ্ঞানের দিক দিয়ে অত্যন্ত সজ্জিত, মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত উষ্ণ যোগাযোগ ছিল। তিনি নবী (স.) এর নৈতিকতার তথা আখলাকের উপর জীবনযাপন করতেন। তার জন্ম এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে।

এদিকে পূর্ব জেরুজালেমের পুরাতন শহরের মসজিদ-ই-আকসাতে প্রদত্ত জুমার খুতবায় মোহাম্মদ আলী-সাবুনির প্রতি সমবেদনা জানানো হয়। জুমার খুতবাতে জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনের মুফতি শেখ মোহাম্মদ হুসেন বলেন, ‘আজ ইসলামী উম্মাহ তাফসির আলেমদের কাছ থেকে বড় আলেম মোহাম্মদ আলী এস-সাবুনিকে হারিয়েছে।

তুরস্ক সংসদের স্পিকার মোস্তফা সেনটপ তার টুইটারে মুহাম্মদ আলী এস-সাবুনির মৃত্যুর জন্য শোক জানান। বলেন, ‘সাফওয়াত-তাফসির রচয়িতা আলেম মুহাম্মদ আলী এস-সাবুনি হোজ্জা। যিনি পুরো জীবন ধর্মীয় জ্ঞান এবং ইসলাম সঠিকভাবে বোঝানো জন্য নিজেকে উত্সর্গ করেন।

তুরস্কের ধর্ম বিষয়ক প্রধান আলী এরবাস শোকবার্তায় সাবুনির সঙ্গে তোলা ছবি শেয়ার করে বলেন, ‘সিরিয়ার পন্ডিত মোহাম্মদ আলী আস-সবুনি, যার কাজগুলি থেকে আমি সর্বদা উপকৃত হই। যিনি জীবনকে জ্ঞানের প্রতি উত্সর্গ করেন। আল্লাহ তার প্রতি দয়া করুক। তার জায়গাটি বেহেশত হোক।

সিরিয়ার হাদীস পন্ডিত মোহাম্মদ আভমা, মুহাম্মদ আলী আস-সাবুনির মৃত্যুতে শোক জানান। লিখিত বক্তব্যে আভমে বলেন, ‘আল্লাহ সবুনির আমল কবুল করুন। তাকে উলামায়ে কেরাম ও সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত করুন। আশা করি আমরাও তার সাথে দেখা করব পরকালে। এই আলেমের মৃত্যুতে ইসলামী বিশ্বে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি করে। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের চেয়ে তার চেয়ে আরও ভালো মানুষ পাঠানোর অনুরোধ করি।’

১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি সিরিয়ার আলেপ্পোতে জন্মগ্রহণকারী সাবুনি ১৯৫২ সালে আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে শরিয়া অনুষদ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি ইসলামী আইন বিভাগে পড়াশোনা শেষ করেন এবং ১৯৫৪ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়া জুডিশিয়ারি বিভাগে পড়াশোনা শেষ করেন।

পরে তার সিরিয়ায় ফিরে এসে আট বছরের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যায়। তিনি সৌদি আরবে অভিবাসিত হয়ে মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা অনুষদ এবং শরিয়া অনুষদে শিক্ষকতা শুরু করেন। সাবুনি, ২৮ বছর ধরে তার শিক্ষামূলক সেবা অব্যাহত রাখেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের প্রশিক্ষণ দেন এবং উম্মুল-কুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ধ্রুপদী রচনার তাহকীক করেন। সাবুনি বহু বছর ধরে সিরিয়ান স্কলারদের ইউনিয়নের সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

স্থানীয় তুর্কিদের কাছে তার গবেষণা সমূহ পৃথক স্বীকৃতি পায় ও তুর্কিরা তার প্রতি ভালোবাসা দেখায়। তার ধারাবাহিকতায় তিনি তার কনিষ্ঠ কন্যাকেও এক তুর্কি যুবকের সঙ্গে বিবাহ দেন।

তার লেখা সমূহের বিখ্যাত কয়েকটি

‘সাফওয়াতুত-তাফসির, রাওয়াই-ল বায়ান ফ: তাফসির-ই আয়াতী-ল আহকাম মিন-কুরআন, কাবেসন মিন নুরুল কোরআন কেরিম (৮ খণ্ড), মুহতাসর-ইবনে-ই কাসির, তাহকিক-ই তেনভিরল ইজহান মিন তাফসির-ই রাহিয়াল বায়ান (৪ খণ্ড), মুহতসর-তেফসির-ই তাবেরি, ফেত-উর-রহমন বি কেসফি মা ইয়েলতেবিসু ফিল-কুরআন, এল মুক্তাতাফ মিন ইউনি-তা-তাফসির, ইযাজুল-বেয়ান ফি মাকসাদ’ই সুভেরি-ল কুরআন (১ ম খণ্ড)’, ইত্যাদি।

উল্লেখ্য, আরব বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলেম ও বিখ্যাত তাফসীর সাফওয়াতুত তাফাসীর, রাওয়াই-উল বায়ান ফী তাফসীরি আয়াতিল আহকামসহ বহু প্রসিদ্ধ গ্রন্থের লেখক উস্তাজুল আসাতিযাহ সিরিয়ান শায়খ মুহাম্মদ আলী এসসাবুনি (৯১) ১৯ মার্চ তুরস্কের ইয়ালোভা শহরে নিজ বাড়িতে মারা যান।

মন্তব্য করুন