গোপনে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া ব্যক্তির আমল ও ইবাদত নষ্ট হয়ে যায়!

প্রকাশিত: ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২০, ২০২১

ইউসুফ পিয়াস:
পাবলিক ভয়েস

পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের মানুষের বসবাস। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে বিভিন্ন নেক আমল করে থাকি আমরা। কিন্তু জীবন চলার পথে নিজের ইচ্ছা ও অনিচ্ছায় এমন কিছু বদ আমল সংঘটিত হয়, যা খাঁটি ও কবুল হওয়া আমলগুলো নষ্ট করে দেয়।। তার মধ্যে অন্যতম হলো গোপনে হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া।  প্রকাশ্য গোনাহের চেয়ে গোপনে করা গোনাহ বেশি ভয়াবহ। কেননা যখন কেউ গোপনে গোনাহ করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন অন্তর থেকে আল্লাহর ভয় বিদায় নিয়ে নেয়। ক্রমাগত সে ধ্বংস ও অধঃপতনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। অবস্থা কখনো এত ভয়ানক হয় যে তার ঈমান পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায় এবং ঈমানহীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

অনেকে তো প্রকাশ্যে ভালো মানুষ হলেও গোপনে কবিরা গোনাহ করে। এটি একদিকে মুনাফেকি, অন্যদিকে ধীরে ধীরে তার আমল ও ইবাদত নষ্ট করে দেয়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন পাপ বর্জন করো, যারা পাপ করে, অচিরেই তাদের পাপের সমুচিত শাস্তি দেওয়া হবে।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১২০)

এ ধরনের গোপন পাপ কথার দ্বারাও হতে পারে, চিন্তা বা নিয়তের দ্বারাও হতে পারে, আবার কর্মের দ্বারাও হতে পারে। গোপনে গাইরুল্লাহর নাম নিয়ে পশু জবাই করা—কথার গোপন পাপ। রিয়া বা অন্যকে দেখানোর জন্য ইবাদত করা—নিয়ত বা চিন্তার গোপন পাপ। আর অপ্রকাশ্য ব্যভিচার বা গোপন জিনা—কর্মগত গোপন পাপ। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘বলে দাও, নিশ্চয়ই আমার রব হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা আর পাপ এবং অসংগত বিরোধিতা এবং কোনো কিছুকে আল্লাহর শরিক করা—যার কোনো সনদ তিনি প্রেরণ করেননি। আর আল্লাহ সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা তোমরা জানো না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৩৩)

আল্লাহ তাআলা যেসব কাজ হারাম করেছেন, তা থেকে বেঁচে থাকা একজন মুমিনের একান্ত কর্তব্য। পাহাড়সম আমল করার পর কেউ যদি একান্ত গোপনে হারাম কাজে লিপ্ত হয়, তাহলে তাদের আমল বিনষ্ট হয়ে যায়। সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, আমি আমার উম্মতের একদল সম্পর্কে অবশ্যই জানি, যারা কিয়ামতের দিন তিহামার শুভ্র পর্বতমালার সমতুল্য নেক আমলসহ উপস্থিত হবে। মহামহিম আল্লাহ সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবেন। সাওবান (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! তাদের পরিচয় পরিষ্কারভাবে আমাদের কাছে বর্ণনা করুন, যাতে অজ্ঞাতসারে আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তিনি বলেন, তারা তোমাদেরই ভ্রাতৃগোষ্ঠী এবং তোমাদের সমপ্রদায়ভুক্ত। তারা রাতের বেলা তোমাদের মতো ইবাদত করবে। কিন্তু তারা এমন লোক যে একান্ত গোপনে আল্লাহর হারামকৃত বিষয়ে লিপ্ত হবে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২৪৫)

গোপন গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার উপায়:

* আল্লাহ তাআলার কাছে বেশি বেশি কান্নাকাটি করে দোয়া করা। তিনি যেন তার অবাধ্যতা, নাফরমানি ও সব ধরনের গোনাহ থেকে রক্ষা করেন।

 * নফস তথা আত্মার সঙ্গে মোজাহাদা (লড়াই) করা, মনের কুমন্ত্রণা দূর করা এবং আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা।

 * আল্লাহ তাআলার উপস্থিতির কথা চিন্তা করা। তিনি আমাকে সর্বদা দেখছেন এবং এ ব্যাপারে তাঁকে ভয় করা। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর পর্যবেক্ষক।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১)

 * গোনাহ করার সময় এ কথা চিন্তা করা, কেউ কি দেখলে আমি এমন গোনাহ করতে পারতাম? এভাবে নিজের ভেতরের লজ্জাবোধ জাগ্রত করা। এ বিষয়ে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তুমি তোমার পরিবারের কোনো প্রভাবশালী সদস্যকে যেমন লজ্জা পাও, আল্লাহকে (কমপক্ষে) তেমন লজ্জা করো।’ (মুসনাদুল বাজ্জার : ৭/৮৯)

* এ চিন্তা করা, গোনাহরত অবস্থায় যদি আমার মৃত্যু হয়, তাহলে কিভাবে আমি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করব? মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘প্রত্যেক ব্যক্তিকে (কিয়ামতের দিন) ওই অবস্থায় ওঠানো হবে, যে অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করেছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২০৬)

* আল্লাহর নিয়ামত ও জান্নাতের সুখ-শান্তির কথা স্মরণ করা এবং জাহান্নামের আজাব ও ভয়ানক শাস্তি কল্পনা করা।

* অবসরে জিকির ও ফিকিরে থাকার চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে নিদর্শনাবলি রয়েছে বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষের জন্য। যারা দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে আর বলে, হে আমাদের রব! আপনি এগুলো নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র। আপনি আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯০-১৯১)

গোপন গোনাহ থেকে বেঁচে থাকতে একাকী না থাকার পরামর্শ দিয়ে থাকেন আলেম-উলামারা। ভালো মানুষের সান্নিধ্যে থাকা, অবসর সময়ে বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার ও ইসলামী বই বেশি বেশি অধ্যয়ন করা। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।’ (সুরা : তওবা, আয়াত : ১১৯)

ওয়াইপি/পাবলিক ভয়েস

মন্তব্য করুন