চরমোনাইতে শিরকের খোঁজে একদিন

প্রকাশিত: ৭:১৬ অপরাহ্ণ, মার্চ ৬, ২০২১

নকিব মুহাম্মদ রিজওয়ান

আগেই বলে নিচ্ছি। কসম প্রভুর একটি কথা ও বাড়িয়ে লিখবো না। আমি চরমোনাইয়ের ভক্ত-অনুরক্ত কেউ নই। আমি ও কোন ক্ষেত্রে একজন খাঁটি চরমোনাই বিরোধী মানুষ (অনেক কিছু এখন সমাধান হয়েছে, কিছু হওয়ার পথে)

গত ২৫-২-২০২০ ইং তারিখ বৃহস্পতিবার দিন লঞ্চযোগে আমি আমার বন্ধু দেলোয়ার হুসাইন, মিজান বিন হাফিজ, হাফেজ হাফিজ আহমেদ, জহিরুদ্দীন (সকলেই আলেম) চরমোনাই রওয়ানা হলাম। আনুমানিক বিকাল ৩ টায় চরমোনাই ঘাটে নামলাম৷ সাথে থাকা আরেক প্রিয় অনুজ মাহফুজ, সে আমাদের ময়দান চিনিয়ে দিল। তারসাথে এসে দাঁড়ালাম নিকট–অতীতে স্থাপিত দৃষ্টিনন্দন বাইতুল কারীম মসজিদের সামনে। মাসজিদের সামনেই প্রাচীরঘেরা সমাধিস্থান। যেখানে শুয়ে আছেন আরেফবিল্লাহ সৈয়দ ইসহাক রহ. ও শায়খ সৈয়দ ফজলুল করীম রহ.।  শায়খদ্বয়ের কবর জিয়ারত করলাম।

মনে মনে কুরআন পড়তেছি আর চোখ বুলিয়ে কবরের চারপাশ দেখলাম। কবরের চারপাশে প্রথমে বাঁশের ঘেরাও তার ভেতরে স্ট্রিলের গ্রীলের বাউন্ডারি। ভেতরে ছোটবড় বারো-তেরোটি গাছ। চারপাশে চৌকশ প্রহরী পাহার দিচ্ছে। কেউ যেন সেখানেট মাটি, পাতা, বালুকণা (সংগ্রহ করা) বা সেজদা দেয়াসহ কোন অনৈসলামিক কাজে জড়াতে না পারে। দলে দলে মানুষ আসে ,জেয়ারত করে আর নিজ নিজ জায়গায় ফিরে যাচ্ছে। (কোন শিরক বেদআত পাইনি)

আমরা ও জেয়ারত শেষে মাঠের দিকে পা বাড়ালাম অনেক কষ্টে পরিচিত মানুষজন খুঁজে পেলাম। এর মাঝে খাওয়া-দাওয়াও সেরে নিলাম। সালাতুল আসরের সময় হয়ে গেল। আজান হয়েছে। বাদ আজান স্টেইজে বসে নামাজের আগে জিকরের আয়োজন। মাইকে জিকর চলে। আশপাশে চোখ বাঁকিয়ে দেখি অনেকেই জিকরে মশগুল। তখন শুধুই কালিমায়ে তায়্যিবার জিকর চলছিল।

নামাজ শেষ। রুটিন মাফিক বয়ান চলছে কিন্তু আমার ক্লান্ত শরীর তখন বিছানা খুঁজছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে মাগরিবের ওয়াক্ত হলে নামাজের প্রস্তুতি নিলাম। নামাজ শেষ করলাম। অনেক বড় জামাত। মনজুড়ানো দৃশ্য। নামাজ বাদে শায়খে চরমোনাই (নায়েবে আমীর হুজুর) বয়ান করবেন। স্টেইজ থেকে আগেই ঘোষণা হলো। সকলেই বয়ান শুনার প্রস্তুতি। এর মাঝে জিকরে দায়েমী ও তাসবীহাত পাঠ শেষ হল সবার।

হুজুর বয়ান শুরু করলেন। মুক্তঝরা বয়ান। কোন রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। সাধারণভাবে এক অসাধারণ ব্যক্তির কুরআন নিঃসৃত অমীয় বাণী শুনে পুরো ময়দানে কান্নার শোর পড়ে গেল। জানা নেই কেন ওরা কাঁদে?  কিজন্য কাঁদে? যেদিকে তাকাই সেদিকে কান্না। মনে হল– আকাশ, মাটি, গাছ–বৃক্ষরাজি সবকিছুই কাঁদে।

এই এক কাঁদার প্রান্তর। আস্তে নয় অনেকে অনুতাপে বিকট চিৎকার করেই কাঁদে। বয়ান শেষে মুনাজাত শুরু, আরো বেশী কান্না।

জানিনা! এই কাঁদা শিরক হবে কিনা?

প্রায় এক থেকে সোয়া একঘন্টার কান্না শেষে বয়ানের সমাপ্তি ঘটলো। সকলেই আপন জরুরতে চলে যাচ্ছে।

আনমনা অবুঝ মন রহস্য উদঘাটনে বেরিয়ে পড়লো। অনুসন্ধানী চোখ শিরকের ধূলোবালি খুঁজছে। এর মাঝে পুরাতন এক সাথীভাই বলল বয়ানের সময় দোকানপাট, সম্পূর্ণ কেনাবেচা অফ রাখে, আশ্চর্য হলাম লাখো লাখো লোকের মাঝে এমন নিয়ন্ত্রণ কীভাবে সম্ভব? শিরক হবে না তো?

শিরকের খোঁজে আমি –

মাঠের এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। এক নাম্বার পেরিয়ে তিন নাম্বারে। চার নাম্বারে। কিন্তু যতদূর গেলাম কুরআন হাদীসে বর্ণিত কোন শিরক পেলাম না। কিন্ত ওরা যে বলে শিরক সেটা কোথায়? অজানা আমার!

একজন বলল সেটা ‘ভেদে মারেফাতে’ লেখা। আমি বললাম ভাই, সেগুলো আলহামদুলিল্লাহ সময়ের ধীমান লেখক, জাদরেল আলোচক মুফতি রেজাউল করীম আবরার ভাই বলেছেন। সব ভেদকে নির্বোধ মানুষের জন্য উম্মোচন করেছেন। তারপরও কারো আপত্তি থাকলে সামনে বসে বলুক। জওয়াব শুনুক। কিন্তু তাদের কি সেই সৎ সাহস আছে?

রাত ১২ টায় শরীর ঝিমিয়ে আসছে। পা বার বার বাধা দিচ্ছে না হাঁটতে। তাই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। কিন্তু আশ্চর্য এতো ঘুরে ও কোথাও গাঞ্জার আসর, মদের আড্ডা, কবর পূজা, শিরকি বক্তব্য, জাল হাদীস কিছুই পেলাম না। তাহলে শিরক কই?

রাত কাটলো প্রিয়দের সাথে বিভিন্ন গল্পে। তাহাজ্জুদের সময় এদিক সেদিক তাকাই। কিন্তু শিরক নাই। মানুষ কাঁদে। নামাজ পড়ে। আমার চেনা এক সুদীব্যক্তি সেও নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে কাঁদে। আশ্চর্য হলাম – ও কাঁদে কেন? এটা কি শিরক?

ফজরের আজান হচ্ছে আমরা ক’জন মেহমানখানায় বসা। আজান শেষ জিকর শুরু। শুধুই কালিমায়ে তায়্যিবার জিকর। জামাত পর্যন্ত একজন আশেক এভাবেই জিকরে মশগুল। তার জিকরে আশপাশের অবোলা মানুষগুলোও গুনগুনিয়ে জিকর করে। জামাত শেষ। তেলাওয়াত। আবার জিকর। মনে মনে বললাম— কিরে পিকনিকে আসলাম এতো জিকর কেন? এতো জিকর শিরক হবে না?

নায়েবে আমীরের বয়ান শুরু। আবার বয়ানে মানুষ কাঁদে। ঐ সুদখোরও কাঁদে। আশ্চর্য! ওর তো টাকার অভাব নেই, সে কাঁদবে কেন? তার কাঁদা ও শিরক? বেদআত?

নতুন দিনের দিগন্তে সুর্যের আনাগোনা। সূর্য লালিমা ছড়িয়েছে চারিদিকে। আস্তে আস্তে আশেকান ইশরাক–চাশতের সিজদায় ঢলে পড়ছে। প্রভুর কাছে মন খুলে দিলের অনুযোগ অভিযোগগুলো পেশ করছে। এভাবেই একদিন একরাত কাটালাম শিরক খুঁজে পেলাম না।

সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখলাম এক পরিবারের সাতজন হিন্দু ইসলাম কবুল করেছে। কিন্তু আশ্চর্য হলাম ভিন্নমতপোষণকারীদের দাবী মতে ‘ভন্ড পীরদের’ এই অশুদ্ধ কথা শুনেও কেউ ইসলাম কবুল করে? নিরঙ্কুশ শিরকের পথ ছেড়ে কোন শিরকের পথে তারা পা বাড়াচ্ছে? তা আজো অজানা।

ওনাদের কাছে প্রশ্ন : আপনাদের আদর্শমতে মাহফিলে ইসলাম গ্রহণ যদি হক্ব ও হক্কানিয়াতের মানদন্ড হয়, তাহলে তাহলে এই চরমোনাইয়ের তরীকাকে হক বলতে সমস্যা হবে কেন?

সময় সুযোগ করে আবার শিরক দেখতে যাবো। আমার যে বন্ধু শিরক বলে—আপনিও শিরক দেখতে আসুন।  আপনার বলা শিরকের মাঝে হকই খুঁজে পাবেন।

লেখাটি লেখকের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগ্রহিত।

মন্তব্য করুন