পশ্চিমবঙ্গের ভাইজান ; আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনীতি ও পরিচয়

প্রকাশিত: ৩:১৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ৫, ২০২১

২৭ মার্চ থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন শুরু হচ্ছে। আট দফার ভোট শেষ হবে ২৯ এপ্রিল। এরই মধ্যে পশ্চিবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন নাম হয়ে উঠছেন আব্বাস সিদ্দিকী।

পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী দরবার শরীফ ফুরফুরা দরবারের চতুর্থ প্রজন্মের এই পীরজাদা এবং তাঁর নতুন দল আইএসএফ (ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট) আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে ভেবে নির্বাচনের আকাশে মেঘ দেখছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস। কারন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্রিগেডে বাম নেতৃত্বাধীন জোটের জনসভায় বাংলার রাজনৈতিক মহলে তারকা আসনে বসিয়ে দিয়েছে তাঁকে।

সেদিনের জনসভার মূল মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন আব্বাস সিদ্দিকী। বিজেপি, তৃণমূল দুটোকেই ঠেকাতে মরিয়া পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির এই ভাইজান – তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।

এরপর থেকেই আব্বাস সিদ্দিকীকে আর হালকা করে দেখছে না তৃণমূল কংগ্রেস। তাকে ঠেকাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে তারা। কারণ বড়ভাবে তৃণমূলের ভোটেই ভাগ বসাতে পারেন আব্বাস সিদ্দিকী।

আব্বাসের উত্থানে বিশেষভাবে যে ক্ষতি হবে তা হলো – আব্বাস সিদ্দিকীর উত্থানে দুইভাবে ক্ষতি হবে বলে মনে করছে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। প্রথমত, রাজ্যের যেসব অঞ্চলে ফুরফুরা শরীফের প্রভাব আছে সেখানে সত্যিই আব্বাস মানুষের সমর্থন পেলে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্কে ফাটল ধরবে। দ্বিতীয়ত, বামেদের উত্থআন ঘটলে লোকসভায় বিজেপি যে বাম-সমর্থকদের ভোট কেড়েছিল, তা আবার লাল শিবিরে ফিরতে পারত। কিন্তু, আব্বাসের সঙ্গে যাওয়ায় তা বিজেপির দিকেই থেকে যেতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের গণমাধ্যমের সূত্র অনুসারে আব্বাস সিদ্দিকীর মোকাবেলায় যে যে পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে মমতার দল সেগুলো হলো –

ম্যান মার্ক পদ্ধতি গ্রহণ : অধিকাংশ তৃণমূল কর্মী-সমর্থকের বিশ্বাস, সিদ্দিকীর সভায় ভিড় শুধুই ‘কৌতূহলে’, ইভিএম-এ গড়াবে না। তবে দলের পোড়খাওয়া নেতারা বিষয়টি এত সরল বলে মনে করছেন না। বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতির সামনে রাজ্যের ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোট খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই অবস্থায় আব্বাস সিদ্দিকী ছেড়ে খেলাটা ভুল হবে বলে মনে করছেন তাঁরা। আর তাঁকে ‘ম্যান মার্ক’ করার প্রস্তুতি নেওয়াও শুরু হয়ে গিয়েছে।

ফুরফুরা দরবার শরীফে বাজেট ঘোষণা : এই অবস্থায় আব্বাস সিদ্দিকীকে নিষ্প্রভ করতে বেশ কিছু কৌশল ইতিমধ্যেই কাজে লাগাতে শুরু করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাৎপর্যপূর্ণভাবে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার ঠিক আগে, ফুরফুরা শরীফের দরবারের উন্নয়নের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ২.৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন।

আব্বাস সিদ্দিকীর চাচাকে হাতকরণ : ফুরফুরা শরীফের মধ্যেও ফাটল ধরানোর চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে কয়েকটি গণমাধ্যম। আব্বাস সিদ্দিকীর চাচা তথা ফুরফুরা শরীফের আরেক মাওলানা তহা সিদ্দিকীকে ধরছে তৃণমূল কংগ্রেস। গত সপ্তাহেই তহা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন। তহা কেবল প্রকাশ্যে তৃণমূলের প্রতি সমর্থন প্রদর্শনই করেননি, ‘দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ’এর কারণেই সিপিএম এবং কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে আব্বাস – বলে ভাইপোর কড়া সমালোচনাও করেছেন।

আব্বাস সিদ্দিকীকে বিজেপির লোক বলে প্রচার : তৃণমূল নেতাদের কারো কারো সন্দেহ, আব্বাস সিদ্দিকী আদতে বিজেপিরই লোক। গেরুয়া শিবিরই তৃণমূলের ভোট কাটার জন্য তাঁকে সামনে এনেছে। যুক্তি হিসাবে তাঁরা বলছেন ব্রিগেডে বা তার আগে-পরে আব্বাসের আক্রমণের অধিকাংশটাই থাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। বিজেপির বিষয়ে না বললে নয়, এমনভাবে বলেন ফুরফুরা শরীফের ভাইজান।

তবে আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের মধ্যে অন্যতম হলো। তিনি বলেন – ‘তোষণ নয়, ভাগীদার’ হতে রাজনীতি এসেছেন তিনি। এছাড়াও তার সাথে কেউ বন্ধুত্ব করতে এলে তাঁর দরজা খোলা রয়েছে বলেও বলেন ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা।

কে এই আব্বাস সিদ্দিকী ; কী তার পরিচয় :

বিগত চার বছরে যাঁর জনপ্রিয়তা রাজনৈতিক দল ও নেতাদের সমানে টেক্কা দিচ্ছে। যাঁর প্রকাশ্য সভায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সমাবেশকে ছাড়িয়ে যায়। যাঁকে নিয়ে এখন আলোচনা সর্বত্র।

এই মুহুর্তে বাংলার বহুচর্চিত নাম পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী। শুধু মুসলিম সমাজ নয়, আদিবাসী, দলিত, হিন্দু সকল স্তরের পিছিয়ে পড়া মানুষকে এককাট্টা করে সমাজের পিছিয়ে পড়া জাতির জন্য লড়াইয়ের কথা বলেন তিনি।

আব্বাস সিদ্দিকী ফুরফুরা শরিফ দরবার পরিবারের একজন সদস্য। পীরবংশের সন্তান। ফুরফুরা শরিফের প্রথম পীর আবু বকর সিদ্দিকির পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের প্রতিনিধি হলেন পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী।

ফুরফুরা শরিফের ছোট হুযুর পীর জুলফিকার আলির পৌত্র তিনি। তাঁর বাবার নাম পীরজাদা আলী আকবর সিদ্দিকী। ফুরফুরা শরিফের আর এক চর্চিত নাম পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকীর ভাইপো সে।

‘ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম তীর্থভূমি’ ফুরফুরা শরিফের পীরজাদাদের মধ্যে আব্বাস সিদ্দিকী এখন জনপ্রিয়তায় তুঙ্গে। যাঁর মধ্যে সমাজের জন্য কিছু করার তাগিদ রয়েছে। ছোটো থেকেই অন্যের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত করতেন। জাত ধর্ম বিচার নাম করে ছোটো বেলায় বন্ধুদের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন পীরবংশের এই সন্তান।

আব্বাস সিদ্দিকীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। তিনি নাকি পড়াশোনা করেননি। এই সব ভুল প্রচার রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু বাস্তাবে আব্বাস সিদ্দিকী থিওলজি বিষয়ে এম.এ করেছেন। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুরফুরা টাইটেল মাদ্রাসার স্টাডি সেন্টার থেকে এম.এ পাশ করেছেন তিনি।

পড়াশোনা শেষ করেই ধর্মীয় সভায় বক্তব্য রাখতে শুরু করেন আব্বাস। সেই সভা থেকে যুব সমাজের মধ্যে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন তিনি। এই ভাবে অল্প বয়সেই তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ে।

  • অনুগামীরা তাঁকে ডাকেন ‘ভাইজান’ নামে। আস্তে আস্তে সেই জলসাগুলিতেই আব্বাসের মুখে উঠে আসে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক খোঁজখবর ও ব্যাখ্যার কথাও। একইসঙ্গে কীভাবে গরীবরা বঞ্চিত হচ্ছেন সেই কথাও তুলে ধরেন তিনি।

২০১৬ সালে ফুরফুরা শরিফ আহলে সুন্নাতুল জামাত নামে এক অরাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করে সামাজিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী। ২০১৯ সালে ফুরফুরা ‘নলেজ সিটি’-রও শিলান্যাস করেন তিনি।

এর মধ্যে ২০১৯ সালেই জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা সিএএ নিয়ে যখন দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয় তখনই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতা শোনা যায় সিদ্দিকির গলায়। তখন থেকেই নাকি ঘনিষ্ঠ মহলে রাজনীতিতে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন এই ধর্মীয় নেতা।

২১-এর বিধানসভা ভোট যতই এগিয়ে আসতে থাকে ধীরে ধীরে রাজনীতি নিয়ে নিজের বক্তব্যের আগুনের মাত্রা আরও বাড়াতে থাকেন আব্বাস সিদ্দিকী। রাজ্যের ও কেন্দ্রের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির সমালোচনায় সরব হন তিনি।

গত ২১ জানুয়ারি ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট নামে আত্মপ্রকাশ করে আব্বাসের রাজনৈতিক দল। রাজ্যের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছে যান ‘ভাইজান’। এবারের ভোটে তারদলই ফ্যাক্টর হতে চলেছে বলে ঘোষণা করেন তিনি।

ফুরফুরার সিদ্দিকি পরিবারে আব্বাসই প্রথম যিনি ধর্মগুরু পরিচয় সঙ্গে নিয়েই পা রেখেছেন রাজনীতির আঙিনায়। কিন্তু দলের নামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষ টানতে নয়, সিদ্দিকি ঘোষণা করেছেন দলিত, তফশিলি সহ সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নয়নই হবে তাঁর রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য।

ফুরফুরার সিদ্দিকি পরিবারে আব্বাসই প্রথম যিনি ধর্মগুরু পরিচয় সঙ্গে নিয়েই পা রেখেছেন রাজনীতির আঙিনায়। কিন্তু দলের নামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষ টানতে নয়, সিদ্দিকি ঘোষণা করেছেন দলিত, তফশিলি সহ সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নয়নই হবে তাঁর রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য।

এবারের নির্বাচনে বাম-কংগ্রেসের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আব্বাস সিদ্দিকী। এছাড়াও তার সঙ্গে রয়েছে কয়েকটি ছোট ছোট আঞ্চলিক দলও। রাজ্যে তৃণমূল ও বিজেপি পরাসত করাই তার প্রথম লক্ষ্য।

বামেদের ব্রিগেডেও উপস্থিত ছিলেন আব্বাস সিদ্দিকী। তার ভাষণ যে ব্রিগিডের উত্তাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজ্যে বিভিন্ন প্রান্তে রাজনৈতিক কর্মসূচিও শুরু করে দিয়েছে আব্বাসের দল।

আব্বাসের প্রার্থী তালিকাতেও শুধু মুসলিম সমাজ নয়, সমাজেরর বিভিন্ন ক্ষেতরের জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ থাকতে চলেছে। বাংলার রাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসা ‘আইএসএফ’ ও তার প্রতিষ্ঠাতা সকলের প্রিয় ‘ভাইজান’ কতটা সাফল্য পান, তার উত্তর মিলবে ২ মে।

সম্পাদনা ও বিন্যাস : হাছিব আর রহমান।

মন্তব্য করুন