খারাপ সংবাদেই পাঠক বেশি আকৃষ্ট হয়

প্রকাশিত: ১:৫২ অপরাহ্ণ, মার্চ ২, ২০২১

বিভিন্ন মিডিয়ায় নেতিবাচক বা খারাপ সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে মিডিয়ার দায়ের চেয়ে পাঠকের দায় বেশি বলে মনে করেন অনেকে। কারণ পাঠক নেতিবাচক সংবাদ বেশি পড়ে থাকে। মিডিয়া তাদের পাঠকের চাহিদা অনুসারেই নেতিবাচক সংবাদ ও শিরোনাম বেশি প্রকাশ করে থাকে।

মস্তিষ্ক বিজ্ঞানী হিসেবে প্রো. মারেন উর্নার মনে করেন, ‘‘আমাদের মস্তিষ্ক ইতিবাচক বা নিরপেক্ষ খবরের তুলনায় নেতিবাচক খবরগুলি আরও দ্রুত, আরও ভালো ও আরও নিবিড়ভাবে গ্রহণ করে৷ সে কারণে আমরাও এমন খবর বেশি সময় জুড়ে মনে রাখি৷ বিবর্তনের ইতিহাসের প্রেক্ষিতে নেতিবাচক খবর আমাদের জন্য বেশি সহায়ক৷ কারণ আদিম প্রাণীগুলির আমলে মানুষ নেতিবাচক খবর না পেলে অস্তিত্বের সংকটে পড়তো৷’’

যে কারনেই খারাপ খবর ভালো বেচা যায় – মিডিয়া জগতে এমন একটা ধারণা চালু আছে৷ গবেষকরা আমাদের মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করে নেতিবাচক সংবাদের গুরুত্ব তুলে ধরছেন৷ সেইসঙ্গে এমন পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকার উপায়ও বাতলে দিচ্ছেন৷

সত্যি, সংবাদে খারাপ খবরের যেন শেষ নেই৷ কিন্তু আমাদের পৃথিবীর অবস্থা কি সত্যি এত খারাপ? এটা মানতেই হবে, যে বর্তমান করোনা ভাইরাস মহামারি এক বিরল সংকট৷ কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে বিচার করে দেখলে অনেক ক্ষেত্রে আসলে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে৷ যেমন শিশু-মৃত্যুর হার এর আগে কখনো এত কম ছিল না৷ ১৯৭০ সালের তুলনায় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে৷

গবেষকেরা বিভিন্ন মহাদেশের মানুষের উপর পরীক্ষা চালিয়ে প্রমাণ করতে পেরেছেন, যে খারাপ খবর শোনালেই তারা উত্তেজিত ও মনোযোগী হয়ে উঠেছিলেন৷ সংবাদ মাধ্যমের একাংশ ঠিক এই প্রভাব কাজে লাগায়৷ কারণ গ্রাহকরা নেতিবাচক শিরোনাম পড়লে বেশি ক্লিক পাওয়া যায় বা আরও সংবাদপত্র বিক্রি করা যায়৷

একাধিক গবেষণা অনুযায়ী বিশেষ করে অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে নেতিবাচক খবর বেড়েই চলেছে৷ প্রশ্ন হলো, মিডিয়ায় এত নেতিবাচক খবর থাকা কি একটা সমস্যা? প্রো.উর্নার বলেন, ‘‘আসলে আমাদের সবার মনেই অত্যন্ত নেতিবাচক প্রত্যাশার মনোভাব রয়েছে৷ কারণ পৃথিবীকে বাস্তবের তুলনায় আরও খারাপ হিসেবে দেখাই আমাদের জীবনদর্শনের মূলমন্ত্র৷’’

আমাদের উপর মিডিয়ার প্রভাব কতটা শক্তিশালী, বোস্টন ম্যারাথনের উপর হামলার ঘটনা তার ভালো দৃষ্টান্ত৷ দেখা গেল, সেখানে উপস্থিত মানুষের তুলনায় সেই সব মানুষ আরও মানসিক চাপ ও ভয়ের শিকার হলো, যারা সংবাদ মাধ্যমে ডুবে রয়েছে৷ এর অর্থ কী?

প্রো. মারেন উর্নার বলেন, ‘‘সবার আগে যেটা ঘটে সেটা হলো, মানুষ নিজে সক্রিয় হয় না৷ আমরা জানি, বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বকে নেতিবাচক চোখে দেখে৷ সেই অনুযায়ী মানুষের আরও সক্রিয় হওয়া উচিত৷ অথচ অসংখ্য মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা অনুযায়ী বাস্তবে মোটেই সেটা ঘটে না৷

সেইসঙ্গে ক্রনিকাল স্ট্রেস যোগ হতে পারে৷ আমরা ইতোমধ্যে জানি, যে এমন লাগাতার মানসিক চাপ অন্য অনেক রোগের ভিত্তি হতে পারে৷ ডায়াবিটিস, কার্ডিওভাস্কুলার রোগ থেকে শুরু করে বিষণ্ণতার মতো মানসিক রোগ এভাবে দেখা দিতে পারে৷’’

নিজের গবেষণার ভিত্তিতে মারেন উর্নার এমন একটি সংবাদ পোর্টাল গঠন করতে সহায়তা করেছেন, যেখানে গঠনমূলকভাবে সংবাদ পরিবেশন করা হয়৷ সঙ্গে সমাধানসূত্রও থাকে৷ তবে শুধু মিডিয়া জগতে পরিবর্তনই যথেষ্ট হবে না৷ প্রত্যেকেই নিজের মস্তিষ্কের জন্য ভালো কিছু করতে পারে৷

প্রো. উর্নার বলেন, ‘‘যেমন ঘুম ভাঙার ঠিক পর পরই স্মার্টফোনের দিকে হাত বাড়ানো, রেডিও-টেলিভিশন চালানো চলবে না৷ পাঁচ-ছয়টি যন্ত্র একইসঙ্গে আমাদের উপর তথ্য বর্ষণ করছে, এমনটা যেন মনে না হয়৷ আমাদের ভেবেচিন্তে সংবাদ গ্রহণ করা উচিত৷’’

সেইসঙ্গে সংবাদের উৎস হিসেবে এমন বিশ্বাসযোগ্য মিডিয়া বেছে নিতে হবে, যেগুলি যথেষ্ট নিষ্ঠার সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করে৷

সূত্র : ডয়চে ভেলে

মন্তব্য করুন