অপপ্রচার সেনাবাহিনীতে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলবে না: জেনারেল আজিজ

প্রকাশিত: ৯:৫৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ।

সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ আলজাজিরার প্রতিবেদন সম্পর্কে বলেছেন, এ ধরনের অপপ্রচার সেনাবাহিনীতে, এর চেইন অব কমান্ডে বিন্দুমাত্র আঁচ ফেলতে পারবে না। সেনাবাহিনী বাংলাদেশের সংবিধান সমুন্নত রাখার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য ঘৃণাভরে এ ধরনের অপচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করেছে অতীতে, এখনো করছে।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঢাকার তেজগাঁওয়ে আর্মি এভিয়েশন গ্রুপ পরিচালিত এভিয়েশন বেসিক কোর্স-১১-এর গ্র্যাজুয়েশন সমাপনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

আলজাজিরার প্রতিবেদন সম্পর্কে আইএসপিআর থেকে যে প্রতিবাদ দেওয়া হয়েছে, সেটাই সেনাবাহিনীর অফিশিয়াল বক্তব্য উল্লেখ করে সেনাপ্রধান বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো একটি প্রতিষ্ঠান—যেটি জাতির গর্ব, দেশের গর্ব—এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে তারা নানা ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে, যাতে একটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।

আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, সেনাবাহিনী একটি অত্যন্ত প্রশিক্ষিত এবং ওয়েল মোটিভেটেড ফোর্স। আগের থেকে অনেক বেশি সুসংহত।

আমাদের চেইন অব কমান্ডে যারা আছে, তারা সবাই এ ব্যাপারে সতর্ক। সেনাবাহিনী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুগত এবং বর্তমান সরকারের যেকোনো আদেশ-নির্দেশ পালনে সদা প্রস্তুত এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ হোক, বহির্বিশ্বের হোক, যেকোনো সমস্যা মোকাবেলায় আমরা সাংবিধানিকভাবে ওথবদ্ধ (শপথবদ্ধ)। এটা নিয়ে আমার মনে হয় দুশ্চিন্তা করার তেমন কিছু নেই।’

আলজাজিরার প্রতিবেদনে আপনার পরিবার নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য এসেছে, এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী? আর ইউ বিকামিং দ্য টার্গেট? আরেকটি বিষয় হলো যে আপনি বিমানে যখন উঠলেন তখন পেছন থেকে ভিডিও এবং যে দেশেই গেলেন প্রতিটি জায়গায় আপনার ভিডিও ফুটেজ।

এই ভিডিওগুলো লিকেজ হওয়া আমাদের সেনাবাহিনীর ভারসাম্য নষ্ট করে কি না—সাংবাদিকদের এসব প্রশ্নের জবাবে সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যে কথা বলা হয়েছে, আমি আপনাকে প্রশ্ন করি, আপনার বিরুদ্ধে মামলা আছে? সাজা আছে? কিন্তু আপনি যদি গতকাল সেই সাজা থেকে অব্যাহতি পেয়ে থাকেন, আপনার বিরুদ্ধে যদি আর কোনো মামলা রানিং না থাকে, আপনাকে কি বলা যাবে আপনি সাজাপ্রাপ্ত?

যখন আপনি কোনো চার্জ থেকে অব্যাহতি পেয়ে যান, পরের দিন থেকে আপনি যেকোনো মুক্ত নাগরিকের মতো। আমার ভাইদের সম্পর্কে যে অপপ্রচারগুলো এসেছে, সেগুলোর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া আছে এবং শিগগিরই এ ব্যাপারে পরিবারের পক্ষ থেকে আপনাদেরকে সংবাদ সম্মেলন করে সব কিছু জানানো হবে।

তবে আমি আপনাদেরকে বলতে পারি, আমি সেনাপ্রধান হিসেবে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি, আমার অবস্থান, আমার দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। কী করলে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে, কী করলে আমাকে যে দায়িত্বটা দেওয়া হয়েছে সেটা খর্ব হতে পারে, আমি সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ ওয়াকিফহাল। আমার ভাইয়ের সাথে মালয়েশিয়াতে যখন দেখা করেছি, তখন তার নামে কোনো মামলা ছিল না।

একটা ষড়যন্ত্রমূলক মামলা থেকে সে অলরেডি অব্যাহতিপ্রাপ্ত ছিল। সে অব্যাহতি মার্চ মাসে হয়েছিল, আমি এপ্রিল মাসে গিয়েছিলাম। আলজাজিরা যে স্টেটমেন্টটা দিয়েছে সেটা সম্পূর্ণ অসৎ উদ্দেশ্যে দিয়েছে।

আর দ্বিতীয় যে জিনিসটা হলো- বিভিন্ন দেশে আমার ভ্রমণের সময় আমার যে চিত্র ধারণ করা হয়েছে। যখন আমি অফিশিয়াল ক্যাপাসিটিতে কোথাও থাকব তখন আমার নিরাপত্তা সেটা অফিশিয়ালি নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। আমি অন্য দেশে গেলে সে দেশ করে থাকে।

কিন্তু যখন আমি কোথাও ব্যক্তিগত সফরে থাকি, হয়তো আসার সময় কোথাও ট্রানজিটে কোনো আত্মীয়-স্বজনের কাছে যাই, সেই সময় অফিশিয়াল কোনো প্রটোকল আমার ব্যবহার করা কখনো সমীচীন মনে করি না। সেই ক্ষেত্রে, সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কেউ কিছু করে থাকতে পারে অসৎ উদ্দেশ্যে।’

সেনাপ্রধান বলেন, ‘প্রশ্ন করেছেন বারবার কেন আমাকে টার্গেট করা হয়। আপনারাই বুঝে নেন, খুঁজে নেন কেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধানকে টার্গেট করা হচ্ছে? কারণ এই সেনাপ্রধানকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন। সেনাপ্রধানকে হেয় প্রতিপন্ন করা মানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে হেয় প্রতিপন্ন করা।’

তিনি বলেন, ‘আমি সম্পূর্ণভাবে সচেতন যে আমার কারণে যাতে কখনো আমার ইনস্টিটিউশন, অর্গানাইজেশন—যেটা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং আমাদের সরকার যাতে কোনোভাবেই বিব্রত না হয়, বিতর্কিত না হয়।

যা কিছু আপনারা শুনছেন এগুলোর কোনো প্রমাণ নেই, এগুলো বিভিন্ন জায়গা থেকে তারা কাটপিসসহ অন্যান্য জিনিস সন্নিবেশিত করে করেছে। কিন্তু এতে তাদের এই উদ্দেশ্য হাসিল হবে না।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এই প্রশ্নে সেনাপ্রধান বলেন, ‘কিছু কিছু ব্যাপার আছে হয়তো, যেখানে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কিছু করার থাকবে না। আমি নিশ্চিত যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা অন্য যে সংস্থা আছে তারা হয়তো ব্যবস্থা নেবে।’

আইএসপিআরের প্রতিবাদপত্র : গত সোমবার রাতে আইএসপিআরের এক প্রতিবাদপত্রে বলা হয়, আলজাজিরার প্রতিবেদনটিতে স্পষ্টতই প্রতীয়মান যে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা সেনাপ্রধানকে বাংলাদেশের জনগণ ও বিশ্বের দরবারে বিতর্কিত, অগ্রহণযোগ্য ও হেয় প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার সাথে অন্যান্য অসত্য, বানোয়াট, মনগড়া, অনুমাননির্ভর ও অসমর্থিত তথ্য সংযুক্ত করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

তথ্যচিত্রে সেনাবাহিনী কর্তৃক ইসরায়েল থেকে স্পাইওয়্যার ক্রয় করা এবং সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সেনাপ্রধানের ভাইকে সম্পৃক্ত করে কিছু মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবাদপত্রে বলা হয়, ২০১৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ইউএনডিপি কর্তৃক বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো ‘সিগন্যাল ইউনিটের পরিবর্তে একটি সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে মোতায়েন করতে সক্ষম কি না জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি ওই ইউনিটের প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের তালিকা জাতিসংঘ পাঠায়। ওই তালিকা অনুযায়ী সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জন্য সে সময় সেনাবাহিনীতে কিছু সরঞ্জাম মজুদ না থাকায় সেগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করার প্রয়োজন হয়।

সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটটি সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালের পরে পাঠানো সম্ভব বলে সেনাবাহিনী ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি জাতিসংঘকে অবহিত করে। এরপর যথাযথ সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হাঙ্গেরি থেকে ডিসেম্বর ২০১৭-তে একটি প্যাসিভ সিগন্যাল ইন্টারসেপ্টর কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা জুন ২০১৮-তে সম্পন্ন হয়।

এই সরঞ্জাম জাতিসংঘের চাহিদা মোতাবেক ক্রয় করা হলেও পরবর্তীকালে জাতিসংঘ তানজানিয়ার একটি সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে মোতায়েন করায় ওই সরঞ্জাম এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছেই অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে এবং ভবিষ্যতে জাতিসংঘের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রেরণ করার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

আলজাজিরা কর্তৃক ওই সিগন্যাল সরঞ্জামটি ইসরায়েলের তৈরি বলে যে তথ্য প্রচার করা হয় তা আদৌ সত্য নয় এবং সরঞ্জামটির কোথাও ইসরায়েলের নাম লেখা নেই।

আরো বলা হয়, ‘এই সিগন্যাল সরঞ্জাম ক্রয়প্রক্রিয়া বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের দায়িত্ব গ্রহণের অনেক পূর্বেই শুরু হয়। ২০১৭ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রতিরক্ষা ক্রয় মহাপরিদপ্তর (ডিজিডিপি) সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে ২৬ জুন ২০১৮-তে চুক্তি সম্পাদন করে। অতএব, ওই সিগন্যাল সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ে বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান বা হাঙ্গেরিতে বসবাসকারী তাঁর ভাইয়ের কোনো যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা সম্পূর্ণ অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

সেনাবাহিনী প্রধানের কোনো ভাই বা আত্মীয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কোনো ধরনের অস্ত্র, গোলাবারুদ বা সরঞ্জাম সরবরাহ অথবা ক্রয়প্রক্রিয়ার সঙ্গে কখনোই সম্পৃক্ত ছিলেন না।’

২০১৯ সালের ২৯ মার্চ সেনাবাহিনী প্রধানের ছেলের বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সেনাপ্রধাদের ভাইদের অবস্থান সম্পর্কে প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, ‘তার পূর্বেই সেনাবাহিনী প্রধানের ভাইয়েরা (আনিস ও হাসান) তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার, ষড়যন্ত্রমূলক, সাজানো ও বানোয়াট মামলা থেকে যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অব্যাহতি পান।

সেনাপ্রধান ২০১৯ সালের এপ্রিলে সিঙ্গাপুরে সরকারি সফর শেষে ব্যক্তিগত সফরে মালয়েশিয়া গিয়ে বড় ভাইয়ের বাসায় অবস্থান করেন। সেনাবাহিনী প্রধানের তাঁর প্রবাসী ভাইয়ের সাথে বিবাহ অনুষ্ঠানে এবং মালয়েশিয়াতে সাক্ষাতের ঘটনাকে আলজাজিরায় পলাতক আসামির সাথে সাক্ষাৎ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা একটি নির্লজ্জ অপপ্রচার মাত্র।’

আইএসপিআর বলছে, আলজাজিরার প্রতিবেদনটিতে সামি নামের যে ব্যক্তির বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, ওই ব্যক্তি এখন পিতার নাম পরিবর্তন করে ‘কর্নেল ওয়াসিত খান’ ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়ে পলাতক অবস্থায় হাঙ্গেরিতে বসবাস করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার অভিযোগে রমনা মডেল থানায় গত ৫ মে একটি মামলা দায়ের করা হয়, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।

মন্তব্য করুন