শিবিরের কিছু শহীদের দায় তাদের নিজেদের | জিয়া আল হায়দার

প্রকাশিত: ৯:১৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২১
শিবিরের কিছু শহীদের দায় তাদের নিজেদের | জিয়া আল হায়দার

জিয়া আল হায়দার

মাসুদ বিন হাবিব শান্তশিষ্ট ভদ্র মানুষ ছিলেন। কদিন পর ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে তার বেরিয়ে পড়ার কথা ছিল। খেলার মাঠে লীগ- শিবিরের বাকবিতন্ডা কেন্দ্র করে এক শিবির কর্মীকে মারধর করার ঘটনা ঘটে। এর প্রতিক্রিয়ায় শিবির নবাব চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল করে। তারপর তারা একাডেমিক ভবনের দিকে জড়ো হয়।সেখানে প্রক্টর তাদেরকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। দরকার ছিলো প্রক্টর ও প্রশাসনকে চাপে ফেলে সেখান থেকে তাদের ফিরে আসা। কিন্তু শিবির অত সহজে দমবার নয়। তাদের লজিস্টিক সাপোর্ট এবং সাংগঠনিক শক্তির জোর এত বেশি যে সবকিছু তারা এখনই সুরাহা করার পক্ষে। জেগেছে শিবির, ভেঙ্গেছে তিমির, ছুটেছে সিংহের দল- আগুনের ফুলকি, উঠেছে দুলকি, রুখবে কে আর বল?

আমানত, শাহজালাল, আব্দুর রব, সোহরাওয়ার্দী এমনকি ছাত্রী হলগুলোতে তাদের তখনো পর্যন্ত একক আধিপত্য। ক্যাম্পাসের বার্ষিক সাংগঠনিক বাজেট পৌনে কোটি টাকা! নেতৃবৃন্দ বাইক নিয়ে প্রেমরত কপোত কপোতীদের শাষিয়ে হলে পাঠিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখতেন। অর্থনৈতিক, জনশক্তিক এবং হল- কটেজসমূহে একক আধিপত্যের এই অহমিকা প্রক্টরের অনুরোধ অমান্য করে সামনে অগ্রসর হতে তাদের উস্কানি দেয়।

একটি কর্মীর আহত হওয়ার ঘটনায় ঝটিকা প্রতিবাদ মিছিলকে তারা যথেষ্ট মনে করেনি। ফলে বিপুলা শক্তিধর শিবির প্রক্টরের অনুরোধ থোড়াই কেয়ার করে ঈমানী মিছিল নিয়ে কাটাপাহাড় অতিক্রম করে। ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগকে ধাওয়া করে ক্যাম্পাস থেকে আউট করে দেয়। তারপরও ভাইদের মন ভরেনি।

জিরো পয়েন্ট ও স্টেশনে দাঁড়িয়ে তারা বিপ্লব করতেই থাকেন। প্রচুর সময় ধরে তারা ক্যাম্পাসে ইসলামী বিপ্লব কায়েমের সুযোগ নিতে থাকেন। ইন দ্যা মিন টাইম ছাত্রলীগ তাদের পুলিশ বন্ধুদের নিয়ে এসে স্পটেই পেয়ে যায় শিবিরকে। দুই লীগ মিলে উপুর্যপরি সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়।এক অংশ‌ সেভ জোনে হটে আসতে পারলেও শিবিরের কয়েকজন কাটাপাহাড় রোডে আটকা পড়ে। পুলিশ- লীগের যৌথ আক্রমণে শিবিরের শহিদ রেজিষ্ট্রারে যুক্ত হয় ইংরেজি ফাইনালের মাসুদ বিন হাবিব ভাই (র)।

সেদিনই আমি শিবিরের বন্ধুদের বলেছিলাম, এই হত্যার প্রথম দায় শিবিরের ক্যাম্পাস সভাপতির। একজন কর্মী আহত হওয়ার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের মাত্রা জ্ঞানের অভাব এবং আধিপত্যের অহমিকা ছিল এই হত্যাকাণ্ডের প্রথম কারণ। এই হত্যা উল্লাসের উপলক্ষ তৈরী করেছে খোদ শিবিরের ক্যাম্পাস নেতৃত্ব। শিবির ক্যাম্পাসগুলোতে তাদের জনশক্তি এবং চতুর্পাশ্বিক লজিস্টিক সাপোর্টে ভর করে বারবার অদূরদর্শী হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। “শেষ দেখে ছাড়ব” এবং “এখনই বিপ্লব করে ফেলব”র এক অবাস্তব নেশায় দীর্ঘদিন তারা এভোয়ডাবল রক্ত ঢেলেছে। তারা সময়ের আগেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশী বেশী প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে অসংখ্য প্রাণ ঝড়িয়েছে। লাশ ও রক্তের হিসেবের খাতা খুলে রীতিমতো শহীদদের রেজিস্টার খুলে বসেছে তাদের কেন্দ্রীয় অফিস। ক্রমিক সংখ্যা দিয়ে কর্মীর লাশ গুনে রাখাকে তারা গৌরব, হক্কানিয়ত, এবং ইসলামের একমাত্র ঠিকাদারির মানদণ্ড বানিয়ে নিয়েছে।‌শহীদ সংখ্যা নিয়ে মাঠে ময়দানে‌ অন্তর্জালে অপরাপর ইসলামীদের সাথে কাইজ্জা করেছে।

  • প্রস্ফুটিত হওয়ার আগেই বিকশিত হতে গিয়ে এভাবেই অদূরদর্শী হঠকারী আঞ্চলিক সিদ্ধান্তে শিবির তার শহীদ তালিকা দীর্ঘায়িত করেছে। শাহাদাত নিয়ে তারা এত রোমান্সিজম চর্চা করেছে যে, যখন তখন শহীদ হয়ে যাওয়া এবং যে কোন ঘটনায় দুই একজন শহীদ উঠিয়ে নেয়া ছিল যেন তাদের পরম আরাধনা।

জিহাদের ময়দানে মূল্যবান জীবন দিয়ে দেয়ার জন্য যে সব শাখা সেনাপতি নির্দেশ দিতেন, তাদের যোগ্যতা ছিল ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, ইতিহাস, ইংরেজি, বাংলা, আরবিতে গ্রাজুয়েট এবং সংগঠনের বড় ভাই ও সদস্য স্তরের মানোন্নতি এবং মওদুদী লিটারেচার ও দলীয় সিলেবাসের রাজনৈতিক বদ্ধদৃষ্টিভঙ্গির পাঠ। । একজন ক্যাম্পাস সভাপতি যার বয়স ২২ থেকে ৩০ এর ভিতর তার মাঝে কি এমন নেতৃত্ব গুন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং ইসলামের সিয়াসত ও জিহাদ সংক্রান্ত টাইটুম্বুর তাত্ত্বিক জ্ঞান ছিলো, যিনি জীবন বিলানোর হুকুম দেয়ার ক্ষমতা রাখতেন? শাখায় শাখায় ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে রণক্ষেত্র তৈরি করে সেখানে জীবন দেয়ার সিদ্ধান্ত কি করে একজন ছাত্রনেতা দিতে পারেন?কেন্দ্র তার নির্দেশে শহীদ হওয়াকে বলে দিয়েছে ,’এতাআতে উ’লিল আমর’ (নেতার আনুগত্য।)

যাদের ভিতর এখলাস ছিলো এবং বাড়াবাড়ি ছাড়া সত্যিকারের দ্বীনের স্বার্থে যারা জীবন দিয়েছে তাদের হুকুম ও প্রতিদান কি সেই আলোচনা আমার এখতেয়ারভুক্ত নয়। কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণটা হচ্ছে এভাবে যখন তখন যেখানে-সেখানে ইসলাম কায়েম করে ফেলার ত্বরাপ্রবণতা এবং জীবন দেয়ার জন্য শাখা সেনাপতিদের লিগেসী দেয়ার অথেন্টিসিটি নিয়ে।

আরও পড়ুন –

সারাদেশে ‘শিবিরের’ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত : বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ

কওমি মাদ্রাসায় জামায়াত-শিবিরের অনুপ্রবেশ ঘটেছে: মিছবাহুর রহমান চৌধুরী

জামায়াত-শিবির আমাকে গুলি করেছিলো, আমি সাঈদীর মুক্তি চাইনি : মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী

এই “চাইলে এড়ানো যেতো” এমন অনেক নিষ্ফল প্রাণ ঝরিয়েছে শিবির। শাহাদাতকে একটা দীর্ঘ সময় শিবির পুরোপুরি রাজনীতি হিসেবে চর্চা করেছে। মনে হওয়া স্বাভাবিক যেন তারা দলীয় শহীদের রেজিস্ট্রার খুলে বসেছিলো। শহীদের সংখ্যা নিয়ে তারা অপরাপর ইসলামী দলগুলোর সাথে বড়াই করতে শুরু করেছে। এটাকে তারা তাদের চূড়ান্ত সঠিকতার এবং রিয়েল ইসলামিজমের মানদণ্ড জ্ঞান করে ‘তোমাদের কয়জন শহীদ আছে দেখাও, তারপর আমাদের সাথে তুলনা করতে এসো’র এক ভয়ঙ্কর ডিসকোর্স দাঁড় করিয়েছে। রাজনৈতিক হত্যা’ জেল-জুলুমকে তারা সত্যের পথে অবিচলতার এভিডেন্স হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। যখন তারা ক্ষমতায় ছিল প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করে তখনও তাদের মরা এবং মারার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ক্ষমতাকালীন সময়ে তাদের রাজনৈতিক মিত্র ছাত্রদলের সাথেও আধিপত্যের সংঘাতে জড়িয়ে আছে।

নিজেদের ক্ষমতাকালে নিঃসন্দেহে ছাত্রলীগ জালেম এবং শিবির মজলুম। মাসুদ বিন হাবিবের আজ শাহাদাত বার্ষিকী। আমি তার এবং সকল মজলুম ঈমানদারের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। তবে খন্ড খন্ড সংঘর্ষে জড়িয়ে জীবন হারানোর ক্ষেত্রে একটা বড় দায় খোদ শিবির কে নিতেই হবে। যদি বিচারের মাঠে মাসুদ বিন হাবিবদের মায়েরা দাবি করে বসে,”দ্বীনের জন্য জীবন দেয়া গর্বের। কিন্তু যেখানে শহীদ হওয়া অপরিহার্য ছিল না, সেখানে বরং একটু দূরদর্শিতাপূর্ণ নেতৃত্ব চর্চা করে এই জীবনহানি কেন এড়ানো গেলো না?” সেদিন নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকা ক্যাম্পাস সভাপতিবৃন্দ খুনীর সাথে অভিযুক্ত হয়ে যাবেন না তো?

কর্মী খুন নিয়ে পরকালের জবাবদিহিতার এই ভয় শিবিরের ছাত্রনেতারা যারা সবেমাত্র রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ শুরু করেছে তাদেরকে কি কখনো তাড়া করে? এক হাতে তালি বাজে না। সম্ভাব্য শান্তিপূর্ণ বিকল্প কৌশল বাদ দিয়ে দুই শতাধিক হত্যাকাণ্ডের সবগুলোতেই শিবির নেতৃত্ব দায়মুক্ত এই কথা বলতে তাদের বুক কাপে কি? চিরদিনের জন্য সন্তান হারা মা-বাবাদের শুন্য বুকের হাহাকার শোনার সময় রাজনীতির ব্যস্ততার ভিড়ে তাদের হয়ে উঠে কি?

ইশা ছাত্র আন্দোলনকে অভিনন্দন জানালো শিবির

ইশা ছাত্র আন্দোলনের কর্মীকে শিবির কর্মীরা হামলা করে রক্তাক্ত করার অভিযোগ

অনেক ক্ষেত্রে হয়তো জীবনহানি অপরিহার্য ছিল। কিন্তু এটাও ঠিক শিবিরের কিছু শহীদের দায় নিঃসন্দেহে তাদের নিজেদের। সেদিন আমার কাছে খুব স্পষ্টভাবে এটা মনে হয়েছিল। আমি এখানে মুফতি ফয়জুল করিমের একটি বক্তব্য স্মরণ করবো,

“ইসলামের জন্য জীবন দিতে আমরা প্রস্তুত। কিন্তু অযথা বারবার নয়। একবার। যেদিন ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার অপরিহার্য চূড়ান্ত দিনটি এসে যাবে সেদিন। ইসলামী নেতৃবৃন্দ! আপনারা সিদ্ধান্ত দেন। কখন আমরা জীবন দেব?”

হ্যাঁ এরপরও খন্ড খন্ড যুদ্ধে আপনাকে জীবন দিতে হবে। কিন্তু একান্ত অপরিহার্য না হলে নেতৃত্বের বুদ্ধিমত্তা হলো, যথাসম্ভব খন্ড খন্ড মল্লযুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়া, আলিঙ্গন করা নয়। এই জায়গায় দীর্ঘ সময় পর্যন্ত শিবির ভুল রাজনীতি করেছে।

তবে সর্বশেষ মাওলানা সাঈদীর জন্য দলীয় আন্দোলনের পর তারা এই অযথা জীবনহানীর প্রবণতা ও ‘শাহাদাতের রাজনীতি’ থেকে সরে এসেছে। দেরীতে হলেও ক্যাম্পাস জনশক্তি সংরক্ষণের একটি সঠিক সিদ্ধান্ত তারা নিতে পেরেছে। জামায়াতের পেশী শক্তি হিসেবে জনবল সরবরাহ এবং বিএনপির স্বার্থের লাঠিয়াল পলিসি থেকে তারা সম্ভবত সরে আসার চেষ্টা করছে। বিপ্লবের জন্য সম্মুখ লড়াই, জীবন, রক্ত ও লাশ চূড়ান্ত এবং অপরিহার্য। কিন্তু বিপ্লব নির্মাণের পরিক্রমায় শাহাদাৎ ভিন্ন আরো অনেক বিকল্প কৌশল ও পদ্ধতি আছে। সেই পথ ছেড়ে যুদ্ধের দিনের আগে সৈন্য হারানো কোন বুদ্ধিমান সেনাপতির কাজ হতে পারে না। ইসলামের জন্য জীবন উৎসর্গকারী সকল শহীদের জন্য জান্নাত প্রার্থনা করি। ইসলামকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে বহু মায়ের বুক খালি করেছে, সেইসব খুনি জালিমদের প্রতি অভিসম্পাত। মাসুদ বিন‌ হাবীবের জান্নাত নসীব হোক।

প্রসঙ্গত : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষে নিহত মাসুদ বিন হাবিব (২৪) হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর হাবিবুর রহমানের ছেলে। তার গ্রামের বাড়ি আজমিরীগঞ্জ পৌর এলাকার কুমারহাটি গ্রামে। নিহত হাবিব শিক্ষাজীবনে খুবই মেধাবী ছিলেন। তিনি ২০০৬ সালে নরসিংদীর জামেয়া কাসেমীয়া মাদ্রাসা থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে আলিম পাশ করেন। তিনি দাখিল পরীক্ষায়ও গোল্ডেন এ প্লাস পান।

[দ্রষ্টব্য : পাবলিক ভয়েসের মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার দায়ভার একান্তই লেখকের। পাবলিক ভয়েসের সম্পাদনা পরিষদ ও পাবলিক ভয়েস কর্তৃপক্ষ এ মতামত কলামের দায়ভার গ্রহণ করেন না। মতামত বিভাগে আপনিও আপনার মতামত পাঠাতে পারেন। লেখার বিষয়বস্তু সঠিক হলে পাবলিক ভয়েসে প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠাতে পারেন এই মেইলে : news.publicvoice24@gmail.com]

আরও পড়ুন –

ড. ইউসুফ আবদুল্লাহ আল কারযাভী : ইসলামী পুনর্জাগরণে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি 

প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনায় কি আছে কি নাই

করোনায় মসজিদ ভিত্তিক ত্রাণ কার্যক্রম : নামাজের ইমাম হোক সমাজের ইমাম 

ইসলামী শরিয়ায় নারী : তরুণ দুই বিশ্লেষকের মতামত

সহীহ হাদীসের অহমিকা বনাম ইসলামপন্থীদের প্রকৃত অবস্থান 

ঢাবিতে ধর্মভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবী অসাংবিধানিক

সম্পাদনা ও বিন্যাস : হাছিব আর রহমান।

মন্তব্য করুন