ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট : রাজনীতির রাজনীতি

প্রকাশিত: ১:০১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩০, ২০২১

সৈয়দ শামছুল হুদা

হঠাৎ করেই একটি নামের সাথে পরিচিত হয়ে উঠা। একটি ভিডিও দেখে কৌতুহল জেগে উঠলো পশ্চিম বঙ্গের রাজনীতি বিষয়ে। পশ্চিমবঙ্গের একজন তরুন, যার বয়স মাত্র চৌত্রিশ, তিনি এই বয়সেই মাঠ কাঁপিয়ে দিচ্ছেন, বিষয়টা কি দেখতে দেখতে তার সম্পর্কে জানা হলো অনেক কিছু। তিনি আর কেউ নন, পশ্চিম বঙ্গের হুগলি  জেলার ফুরফুরা দরবার শরীফের একজন সাহেবজাদা। নাম আব্বাস সিদ্দীকি।

মিডিয়ার কল্যাণে যিনি “ভাইজান” হিসেবে ইতিমধ্যেই ব্যাপক পরিচিত হয়ে উঠেছেন। আমি যতই তার আলোচনা শুনছি, ততই অবাক হচ্ছি। তাঁর বক্তব্য, তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্ষতা, দ্বিধাহীনতা, স্পষ্টবাদিতা, অবস্থানের পরিপক্ষতা আমাকে মুগ্ধ করতে থাকে।

আমি আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনৈতিক জ্ঞান দেখে যারপর নাই অভিভুত। একজন পীরজাদা, একজন তরুন আলেম, একজন ধর্মীয় পরিবারের সন্তান  হয়েও এতটা রাজনৈতিক পরিপক্ষতা কীভাবে অর্জন করলেন? তিনি তো কখনো রাজনীতি করেন নাই, তার পরিবারের কেউ রাজনীতি করে না, আর তিনিও খুব বেশিদিন ধরে রাজনৈতিক চর্চা করেননি, রাজনীতি নিয়ে তিনি খুব একটা লেখাপড়া করেছেন সেটাও  জানা যায় না। তাহলে এতটা দক্ষতা কীভাবে আসলো? তিনি ইন্ডিয়ার বাঘা বাঘা সাংবাদিকদের সাথে যেভাবে কথা বলছেন, যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের বড় বড় রাজনীতিবিদদের সাথে রাজনৈতিক বিষয়গুলো ডিল করছেন তা দেখে দিনদিন তার সম্পর্কে আমার আগ্রহ বাড়ছে।

রাজনীতিবিদকে বাস্তববাদি হতে হয়। বাংলাদেশের ইসলামপন্থি রাজনীতিবিদগণ অনেকটািই অবাস্তববাদি। তারা  আকাশ-কুসুম কল্পনা করেন।  সমাজ ও পরিবেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতির বাস্তবতাকে মোটেই পাত্তা দিতে চান না। যার কারণে ফলাফল শুন্য। রাজনৈতিক অর্জন নাই বললেই চলে। বাংলাদেশের ইসলামপন্থি রাজনীতিবিদদের প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের এক ধরণের অবিশ্বাস ও ঘৃণা বিরাজ করছে বলেই আমার বিশ্বাস। এ জন্য একটি স্বাধীন মুসলিম দেশে বাস করার পরও ইসলামপন্থিরা রাজনীতিতে বড় ধরণের স্পেস তৈরি করতে পারেননি।

আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনৈতিক পরিপক্ষতা নিয়ে এখানে কিছু বলতে চাই :

আইএসএফ গঠন : পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিবিদ এবং মিডিয়া মিলে এক ধরণের অপ্রতিরোধ্য থিম তৈরি করে রেখেছে। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে সেক্যুলার আদর্শের কংগ্রেস, অতঃপর একাধারে প্রায় ৩৪ বছর বামফ্রন্টের ক্ষমতায় থাকা, অত:পর সেক্যুলার আদর্শের পতাকা নিয়ে মমতা ব্যানার্জীও দুইটি টার্ম ক্ষমতায় কাটালেন। পশ্চিমবঙ্গের সুশীল সমাজ, এলিটশ্রেনি, মিডিয়াকর্মী, সমাজকর্মী এবং উগ্রহিন্দুত্ববাদের প্রতিনিধিত্বশীল  প্রতিটি মানুষ যে মানসিকতা লালন করে সেই জায়গাটাই যদি আব্বাস সিদ্দিকী কোন ইসলামী নাম ধারণ করে দল গঠন করতেন তাহলে তাকে প্রথম দিনেই বোল্ড আউট করে দিতো পশ্চিমবঙ্গের সকল সামাজিক শক্তি। কিন্তু সেখানে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে একজন পীরজাদা নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানের নাম রাখলেন ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট।

আমাদের দেশের কিছু কিছু ভাই সেক্যুলার নামটি দেখেই হতচকিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু তিনি একবারও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মাথায় রাখলেন না। আব্বাস সিদ্দিকী পরিস্কার বলে দিয়েছেন, সেক্যুলার সেক্যুলার করে আমাদেরকে এতদিন দাবিয়ে রাখা হয়েছে। এখন আমরা দেখিয়ে দেবো সেক্যুলার কারে কয়! ইন্ডিয়ায় একজন কট্টর হিন্দু হয়েও যদি সেক্যুলার হতে পারে, একজন শিখ হয়েও যদি সেক্যুলার হতে পারে, একজন খ্রিষ্টান হয়েও যদি সেক্যুলার হতে পারে, তাহলে  আমি একজন ধর্মীয় পরিবারের সন্তান হয়েও রাজনীতিতে সেক্যুলার হতে পারবোনা কেন? কী দারুন যুক্তি! সেক্যুলারদের মাথায় হাত।

চেয়ারের এক পা হতে চাই : আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনৈতিক অবস্থান খুব পরিস্কার করেছেন। তিনি বলেছেন,  একটি চেয়ারে ৪টি পা থাকে। এর কোন একটি পা না থাকলে চেয়ার খসে পড়ে। সুতরাং এতদিন আমরা দূরে থেকে চেয়ারের একটি পা’র শক্তি যুগিয়েছি। এবার সরাসরি চেয়ারের পা হতে চাই। পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪টি সংসদীয় আসন রয়েছে। আর গোটা পশ্চিমবঙ্গে গড়পরতায় ৩০% মুসলিম ভোট রয়েছে। যে পশ্চিমবঙ্গে মথুয়ারা মাত্র  ১%। তাদের জন্য একজন এমএলএ রয়েছে। প্রায় ১০হাজার সরকারী চাকুরীজীবি রয়েছে। তাদের জন্য উন্নত চিকিৎসার হাসাপাতাল রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। অথচ ৩০% মুসলমানদের জন্য ৩০জন  এমএলএ নাই। কিন্তু কেন? কেন গত ৭৩বছরেও পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের ৩০%দূরে থাক ১০% চাকুরীও দেওয়া হয় নাই? এর একমাত্র কারণ আমরা ৭৩টি বছর ধরে ক্ষমতার যাওয়ার সিড়ি হয়েছি। ক্ষমতায় গিয়ে সিড়িটা লাথি মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এবার আর তা হতে দিবো না। আমরা সরাসরি দলীয় রাজনীতি করে ক্ষমতার একটি অংশ হতে চাই। আমার ৩০%সংসদীয় আসন চাই। ৩০% কর্মসংস্থান চাই। ক্ষমতায় কেউ যেতে চাইলে যেহেতু চেয়ার তথা ক্ষমতা এর ৪টি পা-ই লাগবে, তাহলে  আমাকে ছাড়া কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারবে না, কেউ ক্ষমতায় যেতে পারবে না। এ জন্য তিনি এবারই প্রথম পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ক্ষমতার ভাগ চেয়ে বসেছেন। এতদিন কোন মুসলমান এভাবে অধিকার দাবি করার সাহস পাননি।  এতে অনেকেই মনক্ষুন্ন। তাতে মুসলমানদের কিছুই যায়  আসে না।

৫ দফা দাবী নিয়ে দরকষাকষি : আব্বাস সিদ্দিকী রাজনীতিতে সরাসরি আসার আগে ক্ষমতার রাজনীতির ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করতে তিনি ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের সামনে ৫দফা দাবি তুলে ধরেন। আজকে অনেকেই আব্বাস সিদ্দিকীকে বিজেপির দালাল বলছে। আমাকে একজন ইতিমধ্যেই  ইনবক্সে জানিয়েছে, বিজেপি নাকি আব্বাস সিদ্দিকীকে ৫০কোটি টাকা দিয়েছে, যে কোন মূল্যে মমতাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য। আমি এর সত্যমিথ্যা জানি না। তবে, আব্বাস সিদ্দিকী এ ধরণের কথা আসবে,  ইস্যু আসবে, সেটা জেনেই তার রাজনৈতিক অবস্থান খুব পরিস্কার করে নিয়েছেন।

তিনি ৫দফা দাবি উত্থাপন করে বলেছেন, যে দল এগুলো মানবে, শুধুমাত্র তার সাথেই জোট হবে। তার দাবিগুলোর অন্যতম হল,

ক। দলিত, আদিবাসি, মথুয়া, মুসলিম এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পরিবারের কন্যাদের বিবাহের জন্য ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে ৫লক্ষ টাকা করে বিবাহ ভাতা দিতে হবে।

খ।  ইমাম-মুয়াজ্জিনদেরকে মাসিক ভাতা নয়, ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে মাহিনা দিতে হবে। এদেরকে স্থায়ী চাকুরী দিতে হবে।

গ। শিক্ষা ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির জন্য উন্নত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

ঘ। চিকিৎসা ও বাসস্থানের উন্নত ব্যবস্থা করতে হবে।

ঙ। পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের জন্য ৪৪টি আসন দিতে হবে। যেখানে মুসলমানরা তাদের চয়েজমতো প্রার্থী দিবে। এর বিনিময়ে বাকী ২৫০টি আসনে বিনাশর্তে মুসলমানরা সেই দলকে সমর্থন দিবে।

এ দাবিগুলো এটা পরিস্কার করে যে, আব্বাস সিদ্দিকী আসল জায়গায় হাত দিয়েছেন।

আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা :

৩৪বছর বয়সী একজন আব্বাস সিদ্দিকী সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, আমি পশ্চিমবঙ্গে কিং নই, আমি কিংমেকার হতে চাই। আর তিনি এ কথা রেখেছেন। তিনি ২১জানুয়ারী ২০২১ তারিখে কলকাতা প্রেসক্লাবে এক অকল্পনীয় সাংবাদিক সম্মেলনে যে দল গঠন করেছেন সেখানে তিনি নিজেকে দলের সকল  প্রকার পদ গ্রহন থেকে দূরে রেখেছেন। দলের সভাপতি, সেক্রেটারী বানিয়েছেন যথাক্রমে তার ভাই নওশাদ সিদ্দিকী এবং একজন আদিবাসি নেতাকে। অথচ তিনিই দলের প্রতিষ্ঠাতা। কলকাতা প্রেসক্লাবে সিট আছে ৫০টি। সেখানে সেইদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিল প্রায় ৩শ’ সাংবাদিক। অভূতপূর্ব বিষয় এটি।

তাঁর রাজনৈতিক জ্ঞান দেখে হায়দারাবাদের আরেক সিংহ ছুটে  এসেছেন। আসাদউদ্দীন ওয়াইসি যিনি ভারতের মুসলমানদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় একজন, প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ, তিনি হাত মিলিয়েছেন আব্বাস সিদ্দিকীর সাথে। একসাথে সাংবাদিক সম্মেলন করে তিনি বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে উনারা উভয়ে একসাথে লড়বেন। আব্বাস   সিদ্দিকী ১২টি দল নিয়ে যে ফ্রন্ট গঠন করেছেন সেখানে রয়েছে আদিবাসী, দলিত হিন্দু, মথুয়া, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীসহ পার্লামেন্টে অংশিদারিত্ব রয়েছে এমন কয়েকটি সংগঠন।

[পশ্চিমবঙ্গে আসাদুদ্দীন ওয়াইসীর সঙ্গে আব্বাস সিদ্দিকীর বৈঠক।]

আব্বাস  সিদ্দিকী শুধু মুখেই  নয়, বাস্তবেই প্রমাণ করেছেন যে, তিনি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর একজন বন্ধু। একজন হিতাকাঙ্খী। যার কারণে তার জনসভায় আদিবাসিরা, দলিত হিন্দুরা, মথুয়ারা দলে দলে যোগ দিচ্ছে। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন সেখানেই মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।

আব্বাস সিদ্দিকীর মূল বক্তব্য হলো, গত ৭৩বছরে যে জনগোষ্ঠীর পেছনে সরকার দাঁড়ায়নি। আমি তাদের পক্ষে কথা বলবো, তাদের জন্য কিছু করেই ছাড়বো। এবার আর দূরে থেকে নয়, সরাসরি ক্ষমতার ভাগ চাইবো। যাতে তাদের দাবি নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে  না পারে।

আব্বাস সিদ্দিকী বলেন, রাজনীতি না করলে কী পরিণতি হয়, তা  আমরা মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের থেকে শিখেছি। তাদের করুণ পরিণতি থেকে আমরা উপলব্দি করেছি। রাজনীতি করে অধিকার আদায় করতে না পারলে দুদিন পর আমাদেরকে ক্ষমতাসীনরা বলবে, আমরা বহিরাগত, আমাদেরকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে নির্যাতন করবে। সুতরাং আর নীরব থাকা নয়। কে কি বললো, আমাদের রাজনীতি করার কারণে কে ক্ষমতা হারালো, কে ক্ষমতায় আসলো, এতে আমাদের কিছুই যায় আসে না। আমরা আমাদের অধিকার চাই। ভাগ চাই। অংশ চাই। এটা চাওয়া আমার গণতান্ত্রিক অধিকার। আম্বেদকার আমাদেরকে ভারতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহনের অধিকার দিয়ে গিয়েছেন।

আব্বাস সিদ্দিকীর মধ্যে স্পর্শকাতরতা নেই : আব্বাস সিদ্দিকীর রাজনৈতিক ধারণা খুবই পরিস্কার। তিনি জলে নেমে কাপড় ভিজাবেন না এমন রাজনীতি করছেন না। আমাদের দেশের ইসলামী ধারার রাজনীতিবিদরা এক পা রাজনীতিতে নামালে তিন পা পিছিয়ে থাকেন। এখনো অনেকে নারী নেতৃত্ব, গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক অধিকার, জোট ইত্যাদি বিষয়ে স্পর্শকাতরতায় ভোগেন। যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পিকার নারী, বিরোধীলীয় নেত্রী নারী, প্রশাসনের সর্বত্র নারী নেতৃত্ব  প্রতিষ্ঠিত সেই দেশে বসে এখনো গান গায়, আমরা নারী নেতৃত্ব মানি না, কেউ নারীদের সাথে জোট করলে ছি, ছি করে উঠে। অথচ সবাই সেই নারীদের মেনেই রাজনীতি করেন।

ভারতের নারী সাংবাদিকরা খুবই বেপরোয়া। তাদের পোশাক অতি আধুনিক। সেই সকল বাঘা বাঘা সাংবাদিকদের সাথে আব্বাস সিদ্দিকী খুব সাবলিল ভাবে কথা বলছেন। পাশাপাশি তিনি যে একজন ধর্মীয় নেতা সেটার প্রতিও লক্ষ্য রাখছেন। নারীদের সাথে কথা বলবো না, নারী সাংবাদিক কেন ফুরফুরা দরবার শরীফে? এমন কথা তিনি বলছেন না।

অথচ বাংলাদেশে কোন আলেম যদি নারী সাংবাদিককে পাশে বসিয়ে সাক্ষাতকার দেন, আর সে ছবি ফেসবুকে একটু দেওয়া যায়, ব্যাস, ইজ্জত সব পাংচার। এই হীনমণ্যতা ছাড়তে হবে। বাস্তবতাকে স্বীকার করতেই হবে। আজ মিডিয়ায় নারী সাংবাদিকদের উপস্থিতি ব্যাপক। মাদ্রাসাগুলোতে সাংবাদিকতা শিক্ষার কোন ব্যবস্থা নেই। তাহলে হুজুর সাংবাদিক কই পাবেন?

আব্বাস সিদ্দিকী কতটুকু সফল হবেন, কতটা ব্যর্থ হবেন, সেটা সময়েই বলে দিবে। কিন্তু তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট। দাবি স্পষ্ট। অবস্থান স্পষ্ট। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশের ইসলামপন্থি দলগুলো সময়ের বাস্তবতায় তারা কতটুকু কী করতে পারবেন, সেটা দেশের মানুষের কাছে পরিস্কার করতে পারেননি। নিজেরা মাদ্রাসার চৌহদ্দির ভেতর নিরাপদে থেকে এক ধরণের ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ ধরণের রাজনীতি করেন। নিজেদের গায়ে কোন প্রকার কাদা জড়াচ্ছেন না। অথচ দাবি করছেন বড় বড়। কিন্তু আব্বাস সিদ্দিকী ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঝড় তুলে ফেলেছেন। বড় বড় রাজনীতিবিদরা তাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। সাংবাদিকরা তাকে নিয়ে হয়রান। তাকে কোন প্রশ্নেই কাবু করতে পারছেন না। এটাই আশার কথা।

দীর্ঘদিন পর হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা একজন সাহসী তরুনকে পেয়েছে। আর সেই তরুন শুধু ধর্মের ভিত্তিতে কিছু করার কোন কথাই বলছেন না। বরং তিনি প্রতিটি বক্তব্যে দলিত, আদিবাসি ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কথা বলছেন। উল্লেখ্য যে, পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের সংখ্যা ৩০%ভাগ। পাশাপাশি দলিত, আদিবাসি, মথুয়াদের সংখ্যাও প্রায় ৩০%ভাগ। এ দুটি শক্তি  যদি এক হতে পারে তাহলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কিংমেকার হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

আব্বাস সিদ্দিকীর বড় শত্রু হলো সেই এলাকার নামধারী মুসলিম নেতারা, যারা মুসলমানদেরকে বিভিন্ন দলের কাছে বিভিন্ন সময়ে বিক্রি করে নিজেদের ক্ষুদ্রতম স্বার্থ হাসিল করে এসেছে। তাদেরকে যদি কিছুটা কন্ট্রোল করতে পারেন, তাহলে আব্বাস সিদ্দিকীকে একেবারে দুর্বল ভাবার কোন কারণ থাকবে না।

আব্বাস সিদ্দিকীর নলেজ সিটি : আব্বাস সিদ্দিকী যেই বিষয়টা আরো অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন, সেটা হলো, মুসলমানরা মোড়ে মোড়ে মাদ্রাসা গড়ে তুলে। এবং নিজেদের ভবিষ্যত  এসব মসজিদ-মাদ্রাসার সাথেই সম্পৃক্ত মনে করে। এর বাইরে আর কিছুই চিন্তা করতে পারে না। এটার তিনি তীব্র প্রতিবাদ করেন। এটাকে আত্মঘাতি হিসেবে মনে করেন। এ জন্য তিনি ৫শ; একর জমির ওপর “নলেজ সিটি” গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন। ফুরফুরা পীর সাহেবের নামে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার  উদ্যোগ নিয়েছেন। সেখানে মুসলিম,  আদিবাসি এবং দলিতরা একসাথে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে তারা রাষ্ট্রের সকল সেক্টরে কাজ করার সুযোগ পাবেন।

তিনি আদিবাসিদের আপন করতে তাদের মধ্যে ছুটে যাচ্ছেন। দলিতদের জন্য তার দরবার উম্মুক্ত করে দিয়েছেন। অসাধারণ রাজনীতিবিদ হয়ে উঠছেন আব্বাস সিদ্দিকী। স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে তার জন্য শুভকামনা।

লেখক : জেনারেল সেক্রেটারী, বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট বিআইএম।

মন্তব্য করুন