বারিধারা মাদরাসা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ

প্রকাশিত: ২:৩২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৭, ২০২১

রাজধানী ঢাকার অন্যতম কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম ও দীর্ঘদিনের নায়েবে মুহতামিম মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমীকে স্বাভাবিক নিয়মে মাদরাসার সকল শিক্ষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বহিস্কার করা হয়েছে দাবি করে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে –

‘সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাফেজ মাওলানা নাজমুল হাসানের মাদ্রাসার অভ্যন্তরিণ প্রশাসনিক পরিচালনায় অন্যান্য সকল শিক্ষক অনাস্থা জ্ঞাপন করে গত সোমবার (২৪ জানুয়ারী) কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতি বরাবরে এক আবেদনপত্র পেশ করেন। সভাপতি মহোদয় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিনিয়র সকল শিক্ষকের সাথে পরামর্শ করে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বজায় রাখা ও সুষ্ঠু পরিচালনার লক্ষ্যে ৫ সদস্যের এক পরিচালনা বোর্ড গঠন করে পরামর্শের ভিত্তিতে মাদ্রাসা পরিচালনার নির্দেশ দেন। সেই আলোকেই বর্তমানে জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসা পরিচালনা হচ্ছে।’

তবে বারিধারা মাদরাসার এ ঘটনা নিয়ে দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকা’সহ কয়েকটি গণমাধ্যমে সম্প্রতি প্রচারিত বিভিন্ন খবরকে নির্জলা মিথ্যা ও সত্যের অপলাপ উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পরিষদ।

বুধবার (২৭ জানুয়ারী) বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবাদপত্রটি পাঠান জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার শিক্ষা সচিব ও কার্যনির্বাহী পরিষদের অন্যতম সদস্য মুফতি মকবুল হোসাইন কাসেমী।

যারা এসব নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে তাদেরকে ভূঁইফোর বলেও ক্ষোভ ঝেড়েছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ।

প্রতিবাদ বিবৃতিতে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তিনি বলেন, গতকাল দৈনিক কালেরকণ্ঠ’সহ আরো দুয়েকটি ভূঁইফোড় অনলাইন পোর্টাল রাহবারে মিল্লাত আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী (রাহ.) প্রতিষ্ঠিত জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসাকে নিয়ে মিথ্যা ও কিছু কল্পকাহিনী প্রচার করে। মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমীকে আটক রেখে মাদ্রাসা দখল করা হয়েছে এমন নির্জলা মিথ্যা খবরও প্রচার করে। অথচ বাস্তবতা ও হচ্ছে, বর্তমান ৫ সদস্য বিশিষ্ট পরিচালনা পরিষদে মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমীও অন্যতম একজন সদস্য।

মাওলানা জাকির হোসাইন কাসেমীর এ কমিটিতে থাকাকে মজার বলেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে প্রতিবাদ বিবৃতিতে।

এছাড়াও মাদ্রাসার অভ্যন্তরের স্বাভাবিক পরিবেশে কোনরূপ ব্যত্যয় হয়নি, বরং শিক্ষাকার্যক্রমসহ সবকিছু স্বাভাবিক গতিতেই চলছে বলেও দাবি তাদের।

মাদ্রাসা ক্যাম্পাস উন্মুক্ত এবং যে কারোরই অবলোকন করার সুযোগ আছে বলেও জানিয়েছেন তারা।

বারিধারা মাদ্রাসা পরিচালনা পরিষদ উদ্দেশ্যমূলক এই মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনার তীব্র প্রতিবাদ এবং সংশ্লিষ্ট সাংবাদটি প্রত্যাহার ও দু:খপ্রকাশের দাবি জানিয়েছে। এমনকি তারা এ সংবাদ প্রচারকে ইসলামবিদ্বেষী কোন চক্রের প্ররোচণায় মাদ্রাসার সুনামহানির অপচেষ্টা বলেও মনে করছেন।

প্রসঙ্গত : দুদিন আগে জাতীয় দৈনিক কালের কন্ঠ, দৈনিক বার্তাসহ বেশ কিছু গণমাধ্যমে বারিধারা মাদরাসা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হয়। পাবলিক ভয়েসেও একটি সংবাদ প্রকাশ করা হয় মাদরাসা কর্তৃপক্ষের প্রভাবশালী একজন সদস্য ও বহিস্কৃত ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমীর সাথে কথা বলে।

পাবলিক ভয়েসে প্রকাশিত সংবাদটি দেখুন : 

বারিধারা মাদরাসা থেকে নাজমুল কাসেমী বহিস্কার, জাবের কাসেমীকে নিয়োগ

এছাড়াও দৈনিক কালের কন্ঠ ‘হেফাজত নেতা মুনিরের দখলে বারিধারা মাদ্রাসা’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। যে সংবাদ আরও কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।

কালের কন্ঠের সংবাদে বলা হয়েছে – ‘রাজধানীর জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত মোহতামিম মাওলানা নাজমুল হাসানকে সরিয়ে দখলে নিয়েছেন হেফাজতে ইসলামের অর্থ সম্পাদক মুফতি মুনির হোসাইন কাসেমী।

বিস্তারিত বিবরণে বলা হয় – নাজমুল হাসানের অনুপস্থিতিতে রবিবার রাতে উগ্রপন্থী ও বিতকির্ত এই নেতা তার অনুসারীদের নিয়ে মরহুম আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাটির দখল নেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাদ্রাসা দখলে নিতে তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে কিছু উগ্র অনুসারীকে বারিধারায় নিয়ে আসেন। মাদ্রাসার অভ্যন্তরে থাকা মুফতি মুনির হোসাইনের অনুসারী শিক্ষক ও উগ্র ছাত্ররা মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত মোহতামিমের সহযোগী মুফতি জাকির হোসেনকে জিম্মি করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করেন। এ সময়ে মুফতি জাকিরের মোবাইল কেড়ে নিয়ে তাকে একটি কক্ষে বন্দী করে রাখা হয়। বন্দী থাকা অবস্থায় তাকে শারিরীকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে বলেও জানা যায়। মাদ্রাসায় বর্তমানে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে এবং মাদ্রাসার ছাত্ররা এ পরিস্থিতিতে নিজেদের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত বলে জানিয়েছেন।

এসব বিষয়ে জানতে সোমবার (২৫ জানুয়ারি) মাওলানা নাজমুল হাসান ও মুফতি মুনির হোসাইনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি।

জানা গেছে, মাদ্রাসার শীর্ষ পদ দখলের ঘটনা শুনে ভারপ্রাপ্ত মোহতামিম মাওলানা নাজমুল হাসান প্রাণভয়ে আর মাদ্রাসায় আসার সাহস দেখাননি এবং তাকে মাদ্রাসায় না আসার জন্য বিভিন্নভাবে হুমকি প্রদান করা হয়েছে। অথচ মাওলানা নাজমুল হাসানকে নুর হোসাইন কাসেমী জীবদ্দশায় ভারপ্রাপ্ত মোহতামিম হিসেবে ঘোষণা করে যান। কিন্তু উগ্রপন্থীরা মাওলানা নাজমুল হাসানের নেতৃত্বে মাদ্রাসার সুষ্ঠু পরিবেশকে মেনে নিতে পারছিলেন না।

সূত্রমতে, মাওলানা নুর হোসাই কাসেমী তাঁর জীবদ্দশায় ওসিয়ত করে গিয়েছেন তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য বিশেষ করে তাঁর ছেলে জাবের কাসেমী যেন এ মাদ্রাসার কোনো পদে নিয়োগ না পায়। কিন্তু, কুচক্রিমহল নুর হোসাইন কাসেমীর ওসিয়ত বরখেলাপ করে তাঁর ছেলেকে ভুল বুঝিয়ে মাদ্রাসায় নিয়ে এসে মুহাদ্দিস হিসেবে বসিয়ে দেন। জাবের কাসেমীকে ঢাল বানিয়ে এ পদে বসানো ছিল মুফতি মুনিরের চক্রান্তের অংশ।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সরকারবিরোধীদের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করার জন্য কৌশলে বারিধারা মাদ্রাসা দখলে নিয়ে ভবিষ্যতে হেফাজতে ইসলাম ও সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই হবে মুফতি মুনির হোসাইন ও তার সহযোগীদের মূল লক্ষ্য। মাদ্রাসা দখলে সরকারবিরোধী প্রভাবশালী আলেমরা মুফতি মুনিরের সকল ধরনের অপকর্মে পৃষ্ঠপোষকতা করছে বলে জানা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মুহাদ্দিস, সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রে সহযোগী না হলে তাদেরকে অপমান করে মাদ্রাসা হতে বের করে দেওয়া হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

মাদ্রাসাটির অবস্থান কূটনৈতিক পাড়ায় বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কাছাকাছি হওয়ায় নিরাপত্তার দিক দিয়ে মাদ্রাসাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বারিধারা মাদ্রাসায় কোনোধরনের উগ্রপন্থী কার্যক্রম বহিঃবিশ্বের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি এদেশকে জঙ্গীবাদী বা উগ্রবাদী রাষ্ট্র হিসেবে প্রচার করার সুযোগ করে দিতে পারে।

উল্লেখ্য, মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদে যুদ্ধাপরাধী এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার আসামী থাকায় মাদ্রাসাটির রেজিস্ট্রেশন ইতোপূর্বেই বাতিল করা হয়েছে। এ ধরনের কর্মকান্ডে প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে এবং অন্যান্য মাদ্রাসাগুলোতে এই জাতীয় ঘটনার পুণরাবৃত্তি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

তবে এসব দাবি ভিত্তিহীন ও নির্জলা মিথ্যাচার দাবি করেছেন বারিধারা মাদরাসা কর্তৃপক্ষ।

এসব সংবাদকে সত্যের অপলাপ উল্লেখ করে মুফতি মকবুল হোসাইন কাসেমী বলেন, গণমাধ্যমের দায়িত্ব হচ্ছে, যে কোন বিভ্রান্তির নিরসনে বাস্তবসম্মত তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু এর বিপরীতে গিয়ে কোন গণমাধ্যম যখন সাংশ্লিষ্টদের কোনরূপ মতামত গ্রহণ ছাড়াই অসৎ উদ্দেশ্যে টেবিল প্রতিবেদন করে কল্পকাহিনী ছড়ায়, তখন বাস্তবিকই হতাশ হতে হয়।

তিনি বলেন, গণমাধ্যমের প্রতি আমরা সবসময় শ্রদ্ধাশীল। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারে সংবাদকর্মীদের সাথে আমরা সার্বক্ষণিক সহযোগিতামূলক মনোভাব রাখি এবং দায়িত্বশীলতা আশা করি।

মন্তব্য করুন