আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলেন কুষ্টিয়ার সেই বিতর্কিত এসপি

প্রকাশিত: ৭:৩২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২১

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পৌরসভা নির্বাচন চলাকালে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহসিন হাসানের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগের ঘটনায় গত ২০ জানুয়ারি পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাতকে তলব করেছিলেন হাইকোর্ট।

এ বিষয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন নজরে আসার পর সেটি আমলে নিয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে রুল জারিসহ আদেশ দেন হাইকোর্ট।

সে অনুসারে আজ সোমবার (২৫ জানুয়ারি) সকালে আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা চান পুলিশের এই কর্মকর্তা। এর আগে আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিতভাবে ক্ষমা চান তিনি।

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পৌরসভা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকালে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহসিন হাসানের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনায় ব্যাখ্যা দিতে হাইকোর্টে হাজির হয়ে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম তানভীর আরাফাত এ ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এরপর বিষয়টির ওপর আদালতে শুনানি হয়।

এসপি তানভীরকে কড়া বার্তা দিলো আদালত :

শুনানিতে হাইকোর্ট এসপি তানভীর আরাফাতকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কে কোন দল-মত কিংবা আদর্শের উত্তরাধিকারী সেটা আপনার বিবেচ্য বিষয় নয়।’

হাইকোর্টের বিচারপতি মামুনুন রহমান ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এসপির উদ্দেশে বলেন, ‘পুলিশের দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকের সুরক্ষা দেয়া। সে যে–ই হোক না কেন। কুষ্টিয়ায় যে পরিবেশ বিরাজ করছে এবং পত্র-পত্রিকায় যেভাবে তা এসেছে, সেটা যদি বাস্তব চিত্র হয় তবে তা ভয়ঙ্কর।’

এ সময় এসপি তানভীর আরাফাতকে হাইকোর্ট বলেন, ‘কথায় পটু হলে চলবে না, কাজে পটু হতে হবে। জেলার একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আপনার কার্যক্রমের মাধ্যমে সবকিছুর সমন্বয় সাধন করে কুষ্টিয়ায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করবেন, যাতে পুলিশ ভীতিকর না হয়ে বন্ধু হয়।’

আদালত আরও বলেন, ‘আপনাদের (পুলিশের) মূলমন্ত্র হচ্ছে দুষ্টের দমন শিষ্টের লালন। আপনাকে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আপনি রাষ্ট্রপতি পদক পেয়েছেন। সে পদকের মর্যাদা রক্ষা করা আপনার নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আর রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোর (তিনটি বিভাগ) মধ্যে সমন্বয় সাধন করে কাজ করাকেই দক্ষতা বলে। আপনাদের কর্মকাণ্ডে মানুষের মনে এমন ধারণা যেন তৈরি না হয় যে একটি পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম হয়ে গেছে। আপনারা অনেক ভালো কাজ করেন। সে সব ভালো কাজ দিয়ে সমাজকে একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যান।’

এরপর নির্ধারিত দিনে শুনানি শেষে আদালত আদেশের জন্য আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি দিন রেখেছেন। একইসঙ্গে সেই প্রিসাইডিং অফিসার ও তার পরিবারকে নিরাপত্তা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এসপিকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

আদালতে এসপির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী ও আইনজীবী আহমেদ ইশতিয়াক।

প্রিসাইডিং অফিসারের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী অনিক আর হক ও ইশরাত হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাহেরুল ইসলাম।

এর আগে গত ২০ জানুয়ারি হাইকোর্টের বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এসপিকে তলব করে আদেশ দেন।

ওই দিন হাইকোর্ট বলেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা ও আইন অনুযায়ী ভোটকেন্দ্রে বিচারিক দায়িত্ব পালন করছিলেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহসিন হাসান। কিন্তু দায়িত্বরত একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে ওই পুলিশ সুপার যে আচরণ করেছেন তা আদালত অবমাননার শামিল। উনার (এসপি) এই কর্মকাণ্ড শুধু বিচার প্রশাসনে হস্তক্ষেপই নয় বরং পুরো বিচার বিভাগের প্রতি প্রচণ্ড আঘাতের সামিল। উনার এই কর্মকাণ্ডকে আমরা (আদালত) এড়িয়ে যেতে পারি না। এছাড়া এটাকে হালকাভাবে নেয়ারও সুযোগ নেই। উনি শুধু গুরুতর আদালত অবমাননাই করেননি, বিচার বিভাগের ভাবমূর্তিকেও ক্ষুণ্ন করেছেন।

মন্তব্য করুন