বারিধারা মাদরাসা থেকে নাজমুল কাসেমী বহিস্কার, জাবের কাসেমীকে নিয়োগ

প্রকাশিত: ২:৫৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০২১

রাজধানী ঢাকার অন্যতম প্রসিদ্ধ কওমি মাদরাসা জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদরাসা থেকে মাদরাসাটির সাবেক নায়েবে মুহতামিম ও আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী রহ. এর ইন্তেকালের পর ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম নিয়োগ পাওয়া মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমীকে পদচ্যূত করে মাদরাসা থেকে বহিস্কার করা হয়েছে।

একই সাথে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী রহ. এর ছোট সন্তান মাওলানা জাবের কাসেমীকে মাদরাসার মুহাদ্দিস হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

একটি সূত্র থেকে জানা গেছে – গতকাল রোববার (২৪ জানুয়ারি) বাদ এশা বারিধারা মাদরাসায় মজলিসে ইলমীর সর্বসম্মতিক্রমে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের সভাপতিত্বে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ সময় মাদরাসার মজলিসে ইলমীর সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।

মজলিসের বৈঠক শেষে বারিধারা মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি মুনীর হোসাইন কাসেমী সকলের উপস্থিতিতে এ ঘোষণা দেন। এ সময় বারিধারা মাদরাসার মুফতি মকবুল কাসেমীসহ অন্যান্য শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। তবে এ সময়ে মাওলানা নাজমুল কাসেমীকে বহিস্কারের বিষয়টি জানানো হয়েছে কি না জানা যায়নি।

তবে মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমীকে বহিস্কারের বিষয়টি পাবলিক ভয়েসকে নিশ্চিত করেছেন বারিধারা মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা মুনির হোসাইন কাসেমী।

বহিস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ‘বহিস্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “হ্যাঁ, তাকে মাদরাসা থেকে বহিস্কার করা হয়েছে”। তবে তিনি একটি জরুরী মিটিংয়ে থাকায় বহিস্কারের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত কথা বলতে পারেননি। পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলবেন বলে জানিয়েছেন।’

বহিস্কারের বিষয়ে মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি পাবলিক ভয়েসকে বলেন – ‘আমি এ বিষয়ে কোন কথা বলতে চাই না, বিষয়টি আমি আল্লাহ তায়ালার উপর ছেড়ে দিয়েছি’।

আপনাকে বহিস্কার করা হয়েছে কি না এটুকু বলুন’ এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমুুল কাসেমী পাবলিক ভয়েসের প্রতিবেদককে বলেন – “আমি এটা নিয়ে এখনও কিছুই বলবো না, অন্য জায়গা থেকে জেনে নিন। আমি বিষয়টি আল্লাহর হাওয়ালা করে দিলাম”।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে – গতকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বারিধারা মাদরাসার এ বিষয়টি নিয়ে কওমী শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। সঠিক তথ্য না জানা থাকায় বিভিন্নজন বিভিন্ন কথা বলছেন ফেসবুকে।

তবে বিশেষ একটি সূত্র থেকে পাবলিক ভয়েস নিশ্চিতভাবে জেনেছে – মাদরাসার অভ্যন্তরীন কিছু বিষয় নিয়ে মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমীকে বহিস্কার করা হয়েছে। যাকে বহিস্কারের বিষয়ে মাদরাসাটির বেশিরভাগ শিক্ষকরাই সম্মত রয়েছেন বলেও জানিয়েছে সূত্রটি। একই সাথে নাজমুল কাসেমীকে বহিস্কারের পর বারিধারার ছাত্রদের মধ্যে গতরাত সন্ধ্যার দিকে কিছুটা অসন্তোষের খবরও পাওয়া গেছে। কিন্তু শিক্ষকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তেমন কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

প্রসঙ্গত : মাদরাসার মুহাদ্দিস হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী রহ. এর সন্তান মুফতী জাবের কাসেমী ২০০৮ সালে জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা থেকে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন। এরপর বিশ্ববিখ্যাত দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হয়ে সেখানে পূনরায় দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন।

দারুল উলূম দেওবন্দে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করার পর আল্লামা কাসেমী (রাহ.) এর নির্দেশনায় তিনি ভারতের চেন্নাইয়ে অবস্থিত মাদ্রাসায়ে মোজাহেরুল উলূম-সাইলামে ভর্তি হয়ে ইসলামী আইন শাস্ত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রী ‘ইফতা’ সম্পন্ন করেন।

শিক্ষা জীবন সমাপন করার পর দেশে ফিরে এসে প্রথমে তিনি জামিয়া মাহমূদিয়া টিকরপুরে ২ বছর হাদীসের দরসদান করেন। এরপর রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত জামিয়া মাহমুদিয়া ইছহাকিয়া মানিকনগর মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করে দায়িত্ব এতদিন পালন করে আসছিলেন। পাশাপাশি তিনি মানিকনগর রিয়াজুল জান্নাহ জামে মসজিদের খতীবের দায়িত্ব পালন করেন এবং বশিরুল উলূম হাকিমিয়া মাদ্রাসা নামে একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। মুফতি জাবের কাসেমী অধ্যাপনার পাশাপাশি দাওয়াতী কার্যক্রমের সাথেও জড়িত আছেন।

তবে তাকে মাদরাসায় নিয়োগ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি আলোচনা রয়েছে যে, আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী রহ. এর অসিয়ত ছিলো তার কোন সন্তানকে বারিধারা মাদরাসার দায়িত্বে না আনার।

কিন্তু এ বিষয়টি সম্পর্কে মোস্তফা ওয়াদুদ নামের একজন গণমাধ্যমকর্মী অনুসন্ধান করে বেশ কিছু সূত্র থেকে জানিয়েছেন – আল্লামা কাসেমী রহ. হাসপাতালে থাকাবস্থায় একদিন বারিধারা মাদরাসার তৎকালীন নায়েব মুহতামিম মাওলানা নাজমুল হাসান, বারিধারা মাদরাসার সিনিয়র শিক্ষক মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমী জায়নামাজে নামাজের সুরতে বসা ছিলেন। এ সময় তারা আল্লামা কাসেমীর কাছে তার সন্তান জাবের এর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার উস্তাদ, কুমিল্লা বটগ্রাম মাদরাসার মুহতামিম ও হোসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর শাগরেদ আল্লামা নূরুল হক আমাকে পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, নিজ সন্তানের বিষয়ে এতো সখতি (কঠোরতা) করতে নেই। এ সময় মুফতি জাকির হোসাইন কাসেমীর চেহারার দিকে তাকিয়ে আল্লামা কাসেমী আরও বলেন, হুজুরের এ পরামর্শটি আমার কাছে ভালো লেগেছে।

এদিকে মাদরাসার আরেকজন শিক্ষক মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মাসউদ জানান, ওসিয়ত উঠিয়ে নেয়ার বিষয়ে হজরত বলেন, কুমিল্লার বটগ্রাম মাদরাসার মুহতামিম আল্লামা নূরুল হকসহ মজলিসে ইলমী যদি চায় তাহলে জাবেরকে মাদরাসায় নিয়োগ দিতে পারে।

আব্দুল্লাহ আল মাসউদ আরও জানান, এ ওসিয়ত করার সময় মাদরাসার সাবেক ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম মাওলানা নাজমুল হাসান, মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মাসউদ, সৈয়দপুর মাদরাসার মুহতামিম ও আল্লামা কাসেমী রহ. এর খলিফা মাওলানা বশির আহমদ, হুজুরের খাদেম নাসির, খাদেম মশিউর মুসা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী রহ. কে আল্লামা নূরুল হক ওসিয়ত উঠিয়ে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তার পরামর্শ মোতাবেক তিনি এ ওসিয়ত উঠিয়ে নেন বলে জানা গেছে।

  • পাবলিক ভয়েস ডেস্ক প্রতিবেদন। সংবাদ সম্পাদনা : হাছিব আর রহমান।

মন্তব্য করুন