করোনার প্রকোপে দেশে এখন ৪২ শতাংশ মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে

প্রকাশিত: ১:২১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৪, ২০২১

দেশে দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে। দেশব্যাপী থানা পর্যায়ের জরিপের ভিত্তিতে এ তথ্য প্রকাশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র (বিবিএস) খানা জরিপে, ২০১৬ সালে গ্রামাঞ্চলের সার্বিক দারিদ্র্য ছিল ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৮ সালের জিইডি-সানেম জরিপ অনুসারে যা ছিল ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু করোনার প্রভাবে ২০২০ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশ।

শহরাঞ্চলে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ আর করোনার সময়ে ২০২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

দারিদ্র্য ও জীবিকার ওপর কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব শীর্ষক এক ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে শনিবার এই জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।

জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২০ সালে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে রেমিট্যান্স বা প্রবাসীয় আয়ের ব্যাপক প্রবৃদ্ধি হলেও ব্যক্তি পর্যায়ে আয় কমেছে। কারণ হিসেবে বলা হয়, অনানুষ্ঠানিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাসী আয় এসেছে। এতে বিনিময় হার কমে গেছে।

জরিপে বলা হয়েছে – ৮২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ পরিবার বলেছে, দেশের বাইরে থেকে আসা প্রবাসী আয় কমেছে। একই ক্ষেত্রে আগের মতো আছে বলেছে ১৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ পরিবার। ফলে প্রবাসী আয়ের প্রভাব সমাজে অতটা অনুভূত হয়নি, যতটা বলা হয়েছে, সে তুলনায়।

জরিপের ফলাফল তুলে ধরে সানেমের গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, জরিপ পরিচালনার খরচ আছে। তবে তহবিল পাওয়া না গেলেও সানেম নিজস্ব অর্থায়নে জরিপটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। তার ভাষ্যমতে, এটা না হলে আমরা একটি পরিপ্রেক্ষিত হারিয়ে ফেলতাম। সেই তাড়না থেকেই এই জরিপ। দারিদ্র্য, অসমতা ও কর্মসংস্থান এই তিনটি ক্ষেত্রে কোভিডের প্রভাব নিরূপণ করা হয়েছে বলে জানান সেলিম রায়হান।

এই জরিপের ভবিষ্যতবানী আগেই করা হয়েছিলো। গত বছর করোনা মহামারি শুরু হওয়ার দিকেই একটি আন্তর্জাতিক জরিপ প্রকাশ করে বলা হয়েছে – দরিদ্র মানুষের তালিকায় যুক্ত হবে আরও প্রায় ৪০ কোটি মানুষের নাম। এর ফলে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা শত কোটি ছাড়াবে বিশ্বব্যাপী। বিপরীতে মহামারি কালেও বিশ্বের ধনকুবেরদের সম্পদের পরিমাণ আরও বেড়েছে।

গত বছর জুন মাসে রয়টার্স প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাতে জানিয়েছিলো, করোনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে চরম ও মারাত্মক ধস নেমেছে তাতে নতুন করে আরও ৩৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে। ফলে বিশ্বে মোট চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে হবে ১১০ কোটিরও বেশি।

জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্ল্ড ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলোপমেন্ট ইকোনমিক্স রিসার্চ (ডব্লিউআইডিইআর) ওই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, সামগ্রিক মাথাপিছু আয় বা ভোগে ২০ শতাংশ সংকোচন হলে সে পরিস্থিতিকে সবচেয়ে খারাপ বিবেচনা করা হয়েছে।

দৈনিক ১ দশমিক ৯০ ডলার বা ১৬৩ টাকায় যারা জীবন নির্বাহ করে থাকেন বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ড অনুযায়ী এমন মানুষদের চরম দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী বলা হয়। এছাড়া দারিদ্র্যসীমার ওপরের দিকে বসবাসকারীদের ক্ষেত্রে এ হিসাব করা হয় দৈনিক ৫ দশমিক ৫০ ডলার বা ৪৮০ টাকা ধরে।

গবেষণায় বলা হচ্ছে, করোনার প্রকোপ চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১১২ কোটি পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া দৈনিক ৪৮০ টাকার কমে জীবন যাপন করেন এমন মানুষের সংখ্যা বেড়ে ৩৭০ কোটিরও বেশি হতে পারে। ফলে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি দরিদ্রসীমার নিচে চলে যাবে।

দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ সবচেয়ে বেশি চরম দারিদ্রসীমার মধ্যে প্রবেশ করবে। একক দেশ হিসেবে এ তালিকায় প্রথমে থাকবে ভারত। এরপরই রয়েছে সাব সাহার আফ্রিকা অঞ্চলের দেশগুলো। ফলে দারিদ্র্য হ্রাসে জাতিসংঘের কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি আরও ২০-৩০ বছর পিছিয়ে যেতে পারে।

গবেষণা নিবন্ধটির অন্যতম লেখক অ্যান্ডি সামনার বলেন, ‘প্রাত্যহিক আয়ের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে সরকারগুলো দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দরিদ্র মানুষদের অবস্থা সামনের দিনগুলোতে আরও খারাপ হবে। ফলে দারিদ্র্যের হার কমাতে নেওয়া এতদিনের পদক্ষেপের কোনো কার্যকারিতা থাকবে না।’

মন্তব্য করুন