ওয়াজ-মাহফিলকে নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টা ; যা বলছেন হাবিবুর রহমান মিছবাহ

প্রকাশিত: ৫:০৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২২, ২০২১

সম্প্রতি বাংলাদেশের ওয়াজ-মাহফিলে কুরআন হাদিসের উদ্ধৃতি ও তথ্যসূত্র উল্লেখ বাধ্যতামূলক করতে উকিল নোটিশ পাঠানো ও ওয়াজ মাহফিলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জার্মানভিত্তিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘ডয়চে ভেলে’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

উকিল নোটিশে দাবি করা হয়েছে – ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় বক্তৃতায় নানা ধরনের কাল্পনিক গল্প বা রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে৷ কারো বক্তব্য জঙ্গিবাদ উসকে দিচ্ছে৷  ওয়াজে  নানা ধরনের গল্প ও কবিতা বলা হয়ে থাকে যা ইসলামের সাথে যায় না৷

এর পরিপ্রেক্ষিতে ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বিশিষ্ট ওয়ায়েজ ও লেখক, পাবলিক ভয়েস সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিছবাহ তার মতামতে বলেছেন – ‘‘ওয়াজে যে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়া হয় না তা নয়৷ কিছু তরুণ ওয়ায়েজিন আবেগপ্রবণ হয়ে এটা করেন৷ আর ফেসবুক ও ইউটিউবের যুগে তারা জনপ্রিয়তা বাড়াতেও কিছু গাল-গল্প করেন৷ এগুলো পরিহার করা প্রয়োজন৷ তরুণ কিছু ওয়ায়েজিনের জ্ঞানের গভীরতা কম থাকায় এরকম হয়৷”

তবে ওয়াজে সরকারবিরোধী বক্তব্যের ব্যাপারে হাবিবুর রহমান মিছবাহ বলেন, “ওয়াজে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়৷ এটাতো বলতে হবে৷ অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বললে যদি সরকারবিরোধিতা বলা হয় তা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়৷”

ভাস্কর্য ও মূর্তি ইস্যুতে তিনি বলেন – “ভাস্কর্য আর মূর্তি একই জিনিস৷ মূর্তি ইসলামে হারাম। তাই মূর্তির বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে৷ তবে আমাদের কাজ হলো এটা বলা, কোনো উগ্রতা সৃষ্টি আমাদের কাজ নয়৷”

জানা যায় – সম্প্রতি ওয়াজ মাহফিলে বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে সরকারকে আইনি নোটিস দিয়েছেন এক আইনজীবী৷ এর পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াজ মনিটরিংয়ে কমিটি গঠন করার কথা ভাবছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন৷

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হাসান ১৮ জানুয়ারি সরকারের চারটি সংস্থাকে পাঠানো নোটিশে অভিযোগ করেছেন, ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় বক্তৃতায় নানা ধরনের কাল্পনিক গল্প বা রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে৷ কারো বক্তব্য জঙ্গিবাদ উসকে দিচ্ছে৷  ওয়াজে  নানা ধরনের গল্প ও কবিতা বলা হয়ে থাকে যা ইসলামের সাথে যায় না৷

তাই আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ওয়াজের মধ্যে এগুলো নিষিদ্ধ করতে তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ধর্মমন্ত্রণালয়ের সচিব, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালককে নোটিশ দিয়েছেন তিনি৷ এগুলো বন্ধের ব্যবস্থা না করলে তিনি আইনের আশ্রয় নিয়ে হাইকোর্টে রিট করবেন বলে জানিয়েছেন৷

উকিল নোটিশ পাঠানো অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হাসান বলেন, ”বাংলাদেশ সংবিধানের ২ (ক) অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম৷ তাই ইসলাম ধর্মের পবিত্রতা রক্ষা করা এবং ইসলাম ধর্ম সঠিকভাবে প্রচার করা সরকারের আবশ্য দায়িত্ব৷ বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় বক্তৃতায় বক্তারা যেন পবিত্র কোরআন ও বিশুদ্ধ হাদিসের রেফারেন্স উল্লেখ করে বক্তব্য দেন এবং রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য পরিহার করেন, এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া দরকার৷”

তিনি প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কোরআন ও বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থের অনুবাদ পড়ানো বাধ্যতামূলক করারও দাবি জানিয়েছেন৷

তার কাছে ওয়াজ মাহফিলে অসত্য ও কল্পকাহিনী প্রচারের সুনির্দিষ্ট উদাহরণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আমি কারো নাম উল্লেখ করে কিছু বলতে চাই না৷ আপনার ইউটিউব ও ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর অনেক উদাহরণ পাবেন৷’’

তবে অনেকেই উকিল নোটিশটিকে নেতিবাচকভাবে নিলেও বিশিষ্ট আলোচক ও জনপ্রিয় অনলাইন সেলিব্রিটি শায়খ আহমদুল্লাহ বলেন – ‘উকিল নোটিশ পাঠানোর যে বিষয়বস্তু তা অবশ্যই ইতিবাচক। ওয়াজ মাহফিল এবং ইসলামের যেকোনো প্রচার-প্রচারণায ও কথাবার্তায় ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার যে কোন পন্থায় অবশ্যই কোন হাদীসের রেফারেন্স থাকা উচিৎ। অসঙ্গতিপূর্ণ কোন কথা বা তথ্য উপস্থাপন করা ওয়াজ মাহফিলে কোন মুসলমানের জন্য সমিচীন নয়।’

শায়খ আহমদুল্লাহ বিষয়টি নিয়ে আরও বলেন – যিনি এই পাঠিয়েছেন তার উদ্দিশ্য সম্পর্কে তিনি ভালো জানেন তবে যে দাবি করেছেন তিনি যে কোন হাদীসের রেফারেন্স বাধ্যতামূলক করতে বলেছেন এটা অবশ্যই ইতিবাচক এবং নেতিবাচক ভাবে দেখার কোনো কারণ নেই। এমনকি দাবিটা আলেম ওলামাদেরও যে, ওয়াজ-মাহফিলে রেফারেন্সভিত্তিক কথাবার্তাই বলা উচিত।

[বিশিষ্ট আলোচক ও ইসলামি স্কলার শায়খ আহমদুল্লাহ।]

তবে এ উকিল নোটিশের মাধ্যমে যেন ওয়াজ মাহফিলের টুটি চেপে না ধরা হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে বলেও মনে করেন শায়খ আহমদুল্লাহ। কারণ এদেশের অপরাধ প্রবণতা কমিয়ে আনার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেরকম অবদান রয়েছে তেমনিভাবে এদেশের লক্ষ লক্ষ ওলামায়ে কেরামদের ওয়াজ-নসিহত, দীনি আলোচনা, জুমার আলোচনা এগুলোর মাধ্যমে মানুষকে নীতি নৈতিকতার চর্চা দেয়া হয়ে থাকে যা অপরাধ প্রবণতা কমিয়ে আনে বলেও তিনি মনে করেন।

  • এছাড়াও সামগ্রিকভাবে উকিল নোটিশটি ও সার্বিক বিষয়টি ইসলামিক ফাউন্ডেশন পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানা গেছে

ইসলামিক ফাউন্ডেশন এরই মধ্যে ওয়াজ মনিটিরিংয়ের চিন্তা করছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক আনিস মাহমুদ৷

তিনি বলেন.  ‘‘তবে এই মূহুর্তে আমরা মনিটরিং করতে পারছি না। কারণ, আমাদের জনবল ও লজিস্টিক-এর অভাব আছে৷’’

তিনি জানান, দেশের বিশিষ্ট আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদদের নিয়ে একটি প্যানেল করতে চাচ্ছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন৷ তারা সারাদেশের ওয়াজে যদি ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়া হয়, তাহলে তা ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে জানাবে৷ এরপর ফাউন্ডেশন ব্যবস্থা নেবে৷ আর ফাউন্ডেশনের গবেষণা সেলের লোকবল বাড়িয়ে একটি মনিটরিং সেলও করা হবে বলে জানান তিনি৷

এ বিষয় নিয়ে মুফতী হাবিবুর রহমান মিছবাহ বলেন, ‘‘মনিটরিং সেলে আমাদের আপত্তি নেই৷ তবে তা সরকারের পছন্দের লোকজন নিয়ে করলে হবে না৷ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য দেশের বিশিষ্ট  আলেম-ওলামাদের নিয়ে এটা করতে হবে৷’’

প্রসঙ্গত, দেশের ওয়াজ মাহফিল নিয়ে গত কিছুদিন ধরে আলেম ওলামা ও সরকারের মধ্যে টানাপোড়ন চলছে। বিভিন্ন জায়গায় ওয়াজ মাহফিল বন্ধ করে দেওয়া ও বক্তাদের বাধা দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ আসছে। সরকার ওয়াজ মাহফিল নিয়ে একটি গোছালো সিদ্ধান্তে আসতে চাচ্ছে বলে মতামত বিশ্লেষকদের।

এর আগে দুই বছর আগে ওয়াজ নিয়ে সরকারের একটি গোয়েন্দো সংস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল৷ তখনও মনিটরিং সেল গঠনের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু এতদিনেও তা হয়নি৷

মন্তব্য করুন