ইউরোপে সর্বপ্রথম ইসলামের প্রচার ঘটে মেসিডোনিয়ায়

প্রকাশিত: ৪:৫৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২২, ২০২১

মহাবীর আলেকজান্ডার। বিশ্ববাসী তাকে এক নামে চেনেন। এখন থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৬ অব্দে গ্রিসের অতিক্ষুদ্র এক রাজ্য মেসিডোনিয়ার রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ইতিহাসের এই কিংবদন্তি। মেসিডোনিয়াকে বলা হয় আলেকজান্ডারের দেশ। ১৯৯১ সালে সাবেক যুগোস্লাভিয়া থেকে বের হয়ে এসে স্বাধীনতা ঘোষণা করে মেসিডোনিয়া।

মুশকিল হলো, গ্রিসের একটি অঞ্চলের নামও মেসিডোনিয়া। গ্রিসের সবচেয়ে জনবহুল অংশ সেটি। অন্যদিকে দুই মেসিডোনিয়াই একসময় রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল, তাই নাম নিয়ে তাদের বিবাদ বহুকালের। দুই মেসিডোনিয়াই দাবি করে, তারা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের উত্তরাধিকারী।

অনেক গ্রিকবাসীর কাছে নামটি বেশ স্পর্শকাতর। তারা মনে করেন, মেসিডোনিয়া শুধু গ্রিকের থাকবে। অতএব এই নামে আপত্তি গ্রিসের। শেষমেষ চুক্তি, আলোচনা ও গণভোটে ফায়সালা হয় মেসিডোনিয়া নাম বদলে ‘রিপাবলিক অব নর্থ মেসিডোনিয়া’ করবে। ২৮ বছরের বিবাদ শেষে ২০১৮ সাল থেকে মেসিডোনিয়ার সাংবিধানিক নাম ‘রিপাবলিক অব নর্থ মেসিডোনিয়া’ বা উত্তর মেসিডোনিয়া প্রজাতন্ত্র।

২৫ হাজার ৭১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশ মেসিডোনিয়ার জনসংখ্যা ২৫ লাখের কাছাকাছি। রাজধানী স্কোপজে। যুগোস্লাভিয়া থেকে স্বাধীন হওয়ার পর দেশটি এখনও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি। গ্রিসের সঙ্গে ভাষা, ঐতিহ্য এমনকি চার্চ বিষয়ে মেসিডোনিয়ার বিরোধ দীর্ঘদিনের। তবে মেসিডোনিয়া নিজের মতো করে নিজ দেশের পরিচিতি তৈরি করার চেষ্টা করছে।

দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ মুসলিম। এদের বেশিরভাগ আলবেনিয়ার নাগরিক। তা ছাড়া তুর্কি, বসনিয়া ও রুমানিয়ার অধিবাসীও রয়েছে। রাজনৈতিক উত্থান-পতন থাকলেও দেশটিতে মুসলমানের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার হার ও রাজনীতিতে মুসলমানদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। পিউ ফোরাম রিসার্চ সেন্টারের দাবি, ২০৫০ সালে ৫৬.২ শতাংশে উন্নীত হবে মুসলমানরা।

দেশটিতে ৫৮০টি মসজিদ এবং একাধিক ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। উসমানীয় শাসনামলে গড়ে তোলা পাঁচ শতাধিক মসজিদ রয়েছে মেসিডোনিয়ায়। সেন্টার জুপা, দেবার, স্ট্রুগা ও প্লাসনিকাসহ দেশটির উত্তর-পশ্চিম ও পশ্চিমের কিছু অঞ্চলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিদ্যমান। ইতিহাস থেকে জানা যায়, স্পেনে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলিম ধর্ম প্রচারকরা ছড়িয়ে পড়েন। তন্মধ্যে মেসিডোনিয়ায় সর্বপ্রথম ইসলামের প্রচার ঘটে। মুসলিম ধর্ম প্রচারকরা সেখানে মসজিদ ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

১৩৮২ খ্রিস্টাব্দে উসমানীয় শাসকরা মেসিডোনিয়া বিজয় করেন এবং তাদের সহযোগিতায় সেখানে দ্রুত ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় পাঁচশ’ বছর তা তুর্কি শাসনাধীন ছিল। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত প্রথম বলকান যুদ্ধ পর্যন্ত তুর্কিরা কার্যত মেসিডোনিয়া শাসন করে। উসমানীয় শাসকরা মেসিডোনিয়ায় বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯২১ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত মুসলিম জনসংখ্যা ৩১ শতাংশ থেকে ২৪ শতাংশে নেমে আসে। ১৯৭১ সাল থেকে মুসলিম জনসংখ্যা আবারও বাড়তে থাকে।

মেসিডোনিয়া ইউরোপিয়ান দেশ হলেও এখানকার মুসলিম জীবনে তুর্কি সংস্কৃতির প্রভাব বেশি। খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে ধর্মীয় আচার-আচরণ পালন পর্যন্ত সব কিছুতেই তারা তুর্কি সংস্কৃতির অনুসারী। দীর্ঘদিন তুর্কি শাসনাধীন থাকাই এর প্রধান কারণ। দেশটির মুসলিমদের এক-তৃতীয়াংশই ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলেন, হিজাব পরিধান করে রাস্তায় নারীরা চলাফেরা করেন। প্রতি ফেব্রুয়ারি মাসে বেশ ঘটা করে পালিত হয়- হিজাব দিবস। আলাদা কোরআন শিক্ষার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কয়েকশ মানুষ প্রতিবছর হজ পালনের জন্য সৌদি আরব গমন করেন।

দেশটির মুসলিম জনগণের সর্বোচ্চ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দারুল ইফতা মেসিডোনিয়া। সরকার ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কিংবা সংস্থায় দারুল ইফতা মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারীদের বিভিন্ন সেবাও এই সংস্থাটি দিয়ে থাকে। ঋতু ও রূপবৈচিত্র্যের কারণে ইউরোপীয় পর্যটকদের কাছে মেসিডোনিয়া বেশ প্রিয়। দেশটির প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলো দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। দেশটিতে আছে বিভিন্ন ধর্মের অসংখ্য প্রাচীন নিদর্শন।

মেসিডোনিয়া উচ্চ ভূমিকম্পপ্রবণ একটি দেশ। তবে দেশটির প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম। সারি সারি পর্বতমালাকে কেন্দ্র করে গাছগাছালিতে তৈরি হয়েছে এক মায়াময় পরিবেশ। গ্রীষ্মকাল বেশ উষ্ণ এবং শুকনো আবহাওয়া। শীতের তীব্রতা খুব বেশি না হলেও তুষারপাত হয় ব্যাপক। প্রাচীনকালে মেসিডোনিয়া নামে এই ছোট রাজ্যটিই গ্রাস করে নিয়েছিল পৃথিবীর প্রায় পুরো ভূভাগ। সেই ইতিহাস গড়েছিলেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। ইতিহাসের সবচেয়ে সফল এই সমরনায়কের কোনো যুদ্ধে হেরে যাওয়ার নজির নেই। মৃত্যু অবধি একে একে রাজ্য জয় করে চলেছিলেন তিনি।

আলেকজান্ডারের হার না মানা ইতিহাসকে সামনে রেখে নানা ঘাত-প্রতিঘাত সত্ত্বেও এগিয়ে চলছেন মেসিডোনিয়ার মুসলমানরা। স্বাধীনভাবে ধর্ম চর্চার ধারা তারা অব্যাহত রেখেছেন। ধর্মীয় সংঘাত এড়িয়ে নতুন উদ্যামে মেসিডোনিয়ার মুসলমানদের পথচলা নিকটবর্তী দেশের মুসলমানদের জন্য আশাব্যঞ্জক খবর।

মন্তব্য করুন