ভোটকেন্দ্রে ম্যাজিস্ট্রেটের সাথে দুর্ব্যবহার কুষ্টিয়ার সেই এসপির, বিচার গেল আদালতে

প্রকাশিত: ১২:১৪ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২০, ২০২১

কোন প্রমান ছাড়াই আলেম ওলামারা ভাস্কর্য ভেঙ্গেছে দাবি করে চরম ঔদ্ধত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে সমালোচিত হওয়া কুষ্টিয়া জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম তানভীর আরাফাতের নামে ভোটকেন্দ্রে অনিয়মকারী প্রিসাইডিং অফিসারকে বাঁচাতে জেলার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহসিন হাসানের সঙ্গে দুর্ব্যাবহারের অভিযোগ উঠেছে।

লিখিত আকারে সে অভিযোগ যাচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে।

এসপি তানভীর আরাফাতের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা একটি আবেদনের কপি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

এর অনুলিপি আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের আইজির দফতরেও পাঠানো হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৯ জানুয়ারি) রাতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবর আবেদনের অনুলিপি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

আরও পড়তে পারেন :

কুষ্টিয়ার এসপি তানভীরের বক্তব্যের কঠোর প্রতিবাদ ইসলামী আন্দোলনের

কুষ্টিয়ার এসপি তানভীরের বহিস্কার চায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ

পুলিশি পোশাকে গুন্ডার মত কথা বলছে কুষ্টিয়ার এসপি : মামুনুল হক

আবেদনে কুষ্টিয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহসিন হাসান বলেন, ‘কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পৌরসভা নির্বাচনে ১৪ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হই।

এরপর ১৬ জানুয়ারি আমার দায়িত্বপালন অবস্থায় সকাল ১০টায় ভেড়ামারা পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে অবস্থানকালে জনৈক ভোটারের অভিযোগের ভিত্তিতে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করি।

সেখানে কতিপয় ব্যক্তিকে ভোটকেন্দ্রের বুথের ভেতর লম্বা বেঞ্চে পোলিং এজেন্টদের সঙ্গে বসে থাকতে দেখি। তখন তাদের পরিচয়পত্র দেখাতে বললে তারা পরিচয়পত্র না দেখিয়ে প্রিসাইডিং অফিসারের স্বাক্ষরিত এ-ফোর সাইজের কাগজ দেখান।’

‘আমি সংশ্লিষ্ট প্রিসাইডিং অফিসারকে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বুথের বাইরে ডাকি। কথা বলা শুরু করতেই ওই ভোটকেন্দ্রে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাতসহ ৪০-৫০ জন ফোর্সসহ প্রবেশ করেন। তিনি প্রবেশ করেই প্রিসাইডিং অফিসারকে উচ্চস্বরে তলব করেন।

তাৎক্ষণিক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমানসহ কয়েকজন ফোর্স প্রিসাইডিং অফিসারকে আমার সাথে কথা বলতে না দিয়েই তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপাচাপি করেন। তখন আমি নিজের পরিচয় দিয়ে বলি প্রিসাইডিং অফিসারের সাথে একটি বিষয়ে কথা বলছি। কথা শেষ হলে উনাকে নিয়ে যান। এরপরও এএসপি মোস্তাফিজুর রহমান ধমক দিয়ে প্রিসাইডিং অফিসারকে আমার সামনে থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ সুপার তানভীর আরাফাত আমার দিকে অগ্রসর হন এবং আমাকে জিজ্ঞেস করেন আপনি কে? কী করেন এখানে?’

‘আমি আমার পরিচয় দিলে তিনি (তানভির আরাফাত) আরও ক্ষিপ্তস্বরে বলেন, ‘আপনি এখানে কী করেন? বেয়াদব, বের হয়ে যান এখান থেকে।’

আমি পুলিশ সুপার ও তার ফোর্সদের আক্রমণাত্মক চরম অসৌজন্যমূলক ও মারমুখী আচরণে হতচকিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকি।

এরপর এসপিসহ তার সঙ্গী ফোর্সরা আমার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে উদ্দেশ্য করে একাধিকবার বলেন, এসব লোককে পাঠায় কে? বেয়াদব ছেলে। এখানে কাজ কী আপনার? বের হয়ে যান এখান থেকে। তারা কেন্দ্র থেকে চলে যাওয়ার পর আমি বিষয়টি ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করি।’

আবেদনে বলা হয়েছে, ‘পুলিশ সুপার ও তার সঙ্গী ফোর্সদের আচরণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিধিমালা ২০১০ এর ৬৯,৭০,৭৪,৮০ ও ৮১ বিধির সরাসরি লঙ্ঘন। তাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রার্থনা করছি।’

প্রসঙ্গত : কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বাঘা যতিনের ভাস্কর্য ভাংচুরের ঘটনায় কোনো তথ্য প্রমান ছাড়াই কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম তানভীর আরাফাত বলেন, মৌলবাদীদের এদেশে দরকার নেই। আমার বাবার জানাজা আমি নিজেই পড়াতে পারবো। আমি ৪ বার কুরআন খতম করেছি। নিয়মিত নামাজ পড়ি। সুতরাং দেশের সংবিধান মেনেই আপনাকে এদেশে থাকতে হবে। যদি সংবিধান না মানেন তাহলে আপনাদের জন্য তিনটি অপশন।

‘এক. উল্টাপাল্টা করবা হাত ভেঙে দেব, জেল খাটতে হবে।

দুই. একেবারে চুপ করে থাকবেন, দেশের স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস নিয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারবেন না।

তিন. আপনার যদি বাংলাদেশ পছন্দ না হয়, তাহলে ইউ আর ওয়েলকাম টু গো ইউর পেয়ারা পাকিস্তান।’

তিনি বলেন, যারা যে উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকুক না কেন, প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্য দল থেকে অনুপ্রবেশকারী কাউকে দলের পদ দেওয়া হলে যেসব নেতা পদ দেবেন, তাদের বিরুদ্ধেও সংগঠন থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অসাম্প্রদায়িক বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে কোনো মৌলবাদী বা দুষ্কৃতকারীর ঠাঁই হবে না।

তার এমন ঔদ্বত্বপূর্ণ বক্তব্য নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে দেশের সুশীল সমাজ থেকে শুরু করে আলেম ওলামাসহ অনেকেই। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ তার এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তাকে বহিস্কারের দাবিও তুলেছে। তবে গতকাল (১৯ জানুয়ারী) কুষ্টিয়ায়  আলেমদের নিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার জনাব মনিরুল ইসলাম বলেন- ‘এটা পুলিশ বাহিনীর কোনও বক্তব্য নয়। এটা ওই কর্মকর্তার নিজস্ব বক্তব্য।’

মন্তব্য করুন