‘ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ’: পুনর্বিবেচনা (প্রথম পর্ব)

ফরহাদ মজহারের কলাম

প্রকাশিত: ১:৪৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৯, ২০২১
ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ। ফরহাদ মজহারের কলাম। ছবি : পাবলিক ভয়েস।

ফরহাদ মজহার : 

শাহবাগ ঘটবার আগে দুই হাজার বারো সালে ‘ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ’বইটি আমি তাড়াতাড়ি শেষ করি। জাগৃতি প্রকাশনী থেকে ফয়সল আরেফীন দীপন ভীষণ ভাবে বইটি চেয়েছিল এবং বারবার তাগিদ দিচ্ছিল। বইটির সঙ্গে দীপনের স্মৃতি জড়িত আছে। কিন্তু ‘ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ’কে ধারণা হিশাবে প্রতিষ্ঠিত করবার ক্ষেত্রে আমার ঘাটতি তখনই আন্দাজ করেছিলাম। সেটা নিতান্তই তাড়াহুড়াজনিত। নিদেন পক্ষে হর্কহেইমার (Max Horkhheimer)আর এডর্নোর (Theodor W. Adorno) ‘কালচারাল ইন্ড্রাস্ট্রি’র আলোকে তথাকথিত মডার্নিটি এবং পাশ্চাত্যের আলোকায়ন প্রকল্পের বিকার নিয়ে আলোচনা জরুরি ছিল। তাহলে ‘ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ’ ধারণার বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতটা বোঝানো সহজ হোত। বাংলাদেশের বিকার আরও স্পষ্ট করা যেত।

জর্মন শব্দটি ছিল Dummheit, ইংরেজি অনুবাদ স্টুপিডিটি, বাংলায় গাধামি, গর্দভগিরি ইত্যাদি। সারকথা হচ্ছে পাশ্চাত্যের আলোকায়ন প্রকল্পকে মুগ্ধ চোখে দেখবার ও আয়ত্ব করবার দিন শেষ হয়ে গিয়েছে। আলোকায়ন প্রকল্প থেকে উৎপন্ন ধ্যান ধারণা আধুনিক কমিউনিকেশান ইন্ডাস্ট্রি — যেমন টেলিভিশান, রেডিও ইত্যাদি,  স্টুপিডিটিতে পর্যবসিত করেছে।

আমরা এখন ডিজিটাল জগতে হাবুডুবু খেতে শুরু করেছি। ইন্টারনেট, ফেইসবুক, টুইটার, গুগল ইত্যাদির মধ্যে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাচ্ছি। তারপর, এখন ‘বিগ ডাটা’র যুগ।

আমাদের চিন্তা, আচার আচরণ, সংস্কৃতি ইত্যাদির মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। প্রশ্ন হচ্ছে তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও তার রাজনৈতিক প্রকাশটা কি হতে পারে? উত্তর:  গাধামি। আমরা স্টুপিড হয়েছি।

কিভাবে বুঝব? কোন বিষয় বিচার বাপর্যালোচনার গভীরে গিয়ে ভাল মন্দ নির্ণয়ের তাগিদ আমরা হারিয়েছি। এনলাইট্মেন্টের এটা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। লোকে যে কথা শুনতে পছন্দ করে সেকথা আমরা বলি, কারন কথাবার্তাও ভোগ্যপণ্য হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশে টেলিভিশিনারের টক শো দেখলে আমরা সেটা বুঝব। কারা কথা বলছে, কী তারা বলছে, কিভাবে বলছে ইত্যাদি কথার ব্যবসা হয়ে উঠেছে। চিন্তা চর্চা থেকে আমরা বিচ্যূত হয়েছি। এই পরিস্থিতি ফ্যাসিবাদের উর্বর ভূমি।  ‘ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ’ এই পরিপ্রেক্ষিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। পরের সংস্করণে আমার কাজ বাড়ল।

বাংলাদেশের আধুনিক ও সেকুলার চিন্তার বিকার অপরিসীম , তার বঙ্গীয় খাসিলত রয়েছে, আলাদা তর্কের বিষয়। যদিও সেটা বোঝা বিশেষ কঠিন না। কিন্তু ইলেক্ট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়া যা বুদ্ধিচররাচ্র শূন্যতা তৈরি করেছে সেটা নতুন এক বাস্তবতা।  পাশ্চত্যের এনলাইটনমেইন্ট বুদ্ধি ও বিচারের যে গৌরব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে তার বিপরীতে ইনফরমেশান টেকনলজি ও ‘কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি’ আমাদের বুদ্ধিমান করে নি, বরং চরম গর্দভে পরিণত করেছে। তাই অনিবার্য ভাবেই হর্কহেইমার ও এডোর্নো আবার আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন।  নতুন টেকনলজি আমাদের চিন্তাচেতনা ও সংস্কৃতির চরিত্র বদলিয়ে দিচ্ছে। ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ তারই ফল।

তাই পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের যুগে কালচারাল ইন্ড্রাস্ট্রিজাত ফ্যাসিবাদকে হিটলার-মুসোলিনির ফ্যাসিবাদ থেকে আলাদা বোঝা দরকার। তেমনি বাংলাদেশে বাকশালী ফ্যাসিবাদ এবং শাহবাগী ফ্যাসিবাদের মিল থাকলেও তারা এক নয়। শাহবাগ ছিল নতুন ডিজিটাল টেকনলজি ও কালচারাল ইন্ড্রাস্টি জাত বঙ্গীয় স্টুপিডিটির চূড়ান্ত প্রদর্শন।

এখন আমাদের হাতে তাহলে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের স্ফীতি ও বিস্তৃতির মধ্যে কমিউনিকেশান ও কালচারাল ইন্ডাস্ট্রি কিভাবে নিত্যদিন আমাদের চিন্তা, চেতনা, সজ্ঞানতা ও জ্ঞানচর্চার চরিত্র বদলে দিয়েছে এবং দিচ্ছে তা পর্যালোচনা করবার হিম্মত দ্রুত অর্জন করা। ডিজিটাল টেকনলজি মানুষের চিন্তাকে হাল্কা, ফ্যাকাশে এবং অগভীর করে তোলে এই তর্ক বিশ্বব্যাপী উঠেছে। ধরুন,কলম দিয়ে খাতায় না লিখে কম্পিউটারের কী বোর্ডে আঙুলে টাইপ করে লেখার চর্চা শরীর ও মস্তিষ্কের বদল ঘটায়। এটা বাস্তবতা। তার মানে  কম্পিউটারে লিখব না, তা নয়। কিন্তু ইন্দ্রিয় ব্যবহারের রূপান্তরের ফলে ঘটে যাওয়া ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে হুঁশিয়ার হয়ে যাওয়া দরকার। যেন আমরা নিজেদের অজান্তে চিন্তা করবার ক্ষমতা হারিয়ে স্টুপিড হয়ে না যাই। ‘ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ’ বইটি তড়িঘড়ি শেষ করতে গিয়ে এইসব বিষয় বিস্তৃত লিখতে পারি নি। সত্যি বলতে কি বিষয়টির গভীরে একনিষ্ঠ হবার ফুরসত হয় নি। দ্বিতীয় সংস্করণে এই অভাব কাটিয়ে ওঠার অঙ্গীকার করেছিলাম,কিন্তু অবসর মেলে নি।

ওপরের কথায় আশা করি পরিষ্কার যে আমার লেখায় ‘ফ্যাসিবাদ’, ‘ফ্যাসিস্ট’ বা ‘ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা’ ইত্যাদির ব্যবহার স্রেফ নিন্দা,তিরস্কার বা গালাগালি অর্থে নয়। যে কালে আমরা বাস করছি,সেই কালের বাস্তবতা অনুধাবনের জন্য জরুরি বর্গ হিশাবেই তাদের ব্যবহার। অন্যান্য দিক ছাড়াও টেকনলজি আমাদের বাস্তব চরিত্র ও অবস্থার যে বদল ঘটিয়েছে এবং রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিশাবে আমাদের অভিমুখের বদল আমাদের অজান্তে কিভাবে ঘটিয়ে দিয়েছে তাকে সঠিক ভাবে চিহ্নত ও বিশ্লেষনের জন্য নতুন বর্গের দরকার হয়ে পড়েছে।

টেকনলজি কিভাবে খোদ মানুষকে বদলায় এবং মানুষের চিন্তার প্রকরণে বদল ঘটায় সেটা তরুন বয়সে মার্শাল মাকল্যুহানের (Marshal Mcluhan) বইপত্র পড়ে  কিছুটা বুঝেছি। শাহবাগের সময় আমার মনে হয়েছে কিভবে টেলিভিশান এবং সোশ্যাল মিডিয়া মিলে দ্রুত এক দল শহুরে ছেলেমেয়ে তৈরি হয়েছে যারা একমাত্র নিজেদেরকেই ‘তরুণ প্রজন্ম’ মনে করে, আর কাউকে তারা ‘মানুষ’ গণ্য করে না। কোর্তাপরা টুপিওয়ালা হলে কোন কথা নাই।  তাদের কাছে ঢাকা শহরের বাইরে বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠির মধ্যে আর কোন ‘তরুণ’ নাই। টুপি-কোর্তা পরা গ্রামের তরুণ তাদের কাছে গ্রাহ্য নয়। তারা ভেজিটেবল। বিশেষ ভাবে মাদ্রাসার ছাত্র কোন ভাবেই ‘তরুণ প্রজন্ম’ হতে পারে না। টেলিভিশান এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় যেভাবে ‘তরুন প্রজন্ম’ হঠাৎ পয়দা হয়ে গেল সেটা ডিজিটাল টেকনলজি, পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়ন এবং মার্কন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়ুথ লিডার তৈরির কর্মসূচি না বুঝলে বোঝা যাবে না। বলাবাহুল্য, শাহবাগ বাংলাদেশের খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

শাহবাগী ফ্যাসিবাদ বাকশালের পূর্বানুবৃত্তি নয়। এই ডিজিটাল ফ্যসিবাদ ‘তরুণ প্রজন্ম’ নামক নতুন দেবতাদের হাজির করলো । সারা দেশের জনগণকে বিপুল মিডিয়া কভারেজ দিয়ে বোঝানো হোল ‘তরুণ প্রজন্ম’ই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এবং শেখ হাসিনা একাত্তরের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীর প্রতি বিন্দু মাত্র সদয় হবার চেষ্টা করলেও করতে পারেন। কিন্তু তথাকথিত শহুরে ‘তরুণ প্রজন্ম’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে কোন মূল্যে বাস্তবায়িত করবে। অর্থাৎ একাত্তরে মানবতার বিরুদ্ধে অভিযুক্তদের তারা ফাঁসি দেবেই দেবে। এই প্রথম আমরা দেখলাম বিচারের অর্থ হচ্ছে যে কোন মূল্যে অভিযুক্তদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো। এমনকি যাব্জজীবন শাস্তির রায়কে ফাঁসির রায়ে পরিবর্তন করবার জন্য খোদ আইনের বদল। শাহবাগ চত্বরেরও নতুন নাম হোল:‘প্রজন্ম চত্বর’।

সাংস্কৃতিক দিক থেকে শাহবাগের বেশ কিছু মৌলিক অবদান রয়েছে যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে থাকবে। সেটা হোল মোমবাতি জ্বালিয়ে ফাঁসির দাবি তোলা। মোমের আলো দয়া,ক্ষমা, ঔদার্য, প্রার্থনা ও মানুষের সঙ্গে মানুষের বিনষ্ট সম্পর্ক আবার নতুন করে জোড়া দেবার সম্ভাবনার প্রতীক। বিস্ময়কর যে শাহবাগে মোমের আলো তার চিরাচরিত প্রতীকী ব্যঞ্জনা হারিয়ে ভয়ংকর রূপ পরিগ্রহণ করেছিল। এই এক পরাবাস্তব পরিস্থিতি! যেখানে সারা দুনিয়ায় ‘ফাঁসি’ বা Capital Punishment-এর বিরুদ্ধে প্রবল জনমত তৈরি হয়েছে সেখানেবাংলাদেশে মোমবাতি জ্বালিয়ে ‘ফাঁসি’র দাবি তোলা হচ্ছে। কারা তুলছে? ‘তরুণ প্রজন্ম’। এই দিকগুলো আমাকে স্তম্ভিত করেছিল এবং ফ্যাসিবাদের নতুন চেহারাকে তখন থেকেই নৈর্ব্যক্তিক ও ঐতিহাসিক ভাবে বোঝা আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে শুরু করি।

বলাবাহুল্য আমি শাহবাগের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। ফলে শাহবাগীদের কাছে নিন্দিত হয়েছি। শাহবাগের সময় আমাকে কুৎসিত ভাবে সোশ্যাল মিডিয়া কিম্বা পত্রপত্রিকায় যারা গালিগালাজ করেছেন তাদের অনেকেই আমার একদার বন্ধু, অনেকে স্নেহভাজন। কিন্তু কারো বিরুদ্ধে আমার কোন ব্যক্তিগত ক্ষোভ নাই। স্নেহভাজন সলিমুল্লাহ খান সেই সময় অতি চেনা টিভি শোতে শাহবাগ আন্দোলনকে আমি ফ্যাসিবাদ হিশাবে কেন চিহ্নিত করেছি তার জন্য নিন্দামন্দ করেছেন। ভাল করেছেন, কারন কথাটা সত্য। বুঝেছি, ফ্যাসিবাদ এবং ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণায় আমাদের গভীর পার্থক্য আছে। আমি তাকে দোষ দেব না, কারণ এই পার্থক্য কেন তৈরি হোল সেটা বোঝাটাই আসল কাজ। তার অন্যায় ও হিংস্র  ক্লিপগুলো এখনও বাজানো হয়। আমার ভাল লাগে, কারন সবই আগামি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

সেই সময় আমাকে রাষ্ট্রীয় ভাবে শাস্তি দেবার জন্য অধ্যাপক ডক্টর সলিমুল্লাহ খান এটিএন নিউজ, একাত্তর ও অন্যান্য  টিভির সঙ্গে মিলেঝুলে অনেক প্রপাগান্ডা করেছেন। সেই সবও আমি গ্রাহ্য করি না। আমাদের দেশের ধর্ম প্রাণ সরল মানুষের ভাষা ধার নিয়ে আমি শুধু বলব, ডিজিটাল মিটিয়া ও সলিমুল্লাহ খানের হিংস্রতার মুখে সাধারণ মানুষের দোয়ায় আমি এখনও বেঁচে আছি। কিন্তু তার অভিযোগ আমি অস্বীকার করি না। তার অভিযোগ বরং আমার জন্য গৌরবের। আমি ও মাহমুদূর রহমান শাহবাগকে বাঘের বাচ্চার মতোই রুখে দেবার প্রাণপণ চেষ্টা করেছি। তিনি স্বীকার করতে বাধ্য হবেন, আমরা ব্যর্থ হই নি।

ইতিহাস নিজেই অনেক কিছু স্পষ্ট ও মীমাংসা করে দেয়। ফলে এইসব নিয়ে আমার কোন পিছুটান নাই। শাহবাগ রুখে দেওয়া একই সঙ্গে ছিল ভারতীয় আগ্রাসনের আরেকটি ধরন বা রূপকে রুখে দেওয়া। আমার প্রমাণ করার দরকার ছিল হাতে গোনা শহরের কিছু তরুণ বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করে না। আসল ‘তরুণ প্রজন্ম’অন্যত্র। এতোটুকু বাস্তবে প্রমাণ করা আমার দিক থেকে সেই সময় যথেষ্ট ছিল।

হেফাজতে ইসলামের বিস্তর সমালোচনা করা যায়, করেছি, করব। কিন্তু হেফাজতে ইসলাম প্রমাণ করে দিয়েছে তথাকথিত ব্লগার ও একটিভিস্ট এবং তাদের সমর্থকরা ছাড়াও সারা বাংলাদেশ বিপুল এক ‘তরুণ প্রজন্ম’ পড়ে আছে, যারা আগামি ইতিহাস সৃষ্টির কর্তা। আমার কাজ হচ্ছে একদিকে তাদের আবির্ভাবের শর্ত তৈরি করা এবং একই সঙ্গে তাদের কর্তাসত্তাকে সার্বজনীন বিপ্লবী চরিত্র দান করা। তারা যেন ভুল ভাবে ফ্যাসিস্ট বাঙালি জাতিবাদের প্রতিক্রিয়ায় ইসলামকে পাল্টা সাম্প্রদায়িক এবং জাতিবাদী ফ্যাসিস্ট মতাদর্শে পর্যবসিত না করে তাকে আগাম রুখে দেওয়া।  জাতিবাদী ইসলাম একই বাঙালি  জাতিবাদি মূদ্রার অন্য পিঠ।

ইসলাম আমার কাছে স্রেফ একটা পরিচয়বাদী আধুনিকজাতিবাদী  উৎক্ষেপ না। ইসলাম মানুষকে আল্লার খলিফা, অর্থাৎ দৈবগুণ সম্পন্ন রুহানি সত্তা হিশাবে ঘোষণা দিয়ে  মানুষের মহিমা যেভাবে ঘোষণা করেছে সেই স্তরে পাশ্চাত্যকে পৌঁছতে ফরাসি বিপ্লব অবধি অপেক্ষা করতে হয়েছে। ইসলাম সেই মহিমাকে নিছকই ধর্মতত্ত্ব হিশাবে হাজির করে নি, সেই মহিমার রাজনৈতিক রূপ ও প্রকাশ কি হতে পারে সেটা মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কিন্তু যে কোরেশদের দম্ভ রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছেলে সেই গোত্রবাদী কোরেশী দম্ভ আজ ইসলামের পথ রুদ্ধ করে দাঁড়িয়েছে। মানুষের এই গৌরব ও  মহিমা কায়েমের কর্তব্যকে আদর্শিক ভাবে বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ ও বোঝা আমার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শুধু তাই নয়, মানুষের গৌরব ও মহিমাকে রাজনৈতিক ভাবে বাস্তবায়নের সঠিক পথ ও পন্থা  সাধ্য মতো নিজে বোঝা এবং জনগণকে ধরিয়ে দেওয়াই ামি বাংলাদেশে এখনকার প্রধান কাজ বলে গণ্য করি। ইসলাম জাতিবাদ কিম্বা কোন প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, গোত্রবাদ, রক্তবাদ, পরিবারতন্ত্র  বরদাশত করে না। ইসলাম বাঙালি জাতিবাদীদের মতো কোন ভূখণ্ডের পূজাও করে না। সেই আলোকে বাংলাদেশের জনগণকে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবার অভিমুখ স্পষ্ট করে তোলাই এখনকার প্রধান রাজনৈতিক কর্তব্য। তার জন্য পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য যে আদর্শিক স্পষ্টতা আমাদের চিন্তায় ও কাজে আয়ত্ব করবার কর্তব্য রয়েছে আমি তা যথাসাধ্য পালন করে যাচ্ছি। অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান অভিযোগ করেছেন মাহমুদুর রহমান ও আমি ইসলামপন্থিদের,বিশেষত হেফাজতে ইসলামকে ‘উস্কানি’দিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, খুবই বড় একটা কাজ করতে পেরেছি আমরা । আমাদের কাজ বাংলাদেশের সত্যিকারের তরুণ প্রজন্মের আবির্ভাবের বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আদর্শিক শর্ত তৈরি করা। সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশের ‘তরুণ প্রজন্ম’ আসলে কারা তাদের চিনিয়ে দেওয়া ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সফল রাজনৈতিক অর্জন।

কিন্তু আরও বড় জিজ্ঞাসা আমার তৈরি হয়েছে। শাহবাগে যারা গিয়েছেন, যোগ দিয়েছেন, তাদের কাউকেই ব্যক্তি হিশাবে নিন্দা, সমালোচনা কিম্বা ভালমন্দের সার্টিফিকেট দেওয়া আমার কাজ না। সেই অধিকার আমার আছে বলে আমি মনে করি না। সেটা ইতিহাসের দায়, সমাজের বিবেচনা। তাই, আবারো বলি, ব্যক্তি হিশাবে কারো বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নাই। স্নেহভাজন সলিমুল্লাহ খানের বিরুদ্ধেও আমার কোন অভিযোগ নাই। তাকে সবসময় স্নেহ করে এসেছি, আগামিতেও করব। তার শুভবুদ্ধির উদয় হোক। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী হওয়া এবং ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার পক্ষাবলম্বক করার মধ্যে অবাক হওয়ার কিছু নাই। এটা শুধু বাংলাদেশের নয়, এটা বৈশ্বিক বাস্তবতা। ব্যক্তিকে দোষারোপ না করে কংক্রিট বাস্তব পরিস্থিতিকে ঠিক ভাবে বিশ্লেষণ, বোঝা এবং নিজেদের কর্তব্য নির্ণয় করতে পারাই আসল কাজ। যারা শাহবাগে গিয়েছেন তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন, তাদের সংখ্যাও কম নয়। তাই মানুষ নিজের ভুল বুঝবে না এটা আমি মনে করি না। মানুষ ভুল করে, কিন্তু ভুল ধরতে পারলে নিজেকে শোধরাবার ক্ষমতাও মানুষের ধারণ করে।

তাই ব্যক্তি না, বরং আমাদের কাজ হওয়া উচিত বাংলাদেশে ‘তরুণ প্রজন্ম’ নামক শহুরে ফ্যাসিস্ট প্রজন্ম কোন বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে এবং কিভাবে তৈরি হোল তাকে আরও গভীর ভাবে বোঝা। শাহবাগে অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান তাদেরকেই বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এই বোঝাবুঝি সততার সঙ্গে সম্পন্ন করা দরকার , যেন ফ্যাসিবাদ এবং ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আগামি দিনে লড়াই চালিয়ে নেবার জন্য আমরা ভালো ভাবে প্রস্তুতি নিতে পারি। বাংলাদেশের বাস্তবতা উপলব্ধির মধ্য দিয়ে নিজেদের ভুলত্রুটি  কাটিয়ে উঠে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আমাদের দল ভারি করতে পারি।

এই কর্তব্যের আলোকেই টেলিভিশান এবং ডিজিটাল টেকনলজি আমার গভীর আগ্রহের বিষয়। কিভাবে মিডিয়া ফ্যাসিস্ট বুদ্ধিজীবি বা প্রপাগান্ডা নায়কদের বানায়, তৈরি করে, তাকে একটা  নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়া হিশাবে বোঝা দরকার।  কিভাবে বাংলাদেশে এমন তরুণদের উৎপত্তি ঘটল যারা প্রবৃত্তি পরায়ন, স্মৃতিভ্রংশ, হিংস্র, আবেগ ও ইতিহাসের সম্বন্ধ সম্পর্কে অজ্ঞ ? যারা নয় মাসের যুদ্ধের মধ্যেই বাংলাদেশের ইতিহাস সমাপ্ত বলে গণ্য করে? শাহবাগে আমরা এমনই এক শহুরে ‘তরুণ প্রজন্ম’কে দেখলাম যাদের আগেপিছে কিছু নাই। ভেবেছিলাম নিদেন পক্ষে আঠারোশ’ সাতান্নর সিপাহি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে যে লড়াই শুরু হয়েছিল সেটা তারা পাঠ্যপুস্তকে হলেও পড়েছে। ইংরেজের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকদের সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামের ধারাবাহিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আরও বৃহৎ পরিসরে নিজেদের ভূমিকা কল্পনা করবার ক্ষমতা তাদের আছে। শুধু বাংলাদেশকে নয় পুরা উপমহাদেশের নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা অর্জনের সংকল্প তাদের মধ্যে থাকা মোটেও অতিরিক্ত কিছু চাওয়া নয়। শুধু তাই নয়, সারা বিশ্বের মানুষকে নতুন পথ দেখাবার সংকল্প তাদের থাকা উচিত।

আমি বিশ্বাস করি আমামদের এখনকার সীমাবদ্ধতা আমরা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে পারব। কেন এই তরুণ প্রজন্ম গড়ে উঠল তাকে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম ও ডিজিটাল টেকনলজির জায়গা থেকে বোঝা দরকারি কাজ। তাহলে ‘ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ’ ধারণাটিও পরিচ্ছন্ন হবে। তথ্য হিশাবে মনে রাখা দরকার সেই সময় ইমরান সরকার ফেইসবুকে Blogger Online Activist Network নামে একটি ফেইসবুক গ্রুপ খোলে এবং সেই নেটওয়ার্কের তরফে শাহবাগে একটি প্রতিবাদের আয়োজন করা হয়। শাহবাগ ফেইসবুকে অর্থাৎ সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়েই রূপ লাভ করে। বাংলাদেশের জন্য এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কাদের মোল্লাকে ফাঁসি না দিয়ে কেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হোল তার জন্য মানব বন্ধন ও প্রতিবাদের ডাকে সাড়া দিয়ে শাহবাগ বা তথাকথিত ‘প্রজন্ম চত্বর’ গড়ে উঠেছিল। এই ধরণের প্রতিবাদ সাধারণত সাময়িক হয়,পত্রিকায় খবর হয়। কিন্তু দেখা গেল ব্লগার অনলাইন এক্টিভিস্ট-এর ডাক ধীরে ধীরে একটা বিশাল জমায়েতের রূপ নেয়। টেকনলজি, বিশেষত টেলিভিশান, মোবাইল ফোন, সোশ্যাল নেটওয়ার্কের প্রবল একটা ভূমিকা আছে,তাকে আমলে না নিলে আমরা শাহবাগ পুরাপুরি বুঝব না। সেই বোঝাবুঝি পরিষ্কার হলে ‘ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ; কিভাবে বাকশালী ফ্যাসিবাদ থেকে আলাদা সেটাও আমরা ভালভাবে বুঝব। (চলবে)

লেখক : কবি, কলামিস্ট, লেখক, ঔষধশাস্ত্রবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বুদ্ধিজীবী, সামাজিক ও মানবাধিকার কর্মী এবং পরিবেশবাদী।

[‘ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ’ শিরোনামের ফরহাদ মজহারের প্রতিটি লেখাই পাবলিক ভয়েসের মতামত কলামে প্রকাশিত হবে।]

মন্তব্য করুন