রাষ্ট্রশক্তিকে ‘প্রতিপক্ষ’ বানিয়ে মোকাবেলা করার সামর্থ্য কতটুকু আমাদের?

প্রকাশিত: ২:১৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৭, ২০২১

মুফতী মনোয়ার হোসেন : 

আল্লামা আহমাদ শফী রহ.-এর পূর্বাবর দেশের কওমিপন্থী আলেমদের ইসলাম চর্চার বিবিধ রুপ দেখা গেছে।  জাতীয় রাজনীতি ও আলোচনায় ইসলামপন্থী হিসেবে জামাআতে ইসলামীকে দেখা/দেখানো হলেও ২০১০ সালের পর থেকে সেটা অন্যরকম হয়ে যায়।

ভূ-রাজনৈতিক স্ট্রাটেজিকের গ্যারাকলে জামাতকে আটকে ফেলা হয়। উত্থান ঘটে নিরিহ শ্রেণী কওমি আলেমদের – যাদেরকে মিডিয়াসহ রাষ্ট্রের কী-পয়েন্টগুলো খুব বেশি চিনতো না এর আগে।

২০ ১৩ সালে শাহবাগীদের  ইসলামবিরোধী অ্যাকটিভিটির অনিবার্য কাঙ্খিত  ফলাফল হিসেবে আবির্ভাব হয় কওমী মাদরাসাকেন্দ্রিক হেফাজতে ইসলামের।

অখ্যাত আল্লামা আহমাদ শফী (রহ.) পরিচিতির শীর্ষে চলে আসেন। সংগঠিত হয় শাপলা বিদ্রোহ। ফলাফল অজানা নয়। শাপলা পরবর্তি পলিসি বা সংগঠনের অভ্যন্তরীন বিষয়ে পরিবর্তন আসে। সরকারের সাথে সংঘাতে না জড়িয়ে সরকার ও হেফাজত সহাবস্থানে থেকে উভয়ে নিরাপদে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছিল। আল্লামা আহমাদ শফী রহ. এর ইন্তেকালের পরক্ষণেই এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।

সরকারের ফ্যাসিস্ট আচরণে জনমানুষের মনে মনে ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক এবং সেটা আছে। এমতাবস্থায় উলামায়ে কিরামের যুব নেতৃত্ব মূর্তিকেন্দ্রিক জটিলতায় সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনায় মুখর হয়।

জবাবে সরকার যথেষ্ট রকম ছাড় দিয়েছে বলা চলে-কারণ, সরকার ইতিপূর্বে বিরোধী মতকে যথেষ্টরকম নির্দয়ভাবে দমন করেছে কিছুই হয় নি। পাবলিক ঘরের কোণে চুপ থেকে দৃশ্য দেখেছে। মধ্য রাতে ভোটের প্রহসন করে ক্ষমতা ডাকাতি করে নিয়েও তারা বৈধতার সাথে বহাল তবিয়তে আছে। সেই সরকার যে কোন বিরোধীমতকে সর্বোচ্চ শায়েস্তা করলে কেউ কিছু যে করার ক্ষমতা রাখে না দেশবাসী তা দেখেছে সুতরাং যারা সরকারবিরোধী উচ্চকণ্ঠ তাদেরকে জেলে বা ফাঁসিতে তুললে আপাতত আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া ছাড়া কিচ্ছু করার আছে?

এদেশের জনতা আবেগি। মাহফিলে ঠিইইক কি’না, জিজ্ঞেস করলে সাপোর্ট করবে ’ঠিইইক’ বলে। এরপর তারা নেই, ঘুমিয়ে ফজর কাজা করা শ্রোতা এরা।  জামাআতে ইসলামের মরহুম কামরুজ্জামান সাহেব বলেছিল ‘ধরে দেখুকতো’ উনাকে শেষে ধরে ফাঁসি দিয়েছে। রগকাটা, ক্যাডার বলে খ্যাত তাদের দলের লোকরা কিছুই করতে পারে নি। কিছুই হয় নি। এটাই ক্ষমতা।

এখন একশ্রেণীর বক্তা ও গণতান্ত্রিক ইসলামিক নেতারা কথায় কথায় সরকারকে হুমকি দেয়, বঙ্গপোসাগরে ভাসিয়ে দেয়। আচ্ছা বলুনতো, এসকল নেতাদের সরকার জেলে পুরলে কে বাধা দেবে? কে জীবন নিয়ে তাদের প্রতিবাদ করবে? দেলোয়ার হোসেন সাইদী সাহেবকে মুক্তি দেয়ার জন্য সরকারের কাছে অনুনয় করতে হচ্ছে না? হচ্ছে। কিন্তু আমরা আমাদের চালান কতটুকু তা বুঝি না।

গ্রামে-গঞ্জে ছোট ছোট মাদরাসা গড়ে উঠেছে। কিছু না হলেও কুরআনুল কারীমের চর্চা হচ্ছে নিয়মিত। সরকারের সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও  এ সকল প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করতে পারছে। এগুলোকে সরকার অনুমোদন দেয়নি? কিছু গরম বক্তৃতা দেয়ার মাধ্যমে গ্রামে গঞ্জের এ মাদরাসাগুলো অর্থনৈতিক ঝুকিতে পড়েছে এবং নিয়মিত অনিরাপত্তায় ভুগছে। ইতিমধ্যে, বিভিন্ন মাদরাসা,উলামায়ে কিরাম হামলার শিকার হয়েছে। এ মাদরাসাগুলোর নিরাপত্তা দেবার জন্য, তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কে আছে? কারা এগুলোর অভিভাবকত্ত নেবে?

এ সকল মাদরাসাগুলোর কোন অভিভাবক আছে? আক্রান্ত হলে কেউ তার দায়িত্ব নিয়ে কথা বলে? যার যার মত করে বাঁচতে হয়, মাদরাসা পরিচালনা করতে হয়।

হয়তো বলবেন, আপোষকামী কথা বলছি- গ্রাউন্ডে থেকে এমন অবস্থায় থেকে কথা বলবেন। যদি সরকারের সাথে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন তবে তার স্ট্রাটেটিজ প্ল্যান বলুন। কে কোন এলাকার নেতৃত্ব দেবে, কী কী সিদ্ধান্ত হবে আপনারা জানান। অযথাই নিরীহ ছাত্র-শিক্ষকদের এভাবে অভিভাবকহীন করে বিপদে ফেলবেন না। যারা শাপলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন, আহত নিহত হয়েছে তারা জানেন নেতৃবৃন্দ কী ভুমিকা পালন করেছেন।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি মাথায় রেখে এগুতে হবে। পাম্পেও (আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী) বলেছে, বাংলাদেশে আলকায়েদা আছে। এ বক্তব্যর গভীরতা মাপার পররাস্ট্রনৈতিক প্রাজ্ঞতা আমাদের আছে? ভবিষ্যত কী অপেক্ষা করছে? এভাবে আজ এ বক্তব্য, এরপর আরেক বক্তব্য দেবে। এরপর তারা তাদের সামরিক মিশন বাস্তবায়ন করবেন। কোন চিল্লাচিল্লিতে কাজ হবে না। দেশের মানুষকে আগে থেকেই আমাদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে রাখলে পরিণতি কোন দিকে যাবে আল্লাহ জানেন। আর এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, মাইক পম্পেওরা আওয়ামিলীক ও বিএনপিকে ‘আলকায়েদা’ মনে করে না। হুজুররেদকেই মনে করে। অতএব সাধু সাবধান।

সাবধানতার পাশাপাশি ৬৮ হাজার গ্রামকে উন্নত করবার রোডম্যাপ গ্রহণ করি। এমন একটি গ্রাম আছে যেখানে একজন হুজুর বা আলেম নেই? সেখানে কেন কাজ হবে না? আমাদের লোক আছে, অবকাঠামো মসজিদ আছে। এগুলোকে সমাজ উন্নয়নের জন্য কাজে লাগাই। নেতৃত্ব সে কথাই বলুক। একটি শান্তিপূর্ণ দেশে আমাদের প্রজন্ম নিঃশ্বাস ফেলতে পারুক সেটার প্রত্যাশায়।

আল্লাহ আমাদেরকে ঈমানের শক্ত কঠিন পথের প্রস্তুতি গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন।

মন্তব্য করুন