শৈশবে ইসলামী শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

প্রকাশিত: ৬:৩৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৮, ২০২১

একজন শিক্ষক হওয়ায় এবং ইসলামী স্টাডিজের শিক্ষক হওয়ায় প্রায়ই শিক্ষার্থীদের একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়—স্যার! এ কাজ করা ঠিক হবে? তাদের প্রশ্নের উত্তরে সাধারণত আমি বলি, ‘কাজটি করা ভালো’, ‘কাজটি করা যেতে পারে’, ‘কাজটি করা উচিত’ অথবা ‘কাজটি করা অনুচিত’, ‘করা ঠিক নয়’ ‘নৈতিকতা পরিপন্থী’ ইত্যাদি। কিন্তু এ সময়ের অনুসন্ধিত্সু শিশুরা এতটুকুতে সন্তুষ্ট হতে পারে না। তারা প্রশ্ন করে ‘স্যার!

ইসলামের দৃষ্টিতে, কোরআন-হাদিসের আলোকে কাজটি কিরূপ? শিক্ষা-সচেতনতার অগ্রগতির কারণে শিশুদের কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি এবং তারা জানে ইসলাম পালনে অনুসন্ধানের প্রয়োজন আছে। প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামী শিক্ষা ছাড়া এসব শিশু কিভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও জিজ্ঞাসার উত্তর লাভ করবে?

আমার ও আমার শিক্ষক বন্ধুদের অভিজ্ঞতা হলো প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সাধারণ মোটিভেশনের তুলনায় শিশুরা ধর্মীয় অনুপ্রেরণাটি বেশি গ্রহণ করে। কেননা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম বা শুধু নৈতিকতার প্রশ্নে শিশুদের লক্ষ্য থাকে ফাঁকি দেওয়া বা এড়িয়ে যাওয়া।

কিন্তু যখন তাদের সামনে ইসলামী আদেশ-নিষেধ হিসেবে কোনো কিছু উপস্থাপন করা হয়, তখন পরকালীন জবাবদিহির বিষয়টিও তাদের সামনে থাকে। পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো উপদেশ দেওয়া হলে ছাত্র-ছাত্রীরা তা যতটা মেনে চলে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কিছুর গুরুত্ব তুলে ধরা হলে তারা বেশি আগ্রহী হয়।

প্রবন্ধ, কবিতা, গল্প, উপন্যাস পড়ানোর মাধ্যমে, বিভিন্ন বৈষয়িক সাবজেক্টের পাঠ্যসূচিতে নৈতিক শিক্ষাসংশ্লিষ্ট পাঠগুলো অন্তর্ভুক্ত করে, মনীষীদের জীবনী পড়ানোর মাধ্যমে শিশুদের নৈতিক শিক্ষা প্রদান সম্ভব। তবে ইসলামী শিক্ষা তার চেয়ে বহু গুণ বেশি ফলপ্রসূ।

ইসলামী শিক্ষার বহুবিধ কল্যাণের মধ্যে একটি হচ্ছে, এ শিক্ষা শিক্ষার্থীদের মধ্যে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে। তাকওয়া এমন একটি গুণ, যা অর্জিত হলে মানুষ সর্বদা আল্লাহর উপস্থিতি অনুভব করে।

সেই অনুভবের কারণে সে কোনো অন্যায় কাজ করার সাহস পায় না। সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে যাবে মনে করে মানুষ সাধারণত সিসি ক্যামেরার সামনে বসে অন্যায় কাজ করে না। তাকওয়া মানুষের মধ্যে এই চেতনা জাগিয়ে তোলে।

আল্লাহর ক্ষমতা সিসি ক্যামেরার চেয়ে কোটি গুণ বেশি। সিসি ক্যামেরা শুধু মানুষের বাহ্যিক চলাফেরা, নড়াচড়া, গতিবিধি ধারণ করতে পারে। আর আল্লাহ গোপন-প্রকাশ্য, আলো-অন্ধকারের সব কিছু জানেন ও দেখেন। তাঁকে ফাঁকি দেওয়ার কোনো উপায় নাই।

আল্লাহভীরু মানুষ অন্যায় কাজ করা দূরের কথা, অন্যায়ের চিন্তাও করে না। কারণ সে জানে, নিশ্চয়ই শ্রবণ, দর্শন এবং অন্তরের চিন্তা সম্পর্কেও তাকে একদিন জিজ্ঞাসিত হতে হবে, শাস্তি পেতে হবে।

যেসব অনাচারের কারণে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে এত অশান্তি; যেমন—চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, ব্যভিচার, ধর্ষণ, ওজনে কম দেওয়া, খাদ্যে ভেজাল দেওয়া, মাতা-পিতার অবাধ্যতা, সুদ খাওয়া, ঘুষ আদান-প্রদান করা, নারী নির্যাতন করা, গিবত-চোগলখুরি, ধূমপান, মাদকাসক্তি ইত্যাদি অপরাধ দমনেও আল্লাহভীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

শৈশব ও কৈশোরের শিক্ষা মানুষের মনস্তত্ত্ব ও চিন্তা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শৈশবে সুশিক্ষা না পেলে পরবর্তী জীবনে শিশুর আদর্শ জীবন গঠন সম্ভব নয়। আবার পারিবারিক শিক্ষাও প্রাতিষ্ঠানিক ও জ্ঞানের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না।

বিশেষত বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ হওয়ায় শিশু ও তাদের অভিভাবকদের অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়া প্রায় অসম্ভব। আবার সব অভিভাবকের পক্ষে শিশুর জন্য পৃথক ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব ও আয়োজন করাও সম্ভব হয় না।

স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষাধারা বা মূলধারা বলা হয়। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি এই মূলধারায় তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শ্রেণিতে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের ১০০ নম্বরের ইসলামী শিক্ষা বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে পড়ানো হয়। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য তাদের ধর্মও পড়ানো হয়।

বিষয়টি শিক্ষার্থীদের নিজ ধর্মের প্রয়োজনীয় জ্ঞান লাভ করার পাশাপাশি পরমতসহিষ্ণু ও পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হিসেবে গড়ে তুলছে। তেমনি স্কুল-কলেজে ১০টি বিষয়ের স্থলে ৯টি বিষয় পড়ানো হলে বড় ধরনের ক্ষতি হবে না। কিন্তু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা না থাকলে জাতির যে ক্ষতি হবে তা পূরণ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। ধর্মীয় শিক্ষা চরিত্র গঠনের সর্বোত্তম হাতিয়ার।

এ শিক্ষা না থাকলে জাতি চরিত্রহীন হবে, চরিত্র হারাবে। তাই বলা হয়, হোয়েন ক্যারেক্টার ইজ লস্ট এভরিথিং ইজ লস্ট, অর্থাৎ চরিত্র হারানো মানে সব হারানো।

বর্তমানে ১০০ নম্বরের ইসলামী শিক্ষা দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক আছে, যা যথাস্থানে রাখার বিকল্প নাই। গুচ্ছের আওতায় ফেলায় উচ্চ মাধ্যমিক স্তর থেকে ইসলামী শিক্ষা বিদায়ের পথে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

উচ্চ মাধ্যমিকে ইসলামী শিক্ষাকে শুধু মানবিক বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট করা এবং চতুর্থ বিষয় করার কারণে বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার ছাত্র-ছাত্রীরা পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না। মানবিক বিভাগের গুটিকয়েক ছাত্র-ছাত্রী এ বিষয়টি পড়ছে। কারণ তারা তৃতীয় বিষয় হিসেবে নিতে পারছে না, তাদের পড়তে হচ্ছে চতুর্থ বিষয় হিসেবে। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ইসলামী শিক্ষার কল্যাণকর প্রভাব থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা বঞ্চিত হচ্ছে।

সমাজ ও রাষ্ট্রে দিন দিন সামাজিক অনাচার বেড়েই চলছে ধর্মবিমুখতার কারণে। এমন পরিস্থিতিতে প্রথম শ্রেণি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত সব শ্রেণিতে ১০০ নম্বরের ইসলামী শিক্ষা পড়ানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, বিশেষ করে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে। এই স্তরে দেশ সম্পর্কে জানার মতো কোনো বিষয় পাঠ্যভুক্ত নেই।

এটা অনাকাঙ্ক্ষিত। অনুরূপভাবে ধর্ম সম্পর্কে জানার ব্যবস্থাও নেই বললেই চলে, যা অনভিপ্রেত। অতএব, দেশ ও জাতির কল্যাণে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে ৫০ নম্বরের ধর্মশিক্ষা এবং ৫০ নম্বরের বাংলাদেশ স্টাডিজ—এই মোট ১০০ নম্বরের একটি বিষয় বাধ্যতামূলক হিসেবে সংযোজন করা সময়ের অনিবার্য দাবি।

লেখক: ড. মুহাম্মাদ আল আমীন, অধ্যাপক

আই.এ/

মন্তব্য করুন