নববী আদর্শের সুযোগ্য ওয়ারিশ ছিলেন আল্লামা আশরাফ আলী (রহ.)

প্রকাশিত: ৩:৩০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩১, ২০২০

মুফতি নাজমুল হাসান:

এ যুগের অনন্য মনীষী ঈমান-আমলের জ্যোতিস্নাত শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত বুজুর্গ, হাদিস শাস্ত্রের বিদগ্ধ পন্ডিত, ওয়ারিছে নবী শায়খুল হাদিস আল্লামা আশরাফ আলী (রহ.)৷ জেগে ওঠার একটি প্রেরণা, একটি শক্তি, একটি দুর্দান্ত ইতিহাসের নাম আল্লামা আশরাফ আলী (রহ.)৷ নেককার আলেম পিতা আলহাজ্ব মফিজউদ্দিন (রহ.) ও নেককার মায়ের এই সন্তানের জন্ম ১৯৪১ সালের ১লা মার্চ কুমিল্লার বিজয়পুরস্থ রামচন্দ্রপুর [ইসলামপুর] গ্রামে৷

শিক্ষা জীবন:
শিক্ষার সূচনা হয় পারিবারিক পরিবেশে৷ প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের পর ভর্তি হন মাজহারুল উলূম যশপুর মাদরাসায়৷ তারপর দুই বছর কুমিল্লা শহরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান জামিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলূমে শিক্ষা অর্জন করেন৷ এরপর তৎকালীন ঢাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাদরাসা হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম বড়কাটারায় ভর্তি হন এবং সেখানে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন৷ এরপর উচ্চতর পড়াশোনার জন্য জামিয়া আশরাফিয়া লাহোর পাকিস্তানে চলে যান এবং সেখানে ধারাবাহিকভাবে দুই বছর অধ্যায়ন করেন৷

কর্মজীবন:
পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পর বড়কাটারা মাদরাসার আসাতিযায়ে কেরাম তাঁকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানান এবং বড়কাটারা মাদরাসার শিক্ষক হিসেবে তাঁর নাম লিপিবদ্ধও করা হয়৷ কিন্তু আসাতিযায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে তিনি জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জে যোগ দেন এবং মুসলিম শরীফ প্রথম খন্ডের দরসদানের মধ্য দিয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য হাদিসের খেদমতের অধ্যায় শুরু করেন৷ এখানে দীর্ঘ ৯ বছর শিক্ষকতা করার পর ঢাকা ফরিদাবাদ মাদরাসায় চলে আসেন এবং দীর্ঘ ৮ বছর শায়খে ছানী ও নাজিমে তালিমাতের গুরুদায়িত্ব অত্যন্ত সফলতার সাথে পালন করেন৷ মধ্যখানে তিনি ১৯৭৪-৭৫ সালে বড়কাটারা মাদরাসাতে অধ্যাপনা করেন এবং তিরমিজি শরীফের দরস প্রদান করেন৷

এরপর জামিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলূম কুমিল্লার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম মাওলানা জাফর আহমদ (রহ.) তাঁর মাদরাসার জন্য হযরতকে আনার চেষ্টা করেন এবং মাধ্যম ও সুপারিশকারী হিসাবে হযরত আম্মাজান কে গ্রহণ করেন৷ তিনি তাঁর চেষ্টায় সফল হন এবং এর ফলে হযরত তাঁর মায়ের কথায় ঢাকা ছেড়ে কুমিল্লা কাসেমুল উলূমে চলে আসেন৷ সেই থেকে হযরতের ইন্তেকালের সময় পর্যন্ত মোট ৩৫ বছর যাবত হযরত কাসেমুল উলূমে শায়খুল হাদীস ও ছদরুল মুদাররিসীনের দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করেন৷ এছাড়া জামিয়া শরইয়্যাহ মালিবাগ, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া ঢাকা, জামিয়া আরাবিয়া লালমাটিয়া, দারুল উলুম মিরপুর – ৬, আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া বাইতুল ফালাহ ঢাকা, বনানী টিএন্ডটি মাদরাসা ও মিরপুর দারুস সালাম সহ দেশের আরো অনেক উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি বুখারী শরীফের দরস প্রদান করেন৷

রাজনৈতিক জীবন:
হযরত শায়খুল হাদীস সাহেব ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন৷ কাসেমুল উলূম কুমিল্লায় লেখাপড়ার সময় থেকেই তিনি আল্লামা আতহার আলী (রহ.) এর নেজামে ইসলাম পার্টির সেক্রেটারি ছিলেন এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর নেজামে ইসলাম পার্টিকে সংগঠিত করেন ও কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী হিসেবে নিযুক্ত হন৷ পরে হাফিজ্জী হুজুরের সম্মিলিত জোটে যোগদান করে৷ তারপর কিছুদিন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকার পর শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) এর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে তিনি খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর হিসেবে যোগদান করেন৷ ১৯৭৯ সালে তিনি সংসদ নির্বাচনে নেজামে ইসলাম পার্টির পক্ষ থেকে পার্টির নাম ব্যবহার না করে অংশগ্রহণ করেছিলেন৷

আধ্যাত্বিক জীবন:
সংগ্রামী এই মহাপুরুষ ছাত্রজীবন থেকেই তাসাউফ চর্চায় আত্মনিমগ্ন ছিলেন৷ তিনি থানভী (রহ.) এর বিশিষ্ট খলিফা আল্লামা রসূল খান (রহ.) এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে তাঁর থেকে খেলাফত লাভে ধন্য হন৷ তারপর দারুল উলূম দেওবন্দের আল্লামা ক্বারী তাইয়্যিব (রহ.) এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেন৷ তার মৃত্যুর পর পাকিস্তানের আল্লামা শাহ হাকিম মুহাম্মদ আখতারের হাতে বাইআত গ্রহণ করেন এবং খেলাফত লাভ করেন৷ ২০১০ সালে দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল হাদিস আল্লামা আব্দুল হক আ‘যমী ও দারুল উলূম হাটহাজারীর শায়খুল হাদীস ও সুযোগ্য মহতামিম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.) তাঁকে খেলাফত দান করেন৷

মৃত্যু:
যুগের এই শায়খুল হাদীস ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে ঢাকার আসগর আলী হসপিটালে ইন্তেকাল করেন৷ ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন৷ আজ তাঁর ইন্তেকালের ১ বছর পার হল৷ আমরা তাঁর জন্য দুআ করি – আল্লাহ তা‘আলা যেন তাঁর কবরকে জান্নাতের বাগানে রূপান্তরিত করেন এবং তাঁর হাশর-নশর, হিসাব-নিকাশ সব কিছু সহজ করে দেন৷

লেখক: শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলূম, কুমিল্লা।

এন.এইচ/

মন্তব্য করুন