ইসলামী আন্দোলনের কাউন্সিল : দলের প্রতি বিশেষ একটি খোলা চিঠি

প্রকাশিত: ২:৫৫ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৯, ২০২০

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশেষ লেখক : 

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সবচেয়ে ধারাবাহিক উন্নয়নশীল সংগঠন। বিভিন্ন কারণে বিশেষত : এর ছাত্র শাখার ডাকসু নির্বাচন, করোনায় মানবিক ভূমিকা ও সর্বশেষ দলের ভাস্কর্য বিরোধী কঠোর অবস্থানদ্বিতীয় শীর্ষ নেতা আল্লামা মুফতী ফয়জুল করিমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার সুবাদে এ দলটি সুধী ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের নজর আকর্ষণ করেছে।

বলা চলে স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজ-মাটি থেকে জন্ম নেয়া একমাত্র গণসংগঠনও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

যেহেতু আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর জন্ম পাকিস্তানে। জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও জাতীয় পার্টির জন্ম সামরিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায়। অন্য সংগঠনগুলো “গণসংগঠন” হয়ে উঠতে পারেনি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অনন্য কৃতিত্ব হলো, দেশের রাজনীতিতে নতুন আদর্শিক ধারা তৈরির সক্ষমতা। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বাইরে ইসলামকে দেশ গঠনের স্বতন্ত্র একটি ধারা হিসেবে উপস্থাপন করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। একই সাথে বাংলাদেশের ইসলামপন্থাকে জামায়াতে ইসলামীর নতুন ব্যাখ্যাত “শুধুমাত্র রাষ্ট্রবাদী ইসলাম” থেকে সরিয়ে এনেছে এবং নৌকা-ধান কতৃক নির্বাচনে ইসলামের মতলববাজী ব্যবহারের অসাড়তা সামনে এনে ইসলামকে একক রাষ্ট্রদর্শন হিসাবে উপস্থাপন করেছে।

  • দেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আক্ষরিক অর্থেই ৩য় ধারা তৈরি করেছে। এই ধারা নির্ণয়ে ভোটের হিসেবের চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ হলো আদর্শিক বয়ান দাড় করানো ও ৩য় কোন মার্কা প্রতিষ্ঠা করা।

৩য় কোন আদর্শ ও প্রতিক প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব বোঝা যাবে ভারত, পাকিস্তান, আমেরিকা, বৃটেনসহ অধিকাংশ দেশেই গণতন্ত্রের নামে দ্বি-দলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করে একই মুদ্রাকে পিঠ বদলিয়ে বারংবার জনতার ওপরে চাপিয়ে দেয়ার কৌশল থেকে।

সবমিলিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দেশের, ইসলামের ও মানুষের স্বার্থের পক্ষে একটি কার্যকর অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই অবস্থানই শেষ কথা না। বরং এই অবস্থান হলো “শুরুর সূচনা” মাত্র। এদেশের মানুষকে সত্যিকার মুক্তি এনে দিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে আরো বহুদুর যেতে হবে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান তৈরিতে মুল ভূমিকা হিসেবে কাজ করেছে দলের প্রতিষ্ঠাতা আমীর মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করীম র এর সামগ্রিক মুজাদ্দিদি চিন্তা ও কর্মকৌশল এবং তাঁর সঙ্গী হওয়া নিবেদিতপ্রাণ দক্ষ, কুশলী ও ধী-শক্তি সম্পন্ন একদল মানুষ।

দলের আজকের অবস্থান নির্মাণে তাদের ভূমিকা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে ইনশাআল্লাহ।

  • এই সত্যকে মাথায় রেখেই কিছু বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করছি।

২০২১ এ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সারা দেশের কমিটিগুলো নবায়ন করা হবে। (২০১৯ এ হয়েছে, সেই হিসেবে ২০২১ এ হবে বলে ধরে নেয়া হচ্ছে)।

  • এই প্রসঙ্গে একান্ত ভালোবাসা থেকে কিছু কথা আরজ করছি।

ক. ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কমিটি কাঠামোতে কাঠামো হিসেবে “মজলিসে সাদারাত” “প্রেসিডিয়াম”ই সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ও মূল নীতিনির্ধারক। এই মজলিস দৈনান্দিন কাজ পরিচালনা করে না বটে; কিন্তু দলের গতিপথ, কৌশল ও নীতি এখানেই নির্ধারিত হয়।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এখন যে অবস্থানে রয়েছে সেখানে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্র বড় হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে এখন মার্কিন নির্বাচনে, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতা বলয়ে, ভারত-চীনের দ্বৈরথে, তুরস্ক-সৌদীর দ্বৈরথে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

বিশ্ব অর্থনীতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি, স্বাস্থ্য নীতি, রাজনৈতিক স্বাস্থ্যনীতি, জলবায়ু, আন্তর্জাতিক চুক্তি, যুদ্ধ ইত্যাদি বিষয়েও নিজেদের অবস্থান সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

দেশীয় প্রশাসন, অর্থনীতি, দলভিত্তিক রাজনীতি, আন্দোলন মুখী সহাবস্থান, ক্ষমতার শত্রু নাকি সহযোগী নাকি প্রতিদ্বন্দ্বী এসব প্রশ্নের মিমাংসা দিতে হয়। দেশের পররাষ্ট্রনীতি, শিক্ষানীতি ইত্যাদি নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

ফলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মজলিসে সাদারাত এমন বহুমাত্রিক সিদ্ধান্ত নিতে পারঙ্গম এমন একাডেমিক ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকদের নিয়ে গঠিত হতে হবে।

১. মার্কিন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনীতি বিশেষজ্ঞ : 

বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার এতোটাই প্রভাব যে তাদের সামান্য পদক্ষেপও বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থানও প্রায় এক। সেজন্য এমন একজন দরকার যিনি ইউরোপ ও মার্কিনিদের প্রতিটি কার্যক্রম পর্যাবেক্ষণ করবেন এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবেন।

২. মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ :

তুর্কি-ইরান-পাকিস্থান বলয় না সৌদি-মার্কিন-ইজরাইর বলয়, সিরিয়ার আসাদ ইস্যু, ইয়ামানের হুতি-সৌদি ইস্যু, আরবদের ইজরাইলের সাথে চুক্তি ইস্যু, ইরান ইস্যু, ফিলিস্তিন ইস্যু ইত্যাদি ইস্যুগুলো জটিল ও বহুমাত্রিক। এসকল বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ দরকার।

৩. সার্ক ও দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ : 

সার্কের দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপুর্ণ।   এখানকার ইস্যুগুলোতে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ভুল করলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সব সম্ভবনা নষ্ট হবে। এর সাথে রয়েছে ভারত-চীন দ্বৈরথের মাঝে সমন্বয় করা। এক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ দরকার।

৪. বিশ্ব বাণিজ্য : 

আধুনিককালে দেশগুলোর প্রধান শক্তি হলো তার বাণিজ্যিক শক্তি। এই শক্তি দিয়েই সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা হয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা WTO  মুসলিম উম্মাহকে চাঁপে রাখতে প্রতিনিয়তই নানা ছক আঁকছে। সেগুলোকে পর্যালোচনা করে দলকে সেভাবে প্রস্তুত করতে মজলিসে সাদারাতে একজন বিশেষজ্ঞ দরকার।

৫. বিশ্ব অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ : 

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল,  বিশ্বব্যাংক গ্রুপ, এডিবি, আইডিবি, ফেডারেল রিজার্ভের কৌশল, পদক্ষেপ, কর্মপন্থা ইত্যাদি বুঝতে না পারলে আধুনিক বিশ্বে কোন আদর্শিক সংগঠন রাষ্ট্র শক্তি হয়ে উঠতে পারবে না।

৬. স্বাস্থ্য রাজনীতি বিশেষজ্ঞ : 

করোনা কাণ্ডের পরে কারো আর বুঝতে বাকি থাকার কথা না যে, জনস্বাস্থ্য একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার। এটাকে মোকাবিলা করতে স্বাস্থ্য রাজনীতি বিশেষজ্ঞ দরকার।

৭. জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ : 

বাংলাদেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য এই দুইটা বিষয়ে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগন পরামর্শ দিতে পারলে বাংলাদেশের জনপ্রশাসন বিষয়ে একক কোন বিশেষজ্ঞ দরকার। জনপ্রশাসন যে কোন দেশের জন্য গুরুত্বপুর্ণ। বাংলাদেশের জনপ্রশাসন আরো এককাঠি বাড়া। সাম্প্রতিককালে এরা অতি রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। এদের ভেতরকার মেকানিজম বোঝা, সেটাকে ম্যানেজ করার জন্য বিশেষজ্ঞ দরকার। এই ক্ষেত্রে ব্যর্থতা প্রতিষ্ঠিত সরকারকে পর্যন্ত ফেলে দিতে পারে।

৮. সমাজ তাত্ত্বিক : 

সমাজ কি করে সিদ্ধান্ত নেয়, সিদ্ধান্ত গ্রহনে সমাজের প্রভাবকগুলো কি? সমাজের রাজনৈতিক চরিত্র, নেতা হিসেবে তারা কেমন মানুষকে পছন্দ করে, কোন ধরনের কর্মসুচি তাদেরকে কেমন আলোড়িত করে ইত্যাদি বুঝতে পারা জরুরী।

আরও যেসব বিশেষজ্ঞ থাকা প্রয়োজন –

৯. দাওয়াহ বিশেষজ্ঞ।

১০. শরীয়াহ বিশেষজ্ঞ।

১১. আইন বিশেষজ্ঞ।

১২. মনস্তত্ত্ববিদ

১৩. প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ মাঠ নেতা।

১৪. উন্নয়ন তত্ত্ববিদ

  • এদের সমন্বয়ে মজলিসে সাদারাত গঠন হলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ যে কোন পরিস্থিতি দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করতে পারবে বলে আশা করা যায়।

খ. নায়েবে আমীর/ভাইস প্রেসিডেন্ট/সহ-সভাপতি পদটিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অলংকারিক পদ হিসেবে দেখা হয়। তাদের নির্বাহী কোন দায়িত্ব থাকে না। তারা পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন।

কিন্তু কর্মমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভাইস প্রেসিডেন্টরা সেক্টরাল প্রধান হিসেবে নির্বাহী দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাংগঠনিক রীতিতে সেক্রেটারি জেনারেল প্রধান নির্বাহী। অনেক কমিউনিষ্ট পার্টির স্ট্রাকচারের মতো। এই পদ্ধতি অনেক কার্যকর পদ্ধতি। কাজের সমন্বয় ভালো হয়। এই স্ট্রাকচার ধরে রাখলে নায়েবে আমীরদেরকে নির্বাহী দায়িত্ব দেয়া একটু জটিল। কিন্তু অন্য বিভাগীয় সম্পাদকদেরকে নায়েবে আমীরদের সাথে সংযুক্ত করে দেয়া যায়।

যেমন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দেখার জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সম্পাদককে একজন নায়েবে আমীরের সাথে, নারী-শিশু, সংখ্যালঘু ইত্যাদি বিষয়ক সম্পাদক যেগুলো স্পর্শকাতর বিষয় সেসব সম্পাদকদের নিয়ে একটা সাব-কমিটি করে সেই কমিটিকে একজন নায়েবে আমীরের সাথে সংযুক্ত করে দেয়া যায়।

  • এভাবে নায়েবে আমীরদেরকে নির্বাহী কাজের সাথে সম্পৃক্ত করলে দলের গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে।

গ. আগেই বলেছি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব হচ্ছেন দলের নির্বাহী প্রধান। দল মূলত তিনিই পরিচালনা করেন। তাঁর কাজ সার্বক্ষণিক।

মহাসচিব বিষয়ে কয়েকটি জরুরী প্রস্তাবনা :

১. মহাসচিবের পদে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পরে পরিবর্তন আনা। এতে করে নতুন নতুন নেতৃত্ব আসবে। তারা নতুন উদ্দোমে কাজ করবে। এবং পরের মহাসচিব আগের মহাসচিবকে ছাড়িয়ে যাওয়ার একটি শুভ ও কল্যাণকর প্রতিযোগিতা করার কারণে দলের কাজে প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি হবে। নিচে যারা দায়িত্ব পালন করছেন তারাও নিজেদেরকে মহাসচিব হিসেবে যোগ্য করে তুলতে সচেষ্ট থাকবেন। এতে পুরো সংগঠনেই চাঞ্চল্য তৈরি হবে।

নির্দিষ্ট মেয়াদ পর পর নেতৃত্ব পরিবর্তনের সুফল দেখতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে দূরে তাকানোর দরকার নাই। তাদেরই সহযোগী সংগঠন ইশা ছাত্র আন্দোলনই এর উৎকৃষ্ট উদহারণ। বলতে দ্বিধা নেই, ইশা ছাত্র আন্দোলন সম্প্রতি কয়েক বছরে খোদ আন্দোলনের জন্য ও পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। বছরান্তে নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে সেখানে যে কোন ছাত্র সংগঠনের সাথে পাল্লা দেয়ার মত কিছু ছাত্রনেতা সেখানে তৈরি হয়ে গেছে। এই অভিজ্ঞতা ফেলনার নয়।

২. মহাসচিব পদে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোকদের আনা উচিৎ। তাছাড়া তাকে চতুর্মাত্রিক দক্ষতা, বাকপটুতা এবং তৃণমূলে কাজ করার দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হওয়া জরুরী। মহাসচিব পদ আমীরের মত অলংকারিক না রেখে ফ্রেন্ডলি তারুণ্য দীপ্ত এবং গতরখাটা কারো কাঁধে ন্যস্ত করা উচিত।

৩. প্রশাসনিক দক্ষতা, সাংগঠনিক প্রজ্ঞা সম্পন্ন মধ্যবয়সী নেতৃত্বকে মহাসচিবের পদে আনা উচিৎ। যিনি আমিরের ন্যায় জবাবদিহিতার উর্ধ্বে অবস্থান করবেন না। বরং প্রতিনিয়ত ফোরামে দায়ভার ও জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকবেন।

৪. ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব পদের জন্য তরিকার খলিফা হওয়ার কোন শর্ত আইনগতভাবে নাই। কিন্তু বহুদিনের চর্চার কারণে এমন একটা ধারনা তৈরি হয়েছে যে মহাসচিব হওয়ার জন্য তরিকার খলিফা হওয়া শর্ত। যদি অলিখিতভাবেও এমন কোন সিদ্ধান্ত থাকে তাহলে তা পরিবর্তন করা উচিৎ। প্রথমত দলের প্রতিষ্ঠাতা আমীরের দর্শন অনুসরন করার জন্য। তিনি মুজাহিদ কমিটি করেছেন আধ্যাত্মিক কাজ করার জন্য। আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ করেছেন গণমানুষের রাজনীতি করার জন্য।  এখানে তরিকাকে তিনি আবশ্যকীয় করেননি।

দ্বিতীয়ত দলকে উন্মুক্ত করে দেয়ার জন্য। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সবার সংগঠন। এমনকি অমুসলিমদেরও। এখানে বোঝা দরকার, ইসলামের পারলৌকিক কল্যাণ কেবলই ইমানদারদের জন্য। কিন্তু এর রাজনৈতিক কল্যাণ সকল মানুষের জন্য, কাফেরের জন্যও। সেজন্যই ইসলামের রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে চলমান সংগঠনেও সব ধর্ম-বর্ন ও মতের মানুষ থাকা উচিৎ।

  • বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামী আন্দোলন এতো সম্ভবনা তৈরির পরেও এখনো প্রায় সবাই তাদেরকে “চরমোনাই পীরের দল” “চরমোনাই পীরের অনুসারীরা” বলে সীমাবদ্ধ করে ফেলে।

এভাবে পরিচিত হওয়ার ক্ষতি বহুমাত্রিক। এভাবে পরিচিত হলে ইসলামপন্থী বিপুল সংখ্যক মানুষই আপনাদেরকে সমর্থন করবে না। কারণ তাদের কেউ ছরছিনা/ ফুরফুরা/ফুলতলি শায়খদের অনুসারী। তারা “চরমোনাই পীরের অনুসারী” হবে না।

  • তাই এভাবে চরমোনাই কেন্দ্রীক পরিচিতি এড়াতে দলের মহাসচিব পদকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। এমন পদ্ধতি গড়ে তোলা উচিত যেখানে একজন অবসরপ্রাপ্ত ঝানু আমলা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরও অন্ততঃ দলের মহাসচিবের পদ অলংকৃত করা সম্ভব হয়। রাজনীতিকে নির্দিষ্ট ছকে বাক্সবন্দী না রেখে যতবেশি উন্মুক্ত করা হয় তত দল বিকশিত হয়।

ঘ. যুগ্ন/সহকারী মহাসচিববৃন্দ : 

যে কোন দলের বা প্রশাসনের মুল চাবিকাঠি হলো, যুগ্ম ও সহকারী সচিব/মহাসচিববৃন্দ। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এরাই নেতৃত্ব দেয়। আধুনিক ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দেয়ার অর্থ কাজের নির্দেশ দেয়া আর প্রতিবেদন নেয়া না। বরং নেতৃত্ব হলো, সাথে নিয়ে নিজেই কাজে সম্পৃক্ত থেকে কাজ সম্পন্ন করা। অর্থাৎ উস্তাদ শাগরেদ নয়;বন্ধু বান্ধব পরিবেশে টিম ওয়ার্ক করা।

যুগ্ম ও সহকারী মহাসচিবদেরকে আরো কার্যকর করতে কেন্দ্রীয় পদগুলোকে কাজের ধরনের সামঞ্জস্যতা বিবেচনায় গুচ্ছ কমিটি করা যায়। যার নেতৃত্বে থাকবে যুগ্ম ও সহকারী মহাসচিববৃন্দ। নায়েবে আমীরগন থাকবেন তত্ত্বাবধায়ক।

ঙ. গতানুগতিক পদবিন্যাসের বদলে গুচ্ছ পদ সৃষ্টি।

দুনিয়া বদলেছে। রাজনৈতিক বয়ান বদলেছে। কৌশলও বদলেছে। এখন পুরোনো আমলের পদবিন্যাস কার্যকর না। সেজন্য রাষ্ট্রের, নাগরিকদের এবং বৈশ্বিক বিষয়গুলোকে মাথায় রেখে নতুনভাবে পদবিন্যাস করা উচিৎ। এবং একক পদ সৃষ্টি না করে গুচ্ছপদ সৃষ্টি করা উচিৎ।

চ. ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ছাত্র, যুব ও শ্রমিক শাখা সবচেয়ে সক্রিয়। তাদের প্রতিনিয়ত মাঠে থাকতে হয়। অনেক নীতিগত বিষয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়। সেজন্য এই সংগঠনগুলোকে সরাসরি মহাসচিবের দপ্তরের অধিনে নেয়া উচিৎ।

ছ. সার্বক্ষণিক পেশাদার দায়িত্বশীল তৈরি করা দরকার। ইসলামী আন্দোলন যাদেরকে মোকাবিলা করছে তারা হাজার হাজার মানুষকে উচ্চবেতনে সার্বক্ষণিক কাজ করাচ্ছে। সেখানে ঐচ্ছিক হিসেবে কাজ করে তাগুতকে মোকাবিলা করার স্বপ্ন অলিকই নয় বরং বোকামীও বটে।

  • খুব সম্ভবত ইসলামী আন্দোলন এই প্রশ্নে ভুল মানসিকতা লালন করে। তারা সংগঠনে সার্বক্ষণিক পেশাদার হওয়াকে ভালোভাবে দেখে না। যারা সার্বক্ষণিক পেশাদার হিসেবে কাজ করে তাদেরকে হেয় দৃষ্টিতে দেখা হয়। তাদেরকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কম গুরুত্ব দেয়া হয়।

ফলে মেধাবী ও পরীক্ষিত মাঠ নেতারা একটা পর্যায়ে এসে সংগঠনের পাশাপাশি অন্য পেশায় নিয়োজিত হয়ে পড়েন। আর বর্তমানকালে পেশা বা ব্যবসা এতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ যে, পেশা/ব্যবসার পাশাপাশি সংগঠনের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে যায়। সময় যারা দেন তারাও সপ্তাহে ৭ ঘন্টা সময়ও দিতে পারেন না। কিছু সফর করলেও সংগঠনের বিকাশে নিয়মতান্ত্রিক ধারাবাহিক কাজ তারা করতে পারেন না।

এজন্য পূর্ণ মর্যাদা, কতৃত্ব, অধিকার দিয়ে পূর্নকালীন সম্মানজনক বেতনভুক্ত পেশাদার সংগঠক গড়ে তোলা উচিৎ। আধুনিক বিশ্বের গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সমাজসেবী এনজিও সবই এভাবে পূর্ণকালীন উচ্চবেতনের পেশাজীবি দ্বারা পরিচালিত।

  • মসজিদের ইমামতি, মাদ্রাসার শিক্ষকতার মতো ধর্মীয় কাজগুলোও এখন পেশায় পরিনত হয়েছে। হয়েছে বলেই মাদ্রাসা ও মসজিদ এতো দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।

ওয়াজ-নছিহতের মতো দায়িত্বও এখন পেশা। এগুলো নিয়ে কারো কোন হীনমণ্যতা না থাকলেও ইসলামী আন্দোলনে পেশাজীবি হওয়াকে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়।

এদেশে ইসলামী আন্দোলন বিকশিত না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ এটা। ইসলামী আন্দোলন যদি এই বিষয়ে এখনি সাহসী পদক্ষেপ না নেয় তাহলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

জ. প্রচার সম্পাদক না বরং প্রচার কমিটি করা : 

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রচার সম্পাদকের কাজ কেবল প্রেস দেয়া ও তৃতীয় শ্রেণীর সাংবাদিকদের সাথে খাতির রাখা। এখন অবশ্য মিডিয়া হাউজগুলোতে যাতায়াত শুরু হয়েছে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেস বিজ্ঞপ্তিগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়লেই বোঝা যাবে যে, এগুলো সবই একই রকম। কাট, কপি, পেষ্ট ধরনের। তাতে কোন নতুনত্ব থাকছে না। কোন বার্তা থাকছে না। প্রচারের অন্য কোন মাধ্যম তারা ব্যবহার করছে না।

এর কারণ হলো, প্রচার সম্পাদক এক বা দুইজনকে নিয়ে গঠিত। এখন সম্ভবত প্রচার সেল নামে একটা সেল করা হয়েছে। কিন্তু তার সদস্যরা প্রতিবছর বদলে যায়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের জন্য কোন এক যুগ্ম/সহকারী মহাসচিবের নেতৃত্বে প্রচার কমিটি করা দরকার। যেখানে প্রেস লেখার জন্য দুই থেকে তিনজন থাকবেন। দেশি সম্পাদকদের জন্য, বিদেশি পত্রিকার জন্য, ইংরেজি,আরবী অনুবাদের জন্য আলাদা আলাদা লোক থাকবে। প্রচারনার সম্ভব্য সকল মাধ্যম তারা ব্যবহার করবেন। সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও লেখালেখির অভিজ্ঞতা এবং ভাষাজ্ঞান আছে এমন লোকদের এখানে পেইড দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।

ঝ. দাওয়াহ বিষয়ক সম্পাদকের পদ সৃষ্টি : 

সমাজে বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন মতের ও জ্ঞানের মানুষ বসবাস করে। তাদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা ভাষা, যুক্তি, উপস্থাপনা ও কৌশল প্রয়োজন হয়। প্রত্যেক শ্রেণী-পেশার কাছে পৌছাতে প্রত্যহ পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক কার্যক্রম থাকা দরকার। সেজন্যই দাওয়াহ বিষয়ক সম্পাদক দরকার।

ঞ. প্রশিক্ষণ যে কোন ইসলামী আন্দোলনের প্রধান ভিত্তি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি আদর্শিক সংগঠন হওয়া সত্যেও এর প্রশিক্ষণ বিভাগের কার্যক্রম খু্বই সীমিত। এখানে যে দুইজন সম্পাদক কাজ করেন তারা দুইজন মহা ব্যস্ত মানুষ। একজন তো ঢাকা মহানগরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ফলে এই বিভাগের কাজের অবস্থা মানসম্মত না।

তাদের কেন্দ্রীয় কোন প্রশিক্ষণ নীতিমালা নাই। ছাত্র আন্দোলন তাদের মতো করে প্রশিক্ষণের বিষয়াবলী নির্ধারণ করে। তার সাথে যুব আন্দোলনের তারবিয়াতের কোন সমন্বয় নাই। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তারবিয়াতি বিষয়বস্তু দেখলে মনে হতে বাধ্য যে, তারা নেতা, নেতৃত্ব বা সংগঠন তৈরির চেয়ে কেরাণী বা অফিস ওয়ার্ক শিখাতে বেশি আগ্রহী। আদর্শিক কোন আলোচনা নাই, কোরআন সুন্নাহর গভীর পাঠ নাই, ইসলামী সাহিত্য, দেশিয় সংস্কৃতি, ইতিহাস, প্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শ সম্পর্কে কোন পাঠ বা তারবিয়াতি পরিকল্পনা নাই। ফলে অবস্থা এতোটাই খারাপ যে, হান্টিংটনের “সভ্যতার সংকট”, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির দলীল “এক-এগারো” এর মতো মৌলিক বইও দলের ৯৯.৯৯% লোক পড়েনি। কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারাও এর মধ্যে শামিল। (এই প্রেডিকশনটা ভুল ও বেয়াদবীমূলক হতে পারে। বিনীত ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি)।

এই দূরাবস্থা থেকে উত্তোরনের জন্য একটি কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ কমিশন বা বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। যেখানে বামুকের শীর্ষ দায়িত্বশীলকে প্রধান রেখে সব সংগঠনের সভাপতিদেরকে সদস্য থাকতে পারেন। এবং বিশেষজ্ঞ ও পূর্ণকালীন দায়িত্বশীল থাকতে পারেন। যারা একটি সমন্বিত ও সমসাময়িক বিষয়কে মাথায় নিয়ে একটি প্রশিক্ষণ নীতিমালা তৈরি করবেন এবং তা বাস্তবায়ন করবেন।

ট. তথ্য ও গবেষণা : 

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তথ্য। একই সাথে বড় শক্তিও হলো তথ্য। তথ্য দিয়ে আমেরিকার নির্বাচন পর্যন্ত প্রভাবিত করা যায়। দুঃখজনক সত্য হলো, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তথ্য বিভাগ কোন ধরনের তথ্য সংগ্রহ, তথ্য প্রক্রিয়াজাত করা, তথ্য ব্যবস্থাপনা, তথ্যের ব্যবহার করে না। এমনকি করোনায় কতজন মারা গেছে সেই তথ্যও এই মুহুর্তে দলের কোথায় পরিকল্পিতভাবে রাখা নাই। গবেষণা খাতের কথা বলাই বাহুল্য।

  • তথ্য ও গবেষণা খাতের এই দুরাবস্থার কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দেশের অন্য ইসলামপন্থীদের থেকে আক্রমনের শিকার হচ্ছে এবং তা মোকাবিলায় ব্যর্থ হচ্ছে।

তথ্য ও গবেষণা খাতেও দক্ষ, যোগ্য, কৌশলী একটি টিম দরকার। প্রয়োজন হলে তাদেরকে উচ্চবেতনে সার্বক্ষণিক পেশাদার হিসেবে নিয়োগ করা উচিৎ। তা না পারা গেলেও দক্ষ একটি টিম গড়ে তোলা দরকার।

পরিশেষে বলবো,

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এখন একটি পর্যায় অতিক্রম করছে। এই সময়ে পুরো দলের সামগ্রিক কাঠামো, কৌশল, নেতৃত্ব ইত্যাদি রিভিউ করা দরকার। প্রয়োজনে সব বদলে ফেলা দরকার। মনে রাখা দরকার, নুরানী মাদ্রাসা বাচ্চাদের প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে বলে ইফতা/তাখাসসুসও নুরানীর নিয়ম, কাঠামো ও জনবল দিয়ে চালানো যায় না।

[লেখাটা কি বড়দের কাছে একান্তভাবে দেয়া যেতো না? যেতো! কিন্তু একটা দলের নীতি ও সংস্কৃতি বড় পরিসরে তৈরি হতে হয়। আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি গণ সংগঠন। তার পর্যালোচনাও গণপরিসরে হওয়া উচিৎ। ইসলামী আন্দোলন রাজনীতিতে সরকারের উপর নানা চাপ তৈরি করে।একটি গণসংগঠন হিসেবে তার নিজেরও জনগণ,বিশ্লেষক,বন্ধু ও শত্রুর কাছ থেকে কিছু প্রকাশ্য চাপ নেয়া উচিত। অভ্যন্তরিন আওয়াজগুলো অগোচরেই উঠে আবার হারিয়ে যায়। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী একটি সংগঠনের পক্ষে স্বাভাবিকভাবেই এসব চাপ নেয়া ও সেগুলো গুরুত্ব সহ আমলে নেয়া দল,দেশ, ইসলামের জন্য সমান কল্যাণকর।]

লেখক : ইসলামী রাজনীতি বিশ্লেষক, ছাত্রনেতা, ধর্মতত্ববীদ।

সম্পাদনা ও বিন্যাস : হাছিব আর রহমান। 

মন্তব্য করুন