আল্লামা শফী র. এর মৃত্যু অস্বাভাবিক : সরকার ও দেশবাসীর কাছে পরিবারের চার দাবি

প্রকাশিত: ১:৫৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৯, ২০২০
  • এবার আল্লামা শফী রহ. এর ইন্তেকাল অস্বাভাবিক বললেন তার বড় ছেলে ইউসুফ মাদানী।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমীর, বাংলাদেশের সর্বপ্রভাবের আলেম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. এর ইন্তেকাল অস্বাভাবিক ছিলো দাবি করে তার মৃত্যু নিয়ে বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবিকে আরও জোড়ালো করেছেন আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী রহ. এর বড় পূত্র মাওলানা ইউসুফ মাদানী।

আরও পড়ুন : আমার দেখা আল্লামা শফী রাহিমাহুল্লাহর ইন্তেকাল ও জানাযা

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর পক্ষে মাওলানা ইউসুফ বিন আহমদ শফী আল-মাদানি রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিশেষ কিছু দাবি ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন।

আরও পড়ুন :

আল্লামা শফী রহ. কে হত্যার অভিযোগে মামলা : আসামী ৩৬ জন

আল্লামা শফী রহ. এর ইন্তেকাল নিয়ে তদন্তের দাবিতে ৮ দফা প্রস্তাবনা

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ব্যানারে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে আজ ২৯ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) সকাল ১১ টায় আল্লামা শফী রহ – এর দুই পূত্রসহ হেফাজতের সাবেক কিছু প্রভাবশালী নেতাদের উপস্থিতিতে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও মোবাইল ফোনে সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হয়েছিলেন বেফাকের সিনিয়র সহ-সভাপতি, জমিয়ত একাংশের সভাপতি মুফতী মোহাম্মদ ওয়াক্কাস ওয়াক্কাস।

  • সম্মেলনে সরকার ও দেশবাসীর কাছে চারটি বিশেষ দাবি পেশ করা হয়। দাবিগুলো হলো –

এক. বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন করে এর সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

দুই. তার পরিবারের পক্ষ থেকে দায়েরকৃত মামলা তদন্ত পূর্বক অবিলম্বে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে হবে।

তিন. আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীর পরিবারের সদস্যদের ও তার অনুসারীদের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। যারা মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি-ধমকি দিচ্ছে তাদেরকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

চার. শহীদ আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী (রহ.) রেখে যাওয়া সকল দ্বীনী ও সামাজিক অঙ্গনগুলো থেকে হযরতের বিরোধীদের অপসারণ করতে হবে।

আরও পড়ুন :

আল্লামা শফী রহ. এর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, মুফতি ফয়জুল্লাহর তদন্ত দাবি

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মাওলানা ইউসুফ মাদানী নিজেই। যিনি এর আগে আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী রহ. এর ইন্তেকাল স্বাভাবিক ছিলো মর্মে ভিডিও বক্তব্য দিয়ে আলোচিত হয়েছিলেন। তবে পরবর্তিতে এবং আজকেও তিনি সেই ভিডিও ব্যাখ্যায় বলেছেন –

জুনায়েদ বাবুনগরী বারবার বলছেন, আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীর মৃত্যু স্বাভাবিক হয়েছে। আর এর স্বপক্ষে তিনি আমার (হযরতের বড় সাহেবজাদা মাওলানা ইউসুফের) ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দেওয়া স্বীকারোক্তিকে বড় দলিল হিসাবে পেশ করছেন। অথচ আমার (মাওলানা ইউসুফের) কাছ থেকে জোরপূর্বক এই স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে ২২ শে সেপ্টেম্বর আর তা প্রচার করা হয়েছে এক সপ্তাহ পর। এতেই প্রমাণিত হয়, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের বাঁচানোর হীন উদ্দেশ্যে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার জন্য এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। অথচ আমি পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও বার্তায় বলেছি যে, আমাকে জিম্মি করে জোরপূর্বক ও ভয়-ভীতি দেখিয়ে এই পরিত্যক্ত স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছিল। আমি পরিষ্কার ভাষায় বলেছি, আমার বাবার মৃত্যু স্বাভাবিক হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয় – হাটহাজারী মাদ্রাসার দায়দায়িত্ব ছিনিয়ে নেওয়া ও আল্লামা শফীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রায় মাসখানেক পর হেফাজতে ইসলামের নামে মামা-ভাগ্নের একটি অবৈধ কাউন্সিল করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে একটি অবৈধ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।

অথচ বাবুনগরীর মামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী দুই বছর আগে নিজেই হেফাজত থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং জাতীয় দৈনিকে তার পদত্যাগের সেই ভিডিও এখনো বিদ্যমান আছে। তিনি হেফাজতের কোনো দায়িত্বে না থাকলেও তারই আহবানে অবৈধ কাউন্সিলের মাধ্যমে গঠিত তথাকথিত এই কমিটিতে বাবুনগরীর পারিবারিক সদস্যই রয়েছে প্রায় ২২ জন। এছাড়া দুইটি রাজনৈতিক দলের একটির ৩৬ জন আরেকটির ২৪ জন সদস্যকে বিভিন্ন পদে পদায়িত করে হেফাজতকে একটি চিহ্নিত রাজনৈতিক গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন :

অবিশ্বাস্য এক সিন্ডিকেট চক্রের অদৃশ্য জালে হেফাজতে ইসলাম : হারুন ইজহার

বর্তমান হেফাজতে ‘সিন্ডকেট’ ভাঙ্গার আহবান মুফতী হারুণ ইজহারের

হেফাজতের আমীর নির্ধারণ সঠিক হয়নি জানিয়ে তারা বলেন – আমীরের ইন্তেকালের পর শূরা নতুন আমীর নিয়োগ করবে, এখানে পুরো কমিটি ভেঙ্গে নতুন করে কমিটি করার পেছনে উদ্দ্যেশ্য কী? তাহলে তো মহাসচিবের মৃত্যুর পর নতুন করে পুরো কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। হেফাজতের নির্বাহী কমিটি তথা মজলিসে আমেলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে এবং হেফাজতের গুরুত্বপূর্ণ ৭০ জন কাউন্সিলরকে দাওয়াত না দিয়ে সিন্ডিকেট করে যে কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অবৈধ ও অসাংবিধানিক। আজকের এই সংবাদ সম্মেলন থেকে আমরা এই অবৈধ কমিটিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি।

হেফাজত প্রধান আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে আমীর মানা হবে না উল্যেখ করে বলা হয় – আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীর চরম বিরোধী ও বিদ্বেষী, মাজারপূজারী ভান্ডারীর প্রস্তাবে যিনি হেফাজতের আমীর হয়েছেন, তাকে এদেশের ধর্মপ্রাণ জনগণ মেনে নিতে পারে না। আমরা মনে করি, বর্তমান হেফাজত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে একটি পকেট কমিটি গঠিত হয়েছে, যেখানে আল্লামা আহমদ শফীর মূল অনুসারী হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃবৃন্দকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিগত দিনে যারা আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন, সক্রিয় ছিলেন, জীবন বাজি রেখে, জেল-জলুম উপেক্ষা করে, হামলা-মামলার তোয়াক্কা না করে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, তাদেরকে পাশ কাটিয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠনতন্ত্রে না থাকলেও এককভাবেই তিনি নিয়ম বহির্ভূত প্রতিদিন নতুন নতুন সদস্যের নাম ঘোষণা করে চলেছেন। সুতরাং নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাউন্সিল আহ্বান করে অচিরেই হেফাজতের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে ইনশাআল্লাহ। হেফাজতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিকভাবে সব জেলা, থানা, শহর ও নগর কমিটিগুলো নবায়ন করে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে হেফাজতের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

লিখিত বক্তব্যে দেশের আলেমদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলা হয় – হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর পক্ষ থেকে আয়োজিত আজকের এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া দেশের সর্বস্তরের ওলামায়ে কেরামের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

মুহতারাম উলামায়ে কেরাম! আপনারা সত্যের পতাকাবাহী, নবী (সা.)-এর ওয়ারিশ। উম্মাহর সামনে সত্য কথা তুলে ধরা আপনাদের দায়িত্ব। আমরা জানি, একটি মহল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এ দেশের আলেম সমাজকে ভুল পথে ঠেলে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে। ওলামায়ে কেরামের সরলতার সুযোগে তারা ঘোলাপানিতে মাছ শিকার করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। শহীদ আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল কি না এ বিষয়ে প্রকৃত সত্য খুঁজে জাতির সামনে তুলে ধরা ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে দেশের সচেতন উলামায়ে কেরাম এগিয়ে আসবেন বলে আমরা আশা করছি। একশো-ঊর্ধ্ব বয়সে আল্লামা আহমদ শফীর ইন্তেকাল স্বাভাবিক হবে এটাই ছিল সবার প্রত্যাশা। কিন্তু আসলেই কি তাই হয়েছিল? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে চিত্র দুনিয়াবাসীর সামনে এসেছে, তাতে কি বলা যায় তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে? প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা না হয় বাদ-ই দিলাম ।

আরও পড়ুন :

আল্লামা শফী রহ. জানাযায় স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্বে ছিলো ইসলামী আন্দোলন : মামুনুল হক

হাটহাজারী মাদরাসায় আন্দোলনের নেতৃত্ব কে দিচ্ছেন?

সংবাদ সম্মেলনে মাওলানা ইউসুফ মাদানী বলেন – আমরা মনে করি, শাইখুল ইসলামের শাহাদাতের বিষয়ে ওলামায়ে কেরামকে এর প্রকৃত অবস্থা উদঘাটনে এগিয়ে আসা দরকার। তা না হলে বাংলাদেশে ইসলামের ভবিষ্যত অন্ধকার।

হাটহাজারী মাদরাসায় হওয়া বিশেষ একটি আন্দোলন বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় – আপনারা নিশ্চয় অবগত আছেন, শহীদ আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর আগের তিন দিন হাটহাজারীতে নারকীয় তান্ডব ও ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে। তাঁর অফিস রুম ও হাটহাজারী মাদ্রাসার অনেক শিক্ষকের রুম ভাংচুরের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুনিয়াবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।

সে আন্দোলনের সময় আল্লামা শফী রহ. এর উপর জুলুম করা হয়েছে মর্মে উল্যেখ করে বলা হয় – জীবনের শেষ মুহূর্তে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে (আল্লামা শফী) অতি প্রয়োজনীয় ওধুষ গ্রহণ করতে দেয়া হয়নি, রুমের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, এসি-ফ্যানসহ আসবাবপত্র ভাংচুর করা হয়েছিল, চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটানো হয়েছিল, মুখের অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলা হয়েছিল, হাসপাতালে যেতে বিলম্ব ঘটানো হয়েছিল। একশো-ঊর্ধ্ব এই বয়োবৃদ্ধ আলেমের নাতির গলায় ভাঙ্গা কাচ ধরে বলা হয়েছিল, ‘এই বুইড়া, স্বাক্ষর কর, না হয় তোর নাতিকে হত্যা করবো।’ এ কথা বলে জোর জবরদস্তিমূলক স্বাক্ষর নিয়ে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। এসব কিছুর পরও কি বলতে হবে, আল্লামা শফীর মৃত্যু স্বাভাবিক হয়েছে? একটি চরমপন্থী উগ্রগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সহজ-সরল ছাত্রদের উস্কানি দেওয়া হয়েছে। সবকিছুই তো দেশবাসীর সামনে। তারপরও বলতে হবে আল্লামা শফীর মৃত্যু স্বাভাবিক হয়েছে?

আরও পড়ুন ;

হাটহাজারী মাদরাসা থেকে হাসপাতালে আল্লামা শফি

হাটহাজারীর মুহতামিম থেকে আল্লামা শফীর অব্যহতির ঘোষণা : আন্দোলন স্থগিত

হাটহাজারী মাদরাসা বন্ধ ঘোষণা : শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের প্রজ্ঞাপন জারী

হাটহাজারী মাদরাসার শুরা বৈঠকে গৃহিত সিদ্ধান্ত

আল্লামা শফী রহ. এর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিলো দাবি করে গত ২৩ ডিসেম্বর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর করা সংবাদ সম্মেলনকে জঘণ্যতম আখ্যা দিয়ে বলা হয় – আরো জঘন্যতম বিষয় হলো, হেফাজতের তথাকথিত আমীর জুনায়েদ বাবুনগরী গত ২৩ ডিসেম্বর হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষকদের সামনে বসিয়ে রেখে বলেছেন, হুজুরের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। কি চরম মিথ্যাচার! এর নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে দেশের শীর্ষ এই প্রতিষ্ঠানের মুহাদ্দিসদের সামনে যেভাবে তিনি মিথ্যাচার করেছেন, আল্লাহ তাআলার দরবারে এর জন্য কী জবাব দেবেন? অথচ জেনেশুনেও তারা এই মিথ্যাচারগুলো শুনে গেছেন, একটু প্রতিবাদ করার সাহসও কারো হয়নি! এটা কি আলেমদের স্বভাববিরোধী নয়?

আরও পড়ুন :

আল্লামা শফী রহ. এর মৃত্যু স্বাভাবিক, মামলা ষড়যন্ত্র : দাবি আল্লামা বাবুনগরীর

হাটহাজারীর শিক্ষকদের বিবৃতি : আল্লামা শফী রহ. এর ইন্তেকাল স্বাভাবিক

সংবাদ সম্মেলনে হাটহাজারী আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন রেখে বলা হয় – সে দিনগুলোতে হাটহাজারীতে কি অস্বাভাবিক ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়নি? তাহলে কেন বলা হচ্ছে যে, কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। আমরা তো জানি, অনেক সিনিয়র শিক্ষকের গলায় গামছা লাগিয়ে টানা-হেচড়া করা হয়েছে। তাদের রুম ভাঙচুর করা হয়েছে। তাদের অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠন করা হয়েছে। এসব কি সেদিন হাটহাজারীতে হয়নি? তারপরও বাবুনগরী গং কিভাবে বলছেন, মাদরাসায় কোনো কিছুই হয়নি? আল্লাহ তাআলা হেফাজত করুন। আমরা তার এসব মিথ্যাচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি ।

আরও পড়ুন :

বিক্ষুব্ধ হাটহাজারী মাদরাসার ছাত্ররা : আনাস মাদানীর রুম ভাংচুর

হাটহাজারী মাদরাসার সামনে পুলিশের সতর্ক অবস্থান : শান্তিপূর্ণ অবস্থায় ছাত্ররা

নতুন করে হেফাজতের কাউন্সিল ডেকে কমিটি গঠন করা হবে মর্মে জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় – নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাউন্সিল আহ্বান করে অচিরেই হেফাজতের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে ইনশাআল্লাহ। হেফাজতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিকভাবে সব জেলা, থানা, শহর ও নগর কমিটিগুলো নবায়ন করে কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে হেফাজতের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

আল্লামা শফী রহ. এর ইন্তেকাল অস্বাভাবিক ছিলো উল্যেখ করে সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয় – দেশবাসী মনে করে, আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীকে লাঞ্ছিত করে হাটহাজারী মাদরাসা থেকে পদত্যাগে বাধ্য করায় এবং বিভিন্নভাবে মানসিক নির্যাতনের কারণে তার অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। আন্দোলনের নামে সে সময় এমন ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল, তখন সহজ-সরল ছাত্র-শিক্ষকরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে মুখ খোলার পর্যন্ত সাহস পায়নি। একটি চিহ্নিত উগ্রগোষ্ঠি ছাত্র-শিক্ষকদের জিম্মি করে মাদ্রাসায় অরাজকতা সৃষ্টি করে যে নারকীয় তান্ডবলীলা চালায় এর ভিডিও ফুটেজগুলো এখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্যমান। সেই উগ্রগোষ্ঠীর কয়েকশো সদস্য এখনো হাটহাজারীতে অবস্থান করে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটিকে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রেখে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আজও হযরতের ভক্তরা হযরতের কবর জিয়ারত করতে গেলে তাদেরকে শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে। এমনকি হযরতের কবরে তার পরিবারের পক্ষ থেকে নামফলক লাগাতে গেলে তাও লাগাতে দেয়া হয়নি। হযরতের রুমকে এখন টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা মনে করি, প্রশাসন এই বিষয়ে নজর দিলে সত্য উদঘাটন সম্ভব।

তদন্তের দাবি করে বলা হয় – আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীর ইন্তেকাল যদি স্বাভাবিকই হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত করলেও তো তার স্বাভাবিক মৃত্যুর বিষয়টিই বেরিয়ে আসবে। এতে তো কারো আতঙ্কিত হবার কথা নয়; বরং আল্লামা শফীর প্রকৃত হিতাকাঙ্খী হয়ে থাকলে এই তদন্তকে তাদের সাধুবাদ জানানো উচিত ছিল। কিন্তু তার পরিবারের পক্ষ থেকে এর তদন্ত ও দোষী ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে মামলা দায়ের করা হলে বিশেষ মহল আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। হযরতের শ্যালক মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন পারিবারিক সিদ্ধান্তক্রমে মামলা দায়ের করার পর থেকেই তাকে ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি ও জীবননাশের ভয় দেখানো হচ্ছে।

জুনায়েদ বাবুনগরী বারবার বলছেন, আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীর মৃত্যু স্বাভাবিক হয়েছে। আর এর স্বপক্ষে তিনি আমার (হযরতের বড় সাহেবজাদা মাওলানা ইউসুফের) ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দেওয়া স্বীকারোক্তিকে বড় দলিল হিসাবে পেশ করছেন। অথচ আমার (মাওলানা ইউসুফের) কাছ থেকে জোরপূর্বক এই স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে ২২ শে সেপ্টেম্বর আর তা প্রচার করা হয়েছে এক সপ্তাহ পর। এতেই প্রমাণিত হয়, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের বাঁচানোর হীন উদ্দেশ্যে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার জন্য এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। অথচ আমি পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও বার্তায় বলেছি যে, আমাকে জিম্মি করে জোরপূর্বক ও ভয়-ভীতি দেখিয়ে এই পরিত্যক্ত স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছিল। আমি পরিষ্কার ভাষায় বলেছি, আমার বাবার মৃত্যু স্বাভাবিক হয়নি। এরপরও বিগত ২৩ ডিসেম্বর হাটহাজারী মাদ্রাসায় হেফাজতের নামে মামা-ভাগ্নের সংবাদ সম্মেলনে বাবুনগরী আমার সেই স্বীকারোক্তিকেই বড় দলিল হিসেবে পেশ করেছেন এবং তিনি মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি-ধমকি দিয়েছেন, আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণার কথা বলেছেন। আমাদের প্রশ্ন হলো, আমার পিতার মৃত্যু যদি স্বাভাবিক হয়ে থাকে তাহলে তদন্তে বাবুনগরী গংদের এত ভয় কিসের? তার দাবি অনুযায়ী তদন্তে তিনি তো নির্দোষই সাব্যস্থ হবেন। এই মামলা তো কাউকে অমূলক হয়রানি করার জন্য করা হয়নি। সুতরাং এই মামলার তদন্তে কোনো ধরনের বাধার সৃষ্টি করা হলে এর সম্পূর্ণ দায় বাবুনগরী গংদের উপরই বর্তাবে।

বাবুনগরী কওমি ভিশন নামে তার ভাগিনার মাধ্যমে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ভিডিও চ্যানেল খুলে মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। একদিকে ওই চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেন, ছাত্র আন্দোলনের সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই, কে বা কারা আন্দোলন করেছে, তাও তিনি জানেন না। মাদ্রাসার ক্লাস বন্ধ করলো ছাত্ররা অথচ মসজিদের মিম্বারের দাঁড়িয়ে বাবুনগরী ঘোষণা দিলেন মাদ্রাসার ক্লাস চালু করার। এতে কি প্রমাণ হয় না যে, তার যোগসাজশেই বিশৃংখল এই আন্দোলন হয়েছে? তা না হলে তিনি ক্লাস চালুর ঘোষণা কিভাবে দেন? আমরা মনে করি, আল্লামা শাহ আহমদ শফীর অস্বাভাবিক এই মৃত্যুর বিচার বিভাগীয় তদন্ত হতে হবে। যারা এই তদন্তের বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, কেননা তদন্ত কাজে বাধাদান ও এ জাতীয় হুমকি-ধমকি স্বাধীন ও স্বাভাবিক বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয় – যারা আল্লামা আহমদ শফীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে বলেছে যে, তিনি কেন সরকারের বিরোধিতা করেন না, কেন সরকার পতনের আন্দোলন করেন না, তার অনুসারীরা সরকারের দালাল; কিন্তু যারা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছে, উস্কানি দিয়েছে, নিরীহ ছাত্রদেরকে বিভ্রান্ত করেছে, নিজেদেরকে সরকার বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে ধর্মপ্রাণ মুসলমান বিশেষত কওমী অঙ্গনের ছাত্র-শিক্ষকদের বাহবা নেওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা অপপ্রচার চালিয়েছে, আজ তারাই কিন্তু ভান্ডারী, আনিস মাহমুদসহ সরকারি সংস্থার লোকজনদের সরাসরি সহযোগিতা নিয়ে এবং মুচলেকা দিয়ে তাদের জন্য দোয়া দুরূদ পড়ছেন। বক্তৃতায় সরকারকে শত বৎসর ক্ষমতায় থাকার জন্য মায়াকান্না করছেন। এগুলো কি দালালি নয়?

ভাস্কর্য ভাঙার নামে আন্দোলনের হুংকার দিয়ে আবার তারা এখন ভাস্কর্য রক্ষার জন্য সেগুলো পাহারার ব্যবস্থা করছেন। এগুলো কিসের আলামত? দূরদর্শীহীন, হঠকারীমূলক বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে দেশের ওলামায়ে কেরামকে আবারো বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আজ মাহফিল বন্ধ, মাদ্রাসাগুলো আবারো নজরদারির আওতায়, হেফাজতের মৃত মামলাগুলো আবারো জীবিত করার দাবি উঠছে, আন্দোলনের নামে নিজেদের নেতা হওয়ার খাহেশে ইসলামকে আজ বিপদের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীও সরকারবিরোধী আন্দোলন করেছেন। আবার তিনি স্বকীয়তা বজায় রেখে সরকারের কাছ থেকে ইসলামের অনেক দাবি-দাওয়া আদায় করে এদেশের মুসলমানদের মাথা উঁচু করেছেন। তিনি কারো কাছে মুচলেকা দিয়ে তার আন্দোলনের ভূমিকাকে কোনোকালেই খাটো করেননি। তিনি বিশ্ববাসীর সামনে ইসলামকে সমুন্নত করেছেন। কোনো বাধা-বিপত্তি তার আধ্যাত্মিক শক্তির মোকাবেলা করতে সক্ষম হয়নি। তাঁর দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে সকল শ্রেণী পেশার মানুষ তাকে সম্মান জানিয়েছে, তাঁকে শ্রদ্ধা করেছে। এগুলো কি আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীর অপরাধ ছিল? তিনি কি এসব নিজের জন্য করেছিলেন? দেশ ও উম্মাহর স্বার্থে আজীবন তিনি সংগ্রাম করে গেছেন। এতকিছু করার পরও একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নে কেন তার সাথে এহেন অমানবিক আচরণ করা হলো?

আমরা মনে করি, ইসলামবিরোধী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সুকৌশলে মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। দেশ ও জাতিকে চরম বিভ্রান্তির মাঝে ফেলে দিয়ে ইসলামের নামেই ইসলাম জবাইয়ের কাজটি সুচতুরতার সাথে করা হয়েছে।

মাওলানা ইউসুফ মাদানী বলেন – আমরা মনে করি, আল্লামা শাহ আহমদ শফীর শত বছরের অর্জন, আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা, তাঁর বুযুর্গী ও আধ্যাত্মিকতা, দেশ উম্মাহর কল্যাণে অক্লান্ত মেহনত, নাস্তিক-মুরতাদ বিরোধী সফল আন্দোলন, স্বকীয়তা বজায় রেখে কওমী সনদ অর্জনে যোগ্য নেতৃত্ব, ২০১৩ সালে দুনিয়া কাঁপানো আন্দোলনে ঈর্ষান্বিত হয়ে একটি মহল তাঁকে এবং তাঁর অনুসারীদের সর্বোপরি তাঁর জীবনের সকল সফল অর্জনকে বিনষ্ট করে দেওয়ার চক্রান্ত করে তাঁকে দুনিয়া থেকে বিদায় করার ষড়যন্ত্র করেছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ইসলামবিরোধী অপশক্তি তাঁর এই অর্জনকে ধ্বংস করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। আর ইসলামের লেবাসধারী একটি মহল ইসলাম বিরোধীদের চক্রান্ত বাস্তবায়নে সফল ভূমিকা পালন করেছে। এখনই এই চক্রটির মুখোশ উম্মোচন করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে দেশে নতুন আরেকটি উগ্র খারেজি ও সাবায়ী চক্রের উত্থান ঘটার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। হযরত উসমান, হযরত আলী ও হযরত হুসাইন রা.-এর হৃদয়বিদারক হত্যাকান্ডসহ ইসলামের ইতিহাসে এজাতীয় আরও অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। যেগুলোর বাস্তবায়নে লেবাসধারী একটি মহল সক্রিয়ভাবে কাজ করে গেছে। যুগে যুগে ইসলামের বিরুদ্ধে ইসলামের নামে এদের ষড়যন্ত্র ছিল, যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। আমরা মনে করি, আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীকে একই কায়দায় ভয়-ভীতি ও মানসিক নির্যাতন করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সর্বশেষ সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলা হয় – আপনারা সত্য প্রকাশে অহর্নিশ কাজ করে যাচ্ছেন। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই আপনাদের এই নিরন্তর চেষ্টা প্রচেষ্টা। সুতরাং আল্লামা শাহ আহমদ শফীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা আপনারা দেখেছেন। আমাদের অনুরোধ, আপনারা সত্য উদঘাটনে অগ্রসর হোন। এক্ষেত্রে আপনাদের ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

আরও পড়ুন :

আল্লামা শফীর জানাযাই প্রমান : হেফাজতি চেতনা এখনও বেঁচে আছে

আল্লাহ আহমদ শফী (রহ.)-এর শূণ্যতা অতি দ্রুত  পূরণ করে দিক : আল্লামা তাকি উসমানী

  • প্রতিবেনটি সন্নিবেশিত ও সংযোজিত করেছেন পাবলিক ভয়েস নির্বাহী সম্পাদক হাছিব আর রহমান।

মন্তব্য করুন