মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে আমরা হতাশ : সৈয়দ শামছুল হুদা

প্রকাশিত: ১১:২৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৮, ২০২০

মাওলানা মামুনুল হক সাহেবকে মানুষ রাজনৈতিক মঞ্চে দেখতে চায়। তাঁর বলিষ্ঠ কন্ঠ, তাঁর সাহস, তাঁর উভয়বিধ শিক্ষায় পারদর্শিতা, সবকিছু মিলে ইসলামপন্থী মানুষের মধ্যে মাওলানা মামুনুল হক আশার সঞ্চার করেছেন। তবে তিনি বর্তমানে কওমী ফোরাম বা রাবেতাতুল ওয়ায়েজীন এর মতো যে সকল সংগঠনের সাথে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছেন তাতে আমরা হতাশ।

সৈয়দ শামছুল হুদা

  • জাতীয় রাজনীতিতে মাওলানা মামুনুল হক এর ফ্যাক্টর হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কতটুকু?

দেশের বর্তমান যে সংকট, যে অস্থিরতা, তার একমাত্র কারণ হলো রাজনৈতিক নেতৃত্বের শূন্যতা। রাজনৈতিক ময়দানে দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাবেই আজকের বাংলাদেশের সমস্যার শুরু। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রে দেশের আলেম-ওলামাদেরকে শুধুমাত্র মসজিদ ও মাদ্রাসামুখী করে ফেলা হয়েছে। সকল পেশা থেকে আলেম-ওলামাদেরকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। খুব কৌশলের সাথে ইসলামী রাজনীতিবিদদেরকে তাদের নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। এক গ্রুপকে অন্য গ্রুপের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। মাযহাবগত দ্বন্ধ, ধর্মীয় কোন্দল ইত্যাদিকে মিডিয়ার মাধ্যমে হাইলাইট করা হয়েছে। বর্তমানে ওয়াজ মাহফিল গুলোতে বক্তাদের যে আচরণ, যে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপেশাদারিত্ব দেখতে পাচ্ছি এটাও দীর্ঘদিনের নানা দুর্বলতার ফসল।

আজ ওরা দূরে থেকে আমাদের নিয়ে হাসছে। আজকের মেয়র তাপস, শামীম ওসমান, মাহবুব-উল আলম হানিফরা আমাদেরকে নিয়ে উপহাস করছে। এস পি এস এম তানভীর হোসেন আমাদেরকে নিয়ে হুংকার দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। চরম বিতর্কিত কমান্ডো সিনেমা চালানোর সাহস বাংলাদেশে দেখানো হচ্ছে।

এসব হচ্ছে বাংলাদেশ যোগ্য, সাহসী, পেশাদার রাজনৈতিক নেতৃত্ব না থাকার কারণে। বিশেষ করে ইসলামী অঙ্গনে নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি করা হয়েছে খুব পরিকল্পিতভাবে। এ জায়গাটায় তরুণ নেতৃত্বকে এগিয়ে আসতে হবে। আগামী দিনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাল ধরার জন্য কিছু মানুষকে পেশাদারিত্বের সাথে সামনে আসতে হবে। আর সে জায়গাটায় ইসলামী অঙ্গনের কয়েকজন ব্যক্তির প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন মাওলানা মামুনুল হক। আরো যারা প্রিয় আছেন তাদের মধ্যে মুফতি ফয়জুল করিম ও ডঃ আহমদ আবদুল কাদের অন্যতম।

আজ কিছু কথা বলতে চাই জনাব মাওলানা মামুনুল হক ভাইকে সামনে রেখে। উনি বর্তমানে যে পদ্ধতিতে কাজ করে যাচ্ছেন এবং উনার প্রতি মানুষের যে আস্থা এবং আশা, দুটোর মধ্যে সমন্বয় ঘটছে না। যাকে বলে ব্যাটে বলে হচ্ছে না।  মাওলানা মামুনুল হক সাহেবকে মানুষ রাজনৈতিক মঞ্চে দেখতে চায়। তাঁর বলিষ্ঠ কন্ঠ, তাঁর সাহস, তাঁর উভয়বিধ শিক্ষায় পারদর্শিতা, সবকিছু মিলে ইসলামপন্থী মানুষের মধ্যে মাওলানা মামুনুল হক আশার সঞ্চার করেছেন। তবে তিনি বর্তমানে কওমী ফোরাম বা রাবেতাতুল ওয়ায়েজীন এর মতো যে সকল সংগঠনের সাথে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছেন তাতে আমরা হতাশ।

তিনি বর্তমান সময়ে জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে এমন সকল সংগঠনের সাথে, সকল ব্যক্তির সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলবেন, সকলের সাথে উঠাবসা করবেন এই চিত্রটি দেখতে চাই।  তিনি জাতীয় প্রয়োজনে কখনো জাতীয় পার্টির সাথে, কখনো বিএনপির সাথে, কখনো জামায়াতের সাথে,  কখনো ইসলামী আন্দোলনের সাথে, কখনো মজলিস, জমিয়তের সাথে বসবেন। প্রয়োজনে কখনো আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথেও বসবেন। কখনো নুরুল হক নুর, কখনো মুফতি ফয়জুল করিম, কখনো ডঃ আহমদ আবদুল কাদের, কখনো মাহমুদুল হক মান্না, কখনো কাদের সিদ্দিকী, কখনো বি চৌধুরী, কখনো অলি আহমদ, কখনো মির্জা ফখরুলের সাথে বসবেন।

কখনো গার্মেন্টস শ্রমিকদের সাথে বসবেন, কখনো বাস টার্মিনালের শ্রমিকদের সাথে বসবেন, কখনো হকারদের সাথে বসবেন, কখনো নানা পেশার মানুষের সাথে বসবেন, উদারচিত্তে সবার কথা শুনবেন আমরা সেই জায়গাটায় মাওলানা মামুনুল হককে দেখতে চাই।

তিনি কওমী ফোরাম আর রাবেতার মতো সীমিত গন্ডির লোকদের সাথে উঠাবসা করেন এটা আমাদের পছন্দ না। তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তির সাথে একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের মহাসচিব হয়েছেন এটা দেখে ব্যথিত হয়েছি। কেমন জানি দিনে দিনে তিনি নিজেকে শুধুমাত্র কওমী অঙ্গনের মুখপাত্রে পরিণত করছেন।

দেশের মানুষ মাওলানা মামুনুল হককে জাতির রাজনৈতিক রাহবারির জায়গায় দেখতে চায়। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর জায়গায় দেখতে চায়। মাওলানা আতহার আলী রহমতুল্লাহি আলাইহির জায়গায় দেখতে চায়। শাইখূল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহমতুল্লাহি আলাইহির জায়গায় দেখতে চায়।

আমি একটি বিষয় বিশ্বাস করি যে, এদেশে জমিয়ত হেফাজত খেলাফত ইসলামী আন্দোলন সবাই যদি এক হয়ে যায় তাতেও জাতীয় রাজনীতিতে কোন প্রকার প্রভাব সৃষ্টি করতে পারবে না। নেতৃত্ব গ্রহণ তো অনেক দূরের কথা। এই সবগুলো দলের ক্ষমতা, পরিচিতি, নির্দিষ্ট গণ্ডির ভিতরে সীমাবদ্ধ ‌। কিছু ভাই মনে করেন, এই দলগুলো এক হয়ে গেলেই বুঝি অনেক কিছু হয়ে যাবে। আসলে এই সবগুলো দল মিলেও জাতীয় রাজনীতিতে কোন প্রকার প্রভাব সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে না। এই সবগুলো দল মিলে কতটুকু ক্ষমতা রাখে সেটা ২০১৩সালের ৫ ই মে’র ঘটনার মাধ্যমে বুঝে আসার কথা।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হিসেবে যেহেতু ব্যক্তিকে কেন্দ্র করেই আন্দোলন-সংগ্রাম, স্বপ্ন গড়ে ওঠে সেহেতু মাওলানা মামুনুল হককে নিয়ে আমাদের স্বপ্ন দেখাটা মনে হয় খুব অন্যায় কিছু নয়। এর বাইরে যারা আছেন তাদেরকে নানা কারণে সামগ্রিক নেতৃত্বে এখনো অনেক পিছিয়ে মনে হয়। বিশেষ করে এদেশের ইসলামী রাজনীতিতে দুটি শক্তিশালী সংগঠন জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন এর অগ্রযাত্রাকে সমন্বিত রেখায় নিয়ে আসতে পারলে একটি কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব। পারস্পরিক বিভেদ-বিবাদ জিইয়ে রেখে কোনদিন সেকুলারদের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে আনা সম্ভব নয়।

একটা শুনতে অনেকের কাছে খারাপ লাগলেও বাস্তব সত্য যে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির ইসলামী রাজনীতির অঙ্গনে অসংখ্য মেধাবী মুখ এর জন্ম দিয়েছে, ইসলামী স্কলার তৈরি করেছে, সাংগঠনিক জনশক্তি গড়ে তুলেছে। কিন্তু রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত, একাত্তরের ভূমিকা এবং বিভিন্ন বিষয়ে জিদ ধরে রাখার ফলে এ সংগঠনটি গণমুখী সংগঠনে পরিণত হতে পারেনি। তারা তাদের অসংখ্য মেধাবী মুখ হারিয়েছে, যোগ্য নেতৃত্বকে হারিয়েছে। এই সংগঠনটির সামগ্রিক ব্যবহার এবং সম্মুখ সারির নেতৃত্ব পরিবর্তন করা ছাড়া বাংলাদেশে ঘুরে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়।

অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ একটি যথেষ্ট সম্ভাবনাময় সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও এর পারিবারিক নেতৃত্ব, চরমোনাই কেন্দ্রিক আদর্শ চর্চা ইত্যাদির কারণে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা আদৌ সম্ভব হবে কি-না আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এ দুটি বিষয় এ সংগঠনটির একটি বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা তাদের পক্ষে কতটুকু সম্ভব হবে সেটা আগামী দিনে বোঝা যাবে। এছাড়া রাজনৈতিক ময়দানে খেলতে নেমে এসে অনেক কিছুতেই তাদের নেতিবাচক মনোভাব জটিলতা তৈরি করছে। যেমন কোন জোটে না যাওয়া, নারী নেতৃত্ব, সরকারকে ঝুকিতে ফেলতে পারে এমনতর রাজনীতি না করা, হিসেব কষে রাজনীতি করা ইত্যাদি বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্তে সাময়িক সফলতা দেখা গেলেও সামগ্রিক রাজনীতিতে তারা পিছিয়ে রয়েছে। দেশের ৫০% মানুষ নারী। তারা এখন অনেক বেশি প্রতিষ্ঠিত ও সচেতন। এসব বিষয়ে দলটি সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছিয়ে আছে।

প্রশ্ন আসতে পারে কেন মামুনুল হক সাহেবকে আলোচনায় নিয়ে আসলাম। এত বড় বড় দল থাকতে মামুন সাহেবের সম্ভাবনার কথা কেন বললাম? আমার বিবেচনায় মাওলানা মামুনুল হক সাহেব যদি বুঝে-শুনে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তাহলে কওমী অঙ্গনের একচেটিয়া সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। উপরুন্ত রাজনৈতিক দক্ষতা দেখাতে পারলে জাতীয় নেতাদের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনাও আছে।সাধারণ মানুষের একবার হৃদয় কাড়তে পারলে তিনি অনেক দূর যেতে পারবেন। এদেশের মানুষ এন্টি ভারত মনোভাব লালন করে। এ বিষয়টি উনাকে খুব ভালো করে বুঝতে হবে। এক্ষেত্রে সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হবে।  বিএনপির অন্যতম সফলতা হলো, এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশের মানুষের মনোভাব বুঝতে পেরেছিলেন। যে কারণে তিনি খুব সহজে জনপ্রিয়তার আকাশচুম্বি অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছিলেন। আজকের বিএনপি পথহারা। এ শুন্যতা মামুন সাহেব বুঝতে পারলে সফল হবেন। তিনিও যদি র’ এর ফাঁদে কোনভাবে পা দেন তাহলে সবশেষ।

বাংলাদেশের রাজনীতি বোঝা অনেক কঠিন। দেশের মানুষ অনেক সময়ই জোয়ার ভাটার টানে চলে। দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক শুন্যতা বিরাজ করছে। সময়টা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এই সময়ে জনগণের পালস বুঝে কেউ যদি সামনে চলে আসতে পারে তাহলে অনেক কিছুই হয়ে যাওয়া সম্ভব। একজন সাধারণ ছাত্রনেতা নুরুল হক নূর যদি মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার করতে পারে, তাহলে মামুনুল হক সাহেব আরো অনেক বেশি পারবেন।  তিনি কি আমাদের চাওয়া পাওয়াকে মূল্য দিবেন? উনি কি পারবেন সময়ের রাজনীতিটা বুঝে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নিতে? শুধু খেলাফত মজলিস কেন্দ্রিক চিন্তা করলে উনি সফল হবেন না। বড় পরিসরে কিছু করার কথা উনাকে ভাবতে হবে।সবাইকে নিয়ে নতুন ধারার কিছু করতে হবে। আপাতত: মজলিসের রাজনীতি করতে পারেন। কিন্তু সময়ের দলীয় গন্ডীর বাইরে  সবসময়ই থাকতে হবে। দলটাকে বড় করে দেখলে হবে না।

ইতিপূর্বে আমি একটি লেখায় বলেছিলাম মাওলানা মামুনুল হক এখনো জাতীয় রাজনীতিতে ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেননি। তবে তার ফ্যাক্টর হয়ে ওঠার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। আর সে কারণেই তার উপরে বহুমুখী চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যদি তিনি এই সময়টাকে যোগ্যতা, মেধা এবং রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে মোকাবেলা করতে পারেন তাহলে তিনি বড় ধরনের ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন এ সম্ভাবনা  তৈরি হয়েছে। আমরা উনার মাধ্যমে উন্নত ও উজ্ব্ল ভবিষ্যত কামনা করছি।

লেখক : জেনারেল সেক্রেটারি, বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্ট ‘বিআইএম’।

মন্তব্য করুন