অবিশ্বাস্য এক সিন্ডিকেট চক্রের অদৃশ্য জালে হেফাজতে ইসলাম : হারুন ইজহার

প্রকাশিত: ১১:৫৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৬, ২০২০

বাংলাদেশের অরাজনৈতিক দাবিদার সর্ববৃহত ইসলামী সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ‘অবিশ্বাস্য এক সিন্ডিকেট চক্রের অদৃশ্য জালে’ আটকে আছে দাবি করে ফেসবুকে একটি পাবলিক পোস্ট করেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুফতী হারুণ ইজহার।

হেফাজতে ইসলামের বিভিন্ন পদ পদবির বিন্যাস নিয়ে গত ২৩ ডিসেম্বর (বুধবার) হওয়া বৈঠকের ফলাফল আজকে প্রকাশ হওয়ার পর এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন।

আরও পড়ুন : বর্তমান হেফাজতে ‘সিন্ডকেট’ ভাঙ্গার আহবান মুফতী হারুণ ইজহারের

আজ শনিবার সন্ধ্যায় হেফাজতের বর্তমান প্রচার সম্পাদক মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়জী প্রেরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় গত ২৩ ডিসেম্বর (বুধবার) চট্টগামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় এক বিশেষ বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদী। আগে এ পদটিতে ছিলের সদ্য ইন্তেকাল করা জমিয়তের মহাসচিব আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী।

এছাড়াও হেফাজতের ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি হয়েছেন খতিবে বাঙাল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব। তার সঙ্গী হিসেবে সেক্রেটারি হয়েছেন আলোচিত ব্যক্তি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক।

হেফাজতের কমিটি বিন্যাসের এ বিষয়গুলো সামনে আসার পরই ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুফতী হারুণ ইজহার।

প্রতিক্রিয়ায় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পদটির বিষয়ে তিনি লেখেন –  আল্লামা নূর হুসাইন কােসেমী রাহ.এর ইনতিকালে সংগঠনের  মহাসচিবের শূন্য পদটির জন্য জরুরী সিদ্ধান্তের দরকার ছিলো, আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদী হাফিঃ এর মাধ্যমে সে শূন্যস্থান পূরণ করাটা সার্বিক বিবেচনায় সময়ের প্রয়োজন ও দাবী ছিলো।

অপরাপর পদগুলোর বিন্যাস নিয়ে তিনি ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন – কিন্তু মহাসচিবের দায়িত্ব নির্ধারণের পরামর্শের আড়ালে গোপন এজেন্ডার মাধ্যমে প্রায় এক  মাইল লম্বা এতগুলো পদপদবীর ভাগবাটোয়ারা কোন সাংগঠনিক ধারায় হয়েছে? আবার কেবল মহাসচিবের পদটিতে লেখা হয়েছে ভারপ্রাপ্ত, অন্যরা কেন তাহলে স্থায়ী?

হেফাজতের ব্যাপারে দেশী-বিদেশী অসংখ্য চক্র ভয়ঙ্কর পর্যায়ে সোচ্চার দাবি করে হারুণ ইজহার বলেন – সংগঠনের (হেফাজতের) বিরুদ্ধে দেশী-বিদেশী অসংখ্য চক্র ভয়ঙ্কর পর্যায়ে সোচ্চার। খোদ সংগঠনের সাবেক দায়িত্বশীলদের একটি বিদ্রোহী  অংশ দিনদিন যখন শক্তিশালী হতে চলছে। রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক নানা ডিসকোর্সে হেফাজতের নতুন বয়ান ও নতুন পথচলার দিকে পুরো জাতী তাকিয়ে আছে। এমন সময় নতুন আমীরের সরলতাকে পুঁজি করে এবং সর্বশ্রদ্ধভাজন  মুরব্বি হজরত আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথে কোন রকম আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সম্পর্ক না রেখে  নামকাওয়াস্তে তাঁকে ব্যবহার করে আপনাদের এসব গোপন কর্মকান্ড কোন সাংগঠনিক ধারায় হচ্ছে? এমন হীনমন্যতার চরিত্র কি ইসলাম শিক্ষা দেয়?

তিনি নিজের কর্মপন্থার বিষয়টি উল্যেখ করে বলেন – আমার দাওয়াতি দর্শন ও চরিত্র এসব বিষয়ে আলাপে আমাকে উৎসাহী করে না। আমরা রাজনীতিতে নয় দাওয়াতে, সংগঠনবাদীতায় নয় জামাআহ্’য়, সেলিব্রেটিজমে নয় ইমারাহ্’য় বিশ্বাসী।

হেফাজতের মাধ্যমে অকল্যাণকর পথকে সুগম করতে দেওয়া হবে না দাবি করে তিনি বলেন – হেফাজতকে কেউ এমন বিশ্বাসের জায়গায় আনতে পারবে কিনা জানিনা, তবে বৈপ্লবিক অনেক ভাল কিছু না হলেও এ সংগঠনকে এমন কোন অনৈতিক ও বিশৃঙ্খল প্লাটফর্ম হতে দেয়া হবে না যা কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণকর পথকে সুগম করে শত্রুকে সুযোগ করে দেয়।

‘মু’মিন এক গর্তে দ্বিতীয় দফা পা দেবে না।’ বলেও হুশিয়ারি দেন তিনি। 

তিনি আরও লেখেন – হেফাজতে কোন সিন্ডিকেট চরিত্র বরদাস্ত করা হবে না। হেফাজত কারো সম্পত্তি নয়। চরিত্র না পাল্টালে প্রতিক্রিয়া লেখালেখিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নদি তার নতুন গতি ঠিক করে নেবে আল্লাহর কসম!

উল্যেখ্য : গত ২৩ অক্টোবর হেফাজতের কমিটি বৈঠকে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীর মৃত্যুতে শূন্য হওয়া মহাসচিব পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পান হেফাজতের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা নূরুল ইসলাম জিহাদী।

এছাড়াও হেফাজতের ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি হয়েছেন খতিবে বাঙাল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব। তার সঙ্গী হিসেবে সেক্রেটারি হয়েছেন আলোচিত ব্যক্তি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক।

অপরদিকে মাওলানা হাফেজ তাজুল ইসলামকে সভাপতি ও মাওলানা লোকমান হাকীমকে সেক্রেটারি করে চট্টগ্রাম মহানগর কমিটিও ঘোষাণা করা হয়।

হাটহাজারী মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির প্রধান উপদেষ্টা ও জুনায়েদ বাবুনগরীর মামা আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।

হেফাজত ইসলামের প্রধান উপদেষ্টা আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- হেফাজত প্রধান আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী, উপদেষ্টা সদস্য আল্লামা নোমান ফয়জী, কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা হাফেয তাজুল ইসলাম, মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াহইয়া, মুফতী জসিম উদ্দিন, যুগ্ন মহাসচিব মাওলানা জুনাইদ আল হাবীব, মাওলানা মামুনুল হক, মাওলানা লোকমান হাকীম। মাওলানা নাসির উদ্দিন মুনির, মাওলানা হাবীবুল্লাহ আজাদী, মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, অর্থ সম্পাদক মুফতী মুনির হোসাইন কাসেমী, প্রচার সম্পাদক মাওলানা জাকারিয়া নোমান ফয়জী, সহকারী অর্থ সম্পাদক হাফেয মুহাম্মদ ফয়সাল ও আলহাজ্ব মুহাম্মদ আহসানুল্লাহ প্রমুখ।

বৈঠকে সংগঠনের নায়েবে আমীর মাওলানা আতাউল্লাহকে সিনিয়র নায়েবে আমীর, সহকারী মহাসচিব মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী, মাওলানা শফিক উদ্দীন, মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী ও মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবীকে যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে মনোনীত করা হয়।

এছাড়া সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির পরিধি আরও বৃদ্ধি করে ২০১ সদস্য বিশিষ্ট করা হয়।

তবে একটি সূত্র জানিয়েছে – মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবকে নিয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের মাঝে এক ধরনের অস্বস্তি ও চাপা ক্ষোভ দেখা গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা।

জানা যায়, ২০১৩ সালে ঢাকার মতিঝিলে অবস্থান কর্মসূচিকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার পরপরই ঢাকা ছেড়ে লন্ডন পাড়ি জমান তিনি। এছাড়া আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যুর পর এক স্মরণসভায় তার ভাষণ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল।

প্রসঙ্গত : হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমীর দেশ বরেণ্য শীর্ষ আলেম আল্লামা শাহ্ আহমদ শফি রহ. চলতি বছরের গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার পর হেফাজতের আমিরের পদটি শূণ্য হয়। এরপর গত ১৫ নভেম্বর হাটহাজারী মাদরাসায় হেফাজতের নতুন কমিটি গঠন করা হয় তখনকার মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে আমীর এবং হেফাজত ঢাকা মহানগরীর সভাপতি আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীকে মহাসচিব করে।

এছাড়াও পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের আলেমদেরকে জায়গা দেয়া হয়। বিশেষ করে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের একাধিক নেতাকর্মীরা হেফাজতে ঢালাওভাবে পদ পান যা হেফাজতে নতুন সিন্ডিকেট হয়েছে মর্মে সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো। নতুন এ কমিটিতে হারুণ ইজহারকে তার সাবেক পদ ‘সাহিত্য সাংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক’ হিসেবে বহাল রাখা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হেফাজত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছেন – মুফতী হারুণ ইজহার সাংগঠনিক সম্পাদক পদটির প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তবে এ বিষয়ে হারুণ ইজহারের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হেফাজত সম্পর্কে অনুসন্ধানে জানা যায় – ২০১০ সালের দিকে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির বিরোধিতার মধ্য দিয়ে হেফাজতের আত্মপ্রকাশ হলেও সংগঠনটি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে ১৩ দফা দাবিতে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে ৫ মে শাপলা চত্বর অবরোধের মাধ্যমে।

প্রতিষ্ঠা ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় – ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয়েছিল চট্টগ্রাম কেন্দ্রীক কওমী মাদরাসাভিত্তিক অরাজনৈতিক ইসলামী সংগঠন হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ। যদিও বা পরে অরাজনৈতিক এ সংগঠনটি রাজনৈতিক ফ্যাক্টরও হয়ে দাঁড়ায়।

হটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফিকে আমির ও মাদ্রাসার তৎকালীন সিনিয়র মুহাদ্দিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে মহাসচিব করে হেফাজতের ২২৯ সদস্যের মজলিশে শুরা কমিটি গঠন করা হয়েছিল সেই সময়।

তবে একটি সূত্র থেকে জানা যায় – হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ছিলেন আল্লামা সুলতান যওক নদভী। কিন্তু পরবর্তিতে তেমন কোনো আলোচনা ছাড়াই আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে মহাসচিব বানানো হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধানেও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে তৎকালিন সময়ে মহাসচিব বানানোর কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। তার আগে চট্টগ্রামের প্রবীণ আলেম মাওলানা আ. মালেক হালিমও হেফাজতের মহাসচিব ছিলেন বলে একটি তথ্য পাওয়া যায়। তবে আল্লামা শফী ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বেই হেফাজত অনন্য উচ্চতায় পৌছায়।

আল্লামা আহমদ শফী রহ. এর জীবদ্দশায় শেষ সময়ে হেফাজতের মধ্যে একটি সিন্ডিকেট ছিলো বলে অভিযোগ করা হয়। সে সিন্ডিকেটের আওতায় হেফাজত পথচ্যুত হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। হাটহাজারী মাদরাসায় একটি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই সিন্ডিকেটের পতন হয়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে। অপরদিকে সে আন্দোলনে আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী রহ. এর দূর্ব্যবহার করা সহ হাটহাজারী মাদরাসায় আল্লামা শফীর রুম ভাংচুর ও বেশ কয়েকজন শিক্ষকের রুম ভাংচুরের অভিযোগ রয়েছে। এরপর আল্লামা শফী রহ. এর ইন্তেকালের পর গত ৩ অক্টোবর ঢাকায় হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগরের আয়োজনে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে বিশাল গণসমাবেশের মাধ্যমে হেফাজতের নতুন জাগরণ হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে এ সমাবেশেও হেফাজত ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারির উপস্থিত না থাকা নিয়েও তখন কিছুটা আলোচনা সমালোচনা শোনা গেছে বিভিন্ন মহলে।

পরবর্তিতে ১৫ নভেম্বর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বে হেফাজতের নতুন কমিটি গঠিত হলে সবাই-ই নতুন করে আশার আলো দেখেছিলেন। তবে মুফতী হারুণ ইজহারের সাম্প্রতিক সময়ের লেখাটি হেফাজত নিয়ে নতুন করে আলোচনার পথ তৈরি করে দিয়েছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।

প্রতিবেদন : পাবলিক ভয়েস ডেস্ক।
বিন্যাস সম্পাদনা : হাছিব আর রহমান।

মন্তব্য করুন