আলোচিত হাফিজুর রহমান ও কিছু ঘটনাপ্রবাহ

প্রকাশিত: ৯:০৯ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৫, ২০২০

প্রথমত : হাফিজুর রহমান সিদ্দিকী সাহেব কওমীর সম্পদ। এটা আপনাকে আগে মেনে নিতে হবে। যদি না মানতে পারেন তাহলে আপনার সাথে কথা বলা আগেই বন্ধ এ ইস্যুতে।

দ্বিতীয়ত : তিনি একজন প্রবল জনপ্রিয় মানুষ এটাও আপনাকে স্বীকার করতে হবে। তিনি অনেকের জন্যই ইনফ্লুয়েন্সার এটাও মানতে হবে। না মানলেও ওই একই কথা। আলাপ আগাবে না।

এই দুটো জিনিস মেনে তারপর আলাপে আসতে পারলে পরের কথাগুলো বুঝতে আপনার সুবিধা হবে। কারণ এখানে হাফিজ সাহেবকে নিয়ে বিগত সময় থেকে এ পর্যন্ত কিছু কথা আসবে। তার আগে এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী সাহেবকে নিয়ে দুটো কথা বলি। যেহেতু বর্তমান সর্বশেষ বিতর্কটা তাকে জড়িয়ে।

এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী সাহেব। খুবই কম জানাশোনা উনার ব্যাপারে আমার। একদমই কম। পরিস্কারভাবে জানিও না উনি কোন আকিদার মানুষ। তবে তিনি নিরেট কওমিয়ান বা দেওবন্দি নন এটা জানি আমি। এবং খুব ভালো শিক্ষিত মানুষ এটাও জানি। তাছাড়া উনাকে আমি চিনি ফেসবুকে বিভিন্ন বয়ানের ক্লিপস থেকে। কওমি কয়েকজন আলেমের সাথে একটা বাহস নিয়েও তার ব্যাপারে আলোচনা শুনোছিলাম একবার। তবে কোনো বয়ান তেমনভাবে শুনছি বলেও মনে পড়ে না। শোনার মধ্যে শাহরিয়ার কবিরের সাথে উনার টক-শো-টাই পুরোপুরি শুনেছি বলা চলে। (এটা নিয়ে মূল্যায়ন পরে দিচ্ছি।)

যেহেতু তিনি মাহফিলে প্রচুর ফিকহি মাসয়ালা বয়ান করেন এবং মাহফিল মঞ্চে প্রশ্নের আদলে কাগজের টুকরা পেয়ে ধুমধাম ফয়সালা দেন তাই উনাকে শুরু থেকেই পছন্দ করি না। পছন্দ না করার অন্য কোনো কারণ নেই। কারণ এটুকুই। সেইম এ কারণটাতে আমির হামজাসহ অনেক বক্তাকেই আমি পছন্দ করি না। তাছাড়া আব্বাসী সাহেবের বয়ানের ক্লিপসগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই আসতো কাফের ফতোয়া দেয়ার বিষয়গুলোই।

সেখান থেকে দেখলাম – তিনি মিজানুর রহমান আজহারী, তাবলীগ, কওমী, চরমোনাই সবাইকেই মোটামুটি ছোটোখাটো ভাবে হলেও কাফের আখ্যা দিয়েছেন বিভিন্ন ইস্যুতে। আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী রহ. এর বলা কথা, মাওলানা মামুনুল হকের বলা কথা বিষয়ে কাগজে লিখে উনাকে জিগেশ করা হলেও তিনি কাফের আখ্যা দিয়েছেন দেখলাম। কাফের আখ্যা দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি বেশ কঠোর দলিল-আদিল্লাও চাপিয়ে দেন। মাঝে মাঝে তো বলতেন – যারা কাফের বলবে না তারাও কাফের! সেই কুফুরি আখ্যা দেওয়া থেকে তিনি সরে এসেছেন এবং মিলাদুন্নবীসহ কিছু ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তিনি উলামায়ে দেওবন্দিদের সাথে তার দূরত্ব দূর করেছেন এমনটা কোথাও পাইনি এখনও।

তবে ১৩ সালে হেফাজতের অবরোধ, লংমার্চ নিয়েও তিনি বেশ পক্ষের অবস্থানে ছিলেন। তেমন একটা ভিডিও বক্তব্যে তার পাশে ইসলামী আন্দোলনের এটি এম হেমায়েত উদ্দিন রহ. কেও দেখেছিলাম। এসবের মধ্যেই ভাস্কর্য ইস্যুতে তিনি আলোচনায় এসেছেন ভাস্কর্য নিয়ে বেশ স্পষ্ট অবস্থান প্রকাশ করে। আওয়ামী ঘরাণার সাংবাদিক নাইমুল হকের সাথে প্রথম টক-শোতে তিনি বাজিমাত করেছেন। মোটামুটি প্রশংসা পেয়েছেন। এরপর শাহরিয়ার কবিরের সাথে টক-শো টাতে তিনি প্রবল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। কিন্তু শাহরিয়ার কবিরের সাথে টক-শোতে তিনি শাহরিয়ার কবিরকে তেমনভাবে আক্রমন করেননি তাছাড়া সেখানে সঞ্চালক ছিলো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থানে। শাহরিয়ার কবিরও তেমন একটা কঠোর আক্রমনাত্মক ভূমিকায় ছিলো না। তবে সে টক-শোতে তিনি ‘জামায়াত এবং জামায়াত প্রতিষ্ঠাতা মওদূদি মরহুমের সাথে হক্কানী আলেমদের সম্পর্ক নেই’ এটা বলে শাহরিয়ার কবিরের জামায়াতফোবিয়াটাকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে আটকে দিয়েছেন। যে কারণেও সে আর কথা আগাতে পারেনি তেমন। এছাড়া যা কথাবার্তা তিনি বলেছেন সেগুলো গোছালো এবং কিতাবি কথা। এগুলো খুব বেশি মাত্রাতিরিক্ত আকারে প্রশংসা পাওয়ার কিছু না মনে হলো। কিন্তু টক-শো-তে আমার দৃষ্টিতে প্রশংসার মূল বিষয় হলো – তিনি টক-শোতে খেই হারাননি। শাহরিয়ার কবিরকে রেখে রেখে ভদ্রতার সাথে খেয়েছেন। যেটা আমাদের হুজুররা টক-শোতে গেলে প্রায়ই হারিয়ে ফেলেন। এমনকি সেই খেই হারানোটাকে ফেসবুক প্রজন্ম পছন্দও করে। ১৩ সালের দিকে হেফাজত নিয়ে মঈনুদ্দিন রূহী এবং সাখাওয়াত রাজী সাহেবের টক-শোগুলোতে তারা খেই হারাতেন। আমরা সেটা পছন্দও করতাম। কিন্তু এখানে এসে আব্বাসী সাহেবের ভদ্রোচিত অবস্থান তারা কিভাবে পছন্দ করলো সেটা এখনও রহস্য আমার কাছে।

বলতে গেলে আব্বাসী সাহেবের এই টক-শো-টার পরেই তিনি সবার প্রশংসা পেয়েছেন। যাদেরকে ধুন্ধুমার কাফের আখ্যা দিতেন তারা সবাই-ই তার প্রশংসা করেছেন। এটা তার জন্য শিক্ষার বিষয়। এটা থেকে তিনি শিক্ষা নিলে তার সাথে অন্তত বিভেদ কমে যেতে পারে দেওবন্দি আলেমদের। যা এখন খুবই দরকার। সাথে সাথে তার সেই তাকফিরি মনোভাবগুলো ভুল ছিলো এটা তিনি হালকা করে বলে দিলে আরও সুন্দর হবে বিষয়গুলো। দূরত্ব দূর হতে সময় নেবে না।

এ ক্ষেত্রে ড. জাকির নায়েকের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। জাকির নায়েককে আহলে হাদিস নামের ফেতনাবাজ দলটি মাযহাববিরোধী অবস্থানের জন্য ব্যবহার করতো কিন্তু তিনি মাযহাব নিয়ে তার সুন্দর মনোভাব প্রকাশ করে অনেক ইখতেলাফাত কমিয়ে এনেছেন। আব্বাসী সাহেবও এটা করতে পারেন। তিনি কিন্তু জাকির নায়েককেও যা তা বলতে দ্বিধা করেননি এক সময়।

মোটামুটি এসব বিষয়গুলো ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত আব্বাসী সাহেবের খুব বেশি প্রশংসা করার পক্ষে আমি না। তাতে তিনি যত টক-শো করুক না কেন। যার সাথেই বিজয়ি হয়ে আসুক না কেন। যদিও আমাদের কাছে যে কোনো বমপন্থীর সাথেই যে কোনো ডানপন্থীর আলাপ বা টক-শো-তে ডানপন্থী ব্যক্তিই সব সময় বিজয়ী থাকে। সে বিজয়ে তেমন কোনো প্রশংসা করিও না আমি। এগুলো খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বরং এসবে চুপ থাকাটাই বেটার। প্রশংসাও না আবার দোষচর্চাও না। এটাই অবস্থান। যদিও আব্বাসীর যাকে তাকে কাফের বলার গোস্তাখি নিয়েও তার কোনো সমালোচনা কখনও করিনি। কারণ এসব ফিকহি বিষয় নিয়ে আমি লেখিই না বলতে গেলে। এগুলো ফিকহ নিয়ে যারা ঘাটেন তাদের কাজ।

তাছাড়া যারা তার খুব বেশি প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে তারা আবেগে ভাসে সবকিছু নিয়েই। একটা হুজুগ দেখে প্রশংসায় ভাসাটাই স্বভাব তাদের। তবে এ আবেগের বিপক্ষে দাড়ালেও খুব একটা উপকার হয় না দূরত্ব সৃষ্টি ছাড়া। তাই সমাধান হলো – চুপ থাকা। কারণ আবেগীরা যথা সময়ে তাদের আবেগ বুঝতে পারে। তারাও চুপ হয়ে যায় এক সময়। মাঝখানে আবেগের মূলধন দিয়ে কিছু মানুষের পকেট ভারি করে রেখে যায়। রেখে যাক! সমস্যা তো নাই।

  • এবার খুব সংক্ষেপিত আকারে আসি হাফিজুর রহমান পয়েন্টে :

হাফিজুর রহমান সিদ্দিকী সাহেব আমার জন্য ইনফ্লুয়েন্সার কেউ না। আমি উনার বক্তব্য শুনে ইনফ্লুয়েন্স হয়েছি বা কোনো কিছুর প্রতি তার বক্তব্যের কারণে পছন্দ তৈরি হয়েছে এমন কিছু নেই। একজন অ্যাভারেজ বক্তা তিনি আমার কাছে। কাছাকাছিও যাওয়া হয়নি তার খুব একটা। সব মিলিয়ে দুবার দেখা হয়েছে সম্ভবত। তাও চলতে-ফিরতে হাটতে হাটতে।

কিন্তু ফেসবুকে তাকে নিয়ে আমি চার পাঁচটা পোস্ট ঠিকই করেছিলাম। পক্ষ হয়ে। তাকে নিয়ে খুব বেশি সমালোচনার সময়টাতে তার পক্ষে থাকার চেষ্টা করেছি। তার ভাই হাবিবুর রহমান মিছবাহ সাহেবকে তার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করার কথা বলেছি। তিনিও চেষ্টা করেছেন সব সময়। পাবলিক ভয়েসেও তার পক্ষ নিয়ে নিউজ, প্রতিবেদন আছে বেশ কয়েকটি। সবগুলোই আমার করা।

আরও পড়তে পারেন : 

একজন সিদ্দীকির উসীলায় হাজার মানুষ দীনের পথে এসেছে : হাবিবুর রহমান মিছবাহ

মাহফিলেই নিজ বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন হাফিজুর রহমান সিদ্দিক

ভোলায় হাফিজুর রহমানের মাহফিল জনসমুদ্রে পরিনত

বগুড়ায় দিনের বেলা হাফিজুর রহমান সিদ্দীকের মাহফিল জনসমূদ্রে পরিণত

হাফিজুর রহমান প্রবল জনপ্রিয় এবং বিরাট একটা মহলের জন্য ইনফ্লুয়েন্সার এটা মানতেই হবে। এ দেশের সর্বপ্রভাবের বক্তাদের মধ্যে তিনি একজন এটা সর্বসত্য কথা। তাই উনার কিছু কিছু ভুল খুব বড় করে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করার প্রবনতা তৈরি হওয়ার পেছনে তার সেই জনপ্রিয়তাটাও অনেকাংশে দায়ী!

বাংলাদেশে বক্তাদের আবেদন কেবল স্টেইজ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের দিকে তাকালেই সেটা বুঝতে পারবেন। তিনি রাজনৈতিক প্রভাবের ব্যক্তি ছিলেন তার বক্তা ইমেজের মাধ্যমেই। যে কারণে তিনি রাজনৈতিক সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন একটি দলের হাতে। আযহারি, হাফিজুর রহমানও তেমনিভাবে রাজনৈতিক প্রভাব রাখতে পেরেছেন তাদের বয়ানে। যে কারণে হাফিজুর রহমানও রাজনৈতিকভাবে বাধার সম্মুখিন হচ্ছেন যেমনটা কিছুক্ষেত্রে হয়েছেন মিজানুর রহমান আজহারী সাহেবও। এখানে যার যেভাবে মনে হচ্ছে যে উনারা আমাদের (দলের) জন্য ক্ষতির কারণ হচ্ছেন তারাই সেভাবে বিরোধীতা করছেন।

আপাতত এই রাজনৈতিক প্রভাবটা হাফিজুর রহমানের জন্য কাল হয়েছে ভাবতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে তিনি বাতিলের আক্রমনের শিকার যতটা না হয়েছেন তার চেয়ে বেশি হয়েছেন নিজেদের দ্বারা। একটু যদি পেছনে যান তাহলে দেখবেন বাংলাদেশে কওমী অঙ্গনে রাজনৈতিক বিভেদ অনেক পুরনো। সেই বিভেদে হাফিজ সাহেবকে জড়ানো হয়েছে বেশ সুকৌশলে।

আরো ক্লিয়ার করে বললে একটি দলে তার সম্পৃক্ততা থাকার কারণে এটা আরও বেশি হয়েছে। তাছাড়া তার ইনফ্লুয়েন্সিভ ভূমিকার কারণটাও নিতে পারেন এখানে। এই জড়ানোতে রয়েছে জামায়াত শিবিরের অনলাইন প্রভাব, নতুন করে যুক্ত হয়েছে একটি বক্তা সিন্ডিকেটের প্রভাব আরও রয়েছে সরকারবিরোধীতার ধোয়া তোলা একটি অংশের প্রচেষ্টা।

ধোয়া তোলা শব্দটা ব্যবহার করেছি কারণ হলো – যারা সরকারবিরোধীতার পয়েন্টে হাফিজ সাহেবকে সরকারঘেষা দাবি করে সমালোচনা করেন তারা সরকার থেকে আরও বেশি সুবিধাভোগী। এ ক্ষেত্রে তারা তাকে থামাতে চায় তার ইনফ্লুয়েন্সিভ ভূমিকার কারণেই।

তবে এখানে ফেসবুকে তার বিপক্ষে ভূমিকা রাখা বা লেখালেখি করা বড় একটা অংশই এসব কঠিন পলিটিক্স না বুঝেই লেখে, না বুঝেই বলে। তাদের ভালো লাগে স্রোতে ভাসতে তাই ভাসে।

আরও পড়ুন : 

ফটিকছড়িতে দ্বিতীয়বারের মত বন্ধ হলো হাফিজুর রহমান সিদ্দিকীর মাহফিল

তবে এসবের মধ্যে হাফিজ সাহেবের দোষ যে একদম নেই তা কিন্তু নয়! তিনি হয়ত নিজের অজান্তেই তাদেরকে বিরোধিতা করার অস্ত্র তুলে দিয়েছেন। আযহারিকে জড়িয়ে আযহারির অন্ধ ভক্তদের ‘ওরে বাটপার’ বকা দেওয়া, মালয়েশিয়ায় খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী সাহেবের সাথে কিছুটা অনাকাঙ্খিত আচরণ হয়ে যাওয়া, বি-বাড়িয়ায় মামুনুল হক সাহেবকে নিয়ে অযাচিত মন্তব্য করা, ভাস্কর্য ইস্যু নিয়ে অগোছালো কথা বলা, সর্বশেষ আব্বাসীকে নিয়ে অপরিনামদর্শী কিছু বলা এসব ছিলো তার ভুল পয়েন্টের মধ্যে অন্যতম।

কিন্তু এগুলো প্রতিটি পয়েন্টই বিশ্লেষণযোগ্য ও ব্যাখ্যার দাবিদার ছিলো। কিন্তু সেই বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার ইনসাফ তার প্রতি করা হয়নি কখনও। হবেও না। কারণ তিনি ইনফ্লুয়েন্সার, প্রভাবক। ফেসবুক পাবলিকও সেই ব্যাখ্যার ধারে কাছে যায়নি কোনো সময়। কারো ক্ষেত্রেই যায়নি তারা। তারা তার সমালোচনাটাকেই ব্রত হিসেবে নিয়েছে। অনেকে তো গালী, বিকৃতি এসবও করছে। ব্যাঙ্গ করে ফটো বানানো থেকে শুরু করে প্রতিবাদের নামে সরাসরি হারামে লীপ্ত হতেও দ্বিধা করছে না।

ধরেন হাফিজ সাহেবকে নিয়ে চারটা পয়েন্ট আলাপে আনি :

১. ওরে বাটপার… এই শব্দটা শুনতে খারাপই শোনা যায়। বলার ভঙ্গিও ওনার ভুল ছিলো। কিন্তু উনি কী ঘুনাক্ষরেও এ শব্দটা আযহারিকে বলেছেন? বলেননি! খুব সিম্পল ভাবেই তিনি এটা তাদেরকেই বলেছেন যারা অন্য আলেমরা হেলিকপ্টারে উঠলে বলে হেলিকপ্টার হুজুর আর আযহারি কপ্টারে উঠলে বলে ‘আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা’। এই ডাবল স্টান্ডার্ডবাজী যারা করে তাদেরকে ‘বাটপার’ বলেছেন। এখন আমি একটু ভদ্রতার সাথে ইংরেজি মিলিয়ে ‘ডাবল স্টান্ডার্ডবাজী’ বলেছি আর তিনি সোজা বাংলায় ‘বাটপার’ বলেছেন। দোষ এটাই! কিন্তু সেটাকে চরমভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে আযহারিকে জড়িয়ে এমনভাবে প্রচার করা হয়েছে যে দেশের একটি বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ডিন পর্যন্ত একদিন আমাকে এটার ব্যাখ্যা জিগেশ করে বসছেন। ভাবতে পারেন আপনি!

এটা কারা করেছে আপনারা ভালো করেই জানেন এবং বুঝেন। কোনো রাখঢাক ছাড়াই এটা তারা করেছে। কিন্তু যেহেতু হাফিজ সাহেবের বলার ভঙ্গিতে এবং শব্দচয়নে দোষ আছে তাই চুপ করে থাকা ছাড়া উপায় ছিলো না। ফলাফলে যারা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার করতে চেয়েছে তারা সফল হয়েছে। কিন্তু ইনসাফের দাবি ছিলো তাদের এই ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচারের বিষয়টিও প্রতিবাদ করা। তাদেরকে বলা যে – আপনারা একটি ভুলের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরও কয়েকটি ভুল ও অন্যায় করছেন। যা ইনসাফের দাবি নয়। কিন্তু কেউ বলেনি তাদের এটা। বললে দূরত্ব বাড়তো না আর।

২. মামুনুল হক সাহেবকে নিয়ে বি-বাড়িয়ার মন্তব্য.. এখানেও হাফিজ সাহেবের ভুল আছে এবং ফলাফলে তার সাথে বেইনসাফিও হয়েছে! আগে ভুলের বিষয়টা দেখাই!

প্রথমত : তার এই বলাটাই ছিলো ভুল। কিন্তু যেগুলো বলেছেন সেগুলো তিনি করেছেন বা করবেন বিষয়টি মোটেও তা নয় বরং তিনি কারো কাছ থেকে শুনে সেগুলো বলেছেন। যখন এটি অনলাইনে এসেছে তার মিনিট দশেকের মধ্যেই যে কোনো ভাবেই হোক আমি সিসি ক্যামেরার ফুটেজটি পেয়েছিলাম। তিনি যে এসব মন্তব্য করেছেন তা শিওর হয়েছিলাম। সাথে সাথে হাফিজুর রহমানের সাথে থাকা এক খাদেমকে ফোন করেছিলাম পরামর্শ দিতে। তিনি আমাকে হাফিজ সাহেবের সাথে কথা বলতে দেবেন বলে আর দেননি। দুবার ফোন করেও তাদের নাগাল পাইনি আর। আমিও আর গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু কিছুক্ষন পরই একজনকে (ডা. ইবরাহীম খলিল নামে একজন) দিয়ে কল রেকর্ড প্রচার করিয়েছেন যে তিনি (হাফিজ সাহেব) এমন কথা বলেননি! যে প্রচার করেছে সে আবার মামুন সাহেবদেরকে কড়া আক্রমন করে এটা প্রচার করেছে। তখনই হেসেছি মনে মনে যে হাফিজ সাহেব তো লজ্জিত হবে! হয়েছেও কিন্তু। তবে মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ সাহেবের মাদরাসায় মাওলানা মামুনুল হক সাহেবসহ এটার সমাধান হয়েছে। হাফিজ সাহেবকে সেখানে তারা মাফ চাওয়াইছেন। তিনি মাফও চেয়েছেন। লাইভ করেছেন তারা। লাইভে মামুনুল হক সাহেব সব কথা বলেছেন। লজ্জায় হাফিজ সাহেব কথাও বলেননি।

কিন্তু এরপরই মিজান সাহেবের মাদরাসা থেকে বের হয়েই সেই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ তারা (যারা এটা অনলাইনে প্রথম এনেছে) পাবলিস্ট করে দিয়েছেন। হাফিজ সাহেবের প্রতি আক্রমনের মাত্রা আরও বাড়িয়েছেন। সমাধান হওয়া একটা বিষয় নিয়ে এভাবে এমন কাজ করাটা অবশ্যই বেইনসাফি এবং অমানবিক ছিলো।

শেষ এখানেও হয়নি! কয়েকদিন পর মাওলানা মামুনুল হক সাহেব এক লাইভে এসে আবারও ইশারায় হাফিজ সাহেবকে কিছু বলেছেন। কী একটা যেন স্পর্শকাঁতর বিষয় নিয়ে হাফিজ সাহেবকে দোষারোপ করেছেন। ফলাফলে সেখানের কমেন্টবক্সেও হাজার হাজার কমেন্ট গেছে হাফিজ সাহেবের বিপক্ষে। বিপক্ষ দল আবারও খোরাক পেয়েছে কথা বলার।

এখানেই শেষ নয়! বারিধারা মাদরাসায় আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেবের ইন্তেকালের দিন (রাতে) মাওলানা মামুনুল হক সাহেবের সাথে হাফিজ সাহেব দেখা করতে চাইলেও দেখা দেননি মাওলানা মামুনুল হক। বরং যে রুমে মামুনুল হক সাহেব ছিলেন সে রুমে হাফিজ সাহেব প্রবেশের সাথে সাথেই তিনি বের হয়ে গেছেন। এমনটাই ঘটে আসছে বারবার। তাছাড়া হাটহাজারী পার্বতি স্কুল মাঠে আল আমিন সংস্থার মাহফিল থেকে হাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়াসহ অনেক কিছুই আছে আরও।

কিন্তু এখানেও যেহেতু হাফিজ সাহেব ভুল করেছেন এবং এমন আচরণ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। মামুনুল হক সাহেব উনাকে মাফ করেননি বলে তিনিও দোষী না বরং উনারও হয়ত তিক্ততা আছে। রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ আছে। যা অপরাধ নয়। তাই কিছু বলার নেই কারোরই। কাউকেই। তবে মিমাংসিত একটা বিষয় নিয়ে এতকিছু হওয়া বেইনসাফি ছিলো তা কিন্তু কেউ বলেনি কখনও। বললে হয়ত দূরত্ব এত বাড়তে পারতো না।

৩. মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী সাহেবের সাথের ঘটনা… এ ঘটনাটা পুরোপুরি অনুসন্ধান নাই আমার। তবে আইয়ুবী সাহেবের যে কল রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছে তাতে তিনি হাফিজ সাহেবকে ফেরআউনের সাথে তুলনা করেছেন। তার সাথে কোনোদিন মিশবেন না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন। (আইয়ুবী সাহেব আমার সবচেয়ে পছন্দের ও মুহাব্বাতের মানুষদের একজন। উনাকে শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি।) দীর্ঘ সেই ফোনালাপে কতটা কঠোরতা হাফিজুর রহমানের প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে তা এসবে যারা সংশ্লিষ্ট তারা সবাই-ই মোটামুটি জেনেছেন। এরপর এলো রাবেতা নামে ওয়ায়েজদের একটি উপগ্রুপ। যে গ্রুপের ব্যানারে সর্বপ্রচেষ্টায় হাফিজ সাহেবের বিরোধিতার বিষয়টিও অপেন সিক্রেট এখন। হয়ত এসবের হকদ্বার হাফিজ সাহেব ছিলেন। কিন্তু তালি তো এক হাতে বাজেনি কখনও বরং উভয় হাত মিলেই বেজেছে।

ফলাফলে আইয়ুবী সাহেবের সাথেও তিনি আর মেলেননি। তারা (রাবেতার বেশিরভার প্রথম সারীর দায়িত্বশীল) আর হাফিজ সাহেব এক মঞ্চেও কখনও বসেননি আর। এটাই নিয়তি। কিন্তু কেউ যদি উভয় পক্ষকে যারা যার মূল্যায়ন ঠিক রেখে মিলায়া দিতো তাহলে দূরত্ব এ পর্যায়ে আসতো না।

এই যে তিনটি ঘটনা.. হাফিজুর রহমানের সাথে এই তিন ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন তিন গ্রুপের সাথে ঘটেছে। তাদের বিরাট একটা অনলাইন সমর্থক আছে। তারা সম্মিলিতভাবেই সুযোগে সুযোগে হাফিজ সাহেবের টুকরো টুকরো ভুলকে সামনে এনেছে। ভাস্কর্য ইস্যু এবং আব্বাসী ইস্যুতে যা বিস্ফোরণ ঘটেছে।

৪. ভাস্কর্য ও আব্বাসী নিয়ে তার বক্তব্য… এ বক্তব্য দুটোই বিশ্লেষণ ধরণের ছিলো। ভাস্কর্য নিয়ে বিশ্লেষণটাও ভুল নয়। কিন্তু বলার সময়টা ভুল। একদমই ভুল। সেই ভুলকে সঠিক প্রমানে তিনি দ্বিতীয় আর একটা বক্তব্য দিয়েছেন আর এক মাহফিলে। সেটাও ভুল ছিলো। আব্বাসী নিয়ে তার বক্তব্যটাও ভুল মনে হয়নি। যা আমি উপরেও লিখে এসেছি। কিন্তু বক্তব্যের সময়টা ভুল ছিলো। এখানে এসে চুপ থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ ছিলো। যেমন আব্বাসী সাহেবের এত এত প্রশংসার মধ্যেও মামুনুল হক সাহেবকে দেখিনি তার প্রশংসা করে ফেসবুক পোস্ট করতে। বরং তিনি চুপ ছিলেন। কিন্তু হাফিজ সাহেব মাহফিলে গিয়ে তার ব্যাপারে নেতিবাচক কথা বলতে গেলেন। বলার সময় ও ধরণটা অবশ্যই ভুল ছিলো। যারা তাকে এই বক্তব্য এ সময় দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে তারাই মূল দোষী। তারাই অপরাধী। আর নিজ থেকে দিয়ে থাকলে তো কথাই নেই। তিনিই দায়ী।

  • একটা বিষয় হলো – সঠিক সত্য কথাও গোছায়া না বললে উপকার হয় না বরং ক্ষতি হয়। যে ক্ষতিটার মুখোমুখিই এখন সবাই হচ্ছে। যা আমরা চাই না। আমরা চাই সবাই যার যার মতবিরোধের সাথেই থাকুক। ভক্তকূল উসকে যাওয়ার খোরাক না পাক।

এখন ধরেন – এই যে বিশাল একটা লেখা। এক ঘন্টা লেগেছে লিখতে আমার। পুরোটা কতজনে পড়েছেন তা জানি না। এ বিষয়ে কিছু বলতে কতজন পুরো লেখা পড়ে আসবেন তাও জানি না। এই লেখার প্রভাবে যারা হাফিজুর রহমানের গোষ্ঠি উদ্বার করে গালী দেয়, ট্রল করে, অযৌক্তিক বিদ্ধেষমূলক সমালোচনা করে, নাম-ছবি বিকৃত করে তারা কী ঠিক হয়ে যাবে? না! মোটেও ঠিক হবে না। এমনকি তারা এখন এসে আমাকেও গাইলাবে হয়ত।

কিন্তু তারপরও কেন লিখেছি!

লিখেছি দরদ থেকে, ভালোবাসা থেকে। একক হাফিজ সাহেবের প্রতি না বরং সবার প্রতি। এই দূরত্ব আমাদের সত্যিই ভালো লাগে না। বাংলাদেশে ওয়াজের ময়দান এখন ধিরে ধিরে কঠিন থেকে কঠিনতার দিকে যাচ্ছে। সে সময়ে এসে এমন বহুধা বিভক্ত অবস্থা খুবই খারাপ দিকে যাবে। সবার মনের কষ্টের কারণ হবে। তাই আপনজন হিসেবে হাফিজ সাহেবের কাছ থেকেই আমরা ত্যাগ ও ধৈর্যটা চাই।

সে জায়গা থেকেই হাফিজুর রহমান সাহেবের প্রতি কিছু আন্তরিক পরামর্শ :

এক. আপনার ভাইদের সাথে দূরত্ব কমিয়ে আনুন। আপনার বিপদে তাদের পাশে রাখুন। তাদের বিপদে আপনি পাশে থাকুন। অনেক সমস্যা অনায়াসে সমাধান হবে।

দুই. খাদেম বা আশেপাশের লোকদেরকে তাদের লিমিটেশন বুঝান। লিমিট ক্রস করতে দেখলে বাধা দিন। আপনার জন্য ভালো হবে।

তিন. ওয়াজ এবং বয়ানটাকে নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন। যে বিষয়ে মনের মধ্যে ক্ষোভ আসে সে বিষয়টা ওয়াজে টাইনেনই না একদম। সেটাকে নিজের মধ্যেই রাখুন বা নিজেরা নিজেরা কথা বলে রাগ শেষ করুন।

চার. আপনার একটা ‘আহ’ শব্দও এমনকি নিঃশ্বাস পর্যন্ত রেকর্ডেট – এটা মাথায় রাখুন।

পাঁচ. যাদের সাথেই যখন যেভাবে দূরত্ব হয়েছে সবার প্রশংসা করুন নয়ত একদম চুপ থাকুন। নিজের কাজ নিজে করুন।

ছয়. সবার সাথে মিশুন। সবার কথা শুনুন। সবাইকে ডাকুন। সবাইকে পাশে রাখার চেষ্টা করুন। বিশেষ করে যারা আপনার ভক্ত তাদের সাথে হাসিখুশি কথা বলুন। হয়ত ভাবতে পারেন – মিশলে ওয়েট কমে যাবে, গুরুত্বহীন হয়ে পড়বেন। মোটেও তা নয় বরং এটা গুরুত্ব আর ওয়েট বাড়াবে অনেক।

সাত. আমার এই লেখাটা কিছুটা বেআদবি বেআদবি লাগলেও আমাকে ক্ষমা করুন। আমি আপনার এবং আলেমদের শুভাকাঙ্খি এটা বিশ্বাস রাখুন।

লেখক : হাছিব আর রহমান। বি.এ অনার্স, এম.এ মাস্টার্স – চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) – দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী।

[দ্রষ্টব্য : পাবলিক ভয়েসের মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার দ্বায়ভার একান্তই লেখকের। পাবলিক ভয়েসের সম্পাদনা পরিষদ ও পাবলিক ভয়েস কর্তৃপক্ষ এ মতামত কলামের দ্বায়ভার গ্রহণ করে না। মতামত বিভাগে আপনিও আপনার মতামত পাঠাতে পারেন। লেখার মান ও বিষয়বস্তু সঠিক হলে পাবলিক ভয়েসে প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠাতে পারেন এই মেইলে : news.publicvoice24@gmail.com]

মন্তব্য করুন