সাইকেলে চড়ে মাদরাসা ছাত্রের ৬৪ জেলা বিজয় : স্বপ্ন সাইকেলে হজ্বে যাওয়ার

প্রকাশিত: ৫:০৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৫, ২০২০

শুরুটা খুবই সাদামাটা ভাবেই। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে একটি মাইলফলক স্পর্শ করার স্বপ্ন নিয়েই সাইকেলে চড়ে ৬৪ জেলা ভ্রমণ করতে নামেন কওমী মাদরাসাছাত্র আবু হানিফ নোমান। প্রথমে বিষয়টি কেউ সেভাবে সিরিয়াসলি না নিলেও এক মাসের একটু বেশি সময়ে তিনি তা করে দেখিয়েছেন। ঘুরে বেড়িয়েছেন ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই জনপদ।

সবুজ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে স্লোগানকে সামনে রেখে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, রূপসা থেকে পাটুরিয়াসহ বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় বাই-সাইকেল ভ্রমণ ভ্রমণ করেছেন তিনি।

[ঢাকায় সংসদ ভবনের সামনে আবু হানিফ নোমান।]

চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে ক্সবাজারে সমাপ্ত করা এই সাইকেল ভ্রমণে তিনি সময় নিয়েছেন সর্বমোট ৪২ দিন তবে মূল ভ্রমণে তার সময় লেগেছে ৩৭ দিন। বাকি সময়টা বিশ্রামে কাটিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

[চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের ভবনের সামনে আবু হানিফ নোমান।]

আবু হানিফের নোমানের সাথে পাবলিক ভয়েসের পক্ষ থেকে কথা বলে জানা যায় – তিনি ১ নভেম্বর চট্রগ্রাম জেলা থেকে যাত্রা করে ১২ ডিসেম্বর কক্সবাজার এসে ভ্রমণটি শেষ করেছেন। এর মধ্যে তিনি ঢাকা হয়ে দেশের প্রতিটি জেলায় গিয়েছেন। এই পুরো সময়ে সাইকেলের বাহিরে কোন বাহনে তিনি উঠেন নি। সর্বশেষ পার্বত্য তিন জেলা হয়ে কক্সবাজার গিয়ে ভ্রমণটি শেষ করেছেন তিনি। অন্য জেলাগুলোর তুলনায় আকাবাকা পাহাড়ি পথে কিছুটা কষ্ট হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

নোমানের বয়স ২৪ বছর। পিতা কামাল হোসেন। বি-বাড়িয়া জেলার নবিনগর থানার নোয়াগাঁও গ্রামে তার ঠিকানা। তবে বর্তমানে তিনি বি-বাড়িয়া সদরের ভাদুঘরের ঢালিবাড়ি এলাকায় বসবাস করেন।

তিনি একজন কওমী মাদরাসার ছাত্র। জামিয়া সিরাজিয়া দারুল উলুম ভাদুঘর থেকে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে আবু হানিফ নোমান কওমী মাদরাসার সর্বোচ্চ ক্লাশ দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) সমাপ্ত করেন। ধারাবাহিকভাবেই তিনি কওমী মাদরাসায় পড়েছেন বলে জানিয়েছেন। সে হিসেবে তার নাম নাম মাওলানা আবু নোমান।

তিনি পাবলিক ভয়েসের সাথে একান্ত আলাপকালে জানিয়েছেন – সাইকেলে চড়ে পবিত্র হজ পালন করা তার আগামীর স্বপ্ন। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিয়মতান্ত্রিকভাবে যা করা লাগে তিনি করবেন। সাইকেলে চড়ে তিনি হজ্ব পালন করে একটি মাইলফলক স্পর্শ করা ছাড়াও নিজ পরিশ্রমে গিয়ে কাবাঘর স্পর্শ করার অনুভূতি নিতে চান তিনি।

[দেশের একমাত্র দ্বীপজেলা ভোলায় আবু হানিফ।]

‘৬৪ জেলা ভ্রমণে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় কি ছিলো’ জানতে চাইলে আবু হানিফ নোমান পাবলিক ভয়েসকে বলেন – আনন্দের তো অনেক বিষয় ছিল বিশেষ করে আমি যখন সাইকেলে চড়ে চড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছিলাম তখন স্থানীয়সহ অনেকেই পরিচিত হয়েছেন এবং তারা দাড় করিয়ে আমার গল্প শুনেছেন, আমার ব্যাগের মধ্যে খাবার দিয়ে দিয়েছেন। এমনকি পুলিশ ও প্রশাসনের অনেক ব্যক্তিরাও আমাকে বেশ ভাবে সহযোগিতা করেছেন। কেউ কেউ ব্যাগের মধ্যে টাকাও দিয়ে দিয়েছে আমি খরচ করার জন্য। সব মিলিয়ে এই ভ্রমণে আনন্দের অনেক বিষয়ই ছিলো।

[ভ্রমণের সময় স্থানীয়দের সাথে আলাপ করছেন নোমান। তাদেরকে সচেতন করছেন পরিবেশ সম্পর্কে।]

‘এই ভ্রমণে প্রিয় বাংলাদেশকে কেমন দেখলেন’ জানতে চাইলে নোমান পাবলিক ভয়েসকে জানান – সবুজ শ্যামল এই প্রিয় বাংলাদেশ আসলেই অনেক সুন্দর। গ্রামের মেঠো পথ বেয়ে বেয়ে সাইক্লিং করে আমি যখন ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম তখন মনে হচ্ছিল এর চেয়ে সুন্দর কোন জায়গা পৃথিবীতে হতে পারে না। কখনও পাহাড়ি রাস্তা, কখনও মেঠোপথ, কখনও বিশাল হাইওয়েসহ বন-বাদারের পাশ ঘেষে চলে দেশের প্রতিটি বিষয়কে দেখে দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে এই দেশের মতো সুন্দর কিছু নেই। তাই আমাদের সবার উচিত প্রিয় স্বদেশকে ঘুরে দেখা এবং দেশের প্রতি সর্বোচ্চ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বজায় রাখা। বিজয়ের মাসে এত সুন্দর একটি অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে পেরে আমি সত্যিই গর্বিত।

তিনি সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ গড়তে সবার প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন – পরিবেশ বাঁচাতে বেশি বেশি গাছ লাগাবেন সবাই। এছাড়াও বেশ কিছু কাজ করতে সবার প্রতি উৎসাহিত করেছেন তিনি।

  • কাজগুলো হলো –
  • ১টি করে ফলজ ও বনজ গাছ লাগান – অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হউন।
  • পলিথিন ও ওয়ান টাইম প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার পরিহার করুন।
  • ড্রেনে বর্জ্য ফেলা পরিহার করুন।
  • ডাস্টবিন বা নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলুন।
  • দূষিত ও অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করুন
  • কল কারখানার দূষণ রোধ করুন।
  • ইট-ভাটার দূষণ রোধ করুন।
  • পরিবহণের ক্ষতিকর দূষণ রোধ করুন।

আবু হানিফ নোমানের এই বিস্ময়কর কাজে তাকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন অনেকেই। তার ৬৪ জেলা ভ্রমনের এই কাজকে স্বাগত জানিয়ে ইতিমধ্যেই ফেসবুকসহ গণমাধ্যমে অনেকেই তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ গড়ার এই দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ৬৪ জেলার এই সাইকেলিং ভ্রমণ অবশ্যই এ দেশের জন্য মাইলফলক। বিশেষ করে একজন মাদ্রাসা ছাত্রের এমন উদ্যোগ অবশ্যই আলাদাভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। সাথে সাথে তরুণ প্রজন্ম যে সুন্দর পরিবেশ চায় ও প্রিয় স্বদেশকে দলমত, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে ভালোবাসে সেটার একটি বড় প্রমাণ বহন করে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিবেদনটি করেছেন : হাছিব আর রহমান। নির্বাহী সম্পাদক, পাবলিক ভয়েস।

মন্তব্য করুন