বর্তমান হেফাজতে ‘সিন্ডকেট’ ভাঙ্গার আহবান মুফতী হারুণ ইজহারের

নতুন বিতর্কে হেফাজত

প্রকাশিত: ১১:০২ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৯, ২০২০

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদক : 

‘করো সংগঠন, ভাঙ্গো সিন্ডিকেট’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে ‘হেফাজতকে কি আনাড়িই রেখে দেয়া হবে?’ শিরোনামে বেশ কিছু প্রশ্ন রেখে হেফাজতের বর্তমান অবস্থান নিয়ে ফেসবুকে একটি পাবলিক পোস্ট করেছেন হেফাজতের বর্তমান কমিটির সাহিত্য ও সাংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মুফতী হারুণ ইজহার।

ফেসবুক পোস্টে তিনি ভাস্কর্য/মূর্তি ইস্যুতে বর্তমান তোলপাড় অবস্থায় হেফাজতের নিস্ক্রিয় ভূমিকার প্রতি প্রশ্ন রেখে লিখেছেন – ‘এতো তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে, জাতির কাছে আনুষ্ঠানিক কোন বার্তা আমরা (হেফাজত) দিতে পেরেছি? সব দায় কি আমীরের ঘাড়ে চেপে দিয়ে নিজেরা সাধু সেজে থাকবো? এটাতো সেই পুরানো কালচার।’

একই সাথে সেই পোস্টে তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সম্প্রতি হওয়া আলোচিত সংবাদ সম্মেলন বিষয়ে লিখেছেন – সংবাদ সম্মেলন করে সাংগঠনিক পরিপক্বতার মুরোদ দেখালো ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ। ধন্যবাদ নেতৃবৃন্দকে। তারা আরো বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন অন্যদেরকেও সেখানে সম্পৃক্ত করে। এটাই সংগঠন এটাই রাজনীতি।

এছাড়াও তিনি হেফাজতের একজন মফস্বল নেতাকে ‘একহাত’ দিয়ে লিখেছেন – ‘অন্যদিকে মফস্বলে “সিনিয়র নেতাদের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে”  হেফাজতে ইসলাম কি করেছে সেটা ঐ “রুদ্ধদ্বার” নেতারাই বলতে পারবেন!

ধারণা করা হচ্ছে এটার দ্বারা তিনি হেফাজতের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মাওলানা জাকারিয়া নোমানকে উদ্দিশ্য নিয়েছেন। কারণ মাওলানা জাকারিয়া নোমান গতকাল (৮ ডিসেম্বর) ফেসবুকে দু লাইনের পোস্টে লিখেছিলেন – ‘হাটহাজারীতে বর্তমান পরিস্থিতিতে করনীয় নির্ধারণে  হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নেতাদের  রুদ্ধদ্বার বৈঠক।’

হেফাজতের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক জাকারিয়া নোমানের ফেসবুক পোস্টের স্ক্রীনশট।

তবে এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে আমন্ত্রণ পাননি মুফতী হারুণ ইজহার। এমনটাই পাবলিক ভয়েসকে জানিয়েছে হেফাজতের একটি বিশেষ সূত্র। এছাড়াও হেফাজতের বিভিন্ন পদ পদবিগত বিষয় নিয়েও বেশ কয়েকজন নেতাদের সাথে হারুণ ইজহারের অনুসারীদের দূরত্ব রয়েছে বলেও জানিয়েছেন হেফাজতের কয়েকটি সূত্র।

অপরদিকে কওমী মাদরাসার মধ্যে ‘মানহাজি’ নামে খ্যাত নামে একটি গ্রুপ হেফাজতের মধ্যে নতুন সংগঠন তথা ‘যুব হেফাজত’ করারও একটি প্রস্তাব পেশ করেছে ফেসবুকে। মানহাজি হিসেবে ফেসবুকে পরিচিত ‘আলি হাসান উসামা’ তার একটি ছদ্মনাম আইডিতে ফেসবুকে এ পোস্টটি করেছেন।

আলী হাসান ওসামার ছদ্মনাম আইডিতে করা পোস্টের স্ক্রীনশট।

তবে হারুণ ইজহারের সম্প্রতি দেওয়া পোস্ট নিয়ে তোলপাড় চলছে হেফাজত সংশ্লিষ্টদের মধ্যেই। আল্লামা আহমদ শফী রহ. এর ইন্তেকালের প্রায় একমাস পর বহুত কাঠখড় পুড়িয়ে গঠিত হওয়া হেফাজতের কমিটি গঠনের দেড়মাসের মাথায়ই এমন ফেসবুক পোস্টে সবাই বেশ অবাকই হয়েছেন।

তারা বলছেন – মূলত সিন্ডিকেট বিষয়ক ক্ষোভ থেকেই হারুণ ইজহার ফেসবুকে হেফাজত নিয়ে প্রকাশ্যে এমন কথা লিখেছেন।

তবে কেন তিনি এই পোস্ট করেছেন সে ব্যাখ্যায় ফেসবুকেই তিনি লিখেছেন –  ‘আপনারা বলবেন ফেসবুকে এসব আলাপ না করে ভেতরে করা উচিত। হ্যাঁ ভাইজান! কিন্তু “রুদ্ধদ্বার” যোগ্যতা অর্জন ছাড়া তো সেটা সম্ভব না!!! ‘

মুফতী হারুণ ইজহার হেফাজতের মধ্যে বিভিন্ন মুরুব্বিদের নাম ভাঙ্গানো হয় দাবি করে আরও লিখেছেন –  ‘মুরব্বিদের নাম ভাঙ্গার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া চাই, এসবের পরিণতি অশুভ। গুটিকয়েক ছোটমনা লোকের কাছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়কে এভাবে জিম্মি করে রাখা যায় না, ইতিহাস নদীর মত তার স্রোত নিজেই তৈরি করে নেয়।’

হেফাজতকে গোছানোর আহবান জানিয়ে তিনি আরও বলেছেন – ‘ঘর না গুছিয়ে আপনি বাহিরের সঙ্কট সমাধান করবেন? আল্লাহর ওয়াস্তে হুঁশে আসুন। আপনারা কারা? ইতিহাস থেকে বড় বড় রাজ্যের নাম মুছে গিয়েছে এসব হীনমনা চরিত্রের কারণে।’

প্রসঙ্গত : হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমীর দেশ বরেণ্য শীর্ষ আলেম আল্লামা শাহ্ আহমদ শফি রহ. চলতি বছরের গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার পর হেফাজতের আমিরের পদটি শূণ্য হয়। এরপর গত ১৫ নভেম্বর হাটহাজারী মাদরাসায় হেফাজতের নতুন কমিটি গঠন করা হয় তখনকার মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে আমীর এবং হেফাজত ঢাকা মহানগরীর সভাপতি আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমীকে মহাসচিব করে।

এছাড়াও পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের আলেমদেরকে জায়গা দেয়া হয়। বিশেষ করে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের একাধিক নেতাকর্মীরা হেফাজতে ঢালাওভাবে পদ পান যা হেফাজতে নতুন সিন্ডিকেট হয়েছে মর্মে সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো। নতুন এ কমিটিতে হারুণ ইজহারকে তার সাবেক পদ ‘সাহিত্য সাংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক’ হিসেবে বহাল রাখা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হেফাজত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছেন – মুফতী হারুণ ইজহার সাংগঠনিক সম্পাদক পদটির প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তবে এ বিষয়ে হারুণ ইজহারের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হেফাজত সম্পর্কে অনুসন্ধানে জানা যায় – ২০১০ সালের দিকে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির বিরোধিতার মধ্য দিয়ে হেফাজতের আত্মপ্রকাশ হলেও সংগঠনটি দেশজুড়ে আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে ১৩ দফা দাবিতে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে ২০১৩ সালে ৫ মে শাপলা চত্বর অবরোধের মাধ্যমে।

প্রতিষ্ঠা ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায় – ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হয়েছিল চট্টগ্রাম কেন্দ্রীক কওমী মাদরাসাভিত্তিক অরাজনৈতিক ইসলামী সংগঠন হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ। যদিও বা পরে অরাজনৈতিক এ সংগঠনটি রাজনৈতিক ফ্যাক্টরও হয়ে দাঁড়ায়।

হটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার প্রধান পরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফিকে আমির ও মাদ্রাসার তৎকালীন সিনিয়র মুহাদ্দিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে মহাসচিব করে হেফাজতের ২২৯ সদস্যের মজলিশে শুরা কমিটি গঠন করা হয়েছিল সেই সময়।

তবে একটি সূত্র থেকে জানা যায় – হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ছিলেন আল্লামা সুলতান যওক নদভী। কিন্তু পরবর্তিতে তেমন কোনো আলোচনা ছাড়াই আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে মহাসচিব বানানো হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধানেও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে তৎকালিন সময়ে মহাসচিব বানানোর কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। তার আগে চট্টগ্রামের প্রবীণ আলেম মাওলানা আ. মালেক হালিমও হেফাজতের মহাসচিব ছিলেন বলে একটি তথ্য পাওয়া যায়। তবে আল্লামা শফী ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বেই হেফাজত অনন্য উচ্চতায় পৌছায়।

আল্লামা আহমদ শফী রহ. এর জীবদ্দশায় শেষ সময়ে হেফাজতের মধ্যে একটি সিন্ডিকেট ছিলো বলে অভিযোগ করা হয়। সে সিন্ডিকেটের আওতায় হেফাজত পথচ্যুত হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। হাটহাজারী মাদরাসায় একটি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই সিন্ডিকেটের পতন হয়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে। অপরদিকে সে আন্দোলনে আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী রহ. এর দূর্ব্যবহার করা সহ হাটহাজারী মাদরাসায় আল্লামা শফীর রুম ভাংচুর ও বেশ কয়েকজন শিক্ষকের রুম ভাংচুরের অভিযোগ রয়েছে। এরপর আল্লামা শফী রহ. এর ইন্তেকালের পর গত ৩ অক্টোবর ঢাকায় হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগরের আয়োজনে বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে বিশাল গণসমাবেশের মাধ্যমে হেফাজতের নতুন জাগরণ হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে এ সমাবেশেও হেফাজত ঢাকা মহানগরীর সেক্রেটারির উপস্থিত না থাকা নিয়েও তখন কিছুটা আলোচনা সমালোচনা শোনা গেছে বিভিন্ন মহলে।

পরবর্তিতে ১৫ নভেম্বর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বে হেফাজতের নতুন কমিটি গঠিত হলে সবাই-ই নতুন করে আশার আলো দেখেছিলেন। তবে মুফতী হারুণ ইজহারের সাম্প্রতিক সময়ের লেখাটি হেফাজত নিয়ে নতুন করে আলোচনার পথ তৈরি করে দিয়েছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।

মন্তব্য করুন