মূর্তি-ভাস্কর্য নিয়ে চলমান অস্থিরতায় ওলামায়ে কেরামদের বিশেষ তিনটি সিদ্ধান্ত

মূর্তি/ভাস্কর্য নিয়ে চলমান অস্থিরতায় আলেমদের অবস্থান।

প্রকাশিত: ৩:১৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৫, ২০২০

রাজধানী ঢাকার ধোলাইপাড় চত্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মূর্তি/ভাস্কর্য নির্মানকে কেন্দ্র করে দেশের ওলামায়ে কেরাম ও সাধারণ জনগণের মধ্যে চলমান অস্থিরতা নিয়ে দেশের ওলামায়ে কেরামদের নিয়ে একটি বিশেষ বৈঠক করা হয়েছে ঢাকার জামিয়া মাদানিয়া যাত্রাবাড়ি বড় মাদরাসায়।

যাত্রাবাড়ি মাদরাসার পরিচালক ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সভাপতি ও হাইআতুল উলয়ার চেয়ারম্যান মাওলানা মাহমুদুল হাসানের সভাপতিত্বে দেশের প্রায় সব অঙ্গনের উলামায়ে কেরামরাই উপস্থিত হয়েছেন আজ।

আজ শনিবার (৫ ডিসেম্বর) সকাল ১১ টা থেকে অনুষ্ঠিত এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে দেশের চলমান সমস্যা নিয়ে আলেমদের বক্তব্য শোনা হয় এবং বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে তিনটি সিদ্ধান্তের আলোকে বৈঠক সমাপ্ত হয়।

সিদ্ধান্ত তিনটি হলো :

১. মূর্তি ও ভাস্কর্য বিষয়ে সভাপতির পক্ষ থেকে অর্থাত আল্লামা মাহমুদুল হাসানের পক্ষ থেকে আলেমদের মতামত সম্বলিত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে একটি পত্র প্রেরণ এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

২. সভাপতি তথা আল্লামা মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে তারই মনোনীত একটি প্রতিনিধি দল এই সিদ্ধান্তগুলো সহ আলেমদের যেসব প্রস্তাবনা রয়েছে সে প্রস্তাবনার বিষয়বস্তু বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

৩. পাঁচ দফা প্রস্তাবনা পেশ করা হয় যে প্রস্তাবনাগুলোতে আলেমরা একমত হয়েছেন এবং সেসব প্রস্তাবনা বাস্তবায়নে আল্লামা মাহমুদুল হাসান সাহেব বিশেষ ভূমিকা রাখবেন।

সভায় প্রস্তাবনাগুলো পাঠ করেন জামিয়াতুস সুন্নাহ মাদরাসার মুহতামিম ও মাহমুদুল হাসান সাহেবের জামাতা মুফতি নেয়ামতুল্লাহ আল ফরিদী।

প্রকাশ করা পাঁচটি প্রস্তাবনা হলো :

১. প্রস্তাবনা এক : মানব মূর্তি ও ভাস্কর্য যে কোনো উদ্দেশ্যে তৈরি করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কোন মহল বা কোন নেতাকে ভাস্কর্য বানিয়ে শ্রদ্ধা জানানো শরীয়ত সম্মত নয়। এতে মুসলিম মৃত ব্যক্তির আত্মার কষ্ট হয়। কারো প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও তার স্মৃতিকে জাগ্রত রাখতে মূর্তি ও ভাস্কর্য নির্মাণ না করে শতকরা ৯০ ভাগ জনগণের বিশ্বাস ও চেতনার আলোকে কুরআন-সুন্নাহর সমর্থিত কোন উত্তম বিকল্প সন্ধান করাই যুক্তিযুক্ত।

২. প্রস্তাবনা দুই : আমরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবমাননা, কার্টুন, বিষোদগার করা ইত্যাদির তীব্র নিন্দা জানাই। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নাশের উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডে বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবমাননাকর আচরণের উপর কঠোর নজরদারি এবং দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে এসব অপকর্ম বন্ধ করা হোক।

৩. প্রস্তাবনা তিন : বিগত সময়ে ইমানী আন্দোলনে গ্রেফতারকৃতদের নিঃশর্ত মুক্তি দান ও মামলা প্রত্যাহার করা হোক। এ সংক্রান্ত বিষয়ে সারাদেশে আলেম-ওলামা ও ইমাম-খতীবসহ সাধারণ মুসলমানদের উপর সব ধরনের হয়রানি বন্ধ করা হোক। ধোলাইপাড় চত্বরের পাশে ক্ষতিগ্রস্থ পুনঃনির্মিত মসজিদ নামাজের জন্য অবিলম্বে উম্মুক্ত করে দেওয়া হোক।

৪.  প্রস্তাবনা চার : সম্প্রতি শব্দ দূষণ ও জনদুর্ভোগের অজুহাতে দীনি মাহফিলে লাউডস্পিকার ব্যবহারে প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অপরদিকে সাধারণ শব্দদূষণ তথা উচ্চস্বরে গান-বাজনা ইত্যাদি বিষয়ে কোনো প্রশাসনিক উদ্যোগ নেই বললেই চলে। কেবল ওয়াজ মাহফিল নিয়ে শব্দ দূষণের অজুহাতে বিশেষ নির্দেশনা অনভিপ্রেত। অতএব জনগণের কল্যাণের পথে অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে সকল দ্বীনী মাহফিল যথানিয়মে অনুষ্ঠানের অবাধ সুযোগ প্রদান করা হোক।

৫. প্রস্তাবনা পাঁচ : যে সকল বিষয় শরীয়তে নিষিদ্ধ বা হারাম সেসব বিষয়ে কুরআন সুন্নাহর আলোকে সঠিক বক্তব্য তুলে ধরা আলেমদের দায়িত্ব। অথচ একশ্রেণীর মানুষ আলেমদের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও দায়িত্বহীন আচরণ করছে। কেউ কেউ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনাশের উস্কানি দিচ্ছে। এসবের খোঁজ-খবর রাখা এবং শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্ব। উস্কানিমূলক বক্তব্য অবমাননাকর মন্তব্য ও গান মিছিল-মিটিং সমাজে অস্থিরতা বৃদ্ধি করবে। ওলামায়ে কেরাম এসব বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা প্রবল। সরকারকে এসবের উপযুক্ত প্রতিবিধান করতে হবে অন্যথায় দেশব্যাপী উদ্বৃত্ত বিশৃংখলা অস্থিরতায় সরকার এড়িয়ে যেতে পারবে না। বিশেষ করে ইসলাম দিন ও বাংলাদেশবিরোধী দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব।

বৈঠকে বিশেষভাবে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা হলেন – যাত্রাবাড়ি মাদরসার মুহতামিম, বেফাকের সভাপতি ও হাইআর চেয়ারম্যান আল্লামা মাহমুদুল  হাসান। ফরিদাবাদ মাদরাসার মুতাওয়াল্লি ও মুহতামিম আল্লামা আব্দুল কুদ্দুস। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রধান মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী, জমিয়ত একাংশের চেয়ারম্যান মুফতী  মুহাম্মদ ওয়াক্কাস। বেফাকের খাস কমিটির সদস্য আল্লামা নুরুল ইসলাম জিহাদী। বি.বাড়িয়ার আল্লামা সাজিদুর রহমান। সিলেটের আল্লামা মুহিব্বুল হক গাছবাড়ী। জামিয়া রাহমানিয়ার প্রধান মুফতী মনসুরুল হক। জামিয়া ইউনুসিয়ার প্রধান মুফতি মুবারকুল্লাহ, গহরডাঙ্গা মাদরাসার প্রধান ও ইসলামী ফাউন্ডেশনের গভর্নর মুফতি রুহুল আমীন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতী সৈয়দ ফয়জুল করিম। বরুণার পীর মুফতী রশিদুর রহমান ফারুক। ঢালকানগরের পীর সাহেব মুফতী জাফর আহমদ, বেফাকের মহাসচিব মাওলানা  মাহফুজুল হক, বসুন্ধরা মাদরাসার মুহতামিম মুফতী আরশাদ রাহমানী। শায়খ ড. মুশতাক আহমেদ। খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক। আরজাবাদ মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া। শায়খ জাকারিয়া ইসলামিক রিসার্স সেন্টারের পরিচালক মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ। বেফাকের খাস কমিটির সদস্য মাওলানা  মুসলেহ উদ্দিন রাজু। আফতাবনগর মাদরাসার মুহতামিম মুফতী মুহাম্মদ আলী। উত্তরার মাওলানা কেফায়েতুল্লাহ আজহারী, মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী, মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ।

[বৈঠকে উপস্থিত হওয়া কয়েকজন ওলামায়ে কেরাম।]

আরও ছিলেন দেওনার পীর অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী, মুফতী আমিনী রহ পূত্র মাওলানা হাসনাত আমিনী, বারিধারার মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি, মাওলানা হাফিজুর রহমান সিদ্দিকি কুয়াকাটা, মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ্ আইয়ুবী, মাওলানা হাসান জামিল, মাওলানা মুহিব খান, বারিধারার মাওলানা নাজমুল হাসান, মাওলানা আব্দুল খালেক শরীয়তপুরী, মুফতী শামসুদ্দোহা আশরাফী, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, খুলনার মুফতি আব্দুল্লাহ ইয়াহইয়া, মুফতী নোমান কাসেমী, মাওলানা হোদায়াত উল্লাহ আজাদীসহ অনেক ওলামায়ে কেরামগন।

জানা গেছে – বারিধারা মাদরাসার মুহতামিম, জমিয়ত একাংশের মহাসচিব ও বেফাকের সিনিয়র সহ-সভাপতি আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী অসুস্থ বলে এই মিটিংয়ে উপস্থিত হতে পারেননি। তবে আল্লামা কাসেমীর অনুপস্থিতিতে নিয়ে ভিন্ন গুঞ্জনও শোনা গেছে কয়েকটি মহল থেকে। তবে বিষয়টি সঠিক ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

[আল্লামা মাহমূদুল হাসান স্বাক্ষরিত বিশেষ পাঁচটি প্রস্তাবনা।]

মন্তব্য করুন