ফ্রান্সে চাপে রয়েছে ইমাম-মুসলিমরা, ম্যাক্রঁর সাথে মুসলিম কাউন্সিলের বৈঠক

প্রকাশিত: ৭:১৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২, ২০২০

ফ্রান্স সেদেশে ইমামদের ‘প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধের সনদ’ নামে নতুন এক সনদে স্বাক্ষর করার যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে তার বয়ান নিয়ে কথা বলতে ফ্রান্সের মুসলিম কাউন্সিলের প্রতিনিধিদের এ সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁর সাথে বৈঠকে বসার কথা।

এই সনদে সই করার বিষয়টি ফ্রান্সের মুসলমানদের মধ্যে একটা বড়ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ফ্রান্সের বিশেষ করে উদার মানসিকতার ইমামরা এই সনদে স্বাক্ষর করার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছেন।

দেশটির নয়টি পৃথক মুসলিম সংগঠনের জোট এই ফ্রেঞ্চ কাউন্সিল অব দ্য মুসলিম ফেইথ বা সিএফসিএম ইমামদের নিয়োগ এবং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ইমাম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছে।

ফ্রান্সে এই সনদ নিয়ে বিতর্ক চললেও ফ্রান্সের সরকার এই সনদ কার্যকর করতে এবং ইমামদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করতে যে বদ্ধপরিকর তার একটা প্রমাণ ফ্রান্সে পাকিস্তানের এক ইমামের সাম্প্রতিক কারাদণ্ড।

প্যারিসের উত্তর শহরতলীর একজন পাকিস্তানি ইমাম লুকমান হায়দারকে দিনকয়েক আগে, ২৭শে নভেম্বর, ১৮ মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে টিকটক প্ল্যাটফর্মে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উস্কানি দিয়ে ভিডিও বার্তা পোস্ট করার জন্য।

২০১৫ সালে ফ্রান্সে যাওয়া এই ইমামের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তিনি টিকটকে তিনটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন, যার প্রথমটিতে তিনি শার্লি এবদোতে ইসলামের নবীর কার্টুন ছাপা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, “মুসলমানরা নবীর জন্য নিজেদের জীবন বলি দিতে প্রস্তুত”।

দ্বিতীয়টিতে তিনি “অমুসলিম এবং অবিশ্বাসীদের ওপর হামলার” কথা বলেন এবং বলেন “তাদের স্থান দোজখে”। ২৫শে সেপ্টেম্বর পোস্ট করা শেষ ভিডিওতে তিনি পাকিস্তানি এক হামলাকারীর শার্লি এবেদোর সাবেক দপ্তরের বাইরে ছুরিকাঘাতে চার ব্যক্তিকে জখম করার “সাহসিকতার” প্রশংসা করেন।

ইমাম লুকমান হায়দারের সাজা খাটা শেষ হলে তাকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হবে।

ইমামদের যে ”প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধের সনদ”’এ স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে, সেই সনদের বয়ানে থাকতে হবে যে, ফরাসী মূল্যবোধকে তারা স্বীকৃতি দেন, ইসলাম ধর্মকে রাজনৈতিক আন্দোলনের আদর্শ হিসাবে তারা প্রত্যাখান করেন এবং মুসলিম গোষ্ঠীগুলোতে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’ও এই বয়ানে নিষিদ্ধ করতে হবে। এই সনদ নিয়ে কীধরনের চাপ তৈরি হয়েছে তা নিয়ে বিবিসির প্যারিস সংবাদদাতা লুসি উইলিয়ামসন কথা বলেছেন মুসলিমদের সাথে।

“এই মূল্যবোধের সনদের সবকিছুর সাথে আমরা সকলে একমত নই,” বলেছেন ফ্রান্সের মুসলিম কাউন্সিল সিএফসিএম-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্যারিসের গ্র্যান্ড মসজিদের রেক্টর শেম্স এডিন হাফিজ। তবে তিনি বলছেন, “ফ্রান্সে ইসলাম ধর্মের জন্য এটা একটা ঐতিহাসিক যুগ সন্ধিক্ষণ এবং মুসলিম হিসাবে আমরা একটা বড় দায়িত্বের মুখোমুখি”।

তিনি বলছেন আট বছর আগে তার চিন্তাভাবনা ছিল অন্যরকম। তিনি বিষয়টা দেখতেন ভিন্ন দৃষ্টিতে। তখন টলুসে এক হামলা চালিয়েছিল ইসলামপন্থী মোহাম্মদ মেরাহ।

“প্রেসিডেন্ট (সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট) সারকোজি এ নিয়ে কথা বলার জন্য ভোর পাঁচটায় আমার ঘুম ভাঙিয়েছিলেন,” তার মনে আছে। “আমার মনে আছে আমি প্রেসিডেন্টকে বলেছিলাম: ‘তার নাম মোহাম্মদ হতে পারে, কিন্তু সে একজন অপরাধী!’ আমি অপরাধের সাথে আমার ধর্মকে জড়াতে চাইনি। কিন্তু আজ পরিস্থিতি বদলেছে। ফ্রান্সে ইমামদের সামনে বড় দায়িত্ব রয়েছে।”

ফরাসী সরকারের পরিকল্পনা হল সিএফসিএম-কে ফ্রান্সের ইমামদের একটি নথিভুক্ত রেজিস্টার তৈরি করতে হবে। এই তালিকাভুক্ত ইমামদের প্রত্যেককে এই সনদে স্বাক্ষর করতে হবে এবং সনদে সই করলে তবেই তারা ইমাম হিসাবে স্বীকৃতি এবং অনুমতিপত্র পাবেন। বিবিসি

আই.এ/

মন্তব্য করুন