বেঁচে থাকার ইচ্ছা ফুরিয়ে গিয়েছিল স্বার্থপর পৃথিবীতে

প্রকাশিত: ১০:১১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২, ২০২০

ইউসুফ পিয়াসঃ মাহিনের সাথে আবিরের পরিচয়টা বেশি দিনের না। নিজেদের  জন্মের দুই ঘন্টা পর থেকেই একে অপরের পরিচয়। হাসপাতালের একই কেবিনে ভর্তি হয়েছিল তাদের দুই প্রসূতি মা। নারী মানুষের মন। সপ্তাহখানেক এর পাশাপাশি বেডে শুয়ে থাকার অজুহাতে নিজেদের মধ্যে বিরাট বন্ধুত্ব করে ফেলেছিলেন তারা।

সপ্তাখানেক পর হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে মাসে মাসে নিজেদের নবজাতক সন্তান মাহিন আর আবিরকে কোলে নিয়ে পরস্পরের বাড়িতে বেড়াতে যেতেন তারা। বিভিন্ন সুখে দুঃখে একে অপরের পাশে থাকতেন । দুই পরিবারের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ার এক পর্যায়ে অনিচ্ছা সত্তেও দূরে চলে যেতে হয় দুই পরিবারকে।

অবিরের বয়স যখন দুই বছর তখন আবিরের স্বপরিবার মিলে কাতারে চলে যায়। ওখানে আবিরের বাবা-মা দুজনেই শ্রমিক হিসেবে কাজ পেয়েছিল। এরপর তাদের দুই পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হওয়ারই কথা। কারণ সেকালে বর্তমান সময়ের মতো আর মোবাইল ফোনের প্রচলন ছিল না। স্বশরীরে গিয়ে দেখা সাক্ষাতের ঘটনা না ঘটলে মানুষগুলো কেমন জানি হারিয়ে যেত, সম্পর্কগুলো হয়ে যেত কেবলই মৃত। কালে কালে একপর্যায়ে মাহিনও আবিরকে ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু এক সময় দুই বন্ধু আবারও ফিরে এসেছিল তাদের বন্ধুত্বের জীবনে।

মাহিন এখন অনেক বড় হয়েছে। ঢাকায় একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। এবং একটি ম্যাচে থেকে টুকটাক বিভিন্ন কাজ করে নিজে চলে এবং সে তার পরিবারের দেখাশুনা করে। মাহিন আর অবিরের দূরত্বটা এতোই বেড়ে ছিল সব কিছু ভুলে তারা নিজেদের মত করে চলতে শুরু করেছিল জীবনে।

হঠাৎ একদিন মাহিনের ম্যাচ ম্যানেজার এক উস্কোখুস্কো চুলের উজবুক ছেলে কে বাসায় ঢুকিয়ে দিয়ে গেল রুমমেট হিসেবে। কিন্তু ছেলেটা দারুন মিশুক ছিল। দুইদিন এসেই মাহিনের বিরক্তিকে উড়িয়ে বেশ খানিকটা ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল দুজনেই। নিজেদের সম্পর্কের জানাশোনার একপর্যায়ে মাহিন পরম বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করলো এযে তার জন্মকালের টেবিল মেট আবির! মানুষের জীবনে এমন বিস্ময়কর ঘটনা খুব কমই ঘটে। জন্মের দুই ঘন্টা পর যার সাথে এক ঘরে ছিল দুইজন, মৃত্যুর ঠিক দুই মাস আগে দুইজন  একসাথেই বসাবাস করতে লাগলো। তখনও অবশ্য মাহিন যানতো না যে আবির আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে।

আবির ঠান্ডা মাথায় বুঝেশুনে নিজেকে খুন করার নির্ভুল পরিকল্পনা করে রেখেছিল পূর্ব থেকে।  বড় কষ্টের জীবন ছিল আবির ছেলেটার । শুধুমাত্র বাবা মা ছাড়া পরিবারের সমস্ত আপনজনদের থেকে দূরে থেকে একাকী প্রবাস জীবন কাটিয়েছে ত্রিশটি বছর। তারপর নিজের মতো করে বেঁচে থাকার আশায় দেশে ফিরে ছিল বছর পাঁচেক আগে। ইচ্ছে ছিল বিয়ে করে বউ নিয়ে কাতারে ফিরে যাবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তার আশা পুরণ হলোনা কিছু স্বার্থবাজদের জন্য।

আবির দেশে আসার এক মাসের মধ্যে  কাতারে এক অগ্নিকাণ্ডে ওর বাবা-মা দুজনেই মারা যায়। এমনকি ভিসা ও টিকিট সংক্রান্ত জটিলতায় জড়িয়ে ছেলেটা মৃত বাবা মায়ের জানাযাও যেতে পারেনি। কাতারেই তাদের দাফন করা হয়। এ ঘটনার পর অবির মানসিকভাবে প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে যায়, নিজেকে নিয়ে নানারকম সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকে। এক পর্যায়ে সবকিছু কাটিয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছিল আবির।

আবিরের এক চতুর আত্মীয় তার  সঞ্চিত টাকার লোভে নিজের কন্যার সাথে তড়িঘড়ি করে বিয়ে দিয়ে দেন অবিরের সাথে ।  ওর দুটি সন্তানও জন্ম নেয়। ব্যবসা-বাণিজ্য করে বেশ সমৃদ্ধ জীবন যাপন করেছিল আবির। এরই মাঝে একদিন ব্যবসায়ীক কাজে ঢাকা শহরে এসেছিল আবির। কিন্তু তার বাসস্টপে পৌঁছানোর পর ছিনতাইকারীর খপ্পরে পড়ে অতিরিক্ত চেতনানাশক ঔষধ প্রয়োগের ফলে প্রায় মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে যায় আবির। তখন থেকে শুরু হয়ে তার জীবনের ভিন্ন একটি অধ্যায়।

বেওয়ারিশ রোগী হিসেবে একটা দাতব্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলে। প্রায় দেড় মাস তাকে হাসপাতালে বাস করতে হয়েছিল। কিন্তু মোবাইল চিন্তায় হওয়ার কারণে এবং আবির নিজেও অসুস্থ হওয়ার কারণে ওর স্ত্রী-পরিবার কেউ এই দুরবস্থার কথা জানতে পারেনি। দেড় মাস পর বাড়ীতে ফিরে গিয়ে ভীষণরকম চমকে যায় আবির। চমকে জান তার  শ্বশুরবাড়ির লোকজনও। আবিরের শ্বশুর শাশুড়ি ভেবেছিল সপ্তাহখানেক খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা তার  স্ত্রীকেই আবার বিয়ে দেবেন। এবং এতে আবিরের স্ত্রীরও কোন অসম্মতি ছিলনা।

ভর্তুকি হিসেবে আবিরের স্ত্রীর নতুন বর পাবে আবিরের রেখে যাওয়া সমস্ত সম্পত্তি। এমনকি ওর ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা উঠিয়ে নেয়ার জন্য নমিনি হিসেবে ওর স্ত্রী আইনি প্রক্রিয়াও শুরু করেছিল তখন। এই ব্যাপারটি আবিরকে খুব নাড়া দেয়। নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে দারুন বিপন্ন বোধ করতে থাকে সে। বিষন্ন তাকে পেয়ে বসে। এক পর্যায়ে জীবন সম্পর্কে অদ্ভুত এক সিদ্ধান্ত নেই আবির। নতুন এক নেশায় চেপে ধরে তাকে। তার স্ত্রী এবং শ্বশুর বাড়ির এমন আচরণ দেখে তার মাসকয়েক পর হঠাৎ আবির তার স্ত্রীকে জানায় যেو সে ভীষণ অসুস্থ। শরীরে দুরারোগ্য ব্যাধি বাসা বেঁধেছে। হয়তো আর বেশীদিন বাঁচবেনা চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতে হবে তাকে।

এই কথার প্রেক্ষিতেই আবির মাহিনের রুমে এসে উঠে।  আবিরের পরিবাররের লোকজন জানতো আবির ভারতে চিকিৎসা নিচ্ছে। তাদের আলাপের এই পর্যায়ে মাহিন মুখ বন্ধ রাখতে না পেরে  ফস করে বলে ফেলি তার মানে আবির বন্ধু তুই আসলে অসুস্থ না ? স্রেফ মিথ্যা বলে আপনজনদের আবেগ-অনুভূতি আর ভালবাসা পরিমাপ করার জন্যই ভারতের নাম করে ঢাকায় এসে ঘাপটি মেরে বসে আছিস? মাহিনের কথাগুলো শুনে সেদিন আবির কিরকম একটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে যেন তাকিয়ে থাকল মাহিনের দিকে। বেশ অনেকক্ষণ। তারপর রহস্যময় একটি হাসি দিয়ে বলছিল। হুম! আসলে আমি দেখতে চাই আমার নিশ্চিত মৃত্যুর কথা জেনে কার কেমন প্রতিক্রিয়া হয়! আবিরের কথা শুনে সেদিন হাফ ছেড়ে বেঁচেছিল মাহিন। এর পরের দুই মাসে মাহিন আর আবিরের  সম্পর্কটা দারুন গাঢ় হয়ে যায়। আবিরের মৃত্যুর পর মাহিন বুঝতে পারে আবির  ইচ্ছা করেই তখন ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছিল।

পনের বিশ দিন পর পর দুই একদিনের জন্য বাড়িতে যেত আবির। আর বাড়ি থেকে ফিরে এসে নানা রকম অভিজ্ঞতা শেয়ার করত মাহিনের সাথে। একবার এসে আবির বলতে লাগলো জানিস মাহিন এবার বাড়িতে গিয়ে কি  বললাম? তখন মাহিন বললো কি? তখন আবির বললো আমি এবার আমার পরিবারকে বলতে লাগলাম যেو আমি হয়তো আর একমাসের বেশি বাঁচবো না। ডাক্তার বলেছেন শুনে আমার শাশুড়ি কি বলে জানিস? কিছু না বলে মুখেে একটা হাসির ছাপ রেখে বলল ও আচ্ছা! এবং বলে তাহলে এককাজ করো তোমার মৃত্যু যেহেতু নিশ্চিত হয়ে গেল তাহলে তোমার উচিত তোমর যে সম্পত্তিগুলো আছে তা তোমার সন্তানদের মাঝে লিখে দিয়ে যাওয়া। যাতে তোমার অবর্তমানে তোমার সন্তানরা যেন ভালোভাবে চলতে পারে।

কথা গুলা বলছে আর তখন আবিরের দুই চোখ বেয়ে অঝোর ধারে পানি পড়ছিল আর মাহিনকে বলে  ভেবে দেখ বন্ধু এ পৃথিবীর মানুষ কতটা স্বার্থপর! একবার বললও না যে তোমার সমস্ত সম্পত্তি ব্যয় করেও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চিকিৎসা করাও। আমার বউও নির্বিকার আমার মৃত্যুর কথা শুনে ওর বিতর একটু বিচলিত ভাব দেখলামনা। মনে হচ্ছে আমার মৃত্যুর পর ওরা খুব শান্তিতে থাকবে।

কথা গুলো শুনে মাহিন বন্ধুকে ধমক দিয়ে বলল অযথা বাজে চিন্তা করিস না তুই তো আর সত্যি সত্যি মারছিস না। পরেরবার আবির গ্রাম থেকে ফিরে এসে সে কি কান্না। মাহিনকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে বলছিল মাহিন জানিস এবার গিয়ে দেখলাম আমার বৌ আমাকে মৃত ভেবে মোবাইলে অন্য ছেলের সাথে প্রেম করছে। আর আমার শশুর শাশুড়িও তাতে আপত্তি করছে না।আমার  চারপাশের মানুষগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে সবাই কেবল আমার বিদায়ের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। কি নিষ্ঠুর বাস্তবতা! কত দ্রুত ফুরিয়ে যায় একজন মানুষ তাই না রে মাহিন। সান্তনা দিয়ে মাহিন বলছিল তুই ভুল মানুষকে বিয়ে করেছিস বন্ধু। সবাই একরকম নয়।তখন আবির জবাব মাহিনকে বলছিল তোর অভিজ্ঞতা নেই বন্ধু তাই এরকম ভাবছিস তুই।

এ ঘটনার এক সপ্তাহ পরে আবির হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। তখন মাহিন আবিরকে পাশের ক্লিনিকে নিয়ে যেতে চাইলে আবির ফাহিমকে বলে তাকে হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল নিয়ে যেতে । সেখানে গিয়ে দারুন আশ্চর্য হয়েছিল মাহিন। ওখানকার অনেক স্টাফই আবিরকে চেনেন। অবশেষে মাহিন জানতে পারল আবির এখানে নিয়মিত রোগী । বেশ কয়েক মাস যাবত ওর চিকিৎসা চলছে এ হাসপাতালে।

সবকিছু চুরমার করে সত্যিকার অর্থে হাসপাতালের ডাক্তার জানালো আবিরের বাঁচার আশা নেই আর ! তবে শুরুর দিকে সিঙ্গাপুর নিয়ে গেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। একথা বেশ কয়েকবার আবিরকে  বলেছিল ডাক্তাররা। তবে আবির ডাক্তারের কথাগুলো গুরত্ব দেইনি।  এমনকি এখানকার চিকিৎসাও ভালোভাবে নেয়নি। ডাক্তার থেকে বিদায় নিয়ে মাহিন দৌড়ে ছুটে গিয়েছিল আবিরের কেবিনে। বাচ্চাদের মত প্রিয় বন্ধুর দুই হাত চেপে ধরে কাঁদতে শুরু করলো মাহিন । চিৎকার করে বলতে লাগলো  কেন এমন করলি বন্ধু? তোর তো আর্থিক সামর্থ্যও ছিল কেন চিকিৎসা করালিনা ? তখন আবির হাসি মুখে উত্তর দিয়েছিল- কার জন্য বাঁচব আমি বল? কে ছিল আমার? আবির বলছিল আমার বেঁচে থাকার ইচ্ছা ফুরিয়ে গিয়েছে বন্ধু। মানুষ কখনো তার নিজের জন্য বাঁচেনা রে বন্ধু! মানুষ বাঁচে তার আপনজনদের চাহিদায়। তার পাশের মানুষগুলোর আবদার পূরণের জন্য। আমি তো ফুরিয়েই গিয়েছিলাম বহু আগেই।  এই যে আল্লাহর ইচ্ছায় শেষ একমাস বেচে আছি ডাক্তারের বেঁধে দেয়া সময়ের বাহিরেও। এটা কার জন্য জানিস? এটা  তোর জন্য বন্ধু! বাঁচাটা  আসলে ইচ্ছে নির্ভর, ইচ্ছা মরে গেলে মানুষের অন্তরও মরে যায় বুঝলি? শরীর থেকে প্রাণ বেরোতে তখন শুধু অপেক্ষা করা লাগে মাত্র। কথা গুলো বলেতে বলতেই আবির চলে যায় এ পৃথিবী ছেড়ে । রেখে যায় কিছু শিক্ষা।

লেখকঃ তরুণ লেখক, সাংবাদিক। 

মন্তব্য করুন