‘মুসলিম নোবেল’ দ্য মুস্তাফা প্রাইজ

প্রকাশিত: ৪:০৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২২, ২০২০

বিশ্ববিখ্যাত ওষুধ কোম্পানি ফাইজার এবং জার্মানভিত্তিক বায়োএনটেক ৯০ শতাংশ সফলতা নিয়ে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ঘোষণা করেছে।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ফলে থমকে যাওয়া পৃথিবী আবার সচল হবে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে আসবে বলে দাবি করেছেন জার্মানভিত্তিক বায়োএনটেক সিইও ড. শাহীন।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পুরো দায়িত্বে ছিলেন বায়োএনটেক কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা শাহীন-তুরেসি নামক তুরস্ক বংশোদ্ভূত জার্মান চিকিৎসক বিজ্ঞানী এক মুসলমান দম্পতি।

মাত্র কয়েক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত বায়োএনটেক কোম্পানিটি ইউরোপে খুব একটা পরিচিত না হলেও করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে বিশ্বখ্যাত হয়ে উঠেছে।

ড. উগার শাহীন এবং তার স্ত্রী ড. উজলেম তুরেসি মূলত ক্যান্সার সেল নিয়ে গবেষণার জন্য বায়োএনটেক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

৫৫ বছর বয়সী ড. উগার শাহীন তুর্কির ইস্কেডেরুন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ৪ বছর বয়সে ইস্কেডেরুন শহর থেকে অভিবাসী হিসেবে পরিবারের সঙ্গে জার্মানিতে বসতি স্থাপন করেন। বাবা ফোর্ড গাড়ি ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিতে চাকরি করে কোনো রকমে সংসার চালাতেন।

ছোটকাল থেকেই ড. শাহীনের ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে ডাক্তার হবেন। নতুন অভিবাসী হিসেবে অনেক কষ্টে ফিজিসিয়ান হলেন অতঃপর কর্মস্থান থেকেই ১৯৯৩ সালে প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মস্থলে পরিচয় হওয়া ড. উজলেম তুরেসির সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর থেকেই দু’জনে মিলে বায়োএনটেক নামক একটি গবেষণা কেন্দ্র খুলেছিলেন। যেখানে মূলত ক্যান্সার সেল নিয়ে গবেষণা করা হতো। কোভিড-১৯ নামক ভাইরাসের ওষুধ আবিষ্কার করবেন এমন কোনো পরিকল্পনা তাদের ছিল না। আসলে কোভিড-১৯ নামে কোনো ভাইরাসের অস্তিত্বও তখন ছিলো না।

মাত্র দুই বছর আগে জার্মানির একটি সেমিনারে মানবদেহের কোষে অবস্থিত আরএনএ সেল সম্পর্কে গবেষণামূলক তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছিলেন ড. শাহীন।

আরএনএ সেল সম্পর্কে মানুষের বিশদ জ্ঞান থাকলে ভবিষ্যৎ কোনো মহামারির হাত থেকে মানবসভ্যতাকে বাঁচানো সম্ভব বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। সেখানেই পরিচয় হয়েছিল আমেরিকান ফাইজার কোম্পানির সিইও মি. আলবার্ট ব্রউলারের সঙ্গে।

এ বছরের শুরুতে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারি ছড়িয়ে পড়লে ফাইজার কোম্পানির সিইও মি. আলবার্ট ব্রউলার, বায়োএনটেক কোম্পানির সিইও ড. শাহীনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ভ্যাকসিন আবিষ্কারের গবেষণা শুরু করেন।

ড. শাহীনের স্ত্রী ড. উজলেম তুরেসি জার্মানিতে জন্ম নেওয়া একজন চিকিৎসক বাবার সন্তান, তার পরিবার তুর্কির ইস্তাম্বুল থেকে জার্মানিতে বসতি স্থাপন করেছিল। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই ডক্টরেট ডিগ্রিধারী তুরস্ক বংশোদ্ভূত জার্মান নাগরিক।

২০১৯ সালে ড. শাহীন ইরানের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক মুস্তাফা প্রাইজ জিতেছিলেন। ‘মুস্তাফা প্রাইজ’ বিশ্বব্যাপী মুসলমান গবেষকদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মানিত প্রাইজ বলে গণ্য করা হয়।

বিজ্ঞান বিষয়ক অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ম্যাগাজিন ‘সায়েন্স’ এই পুরস্কারকে ‘মুসলিম নোবেল’ বলে আখ্যায়িত করেছে। বিজয়ীদের পাঁচ লাখ ডলার পুরস্কার দেওয়া হয়।

২০১৫ সাল থেকে প্রতি দুই বছর পরপর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অবদান রাখা ইসলামি বিশ্বের গবেষক ও বিজ্ঞানীদের ‘মুস্তাফা প্রাইজ’ দিচ্ছে ইরান। ড. উগার শাহীন ও ড. উজলেম তুরেসি উদ্ভাবিত করোনা ভাইরাসের টিকা তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালে ৯০ শতাংশ কার্যকারিতা দেখিয়েছে।

ড. উগার শাহীন ও ড. উজলেম তুরেসি ছাড়াও চিকিৎসায় ন্যানো ও মাইক্রো ফেব্রিকেটেড হাইড্রোজেল নিয়ে কাজ করার জন্য অধ্যাপক আলি খাদেম হোসেনি ২০১৯ সালে মুস্তাফা প্রাইজ পান।

এ ছাড়া তুরস্কের অধ্যাপক উমরান এস. ইনান আয়নোস্ফিয়ার ও অ্যাটমোস্ফেরিক পদার্থবিদ্যায় অবদানের জন্য, অধ্যাপক হোসেন বাহারভান্ড ও অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ পারকিনসন্স রোগ ও চোখের চিকিৎসায় স্টেম সেলের ব্যবহার নিয়ে কাজ করার জন্য, কম্পিউটার বিজ্ঞানী তুর্কি-ফরাসি সামি এরোল গেলানবে ও ইরানের অধ্যাপক এম. আমিন শোকরোল্লাহকে ২০১৭ সালে মুস্তাফা প্রাইজ দেওয়া হয়।

মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ছাড়াও অন্য কোনো দেশে বাস করা মুসলিম গবেষক ও বিজ্ঞানীদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়। এছাড়া মুসলিম রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম বিজ্ঞানীদেরও এই পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করার কথা রয়েছে।

২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো মুস্তাফা প্রাইজ দেওয়া হয়। ওইবার পুরস্কার পাওয়া দু’জনের একজন ছিলেন অধ্যাপক জ্যাকি ই-রু ইং। সিঙ্গাপুরের এই বিজ্ঞানী ন্যানোপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন। অন্যজন হচ্ছেন জর্ডানের অধ্যাপক ওমর ইয়াগি। তিনিও ন্যানোপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন।

আই.এ/

মন্তব্য করুন