বাইডেনের জয় থেকে আমেরিকানদের মনস্তত্ত্ব পাঠ

প্রকাশিত: ৩:৩৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৮, ২০২০

প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন কেমন হবে এটা সময়ই বলে দিবে। তবে একটা কথা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে, ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান নির্বিশেষে যে কোনো প্রকার ইসলামপন্থার উত্থানই আমেরিকার কাছে র‍্যাডিকাল ইসলাম বলে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে। ব্রাদারহুড তাই গনতান্ত্রিক রাজনীতি করেও আমেরিকার কাছে র‍্যাডিকালই থেকে যায়। সেনা অভ্যূত্থান করে যখন মুরসিকে সরানো হয় তখন

আশরাফ মাহদি :

জো বাইডেন শেষ পর্যন্ত চলেই আসলো ক্ষমতায়। ৭৪ মিলিয়ন ভোট, প্রেসিডেনশিয়াল টিকিটের জন্য  আমেরিকার ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা আবারো ডেমোক্র্যাটদের হাতে।

আমেরিকার গত তিন দশকের ইতিহাসে ট্রাম্পই প্রথম ব্যক্তি যাকে পাচ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকার সুযোগ দিলো না আমেরিকানরা।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন কেমন হবে এটা সময়ই বলে দিবে। তবে একটা কথা অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে, ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান নির্বিশেষে যে কোনো প্রকার ইসলামপন্থার উত্থানই আমেরিকার কাছে র‍্যাডিকাল ইসলাম বলে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে। ব্রাদারহুড তাই গনতান্ত্রিক রাজনীতি করেও আমেরিকার কাছে র‍্যাডিকালই থেকে যায়। সেনা অভ্যূত্থান করে যখন মুরসিকে সরানো হয় তখন।

জন ক্যারি বলেছিল এটাও নাকি গনতন্ত্র রক্ষা। সেসময় এই বাইডেনই ছিল আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট। অতএব তাদের উদারতা সর্বোচ্চ হচ্ছে নিজেদের জাতির ভেতরই সীমাবদ্ধ।

যে দলই ক্ষমতায় আসুন আমেরিকার ফরেন পলিসির নীতিতে খুব একটা পরিবর্তন হয় না। ট্রাম্পের পাগলামীর ফলে অবশ্য এই নীতি কিছুটা নড়বড়ে হয়েছিল। ডেমোক্র্যাট আবারো সেই জায়গায় ফিরে যেতে চাইলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সেই আলোচনায় আপাতত ঢুকছি না। আমেরিকার জাতীয় রাজনীতিতে বাইডেন কিভাবে আমেরিকানদের কাছে এত গুরুত্ব পেয়ে বসলো এ নিয়েই খুচরা কিছু আলাপ করবো।

বাইডেনের জয় সহজ হওয়ার কিছু কারণঃ

  • ১) মিডল ক্লাসের ভোটঃ

আমেরিকানরা ট্রাম্পের ট্যাক্স বাড়ানো, মেডিকেয়ার বাতিল করাসহ নানা কারণে বিপদে পড়ছিল। বাইডেন তার ইশতিহারে মিডলক্লাসের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করায় মিডলক্লাসের বড় একটা অংশের ভোট বাইডেনের পক্ষে যায়। এমনকি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর উদ্বোধনী বক্তব্যেও বাইডেন মিডলক্লাসদের আমেরিকার মেরুদণ্ড বলেছে।

  • ২) ক্লাইমেট চেঞ্জঃ

ট্রাম্প যথেষ্ট অবজ্ঞা করেছে। অথচ সম্প্রতি এক জরিপে ফক্স নিউজ দেখিয়েছে ৪৬% আমেরিকানরা ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে উদ্বিগ্ন। বাইডেন এই সুযোগটা লুফে নিয়েছে। ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে তার উদ্বেগ ও পরিকল্পনা জনগণের কাছে পেশ করেছে৷

  • ৩) ইমিগ্রেশন পলিসিঃ

৭২% আমেরিকানরা চায় ইলিগ্যাল ইমিগ্রেন্টদের সিটিজেনশিপের সু্যোগবের করা হোক। ইমিগ্রেন্টদের প্রতি ট্রাম্পের আচরণ ছিল বরাবরই আক্রমণাত্মক।

কখনো ইলহান ওমর, রাশিদা তালিবকে কটাক্ষ করে বসছে তারা মুসলিম হওয়ার কারণে, ইমিগ্রেন্ট হওয়ার কারণে তাদের নিজের দেশে ফিরে রাজনীতি করতে বলছে। অথচ তারা জনপ্রতিনিধি।

ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী মনোভাব জনগণ কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি। “ইমিগ্রেন্ট লাইভস ম্যাটার” ইস্যুতে আন্দোলনও হয়েছিল। বাইডেন এই সুযোগটাও কাজে লাগিয়েছে৷

  • ৪) কট্টর ডানপন্থার বিকল্পঃ

আমেরিকার বাস্তবতায় ডানপন্থার রাজনীতি এমনিতেই চ্যালেঞ্জিং। ট্রাম্প সেটাকে আরো কট্টর ডানপন্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকায় হোয়াইট সুপ্রীমেসী ইস্যু দানা বাধতে শুরু করে। মিডিয়ার মতে, ট্রাম্প এসব আদর্শবাদী রাজনীতি করেই ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়।

হোয়াইট আইডেন্টিটি পলিটিক্স বনাম সিভিল রাইটস মুভমেন্ট নিয়ে একটা তর্ক তখন বেশ কিছুদিন চলেছে। তর্কটা হচ্ছে, নিজ আইডেন্টিটির উপর ভিত্তি করে বিশেষ একটা কমিউনিটি তাদের অধিকার আদায় করবে নাকি অধিকারগুলো সকলেই সমানভাবে নাগরিক সুবিধা হিসেবে পাবে।

আমেরিকানদের এই বাস্তবতার কারণেই ডেমোক্র্যাটতা খুব সহজে টপকে যায় রিপাবলিকানদের। ট্রাম্পের গত পাচ বছরের আচরণ ছিল অতিমাত্রায় র‍্যাডিকাল। কনজার্ভেটিভ মূল্যবোধ অনুসরণ করে লিবারেলদের থেকে কিছু হিট ট্রাম্পকে তো নিতে হয়েছেই। যেমন, গান কন্ট্রোল না করা, রেইস ওভারলুক করা, এবরশন বন্ধ করে দেওয়া।

  • ৫) মুসলিমদের নাগরিক অধিকারঃ

ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প সাত দেশের মুসলিমদের আমেরিকা থেকে ব্যান করেছিল। মুসলিমদের অভিবাসী বলে বলে সে ইসলামোফোবিয়া উস্কে দিচ্ছিল। এই সুযোগটিও ছাড়েনি বাইডেন। ক্যাম্পেইন চলাকালীন সময় মুসলমানদেরও কথা দিয়েছে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করবে৷

  • ৬) গণতন্ত্র রক্ষাঃ

বাইডেনই গণতন্ত্র রক্ষার শেষ সুযোগ। এই মন্ত্র এবার ডেমোক্র্যাটরা খুব ভাল করে জপেছে। এবং সফল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আমেরিকানদের গেলাতেও পেরেছে। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সেন্টার কনজার্ভেটিভ ও লিবারেল যে দুইটা ভাগ আছে তারাও এক হয়ে ক্যাম্পেইন করেছে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। এর ফলাফল ভোট বাক্সে পড়েছে বেশ ভালভাবেই।

ট্রাম্প একটা আদর্শবাদী চিন্তা থেকে রাজনীতি করতো। রিপাবলিকান হওয়ার কারণে কনজার্ভেটিভ একটা ডানপন্থী আদর্শ তো ছিলই। তবে আরো কট্টর হয়ে  ন্যাটিভ ন্যাশনালিস্ট ও কনজারভেটিভ আইডেন্টিটি পলিটিক্স ছিল ট্রাম্পের আদর্শের ভিত্তি। তার স্বপ্নের আমেরিকা হবে শুধু ন্যাটিভ আমেরিকানদের জন্য। এই লক্ষ্যে সে অভিবাসী, মুসলিম ও কালো আমেরিকান সবাইকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলেছিল।

সাংবাদিকরা এসব স্বেচ্ছাচারিতা ব্যাপারে তাকে প্রশ্ন করলে সে এর কোন জবাব তো দিতই না, বরং তাদেরকে চরমভাবে অপমান করতো। এভাবে সাংবাদিকদেরও চটিয়েছে সে। শুধু পারেনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটা করতে। যেটা আমাদের জননেত্রী করে  দেখিয়েছেন।

বাইডেন মোটামুটি সবগুলো সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ট্রাম্পবিরোধীদের কাছে নিজের প্রতিশ্রুতি পৌছে দিয়েছে।ইশতিহারে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে অভিবাসী ও মুসলমানদের কথা। বাইডেনের ইশতেহার ও নির্বাচনী প্রচারণার ভাষায় মনে হয়েছে, আমেরিকার জাতীয় রাজনীতিতে সে অভিবাসী এ মুসলিমদের নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় কাজ করবে। আমেরিকার মুসলমানরা ইসলামোফোব মুক্ত সমাজ ও ইমিগ্রেন্টরা হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টমুক্ত সমাজের স্বপ্নই দেখে। সে হিসেবে তাদের বাইডেনের পক্ষে থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। বাইডেন থেকে এর বেশি কিছু আশা আমেরিকান মুসলমান ও ইমিগ্রেন্টদের করার কথাও না।

তবে এইসবই আমেরিকার জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতির আলাপ। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাইডেন মুসলমানদের জন্য ট্রাম্প থেকেও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। কারণ ট্রাম্পের নর্দান সিরিয়া থেকে আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে আনার কঠোর সমালোচনা করেছিল বাইডেন।

আমেরিকার আধিপত্য বিস্তারে বাইডেন মুসলিম দেশগুলোর মাঝে পুনরায় যুদ্ধ বাধানোর বিকল্প খুজবে বলেই মনে হচ্ছে৷ তালেবানদের সাথে পরাজয় ও বিশাল ক্ষয়ক্ষতির পর আবারো যুদ্ধ শুরু করার আগে আমেরিকা দশবার ভাবার কথা। ইয়ামেনের প্রক্সি যুদ্ধে মোহাম্মদ বিন সালমানের পাশ থেকে সরে আসার ঘোষণায় বাইডেনকে যুদ্ধপ্রেমী বলে মনেও হচ্ছেনা। তবে এরদোগান নিয়ে তার বক্তব্য প্রমাণ করেছে সে খুব একটা ভাল মানুষ না। গণতান্ত্রিক একটি দেশে নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে প্রেসিডেন্টকে হারানোর হুমকি দেওয়া কোন গনতান্ত্রিক  শাসকের কাজ না। ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির ব্যাপারে তার সমালোচনাও বলছে সে কৌশলী যুদ্ধে আগ্রহ দেখাতে পারে।

আমেরিকার আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে ট্রেড ওয়ারে অবশ্যই মনোযোগী হবে বাইডেন। আমেরিকা বিরোধী ব্লকে অর্থনৈতিক আঘাত হানার চেষ্টা করলে সেটা মোটেও অস্বাভাবিক কিছু হবে না।

  • সবমিলিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেন কেমন হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, আলোচক, কলাম লেখক।  অধ্যায়নরত ছাত্র, জামিয়া আল-আযহার মিশর।

মন্তব্য করুন