পোষাক, সুন্নাহ, ফ্যাশন এবং ট্রলের সংস্কৃতি

প্রকাশিত: ১:১৩ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৮, ২০২০

সাইফ সিরাজ :

পোষাকের ক্ষেত্রে তিনটা শব্দ (শব্দ না বলে পরিভাষা বলাই ভালো।) আমি খুব অল্প বয়সেই অবগত হই।

  • এক. স্টাইল
  • দুই. ফ্যাশন
  • তিন. সুন্নাহ

– স্টাইল মানে একটা অপরিবর্তনীয় ব্যাপার। ব্যক্তির নিজস্ব পরিচয়বাহী পোষাক। যেটা একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী একাধারে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করতে করতে ঐতিহ্যে পরিণত করে নিয়েছে। যেমন, মাওলানা ভাষানীর তালের আঁশের টুপি। বঙ্গবন্ধুর কোট। মাদানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কিশতি টুপি। পাকিস্তানীদের কাবলি সেট। এইরকম না উদাহরণ দেওয়া যাবে।

– ফ্যাশন হলো নিত্য পরিবর্তনশীল পোষাকের ধারণা। এর কোন ঐতিহ্য নেই। আজকে যা হটকেক। কালকে তার বাজার পতিত। আমরা প্রতিনিয়ত ঈদে পরবে এইরকম নানান পোষাকের নাম শুনি।

– সুন্নাহ হলো একজন তাক্বওয়াবান মুসলমানের পোষাক। যেই পোশাকে একজন মুসলমানকে মুসলমান হিসেবে চেনা যায়। ঢিলেঢালা অনাড়ম্বর। পোষাকের চেয়ে তাক্বওয়ার প্রতি যত্নশীল পোষাকের ভেতরের মানুষটি। পোষাকের আড়ম্বরতার জৌলুসে হারাবে না অবয়বে নিরহম অনুভব। মোটকথা ইসলামের মূল্যবোধ এবং রুচিবোধের বাইরে যাবে না সেই পোষাকের চাকচিক্য।

এইগুলো খুব প্রিলিমিনারি আলাপ। স্কলার, পণ্ডিতগণ গভীর আলাপ করবেন।

এত কথা বলার উদ্দেশ্য হলো, দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামী সঙ্গীত সংশ্লিষ্ট এক্টিভিস্টদের পোশাক ও ফ্যাশন নিয়ে বেশ তক্কাতক্কি চলে আসছে। এই অঙ্গনের সঙ্গে একটা দূরতম সম্পর্কের কারণে এই বিতর্ক-আগুনের আঁচ মাঝেমধ্যে আমাকেও স্পর্শ করে। বাট, ভার্চুয়াল নির্মোহতা আমি অর্জন করেছি বহু কষ্টে। ফলে, এইসব ইস্যূ বা বিতর্কে জড়াই না সচেতনেই।

আজকের এই লেখার কারণ মূলত তিনটা।

এক. বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি। তিনি আমাকে ফোন করে বলেছেন। সাম্প্রতিক পোশাক বিতর্কে আমার চিন্তা লিখতে।

দুই. আমার পছন্দের একজন মানুষ শাহ ইফতেখার তারিক ভাই। তার পোশাক ব্র্যান্ড জুব্বার প্রডাক্টকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক আবার শুরু হওয়া। ফলে এই পছন্দ আর বিতর্কের নো-মেন্স ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে কিছু বলার তাগিদ অনুভব করছি।

তিন. এই বিতর্কে আবারও ইসলামী সঙ্গীতের এক্টিভিস্টরা ইনপুট হয়ে গেছেন। আর আমার ইনবক্সে, ওয়াটসএপে অল্পকিছু ক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিক্রিয়া আসছে। আর টাইমলাইনে তো ট্রল, ক্ষোভ, অপছন্দ নিয়ে স্টেটাস চলছেই। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতি উত্তরও আসছে। ফলে কিছু লেখার প্রয়োজন অনুভব করছি।

একটা কথা বলে নেই। ভার্চুয়াল জগতে নেটিজেনদের ট্রল এবং উগ্রতা আমি সবসময়ই অপছন্দ করি। যদিও সৈয়দ মুজতবা আলীর ব্যঙ্গাত্বক লেখার ভক্ত আমি। এইখানে আমি যা লিখবো স্বাভাবিক দৃষ্টিতে কেউ-ই খুশি হতে পারবেন না বলে মনে করি। যদি কেউ আমার কথাগুলো হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন; তাহলে বিশ্বাস করি তিনি খুশি হবেন।

পোষাক এই আধুনিক সময়ে ব্যক্তির রুচি ও ব্যক্তিত্বের পরিচয় বহন করে। এমনকি পোশাকের রঙ দেখে এক্সপার্টগণ ব্যক্তির লাইফস্টাইল ও মনোজগতের খবর বলে দিতে পারেন। রঙের সঙ্গে নাকি ক্রিমিনালদের অপরাধের রকমফের হয়ে থাকে। আবার রঙের পছন্দের তালিকা থেকে ব্যক্তির চিন্তার রকমফের ধরা যায়। এইসব বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় পড়েছি।

এবার আসি বিতর্কের বিষয়ে। প্রথমত ইসলামী সঙ্গীতের সংশ্লিষ্ট অধিকাংশেরই পোষাকের ফ্যাশন সেন্স খুব বাজে। সেই সঙ্গে জুব্বার মতোন একটা সমীহের (এই দেশে) পোষাকে উৎকট জোড়াতালি খুব অড লাগে। আমি নানা সময়ে দেখেছি, ছেলেরা এই ফ্যাশনেবল জুব্বা গায়ে নিজের উস্তাজের সামনে যেতে ভয় পাচ্ছে। মসজিদে খুতবা দিতে যাওয়ার আগে এই ফ্যাশনেবল জুব্বা খুলে যাচ্ছে।

আমি নিজেও মাঝেমধ্যে গিফট প্রাপ্তিজনিত কারণে এমব্রয়ডারি করা ও ফ্রিন্টেড পাঞ্জাবি গায়ে দিই। কিন্তু কোনদিন এইসব জামা গায়ে দিয়ে আমার কোন মুরুব্বির সামনে যাইনি।

এইসব জুব্বার আরেকটা দৃষ্টিকটু ব্যাপার হলো, এর ফিটিংস। বডির শেইপের সঙ্গে এর ফিটিং। যাকে টেইলাররা বলেন বডি ফিটিং। (ইতোমধ্যে আমার দুটো জুব্বা বানানোর পর থেকেই গায়ে দেওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে আছে। কারণ, টেইলারদের মাথায় একটু শৌখিনদের জুব্বা মানেই বডি ফিটিং। বহু বলার পরেও তারা সেই ফিটিং সিনড্রোম থেকে বের হতে পারেনি।)

এই বডি ফিটিং ব্যাপারটা নিয়ে তরুণ ও প্রবীন কয়েকজন আলেমের সঙ্গে কথা বলেছিলাম গত বছর। উপস্থিত আট ন’জনের সবাই এই বডি ফিটিং জিনিসটাকে হারাম বলেছেন। জানি না আমার ভাইদের কাছে এই হারামের বিষয়টা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বা তারা এই বিষয়টিকে কীসের ভিত্তিতে জায়েজ মনে করেন।

সম্প্রতি কারো কারো জুব্বায় দেখছি অনন্ত জলিলের জুব্বার মতো বুক ও মাসলের বিব্রতকর প্রকাশ।

এখন, এইসব বিষয়কে কেবল অপছন্দ বলেই বা ব্যক্তিগত বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব! আপনি যখন একটা আদর্শিক লড়াইয়ের ময়দান থেকে এসে একটা কিছু করবেন; তখন আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী, হিতাকাঙ্ক্ষী, মিত্র, বন্ধ, ভক্ত, শত্রু, হিংসুক সবাই আপনার কাজে দৃষ্টি রাখবে। সবাই সবার মতোন কথা বলবে।

যদি একান্তই আপনি ব্যাবসার চিন্তা করেন। তাহলে আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা বলে কোন প্রতিক্রিয়ারই জবাব না দেওয়া। কোন ধরণের হটকারি ব্যাখ্যা না দেওয়া। জাস্ট স্কিপ করে যাওয়া বেটার মনে করি। আপন মনে ব্যবসা করে যাবেন। একসময় সব তক্কাতক্কি ঝিমিয়ে যাবে।

আর যদি ইসলামী পোশাকের ফ্যাশন ব্র্যান্ড হতে চান। ব্র্যান্ডিং করতে চান তাহলে প্রতিটা বিতর্ক। মন্তব্য। সমালোচনা। পর্যালোচনা। যথাযথ চিন্তায় ফিল করা উচিত। কীভাবে আরো সুন্নাহ সংলগ্ন ফ্যাশন করা যায় তা ভাবা উচিত। কীভাবে লিবাসুত তাক্বওয়ার নিকটবর্তী ফ্যাশন করা যায়; তার পদ্ধতি বের করা উচিত।

পাঞ্জাবিতে তাও একটু হার্ডকোর ফ্যাশন হলে চলে যায়। কারণ, পাঞ্জাবিটা সাধারণত আওয়ামের কাছে যায় বেশি। কিন্তু জুব্বা! যেহেতু সংস্কৃতি পরিমন্ডলের সদস্যরা এইটা ব্যবহার করে বেশি। ভিডিও ও মঞ্চের পারফর্মেন্সের কারণে আম জনতা তাদেরকে দেখছেন। সেলিব্রিটি হওয়ার কারণে আনেকেই ফলো করছেন। ফলে, জুব্বার একটা নেগেটিভ ইফেক্ট আসছে ইলমি সোসাইটিতে। যেহেতু ইসলামী সংস্কৃতির এক্টিভিস্টরা ইবাদাত হিসেবে তাদের গাওয়াকে রিপ্রেজেন্ট করছেন; ফলে তাদের এইসব হার্ডকোর ফ্যাশন একটা ফিতনায় রূপ নিচ্ছে বলে মনে করি।

সুতরাং জুব্বা হোক পাঞ্জাবি হোক। ইসলামী উসূল অনুযায়ী ঢিলেঢালা হোক। ফ্যাশনের ক্ষেত্রে হার্ডকোর না হয়ে সফটকোর হোক। আরেকটু সহজ করে বললে, জুব্বাগুলোর ফ্যাশন মডেল, নায়ক, তারকাদের পোশাকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা না করুক। আরেকটু সহজ করে বলি, পোশাকগুলো মঞ্চনাটকের অভিনেতাদের পোশাকের মতো চকমকে ফ্যাশনের না হোক।

এইবার আসি ট্রলের সংস্কৃতিতে। আমাদের এই ভার্চুয়াল কমিউনিটিতে অপছন্দ হলেই; ট্রল, ঘৃণা, কুৎসা, মানসম্মানহানি, একধরণের স্লেজিং শুরু হয়ে যায়। খুব বেইনসাফি একটা ট্রেন্ড। যতদূর আমার জানাশোনা এইসব এক্টিভিটি ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম হওয়ার কথা। আর কাউকে মন্দ নামে ডাকা তো স্পষ্টতই হারাম।

ট্রল আসলে কী? এইটা একটা রুপক ব্যাপার বলে জানতাম। ক্ষমতাসীনদের দাপটের কারণে যা স্পষ্ট করে বলা বিপজ্জনক তাকে ট্রলের আশ্রয়ে প্রতিকী একটা রুপ দিয়ে বলা। কিন্তু এই সময়ে এসে এইটা এমন একটা অসহ্য ফিতনায় রূপান্তরিত হয়েছে যে, তরুণ আলেম এক্টিভিস্টদের শতকরা নিরানব্বইটা ট্রলই আমার কাছে হারাম মনে হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি কখনও কাউকে সংশোধন করতে ট্রল করেছেন? ঘৃণার্ত মন্দ নামে ডেকেছেন? ক্ষোভার্ত প্রতিক্রিয়ায় প্রপাগান্ডা চালিয়েছেন? কাউকে অপমান করে সংশোধন করেছেন?

তাহলে আপনারা এইসব জিনিসের বৈধতা কোথায় পেয়েছেন? আজ পর্যন্ত এমন একটা নজির দেখাতে পারবেন; যে কাউকে অপমান করে, কৌতুকের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে সংশোধন করা গেছে?

প্রিয় ভাই, আপনার প্রতিটা কথা, চিন্তা, উগ্রতার জবাব তো আল্লাহর কাছে দিতে হবে। আপনি ইলমি আলোচনা করুন। উদ্দিষ্ট ব্যক্তি গ্রহণ না করলেও অসংখ্য মানুষ তা গ্রহণ করবে। তারা সংশোধিত হবে। আপনি সাওয়াব পাবেন। কিন্তু খুঁচিয়ে ব্যক্তির মনোজগতকে রক্তাক্ত করে, ব্যক্তিকে অপমানিত করে, মন্দ নামে ডেকে কী লাভ হবে আপনার?

তাই আসুন পজেটিভ এপ্রোচ দেখাই। মানুষকে ভালোবাসা দিই। দেখবেন পৃথিবীটা সুন্দর হয়ে গেছে।

আর আমাদের যে ভাইয়েরা এইসব ফ্যাশন করছেন। আপনাদের যেসব পোষাক আমাদের ভাইয়েরা অপছন্দ করছেন। আমি বিশ্বাস করি কেউই আপনাদের শত্রু না। শুভাকাঙ্ক্ষী সবাই। হয়তো প্রচল সংস্কৃতির শিকার হয়ে প্রকাশভঙ্গিটা অসজৌন্য করে দিচ্ছেন। আপনারা তাদের সঙ্গে কথা বললে দেখবেন প্রত্যেকের হৃদয়ে আপনাদের জন্য অফুরান ভালোবাসা জমে আছে।

আল্লাহ্ আমাদের ইসলামী সঙ্গীতের অঙ্গনকে পবিত্র রাখুন। আমাদের ভাইদের ইসলামী ও সুন্নাহ সম্মত পোশাকের নান্দনিক উপস্থাপনার বাণিজ্যে বরকত দান করুন। আমীন।

লেখক : জনপ্রিয় লেখক, শিক্ষাবীদ, কলামিস্ট, বিশ্লেষক।

মন্তব্য করুন