শুক্রবার চালু হল হিজড়াদের জন্য ‘স্বতন্ত্র মাদরাসা’

প্রকাশিত: ৬:০৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৬, ২০২০

গাড়িতে কিংবা রাস্তায় বিশেষ ভঙ্গিমায় হাততালি দিয়ে টাকা চাওয়ার দৃশ্য বেশ পরিচিত। একটু মশকরা ও খুনসুটি করে সাহায্য চাওয়া কিংবা বখশিশ নেওয়াদের সমাজ হিজড়া নামে চেনে। সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষ তারা।

সেই হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য দেশে প্রথম মাদরাসা চালু করা হল। রাজধানী ঢাকার কামরাঙ্গীর চরের লোহারব্রিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত মাদরাসার নাম রাখা হয়েছে, ‘দাওয়াতুল কুরআন তৃতীয় লিঙ্গের মাদরাসা।’

হিজড়াদের জন্য বাংলাদেশে আলাদা কোনো মাদরাসা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার খবর পাওয়া যায় না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও হিজড়াদের পড়ানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। যদিও বাংলাদেশে হিজড়াদের ভোটাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী তারা নারী বা পুরুষ নয়, বরং হিজড়া হিসেবে পরিচিতি পান।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল দশটায় এই মাদরাসা উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন অনুষ্ঠান হবে দুই পর্বের। প্রথম পর্বে থাকবেন শুধু হিজড়ারা। এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন- বাংলাদেশ হিজড়া কল্যাণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আবিদা সুলতানা মিতু।

বিকেলের অনুষ্ঠানে থাকবেন ঢালকানগরের পীর মাওলানা জাফর আহমদ ও মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জীসহ স্থানীয় আলেম-উলামারা। মাদরাসার উদ্যোক্তাদের অন্যতম মাওলানা আবদুর রহমান আজাদ এসব তথ্য জানিয়েছেন।

মাওলানা আবদুর রহমান আজাদ স্থানীয় এক মসজিদে ইমামতি ও মাদরাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রায় এক বছর যাবৎ হিজড়া সম্প্রদায়ের মাঝে কোরআন শিক্ষা নিয়ে কাজ করছেন।

তিনি বলেন, চলতি বছরের শুরু থেকেই এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করা হয়। দাওয়াতুল কুরআন তৃতীয় লিঙ্গের মাদরাসায় পড়ার ক্ষেত্রে কোনো বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়নি। অর্থাৎ হিজড়া জনগোষ্ঠীর যেকোনো বয়সের মানুষ এই মাদরাসায় ভর্তি হতে পারবেন।

এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, হিজড়া বাচ্চা পাওয়া যায় না। বড় হলে নানাবিধ লক্ষণ প্রকাশ পায়, পরে অন্য হিজড়াদের সঙ্গে সে যোগ দেয়। এভাবে তাদের একটা কমিউনিটি গড়ে ওঠে।

এখানে পড়াশোনা করতে শিক্ষার্থীদের কোনো খরচ দিতে হবে না। শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়া এবং পড়াশোনার ব্যয় বহন করবে মরহুম আহমদ ফেরদৌস বারী চৌধুরী ফাউন্ডেশন। তাদের অর্থায়নে মাদরাসাটির যাবতীয় কার্যক্রম আপাতত একটি তিন তলা ভবনে চলবে। প্রতি তলায় প্রায় ১২০০ বর্গফুট জায়গা রয়েছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

হিজড়া জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের পরিবার ও সমাজে নানাভাবে অবহেলিত। তাই তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর লক্ষ্যে এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এখানে কোরআন শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হবে। ফলে এখান থেকে পড়াশোনা শেষে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কারিগরি পেশায় যুক্ত হতে পারবেন।

উদ্বোধনের পর ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে থাকা প্রায় দেড়শ’ হিজড়াকে এই মাদরাসায় ভর্তি করা হবে। মাওলানা আবদুর রহমান আজাদ বলেন, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আমারা আলাদা আলাদা করে তাদের পড়াতাম। মাদরাসা শুরু হলে তাদের সবাইকে এখানে রেখে একসঙ্গে পড়ানো হবে।

তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা মাদরাসা প্রতিষ্ঠাকে স্বাগত জানিয়েছেন এই কমিউনিটির সদস্য থেকে শুরু করে নানা পর্যায়ের মানুষ। মাদরাসা প্রতিষ্ঠাকে সাধুবাদ জানিয়ে অনেকে সামাজিক যোগাযোগ বিভিন্ন পোস্ট দিয়েছেন।

সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের হিসাব মতে, বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতে, এই সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি।

শিক্ষা অধিদপ্তর ২০১২ সাল থেকে হিজড়া শিশুদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি চালু করেছে। এ ছাড়া তাদের নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা উন্নয়নমূলক কাজ করছে। এসব উদ্যোগের ফলে হিজড়া সম্প্রদায়ের মাঝেও সমাজের মূলধারায় অঙ্গীভূত হওয়ার উৎসাহ চোখে পড়ছে। মাদরাসায় ভর্তি হওয়া এবং তাদের জন্য আলাদা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা এরই প্রমাণ বহন করে।

আই.এ/

মন্তব্য করুন