আজ আমেরিকার নির্বাচন : হাতি জিতবে নাকি গাধা !

আমেরিকার নির্বাচন : ২০২০

প্রকাশিত: ১:০৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০২০

আজ তেসরা নভেম্বর সাম্রাজ্যাবাদী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ৫৯ তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এদিনই আমেরিকানরা সিদ্ধান্ত নেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প আর জো বাইডেনের মধ্যে কাকে তারা আরো চার বছরের জন্য হোয়াইট হাউজে দেখতে চায়।

‘জোর যার মুল্লুক তার নীতিতে’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে শুধুমাত্র আমেরিকার সব থেকে শক্তিশালী মানুষ, এমনটা নয়৷ বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি গোটা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রকাশিত হয়ে থাকেন৷ কালই অনুষ্ঠিত হতে চলেছে আমেরিকার নির্বাচন ৷ সুযোগ রয়েছে পালাবদলের৷

বর্তমান প্রেসিডেন্ট রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফিরবেন, নাকি ডেমোক্র্যাট জো বাইডেন হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬ তম  প্রেসিডেন্ট—তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী চলছে জোর আলোচনা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মানেই হাতি ও গাধার দ্বন্দ্ব। সরাসরি হাতি ও গাধাকে যুদ্ধে না নামিয়ে দিলেও এই দুই মার্কা নিয়ে যুদ্ধে নামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট পার্টি। রিপাবলিকান পার্টির প্রতীক হাতি আর ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতীক গাধা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মোটাদাগে দুটিই রাজনৈতিক দল৷ রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট৷ বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন রিপাবলিকান। এই দলটিকে সেদেশে ‘গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি’ বলেও ডাকা হয়। রিপাবলিকানরা আদতে একটি রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল। সাথে সাথে যুদ্ধবাজ ও উগ্রতায়ও তারা ডেমোক্রেটদের থেকে একটু আগানো। ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি, করের হার কমানো, বন্দুক রাখার অধিকার এবং অভিবাসনের উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে।

অপরদিকে জো বাইডেন হলেন ডেমোক্র্যাটদের পক্ষের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। ডেমোক্র্যাট দলটি নিজ দেশের ক্ষেত্রে কিছুটা উদারপন্থী মনোভাবের জন্য পরিচিত। নাগরিক অধিকার, অভিবাসন, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়ে তাদের উদারপন্থার জন্যে দলটি পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গিয়েছে যে, আমেরিকার শহরাঞ্চলে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন তুলনামূলক ভাবে বেশি। তবে অশিক্ষিত এবং কট্টর মনোভাবের আমেরিকানদের কাছে রিপাবলিকানের সমর্থন কিছুটা বেশি।

এদিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনকে ঘিরে পৃথক জরিপ চালিয়েছে বিশ্বের কয়েকটি প্রভাবশালী গণমাধ্যম। জরিপে জানা যায়, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বাইডেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।

বেশ কয়েকটি জরিপ বলছে, এবার জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন। এনবিসি নিউজ-ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের জরিপ বলছে, ট্রাম্পের চেয়ে ১০ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন বাইডেন। ভোটের মাত্র একদিন আগে স্থানীয় সময় রোববার এ জরিপের ফল প্রকাশ করে এনবিসি ও ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল। খবর সিনহুয়ার।

এনবিসি নিউজ এবং ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের জরিপে দেখা যায়, দেশের নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ৫২ শতাংশ বাইডেনকে এবং ৪২ শতাংশ ভোটার ট্রাম্পকে সমর্থন করে। ২৯ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এই জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, কৃষ্ণাঙ্গ, তরুণ, সিনিয়র নাগরিক, নারী, কলেজ ডিগ্রিধারী শ্বেতাঙ্গ এবং স্বতন্ত্র ভোটারের ক্ষেত্রে বাইডেন ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে ৮৭ শতাংশ বাইডেনকে এবং মাত্র পাঁচ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করে। ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সের তরুণ ভোটারদের মধ্যে ৬০ শতাংশ বাইডেনকে এবং ৩২ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করে। সিনিয়র ভোটারদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ বাইডেনকে এবং ৩৫ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করে।

নারী ভোটারদের মধ্যে ৫৭ শতাংশ বাইডেনকে এবং ৩৭ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানায়। কলেজ ডিগ্রিধারী শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ বাইডেনকে এবং ৪১ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করে। স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যে ৫১ শতাংশ বাইডেনকে এবং ৩৬ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন দেয়।

নির্বাচনপূর্ব এই চূড়ান্ত জরিপে আরো দেখা যায়, ব্যাটলগ্রাউন্ডখ্যাত ১২টি সুইং স্টেটে ট্রাম্পের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বাইডেন। বাইডেন ছয় পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছেন ট্রাম্পের চেয়ে। অঙ্গরাজ্যগুলো হচ্ছে- অ্যারিজোনা, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া, আইওয়া, মইন, মিশিগান, মিনেসোটা, নর্থ ক্যারোলিনা, নিউ হাম্পশ্যায়ার, নেভাদা, পেনসিলভানিয়া ও উইসকনসিন। এসব রাজ্যের ৫১ শতাংশ ভোটার বাইডেনকে এবং ৪৫ শতাংশ ভোটার ট্রাম্পকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানায়।

এদিকে ট্রাম্প কেবল শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের সমর্থনের ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন। শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে ৫১ শতাংশ ট্রাম্পকে এবং ৪১ শতাংশ বাইডেনকে সমর্থন করে। কলেজ ডিগ্রি ছাড়া শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ ট্রাম্পকে এবং ৩৭ শতাংশ বাইডেনকে সমর্থন দেওয়ার কথা জানায়।

যেভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন :

নাগরিকদের সরাসরি ভোটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না; বরং নির্বাচন পদ্ধতি হলো পরোক্ষ। প্রথমে জনগণ ভোট দিয়ে ইলেকটোরাল কলেজ বা নির্বাচকমণ্ডলী নির্বাচন করে। এখানে একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য—ব্যালট পেপারে কিন্তু প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের নাম লেখা থাকে। আর একেক অঙ্গরাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচকমণ্ডলীর নাম উল্লেখ থাকতেও পারে, নাও পারে। জনগণ কোনো নির্দিষ্ট প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অর্থ হলো ওই প্রার্থীর দলের নির্বাচকমণ্ডলী মনোনীত করা। পরবর্তী সময়ে সেই নির্বাচকমণ্ডলী ভোট দিয়ে জনগণের পছন্দের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে নির্বাচন করে।

তবে মার্কিন ফেডারেল আইন অনুযায়ী, নির্বাচকমণ্ডলী কিন্তু জনগণের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে বাধ্য নন। অর্থাৎ নির্বাচকমণ্ডলী চাইলে দলের বাইরে গিয়ে বিরোধী দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ২৪টি অঙ্গরাজ্যের আইনে এই ধরনের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। আর বর্তমান যুগে সচরাচর কোনো নির্বাচককে নিজ দলীয় প্রার্থীর বাইরে অন্য কাউকে ভোট দিতে দেখা যায় না। তাই বলা যায়, জনগণ যে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর নির্বাচকমণ্ডলীকে ভোট দেবে, তিনিই ওই অঙ্গরাজ্যের সব ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যাবেন।

নির্বাচনের দিনক্ষণ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়? :

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম ৬৯ বছর নির্বাচনের জন্য কোনো আলাদা দিন নির্দিষ্ট ছিল না। অঙ্গরাজ্যগুলো তাদের পছন্দসই দিনে ভোটগ্রহণের আয়োজন করত। কিন্তু এর ফলে বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। এই বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ১৮৪৫ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—নভেম্বরের প্রথম সোমবারের পরের দিন মঙ্গলবার সারা দেশে একসঙ্গে ভোট গ্রহণ করা হবে। রোববার নির্বাচনের দিন নির্ধারণ করা হোক, এমন প্রস্তাবও ছিল। কিন্তু সে প্রস্তাব তাৎক্ষণিক বাতিল হয়। কারণ, সেদিন সবাই সাপ্তাহিক প্রার্থনায় অংশ নিতে গির্জায় যায়। সোমবারের কথাও ভাবা হয়েছিল। কিন্তু সেটিও বাতিল হয়ে যায়। কারণ, উনিশ শতকের মাঝামাঝি ওই সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতে হেঁটে বা ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে যাওয়া ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। দূর-দূরান্তের মানুষকে পর্যাপ্ত সময় দিতে অবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, মঙ্গলবারেই ভোট গ্রহণ করা হবে। সেই নিয়ম অনুযায়ী এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ৩ নভেম্বর।

জয় পরাজয় নির্ধারণ হবে যেভাবে :

যেহেতু এবার ডাকযোগে প্রচুর ভোট পড়েছে তাই প্রাথমিক ফলাফলে কে এগিয়ে আছে সেটা বোঝা কঠিন হবে। ধারণা করা হচ্ছে ২০১৬ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার দ্বিগুণ পোস্টাল ভোট পড়েছে।

এসব পোস্টাল ভোট কখন ও কীভাবে গণনা করা হবে তার জন্য একেক রাজ্যে রয়েছে একেক ধরনের আইন। সেকারণে এসব রাজ্য থেকে বিভিন্ন সময়ে ফলাফল পাওয়া যাবে এবং কখনও কখনও সময়ের এই ব্যবধান খুব বেশিও হতে পারে। কিছু কিছু রাজ্যে, যেমন ফ্লোরিডা এবং অ্যারিজোনা, সেখানে পোস্টাল ভোটের গণনা শুরু হয়ে যাবে ৩রা নভেম্বরের ভোটের দিনের আগে। কিন্তু উইসকনসিন ও পেনসিলভানিয়ায় ৩রা নভেম্বরের আগে সেগুলো স্পর্শ করা হবে না। ফলে সেখান থেকে ভোটের ফলাফল দেরিতে আসবে।

এখানে আরো কিছু জটিলতা আছে। পোস্টাল ভোট দেওয়ার সময়সীমা একেক রাজ্যে একেক রকমের। কিছু রাজ্য, যেমন জর্জিয়া, সেখানে ৩রা নভেম্বর পর্যন্ত যেসব ভোট কর্তৃপক্ষের হাতে এসে পৌঁছাবে সেগুলো গণনা করা হবে। কিন্তু অন্যান্য রাজ্য, যেমন ওহাইও, সেখানে ৩ তারিখে ভোট দিলেও (অর্থাৎ খামের মধ্যে ৩রা নভেম্বর সিল থাকতে হবে) সেসব ভোট গণনা করা হবে।

এটা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, কিছু কিছু রাজ্যের সম্পূর্ণ ফলাফল পেতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যাবে। ফলে আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্টের নাম কখন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে সেটা আগে থেকে ধারণা করা কঠিন।

আগের নির্বাচনগুলোতে এরকম হয়নি। ২০০৮ সালে ফলাফল পাওয়া গেছে পূর্বনির্ধারিত সময়ে। আর ২০১২ সালের ফল পাওয়া গেছে নির্ধারিত সময়ের মাত্র ১৫ মিনিট পর। ২০১৬ সালে আরো একটু দেরি হয়েছিল। পেনসিলভেনিয়াতে জয়ী হওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল যে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সূত্র : বিবিসি, সিনহুয়া, সিএনএন।

মন্তব্য করুন