নতুন মাদরাসা শুরু করলেন মাওলানা সলিম উল্লাহ : যা বললেন শুরা বিষয়ে

প্রকাশিত: ৬:২৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩১, ২০২০

ফটিকছড়ি থেকে এম ওমর ফারুক আজাদ :

জামিয়া ফারুকীয়া নাজিরহাট নাম দিয়ে নতুন একটি মাদরাসা শুরু হয়েছে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির নাজিরহাটে। আলোচিত নাজিরহাট বড় মাদরাসা নিয়ে দীর্ঘ সমস্যার একটি সমাধানের পর জামিয়া ইসলামিয়া নছিরুল ইসলাম নাজিরহাট মাদরাসা থেকে সদ্য বহিস্কৃত বিতর্কিত মুহতামিম মাওলানা সলিম উল্লাহ এই মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রায় তিন শত ছাত্র নিয়ে জামাতে নাহুম (মিজান) থেকে দাওরায়ে হাদিস, হিফজ এবং শর্টকোর্স বিভাগ চালুর মাধ্যমে আজ মাদরাসাটির উদ্বোধন ও সবক প্রদান সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

জানা যায় – গত ২৮ অক্টোবর দেশের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া নছিরুল ইসলাম নাজিরহাট মাদরাসায় স্থানীয় এমপি নজিবুল বশার মাইজভাণ্ডারির তত্বাবধানে ও স্থানীয় প্রশাসনের কড়া পাহারায় মাদরাসার শুরা অধিবেশনে সর্বসম্মতক্রমে সিদ্ধান্ত নিয়ে দুর্নীতি ও বিভিন্ন অভিযোগে সদ্য বহিস্কৃত সাবেক বিতর্কিত মুহতামিম মাওলানা সলিম উল্লাহ ও ১৩ জন শিক্ষক মিলে এলাকাবাসীর প্রচেষ্টায় মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। এতে এলাকাবাসী ও সকল শিক্ষকদের সম্মতিক্রমে মাওলানা সলিম উল্লাহকে মুহতামিম হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

আরও পড়তে পারেন :

নাজিরহাট মাদরাসা থেকে ১৩ জন বহিস্কার, হাবিবুর রহমান কাসেমীকে মুহতামিম নির্ধারণ

বাবুনগরী নুরানী বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত, আনাস মাদানীকে অব্যহতি

আজ (৩১ অক্টোবর) উপজেলার নাজিরহাট এফ.টি.ওয়াই কনভেনশন হল’এ মাদরাসার বুখারী শরীফের ওরিয়েন্টেশন ক্লাস উপলক্ষে আয়োজিত এক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নাজিরহাট বড় মাদরাসার সাবেক প্রবীন শিক্ষক মাওলানা নূরুল আলম নছিরী।

এতে বুখারীর সবক প্রদান করেন নতুন মাদরাসার মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস মাওলানা সলিম উল্লাহ নিজেই। অনুষ্ঠানে আশেপাশের এলাকা থেকে বেশ কিছু জনসাধারণ, আলেম ওলামা ও মাদরাসার ছাত্ররা উপস্থিত ছিলেন।

উপজেলার নাজিরহাট ঝংকার মোড়ের উত্তরে আজম রোড়ের মাথায় একটি ভবন ভাড়া নিয়ে অস্থায়ীভাবে মাদরাসাটি শুরু হয়। পরবর্তিতে নিজস্ব ভবনে, নিজস্ব জায়গায় কাজ অগ্রসর করার কথাও বলা হয়।

শিক্ষকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা সালাহ উদ্দীন দৌলতপুরী, মাওলানা ইদ্রিস, মাওলানা মিজান, মাওলানা মাহফুজুর রহমান, মাওলানা আমির হোসাইন, মাওলানা হাবিব উল্লাহ, মাওলানা হারুন প্রমুখ।

এছাড়াও এলাকার প্রতিনিধি পর্যায়ে উপস্থিত ছিলেন আব্দুল্লাহ মেম্বার, ইসমাইল চৌধুরী, জহুর আহমদ কোম্পানি, ফরিদ কোম্পানী, মুক্তিযোদ্ধা জহিরুল আলম কোম্পানি, রুহুল আমিন, মুজাফফর, ইসমাইল (সুয়াবিল), হাসমত উল্লাহ, লোকমান, বশির, জাকের আহমদ, সোলায়মান ।

আরও পড়ুন :

 সরকারের কথায়ই আমি জুনায়েদ বাবুনগরীর পক্ষে আছি : এমপি মাইজভাণ্ডারি

আল্লামা বাবুনগরীর পেছনে সারাদেশ কাতারবন্দি : নজিবুল বশার মাইজভান্ডারী

এদিকে মাওলানা সলিমুল্লাহর শুরু করা নতুন মাদরাসা জামিয়া ফারুকীয়ার প্রথম যাত্রায় তিন শতাধিক ছাত্র নাজিরহাট বড় মাদরাসা থেকে চলে আসার দাবি করা হয়েছে।

তবে দাবিটি অস্বীকার করে নাজিরহাট বড় মাদরাসার সদ্য নিয়োগ পাওয়া মুহতামিম মাওলানা হাবিবুর রহমান কাসেমী পাবলিক ভয়েসকে বলেন – “নাজিরহাট বড় মাদ্রাসা থেকে ৩০০ ছাত্রের চলে যাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভুল এবং মিথ্যা দাবি। এই মাদ্রাসা থেকে এত ছাত্র কখনোই দুর্নীতিবাজ সলিমুল্লাহ মাদ্রাসায় যায়নি বরং মাদ্রাসায় থাকাকালীন সময়ে বেয়াদবি করা এবং মাদ্রাসার বিভিন্ন ছাত্র-শিক্ষকদের গায়ে হাত দেয়া মাওলানা সলিমুল্লাহ সহযোগী কিছু ছাত্ররা সেখানে গিয়ে মাদ্রাসা করার চেষ্টা করেছে। তবে তারা নাজিরহাট মাদ্রাসা থেকে ছাত্রদের ভাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে তিনি জানিয়েছেন।”

ভবিষ্যত পরিকল্পনা বিষয়ে মাওলানা সলিম উল্লাহ বলেন, বর্তমানে দাওরায়ে হাদিসে ১৫ জন ও মিশকাত এ ২৩ জন ছাত্রসহ মিজান জামাত পর্যন্ত প্রায় তিন শত ছাত্র দিয়ে যাত্রা শুরু করেছি। এই বছরের মধ্যে নিজস্ব জায়গায় মাদরাসা ভবন করে উচ্চতর বিভাগ চালু করারও পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমি এলাকার মানুষদের দোয়া ও সহযোগিতা একান্তভাবে কামনা করছি।

মজলিসে শুরা ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর প্রতি বিতর্কিত মাওলানা সলিমউল্লাহর চ্যালেঞ্জ :

এদিকে গত ২৮ তারিখের নাজিরহাট বড় মাদরাসায় অনুষ্ঠিত শুরার রায়কে ব্যাক্তিবিদ্ধেষ চরিতার্থ, পক্ষপাতদুষ্ট ও জুলুম আখ্যায়িত করে মাওলানা সলিম উল্লাহ বলেন, শুরা কিংবা ইসলামী আদালতের শর্তে কা’যা (বিচারের শর্ত) হচ্ছে বাদী-বিবাদীর বক্তব্য শুনা ও আত্মপক্ষ সমর্থন করা। কিন্তু পুলিশি পাহারায় সেদিন আমাদের ঢুকতে না দিয়ে আমাদের অনুপস্থিতিতে যে বহিস্কারাদেশ দিয়েছে সেটা সম্পূর্ণ বে-আইনী ও জুলুম। একই সাথে তিনি বিষয়টির জন্য আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে দায়ি করেও কথা বলেছেন তিনি।

একই সাথে তিনি ২৮ তারিখের শুরা সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ওইদিন শুরার যে ঘোষনাপত্র পাঠ করেছিলেন মাওলানা নূরুল ইসলাম জিহাদী এবং মুফতি আরশাদ রহমানী, মাওলানা খুবাইব জিরি তারা পূর্ব থেকে নাজিরহাট মাদরাসার শুরা সদস্য ছিলেন না। তাদের কখন নিয়োগ দেয়া হয়েছে আর কে নিয়োগ অনুমোদন করেছে? এভাবে বাহির থেকে লোক এনে শুরা সদস্য নাম দিয়ে জোরপূর্বক সিদ্ধান্ত নেয়া এটা উসুলে দেওবন্দের কোথায় আছে?

তিনি বর্তমান শুরাকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে জানান, শুরা সদস্যদের মধ্যে অনেকেই মুরুব্বি আছেন কিন্তু তাদের প্রতি সম্মান রেখে বলছি সাংবাদিক ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে আমার সাথে বসুন। আমি একা থাকবো। আপনাদের সকল ধরণের প্রশ্ন ও আপত্তির জবাব দিতে প্রস্তুত আছি। কিন্ত বৈধ পন্থা বাদ দিয়ে আপনারা যে অবৈধ শুরা করেছেন তা জুলুম ও তার জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

তবে এ বিষয়ে নাজিরহাট বড় মাদরাসার শুরার সাথে সংশ্লিষ্ট একজন পাবলিক ভয়েসকে বলেন – “বিষয়গুলোর সুষ্ঠু সমাধান হয়ে গেছে মজলিসে শুরার সর্বসম্মতিক্রমে সবকিছুর একটি গোছালো সিদ্ধান্ত হয়েছে নাজিরহাট বড় মাদ্রাসা ও অত্যন্ত সুচারুভাবে পরিচালিত হচ্ছে প্রশাসন থেকে নিয়ে সবাই বিষয়টিতে আন্তরিকতা দেখেছেন এবং মজলিসে শুরার সিদ্ধান্তের ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়েছেন এখন এসে বহিষ্কৃতরা কি বলল না বলল তা নিয়ে আমরা ভাবনা এবং এসব বিষয়ে আমরা কোন উত্তর দিতেও রাজি না তবে নাজিরহাট বড় মাদ্রাসায় কোন অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইলে সে বিষয়ে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি অবশ্যই থাকবে।”

একই সাথে মাওলানা সলিমউল্লাহ হাটহাজারী মাদরাসার শাইখুল হাদীস, হেফাজত মহাসচিব ও বাবুনগর এলাকার বাসিন্দা আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর প্রতি ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন – আমি আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর প্রতিপক্ষ হিসেবে কখনো ছিলাম না এমনকি আমি কখনো আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে প্রতিপক্ষ হিসেবেও দেখিনাই। তবে বাবুনগর মাদরাসার ঘটনায় এসে তিনি হিংসা বিদ্ধেষ প্রকাশ করেছেন আমার প্রতি।

তিনি আরও বলেন – জুনায়েদ বাবুনগরী হিংসার হাদিস পড়ালেও নিজের মধ্যে সে আমল নাই। হাটহাজারী মাদরাসা থেকে তাকে বহিস্কারের মত যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা আমি আটকিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমার সাথে হিংসার প্রতিদান দিয়েছেন। বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন – কাজিরহাট বাজার মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা জুনায়েদ, মাওলানা হারুন আজীজি ও বাবুনগরীর কাছের ছাত্র মাওলানা সলিম উল্লাহ দৌলতপুরীকে পাঠিয়ে আমিই আল্লামা আহমদ শফী রহঃ এর সাথে দূরত্ব কমিয়ে এনে তার উপকার করেছিলাম। নয়ত হাটহাজারী থেকে জুনায়েদ বাবুনগরীকে বহিস্কার করা হতো কিন্তু তার প্রতিদানে তিনি আমার সাথে যা করলেন তা অত্যন্ত নিন্দনীয়।

অপরদিকে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর ব্যাপারে মাওলানা সলিমুল্লাহ কর্তৃক আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও তার প্রতি বিদ্ধেষ প্রকাশ থেকে করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অনেকে। তবে বিষয়টি নিয়ে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের বক্তব্য নিতে চাইলে তারা বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা বলেননি বরং আল্লামা বাবুনগরীর সাথে সরাসরি সাক্ষাত করে বিস্তারিত জানার অনুরোধ করেছেন। পাবলিক ভয়েসের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বক্তব্য নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের চেষ্টা করা হবে বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন : 

মাদরাসা রক্ষার জন্যই আমি আল্লামা শফীর বিরুদ্ধে মামলা করেছি : মুফতী হাবিবুর রহমান

নাজিরহাট মাদরাসায় গোলযোগ : যা বলছেন মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী

আল্লামা শফীর বিরুদ্ধে মামলা : আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর প্রতিবাদ বিবৃতি

মন্তব্য করুন