হাসান ইবনে সাবার প্রেতাত্মাদের থেকে সাবধান হোন

ইসলামী আন্দোলন ও সমমনা ইসলামী দল বিতর্ক

প্রকাশিত: ৯:২০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০২০

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা হলো জঙ্গে জামাল, জঙ্গে সিফফিন এবং হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর মধ্যকার “মুশাজারাত” এর ঘটনা। (একই গাছের ডালগুলো বাতাসের প্রভাবে একে অন্যের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার পরিস্থিতিকে মুশাজারাত বলে)। আমরা এই দুই মহান সাহাবীর মধ্যকার বিষয়াবলীকে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও তাদের প্রতি পূর্ব উচ্চ ধারণা নিয়ে বিচার করি। ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে না। যেমনটা পাকিস্তানের একজন তাত্ত্বিক করেছেন। সেজন্যই মুশাজারাত বলা।

আরও পড়ুন : পৃথক পৃথক সমাবেশ : নেপথ্য ঘটনা ও সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচনা-সমালোচনা

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক এই মুশাজারাতের পেছনে প্রধান দায় ছিলো একদল কুচক্রীর। যারা উভয় দলে অনুপ্রবেশ করে হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার কট্টর অনুসারী সেজে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে অবিরাম মিথ্যা প্রচারণা চালাতো। এই কুচক্রী “পঞ্চম বাহিনী”র সমস্বরে অবিরাম মিথ্যা প্রচারণায় ইসলামের ইতিহাসের সেরা দুই সমরনায়কের মাঝে দূরত্ব বেড়েছে। এবং অসীম বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটেছে।

হাসান ইবনে সাবার সেই প্রেতাত্মা বাহিনী ইসলামের ইতিহাসে বারংবার দেখা গেছে। তারা সর্বদাই উদীয়মান ইসলামী শক্তির বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে প্রচারণা চালায় এবং এক ইসলামী শক্তিকে অন্য ইসলামী শক্তির মোকাবেলায় দাঁড় করিয়ে দেওয়ার জন্য তিলকে তাল বানিয়ে অশুভ প্রচারণা চালিয়ে যায়।

ইসলামপন্থীদের মাঝে ফাটল সৃষ্টি করতে ও ফাটল জিইয়ে রাখতে তারা চক্রান্ত করে এমনকি ফাটল বৃদ্ধিতে প্রাণপন চেষ্টা করে। এদের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো, দলের নেতার বা আদর্শের প্রতি এরা অতি ভক্তি প্রদর্শন করে অন্য ইসলামী শক্তির বিরুদ্ধে বিষোদগার করে। এরা মাঠের সামান্য জিনিসকে রংচং মাখিয়ে তাকে এক দলের বিরুদ্ধে অন্য দলের পদক্ষেপ আকারে উপস্থাপন করে। পরস্পরকে অবিরাম উস্কানি দেয়।

এই হাসান ইবনে সাবার প্রেতাত্মারা দলের কর্মী, ইন্টেলেকচুয়াল পার্সন, শুভাকাঙ্ক্ষীর বেশ ধারন করে ইসলামী দলগুলোর মাঝে ফাটল সৃষ্টি করতে, জিইয়ে রাখতে ও বৃদ্ধি করার কাজ করে। এদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল এরা কোন ইসলামী সংগঠনেই সক্রিয় কাজ করে না। এদের কাজই শুধুমাত্র তিলকে তাল বানানো। পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো। পরস্পরকে উস্কে দেয়া।

এদের সঙ্গবদ্ধ প্রচারণার প্রভাব খুবই মারাত্মক। আব্দুল রহমান ইবনে আবু বকরের মতো সাহাবাও তাদের মিথ্যা প্রচারণায় প্রভাবিত হয়েছেন।

বাংলাদেশেও হাসান ইবনে সাবার এর প্রেতাত্মারা বিদ্যমান। এবং এখন ফেসবুকের কল্যাণে তারা অতি মাত্রায় তৎপর। এই কুচক্রি বাহিনী ইসলামপন্থী দলগুলোর মাঝে বিষাক্ত কাঁটা হয়ে কাজ করছে।

এদের বিষাক্ত থাবার সর্বশেষ ক্ষেত্র হলো গত শুক্রবার বাইতুল মুকাররমে ধর্ষণের প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশোত্তর পরিস্থিতি।

গত ১৬ ই অক্টোবর বাংলাদেশের ইসলামপন্থার এক উজ্জ্বল দিন। অনেকগুলো কারণেই এই দিন হতে পারতো একটি স্মরণীয় দিন।

প্রথমত, অনেকদিন পরে ইসলামপন্থী দলগুলো জোট-মহাজোটের বাইরে এসে নিজস্ব ব্যানারে সমাজ কেন্দ্রীক ও সরকারবিরোধী ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি পালন করেছে। সমমনা ৬ দলের দলগুলো নানা বাস্তবতায় পরস্পর যুদ্ধোম্মুখ দুই জোটের অংশ ছিলো। আলহামদুলিল্লাহ এই তারিখে তারা তাদের জোট-মহাজোটের সূত্রের বাইরে এসে রাজনৈতিক ইস্যুতে একক ব্যানার দাঁড় করিয়েছে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী সংগঠন খেলাফত মজলিসের দুই ধারা (অংশ বলে বিভেদ আকারে দেখাতে চাইনা) একত্রে একই ব্যানারে এসেছেন।আমরা ছাত্র পর্যায়ে জানি যে, এই দুই ধারা একত্রে তৃতীয় কোনো সংগঠনের দাওয়াতেও উপস্থিত হন না। সেখানে ১৬ অক্টোবর এক বিরল ঘটনার জন্ম দিয়েছে।

তৃতীয়ত, দেশের ইসলামপন্থা এই দিনে সময়কে ধারণ করে ধর্ষণ, দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতির মতো জীবন ঘনিষ্ঠ বিষয়ে কথা বলেছে।

চতুর্থত, এই দিনে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে অনেকটা যুগপৎ আন্দোলনের আদলে দীর্ঘদিন ধরে ইসলামপন্থার একক স্রোত তৈরিতে একক মনোযোগ দেয়া ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ ও সমমনা ছয় দল একই সাথে একই দিনে কাছাকাছি স্থানে বিশাল আকারের সমাবেশ করেছে।

পঞ্চমত, একই ইস্যুতে একই দিনে একই সময়ে দুই দুইটি বিশাল জনসমাবেশ এই ধারণা জন্ম দিয়েছে যে, বাংলাদেশের ইসলামপন্থা বহুমাত্রিক। এবং এর সবগুলো মাত্রাই বিশাল।

ষষ্ঠত, সবাই ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজে পশ্চিমা সাংস্কৃতিকে দ্বায়ী করছে এবং সবাই বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছে। ইসলামী শক্তির এই বহুমাত্রিক উপস্থাপন শত্রুর কপালে ঘাম এনে দিয়েছে।

হাসান ইবনে সাবার প্রেতাত্মারা ইসলামপন্থার এই আশাব্যঞ্জক উপস্থাপনাকে সহ্য করতে পারে নি। জঙ্গে সিফফিনে যখন হজরত আলী ও মুয়াবিয়া রাঃ এর ঐক্য প্রচেষ্টাকালীন সময়ের মতো এই সময়ের হাসান ইবনে সাবার প্রেতাত্মারাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা এতো দূরদর্শী একটা আয়োজনকে বিভেদ আকারে দেখাতে চায়। তারা এখানে সস্তাসব যুক্তি সামনে এনে ইসলামপন্থার মাঝে বিদ্বেষের কুৎসিত নহর বইয়ে দিয়েছে।

১৬ অক্টোবরকে যদি রাজনৈতিক গভীরতা, দূরদর্শিতা ও কল্যাণকামিতার দৃষ্টিতে দেখে যায় তাহলে ১৬ অক্টোবর একটি উজ্জ্বল দিন। আর যদি হাসান ইবনে সাবার দৃষ্টিতে দেখা যায় তাহলে এখানে অনেক বিভেদ খুঁজে পাওয়া যাবে। ব্যানারের রং, টুপির ও পাঞ্জাবির ভিন্নতা, দুই স্থানে সমাবেশ ইত্যাদি সব কিছুতেই বিভেদের উপকরণ বানিয়ে ইসলামী শক্তির মাঝে ফাটল সৃষ্টি করা জিইয়ে রাখা ও বৃদ্ধির কাজ করা যাবে। হাসান ইবনে সাবার এদেশীয় প্রেতাত্মারা তাই করেছে।

১৬ অক্টোবর ইসলামী দুইটি শক্তি একই ভেন্যুতে সমাবেশ করেছে। সমাবেশের ঘোষণা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আগেই দিয়েছে। এটা প্রমাণিত সত্য। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কাছে এই ধরনের সমাবেশ নিয়মিত কর্মসূচি। তারা এই ধরনের সমাবেশের প্রচারণা দুই এক দিন আগেই করে থাকে। সমমনা ছয় দলও একই স্থানে সমাবেশ আহ্বান করেছে। এটা করাটা দোষের না। কারণ ধর্ষনের পরে এটাই ছিলো প্রথম শুক্রবার। ফলে এই শুক্রবারে একাধিক বিক্ষোভ হবে সেটাই তো স্বাভাবিক।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ঘোষণাটি শুনতে ক্লিক করুন 

এখানে কে আগে ঘোষণা করেছে আর কে পরে করেছে এটা কোন ব্যাপার না। তারপরেও আয়োজনের সৌন্দর্যের জন্য উভয়ই ধারার নেতারা পরস্পর বোঝাপড়ায় এসেছেন। এই বোঝাপড়ায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চেয়েছিল নামাজের পরে মিছিল নিয়ে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু সমমনা ছয় দলের প্রতিনিধি আগে মিছিল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলে তাই গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত ছিল ছয় দল মিছিল নিয়ে বেড়িয়ে যাবে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ উত্তর গেটে সমাবেশ করবে। আলহামদুলিল্লাহ সেটাই হয়েছে।

ধর্ষণের বিরুদ্ধে উত্তেজিত হাজার হাজার কর্মীরা নামাজের পরপরই স্লোগানে ফেটে পড়ে। এটা নিছকই ক্ষোভ থেকে উৎসারিত শ্লোগান। এই শ্লোগান মাঠ দখল করার শ্লোগান না। কারণ মাঠ দখল করার মতো অবস্থা নাই। উভয় সংগঠনের কর্মীরাই তাদের মিছিলের ও সমাবেশের স্থান জানে। একদল মিছিল নিয়ে বেড়িয়ে গিয়ে সমাবেশ করবে, আরেক দল সমাবেশ করে মিছিল করবে। কিন্তু সাবার গোষ্ঠি ধর্ষণের ক্ষোভে উৎসারিত শ্লোগানেও বিভেদ খুজে পেয়েছে।

তারপরেও উত্তেজনাবশত কোন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয় কিনা এই আশংকায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান সাহেব মাইকে বারংবার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে সুন্দরভাবেই ছয়দল মিছিল নিয়ে বেড়িয়ে গেছে। ইসলামী আন্দোলন সমাবেশ করেছে।

ধর্ষণের বিরুদ্ধে উত্তেজিত হাজার হাজার জনতার সেই বিক্ষোভ চমৎকারভাবে শেষ হয়েছে, মিডিয়াগুলোও ১৬ তারিখের মিছিল-সমাবেশকে
ইসলামপন্থীদের সম্মিলিত ক্ষোভ আকারে দেখেছে।

উভয় দলের কোন দায়িত্বশীল পর্যায়ের কোন নেতাও এখানে সমস্যার কথা উল্লেখ করেন নি।

কিন্তু সমাবেশের পর থেকেই হাসান ইবনে সাবার উত্তরসুরীরা ফেসবুকে কাঁদা ছোড়াছুড়ির নোংরা খেলা শুরু করেছে। এতো বড় একটা অর্জনের ইতিবাচক দিকগুলো ভুলিয়ে অমূলক-অহেতুক বিষয় সামনে এনে নেতিবাচক প্রচারনায় মেতে উঠেছে। সমাজে ইসলামপন্থীদের সম্পর্কে মিথ্যা বিরোধের চিত্র উপস্থাপন করছে। ইসলামপন্থাকে কলংকিত করছে।

এই সাবাই গোষ্টি গোটা ইসলামের জন্য ক্ষতিকর। এরা কোন ইসলামী শক্তির বন্ধু না। এরা সত্য কথাকেও খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। আর মিথ্যা, বিদ্বেষ চর্চা, ট্রল করা এদের হাতিয়ার। এরা সর্বদাই একজনকে অন্যজনের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়। এরা ভাইয়ে ভাইয়ে সমঝোতা করতে দেয় না বরং পরস্পরের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে।

এখন সময় এসেছে এদেরকে চিহ্নিত করার। এদেরকে চিহ্নিত করে প্রতিহত করতে হবে। এদের থেকে উম্মাহকে রক্ষা করতে হবে। এদের প্রচারনায় কান দেয়া যাবে না।

যদি এটা করা যায় তাহলেই কল্যাণ। অন্যথায় এরা আবারো জঙ্গে সিফফিন ঘটিয়ে ফেলবে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

বি.দ্র. : এখানে কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়ে রাখা ভালো।

১. ইসলাম তার সকল কার্যক্রম মসজিদ থেকেই করেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদ থেকে যুদ্ধের যাত্রা করতেন এবং যুদ্ধ থেকে আবার মসজিদেই ফিরে আসতেন। সেজন্য ইসলামপন্থীদের বাইতুল মোকাররম কেন্দ্রীক হওয়াই স্বাভাবিক। যারা এটাকে নিন্দার চোখে দেখেন তারা আদতে পশ্চিমা সেকুলারিজম দ্বারা প্রভাবিত।

২. ধর্ষণকাণ্ডের পরেই ১৬ তারিখই প্রথম শুক্রবার ছিলো। ফলে সেদিনই সবাই মিছিল করবে এটাই স্বাভাবিক।

৩. বাংলাদেশে যারা “এক ব্যানারে সবাই” ধরনের ঐক্য চিন্তা করেন তারা এদেশের ইতিহাস সম্পর্কে জানেন না। এখানে ব্যানার, দল ও জোটের ঐক্য টিকে নাই। খেলাফত আন্দোলন, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, হেফাজতে ইসলাম ও ঐক্যজোটসহ যতগুলোর নাম আপনি বলতে পারেন সবগুলোতেই ঐক্যের পরে মহা বিভেদ এসেছে। সেই বিভেদে কার কি দায় ছিলো সেটা অন্য আলোচনা। কিন্তু ব্যানারের ঐক্য যে টেকসই হয় না এটা প্রমানিত। তাই বাংলাদেশের ইসলামপন্থায় ব্যানারের ঐক্য নিয়ে চেষ্টাই করা উচিৎ না। বরং যার যার দলে থেকে “নীতিগত” ভাবে এক থাকাই হবে কার্যকর পন্থা।

[পাবলিক ভয়েসের মতামত কলামে প্রকাশিত যে কোন লেখার দায়ভার লেখকের নিজের। পাবলিক ভয়েস কর্তৃপক্ষ বা সম্পাদনা পরিষদ এ লেখার দায়ভার গ্রহণ করে না।]

মন্তব্য করুন